‘সালামুন আলাইকুম’ বনাম ‘আসসালামু আলাইকুম’: "রাসূলের সুন্নাহ" বনাম "সুন্নাতিল্লাহ" (আল্লাহর সুন্নাহ)! আমি এখন কোন দিকে যাব? 🧭 So, which way do we go?

সালাম দেয়া বা অভিবাদনের নির্দেশ ও তার ভাষা:

আল্লাহ বিশ্বাসীদের অভিবাদন জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর ভাষা কী হবে, তাও উল্লেখ করেছেন।

▓▒░ কুরআনের আলোকে অভিবাদন (সালাম) ░▒▓

সালাম প্রদান: "সালামুন আলাইকুম"
➥ (আয়াত রেফারেন্স- ৬:৫৪)

সালামের উত্তর (সমপরিমাণ): "সালামুন আলাইকুম"
➥ (আয়াত রেফারেন্স- ৪:৮৬)

উত্তমরূপে উত্তর প্রদান: "সালামুন আলাইকুম তিবতুম মুবারাকাতান ত্বায়্যিবাহ"
➥ (আয়াত রেফারেন্স- ৩৯:৭৩ এবং ২৪:৬১)

সতর্কতা: বিকৃত সম্ভাষণ বা ভুল উচ্চারণে সালাম দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
➥ (আয়াত রেফারেন্স- ৫৮:৮)


▓▒░ এবারে বিস্তারিত ░▒▓

সূরা আল-আন‘আম-আয়াত ৬:৫৪:

আর যখন তোমার কাছে তারা আসে, যারা আমার আয়াতসমূহের ওপর ঈমান আনে, তখন তুমি বলো, সালামুন আলাইকুম । তোমাদের রব তাঁর নিজের ওপর দয়াকে আবশ্যক করে নিয়েছেন।  

নিচের দিকে একটি ভিডিও রয়েছে:

আল-কোরআন অনুধাবনে আমরা ‘সালাম’ আদান-প্রদানের বিবিধ রূপ, প্রয়োগ ও তাৎপর্য দেখতে পাই। আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর কালিমা বা শব্দের কোনো পরিবর্তনকারী নেই (৬:১১৫, ১০:৬৪)।

এই নীতির আলোকে, আল্লাহর শেখানো সম্ভাষণ ‘সালামুন আলাইকুম’-এর পরিবর্তে অন্য কোনো রূপের প্রচলন কীভাবে হলো—এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়।

আমাদের নিজস্ব কোনো ব্যাখ্যা নয়, দেখা যাক এ বিষয়ে কেবলমাত্র আয়াতগুলো আমাদের কী তথ্য দেয়। তাহলে বোঝা যাবে, ‘সালামুন আলাইকুম’ বলা নতুন কোনো ফিতনা বা বিদআত কি না, নাকি এটি কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ, যা অনুসরণ না করাটাই বরং প্রশ্নবিদ্ধ।


সালামুন আলাইকুম’-এর ব্যবহার: আল-কোরআনের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে-

১. আয়াতে বিশ্বাসী মুসলিমদের প্রতি আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ: ‘সালামুন আলাইকুম(আয়াত ৬:৫৪)

আল্লাহ তাঁর রাসূল (সা.)-কে ঈমানদারদের স্বাগত জানানোর জন্য সরাসরি এই বাক্যটি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।

২. মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের সম্ভাষণ: ‘সালামুন আলাইকুম(আয়াত ১৬:৩২)

মুমিনদের রুহ কবজ করার সময় ফেরেশতারা এই পবিত্র সম্ভাষণটিই উচ্চারণ করেন।

৩. জান্নাতে প্রবেশের সময় অভ্যর্থনা: ‘সালামুন আলাইকুম(আয়াত ৩৯:৭৩)

জান্নাতের রক্ষীরা পুণ্যবানদের অভ্যর্থনা জানিয়ে বলবে, ‘সালামুন আলাইকুম’।

৪. আ'রাফের অধিবাসীদের সম্ভাষণ: ‘সালামুন আলাইকুম’ (আয়াত ৭:৪৬)

আ'রাফের অধিবাসীরা জান্নাতীদের দেখে সম্মান সহকারে ‘সালামুন আলাইকুম’ বলে সম্ভাষণ জানাবে।

৫. অজ্ঞদের কথার জবাবে করণীয়: ‘সালামুন আলাইকুম’ (আয়াত ২৮:৫৫, ২৫:৬৩):

অজ্ঞদের অনর্থক কথার জবাবে বিতর্কে না জড়িয়ে, তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে শান্তি (‘সালাম’ বা ‘সালামুন আলাইকুম’) বলাই হলো কোরআনের নির্দেশিত পন্থা।

