আল কোরআনের বাংলা অনুবাদে আল্লাহ্র প্রসঙ্গে 'আমি'-এর পরিবর্তে 'আমরা' শব্দটি ব্যবহারের কারণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর একটি বিশেষ ভাষাগত ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি কোনোভাবেই আল্লাহ্র বহুত্ব বা একাধিক সত্তা বোঝায় না।
এর মূল কারণগুলো নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
এসংক্রান্ত ১টি ভিডিও নিচের দিকে দ্র:
১. রাজকীয় বহুবচন (The Royal "We" বা Pluralist Majestics):
আরবি ভাষায়, যেমনটা ইংরেজি এবং অন্যান্য অনেক ভাষায় প্রচলিত, সম্মান, মর্যাদা, ক্ষমতা এবং মহত্ত্ব প্রকাশ করার জন্য বক্তা নিজের জন্য 'আমি' (أنا - আনা) এর পরিবর্তে 'আমরা' (نحن - নাহনু) ব্যবহার করে। একে "রাজকীয় বহুবচন" বলা হয়।
উদাহরণ: একজন রাজা বা শাসক যখন কোনো ঘোষণা দেন, তখন তিনি বলতে পারেন, "আমরা আদেশ দিচ্ছি যে..."। এখানে 'আমরা' বলতে রাজা একা নিজেকেই বোঝান, কিন্তু তার পদের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব প্রকাশ করার জন্য এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা হলেন সমগ্র বিশ্বজগতের একচ্ছত্র অধিপতি, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। তাই যখন তিনি তাঁর সৃষ্টি, ক্ষমতা, আইন বা বড় কোনো কাজের কথা বলেন, তখন তিনি এই রাজকীয় বহুবচন 'আমরা' ব্যবহার করেন, যা তাঁর অসীম মহত্ত্ব, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিকে তুলে ধরে।
এখানে 'আমরা' ব্যবহার করে বোঝানো হয়েছে যে, কোরআন অবতীর্ণ করা একটি অত্যন্ত মহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যা সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এসেছে।
২. কাজের ব্যাপকতা ও সংশ্লিষ্টতা:
অনেক সময় আল্লাহ্ যখন 'আমরা' ব্যবহার করেন, তখন তিনি তাঁর কাজে নিযুক্ত অন্যান্য শক্তিকেও (যেমন ফেরেশতা) অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা তাঁরই আদেশে কাজ করে। তবে মূল কর্তা এবং আদেশদাতা একমাত্র আল্লাহ্।
উদাহরণ: আল্লাহ্ বলেন, "আমরাই তো এই উপদেশবাণী (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমরাই এর রক্ষক।" (সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯)
এখানে কোরআন নাজিল করার কাজে জিবরাঈল (আঃ) বাহক হিসেবে কাজ করেছেন এবং এর সংরক্ষণে ফেরেশতারা নিযুক্ত আছেন—কিন্তু সবাই আল্লাহ্র হুকুমেই পরিচালিত। 'আমরা' শব্দটি এই কাজের বিশালতা এবং আল্লাহ্র সার্বভৌম কর্তৃত্বকে প্রকাশ করে, যেখানে তাঁর আদেশে বিভিন্ন শক্তি কাজ করছে।
'আমি' শব্দের ব্যবহার:
কোরআনে যখন আল্লাহ্ তাঁর একক সত্তা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ইবাদত গ্রহণ বা দয়ার কথা বলেন, তখন তিনি 'আমি' (أنا) শব্দটি ব্যবহার করেন। এটি বান্দার সাথে আল্লাহ্র সরাসরি ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে বোঝায়।
কোরআনের উদাহরণ:
আর যখন আমার বান্দারা তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে আমি তো তখন নিকটেই। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা আমার জন্য সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক। তাহলেই তারা আলোকিত হবে। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৬)
এখানে বান্দার প্রার্থনার জবাবে আল্লাহ্ সরাসরি 'আমি' ব্যবহার করেছেন, যা তাঁর দয়া ও বান্দার প্রতি ব্যক্তিগত নৈকট্যকে প্রকাশ করে।
নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত করো। (সূরা ত্বহা, আয়াত: ১৪)
এখানে তাওহীদ বা একত্ববাদের ঘোষণা দ্ব্যর্থহীনভাবে 'আমি' শব্দ দিয়ে করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপ:
'আমরা' (نحن): এটি রাজকীয় বহুবচন। এটি আল্লাহ্র মহত্ত্ব, ক্ষমতা, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব প্রকাশ করে। এটি কোনোভাবেই বহু ঈশ্বর বা অংশীদারিত্ব বোঝায় না।
'আমি' (أنا): এটি আল্লাহ্র একক সত্তা, তাওহীদ, এবং বান্দার সাথে তাঁর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক (যেমন: দোয়া কবুল করা, ক্ষমা করা) প্রকাশ করে।
সুতরাং, কোরআনে 'আমরা' শব্দের ব্যবহার আল্লাহ্র বহুত্বকে বোঝায় না, বরং এটি আরবি ভাষার একটি অলংকারিক রীতি যা আল্লাহ্র অসীম ক্ষমতা, মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বকে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে প্রকাশ করে।