৬. হিদায়াত তথা নাযিলকৃত আয়াত অনুসারীদের প্রতি সালাম: ‘ওয়াস-সালামু ‘আলা মানিত্তাবা‘আল হুদা(আয়াত ২০:৪৭)

যারা আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে, তাদের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা ঘোষণা করতে এই বিশেষ বাক্যটি ব্যবহৃত হয়েছে।


২. সালামের উত্তর বা অভিবাদনের জবাব দেওয়ার নিয়ম (মূলনীতি): 

কোরআন কেবল অভিবাদন জানানোর কথাই বলেনি, বরং এর জবাব কীভাবে দিতে হবে, সে বিষয়েও একটি সুস্পষ্ট মূলনীতি দিয়েছে। সালামের উত্তর দেওয়ার প্রধান এবং একমাত্র মূলনীতিটি সূরা আন-নিসা-তে উল্লেখ করা হয়েছে:

"আর যখন তোমাদেরকে কোনো অভিবাদন জানানো হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম পন্থায় তার জবাব দাও অথবা (কমপক্ষে) তারই মতো করে জবাব দাও। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর হিসাব গ্রহণকারী।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৮৬)

এই আয়াতটি একটি সুযোগ উন্মুক্ত করে যে, প্রাপ্ত অভিবাদনের চেয়ে আরও সুন্দর ও উত্তম কিছু যোগ করে জবাব দেওয়া যেতে পারে।

এই আয়াত থেকে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা যায়:

 উত্তরটি সালামের চেয়ে উত্তম হতে হবে।

 অথবা অন্ততপক্ষে, যে সম্ভাষণ করা হয়েছে, সমপর্যায়ে তার উত্তর দিতে হবে।

📍এবং কেউ তোমাদেরকে সালাম দিলে তাকে বলো না যে, ‘তুমি মুমিন নও’-4:94

  。゚: *. .* :

৩. কোরআনে ব্যবহৃত সালাম/ অভিবাধন/ সম্ভাষণ ও তার প্রয়োগ:

আল-কোরআনে ফেরেশতা, নবীগণ এবং জান্নাতী বান্দাদের সম্ভাষণের উদাহরণ রয়েছে। এগুলোকে ভিত্তি ধরে উত্তর দেওয়া যেতে পারে। কোরআনে ব্যবহৃত মূল সম্ভাষণটি হলো "সালামুন আলাইকুম" (سَلَامٌ عَلَيْكُمْ)

দৃশ্যকল্প ১: সমপর্যায়ে উত্তর দেওয়া-

কেউ যদি সম্ভাষণ করে: "সালামুন আলাইকুম"কোরআনের নীতি অনুযায়ী তার সমপর্যায়ের উত্তর হবে: "সালামুন আলাইকুম" (আপনাদের উপরও শান্তি বর্ষিত হোক)।

এই সম্ভাষণটি আল্লাহ্‌ তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য ব্যবহার করেছেন:

"...যখন তোমার কাছে তারা আসে, যারা আমার আয়াতসমূহে ঈমান আনে, তখন তুমি বলো: ‘সালামুন আলাইকুম’..." – সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৫৪

দৃশ্যকল্প ২: উত্তমভাবে উত্তর দেওয়া:

কেউ যদি সম্ভাষণ করে: "সালামুন আলাইকুম"। কোরআনের নীতি অনুযায়ী উত্তম উত্তর দেওয়ার জন্য এর সাথে অন্য কোনো শুভ বাক্য যোগ করা যেতে পারে।  সূরা যুমার-এ জান্নাতীদের উদ্দেশ্যে ফেরেশতাদের সম্ভাষণ থেকে এর ধারণা পাওয়া যায়:

"সালামুন আলাইকুম তিবতুম ..."

তোমাদের উপর শান্তি। তোমরা উত্তম ছিলে, সুতরাং স্থায়ীভাবে এতে (জান্নাতে) প্রবেশ কর-সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৭৩

অতএব, উপরের আয়াত থেকে সাহায্য নিয়ে উত্তম উত্তর এভাবে সাজানো যায়:

উত্তম উত্তর (ক): সালামুন আলাইকুম তিবতুম। (আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, আপনারা পবিত্র থাকুন)।

উত্তম উত্তর (খ): কোরআনের বিভিন্ন স্থান থেকে উত্তম ও পবিত্র কথা (ত্বায়্যিবাহ) যোগ করে উত্তরটিকে আরও সুন্দর করা যায়। যেমন: সালামুন আলাইকুম তিবতুম মুবারাকাতান ত্বায়্যিবাহ! (আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আপনারা পবিত্র, বরকতময় ও উত্তম জীবন যাপন করুন!)।

সুতরাং, কোরআনের আলোকে সালামের উত্তর দেওয়ার সারসংক্ষেপ হলো: ন্যূনতম উত্তর হলো "সালামুন আলাইকুম" এবং উত্তম উত্তর হলো এর সাথে "তিবতুম" বা অন্য কোনো কল্যাণকর ও পবিত্র কথা যোগ করা। (আয়াত ৬:৫৪/৩৯:৭৩+২৪:৬১)।

  。゚: *. .* :

১. سَلَامٌ عَلَيْكُمْ  

   “সালামুন আলাইকুম” -সূরা আল-আন‘আম ৬:৫৪  

২. سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ   

    সালামুন আলাইকুম, তিবতুমৃ-সূরা আয-যুমার ৩৯:৭৩  

৩. مُبَارَكًۭا طَيِّبًۭا  

 “মুবারাকান ত্বায়্যিবাহ” -সূরা আন-নূর ২৪:৬১

..............................................................

সালামের উত্তরে কি হবে:

"আর যখন তোমাদেরকে কোনো অভিবাদন জানানো হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম পন্থায় তার জবাব দাও অথবা (কমপক্ষে) তারই মতো করে জবাব দাও। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর হিসাব গ্রহণকারী।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৮৬)

আয়াতে বিশ^াসী কেউ একজন ’সালামুন আলাইকুম” বলে সম্ভাষন করলে এই আয়াত অনুসরনে আপনি  তাঁকে সালামের উত্তরে “সালামুন আলাইকুম” বলতে পারেন অথবা সালামুন আলাইকুম তিবতুম  অথবা ’সালামুন আলাইকুম, তিবতুমৃ মুবারাকান ত্বায়্যিবাহ’ বলতে পারেন।  অথবা কাউকে সালাম দিলেও একই সিসটেম ফলো করতে পারেন। ১নং অথবা ১নং+২ অথবা ১নং+২নং+৩নং সালাম।

。゚: *. .* :.

সালামুন আলাইকুম- দুনিয়াতেই অনুশীলন বা practice কেন?

সূরা আল-আন‘আমের ৫৪ নম্বর আয়াতঅনুধ্যান অনুযায়ী এই আয়াতের তাৎপর্য:

আসুন, প্রথমে আয়াতটি দেখি:

وَإِذَا جَاءَكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِنَا فَقُلْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ ۖ كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَىٰ نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ ۖ أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنكُمْ سُوءًا بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِن بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

"আর যখন তোমার কাছে তারা আসে, যারা আমার আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনে, তখন তুমি বল, ‘সালামুন আলাইকুম!’। তোমাদের রব তাঁর নিজের উপর রহমত (দয়া) লিখে নিয়েছেন (কাতাবা) যে, তোমাদের মধ্যে যে কেউ অজ্ঞতাবশত কোনো মন্দ কাজ করে, তারপর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তবে নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৬:৫৪)

এই আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়:

১. এটি সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ: আল্লাহ সু. তা‘আলা তাঁর রাসূল-কে সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যখনই কোনো বিশ্বাসী (মুমিন) তাঁর কাছে আসবে, তখন তিনি যেন তাদেরকে "সালামুন আলাইকুম" বলে অভ্যর্থনা জানান।

২. নবী (সা.)-এর মাধ্যমে অনুশীলন:  "সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে" - এই কথার ভাবার্থ হলো, এই সালামের অনুশীলন নবী করীম (সা.)-এর মাধ্যমেই কওমের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আল্লাহ তাঁকে এই শিক্ষা দিয়েছেন এবং তিনি তা পালন করে দেখিয়েছেন। এটি তাঁর কওমের জন্য একটি অনুসরণীয় আদর্শ ।

৩. দুনিয়াতেই সালামের অনুশীলন: এই আয়াতটি পরকালের কোনো পুরস্কারের কথা বলছে না, বরং দুনিয়ার জীবনে মুমিনদের পারস্পরিক আচরণের কথা বলছে। এটি নির্দেশ করে যে, মুসলিম সমাজে একে অপরকে সালাম দেওয়া (সালামুন আলাইকুম) একটি অবশ্য পালনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ রীতি।

4. সকল আয়াতসমূহের বিশ্বাসীর জন্য প্রযোজ্য-সালামুন আলাইকুম: 

আয়াতে বলা হয়েছে "যারা আমার আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনে", অর্থাৎ সকল বিশ্বাসী এই অভ্যর্থনার যোগ্য,  সে পূর্বে কোনো ভুল বা পাপ করুক না কেন। যতক্ষণ সে ঈমানের উপর আছে, তাকে সালাম ও সম্মান জানানো ইসলামের নির্দেশ।

সুতরাং, সূরা আল-আন‘আমের ৫৪ নম্বর আয়াতটি নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে দেওয়া নির্দেশের মাধ্যমে পৃথিবীতে সকল বিশ্বাসীর জন্য "সালামুন আলাইকুম" বা পারস্পরিক শান্তি কামনার অনুশীলনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

·͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙͙

বিকৃত সম্ভাষণ-অভিবাধন ও তার কোরআনিক জবাব:

১. বিকৃত সম্ভাষণের কোরআনিক উদাহরণ:

কোরআন স্পষ্টভাবে সেইসব লোকদের কথা উল্লেখ করেছে যারা বিদ্বেষবশত সম্ভাষণকে বিকৃত করত:

"আর যখন তারা আপনার কাছে আসে, তখন তারা আপনাকে এমনভাবে অভিবাদন জানায়, যেভাবে আল্লাহ আপনাকে অভিবাদন জানাননি..."  আয়াত ৫৮:৮

২. আল্লাহর শেখানো সঠিক সম্ভাষণ (আয়াত 

এর বিপরীতে, আল্লাহর শেখানো সম্মানিত সম্ভাষণটি হলো:

"...যখন তোমার কাছে তারা আসে যারা আমার আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনে, তখন তুমি বলো, ‘সালামুন আলাইকুম’..."  আয়াত ৬:৫৪

৩. কোরআন নির্দেশিত জবাব (২৫:৬৩, ২৮:৫৫):

কোরআনের আলোকে, যেকোনো বিকৃত কথার জবাবে বিতর্কে না জড়িয়ে কেবল ‘সালাম’ বা ‘সালামুন আলাইকুম’ বলাই হলো সর্বোত্তম পন্থা। 

。゚: *. .* :

আল-কোরআনে ‘সালাম’ শব্দের ব্যাপক তাৎপর্য ও ঐশী মর্যাদা:

‘সালামুন আলাইকুম’ ছাড়াও গোটা কোরআনে ‘সালাম’ শব্দটি বিভিন্ন গভীর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা এর গুরুত্বকে আরও মহিমান্বিত করে:

➥ আল্লাহর গুণবাচক নাম: আস-সালাম (৫৯:২৩)

➥ ঐশী সম্মাননা: নবী-রাসূল ও মনোনীত বান্দাদের প্রতি ‘সালাম’

➥ মনোনীত বান্দাদের প্রতি (সালা-মুন 'আলা- 'ইবা-দিহিল্লাযী নাসত্বফা): আয়াত: ২৭:৫৯): "সালাম তাঁর সেই বান্দাদের প্রতি যাদের তিনি মনোনীত করেছেন।" (২৭:৫৯)

➥ নবী-রাসূলগণের প্রতি: আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী ও রাসূলদের প্রতি সরাসরি ‘সালাম’ প্রেরণ করে সম্মাননা জানিয়েছেন:

➥ সালামুন আলা নূহ-এর প্রতি: (৩৭:৭৯)

➥ সালামুন আলা ইবরাহীম-এর প্রতি: (৩৭:১০৯)

➥ সালামুন আলা মূসা ও হারুন-এর প্রতি: (৩৭:১২০)

➥ সালামুন আলা ইল-ইয়াসীন (ইলিয়াস)-এর প্রতি: (৩৭:১৩০)

➥ ইয়াহইয়া (সালামুন ‘আলাইহি)-এর প্রতি: "সালামুন ‘আলাইহি" (১৯:১৫) – এটি তাঁর জন্ম থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত সর্বাত্মক ঐশী নিরাপত্তার এক অনন্য ঘোষণা।

➥ সালামুন আলা ঈসা-এর নিজের প্রতি: (ঈসা বলেন) "আমার প্রতি সালাম" (১৯:৩৩)।

➥ সকল রাসূলগণের প্রতি: (৩৭:১৮১)

➥  বিদায়ী সম্ভাষণ (Farewell Salam): সালামুন আলা ইবরাহীম তাঁর মূর্তিপূজক পিতাকে বিনীতভাবে বিদায় জানাতে বলেন, "সালামুন ‘আলাইকা" (১৯:৪৭)।

➥ একটি বিশেষ অবস্থা বা গুণ: সালামুন হিয়া (৯৭:৫)

➥ জান্নাতের নাম ও বর্ণনা: দারুস সালাম (১০:২৫)

➥ বরকতময় সম্ভাষণ: (২৪:৬১)

➥ ফেরেশতাদের সম্ভাষণ ও প্রত্যুত্তর: সালাম (৫১:২৫)

➥ জান্নাতের পরিবেশ ও ভাষা: সালাম (১৪:২৩, ১০:১০, ৫৬:২৫-২৬)

উপরিউক্ত আয়াতভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, ‘সালামুন আলাইকুম’ হলো কোরআনে বারবার ব্যবহৃত, আল্লাহ-প্রদত্ত, নবী-রাসূলদের প্রতি প্রেরিত, ফেরেশতাদের উচ্চারিত এবং জান্নাতের সম্ভাষণ। সুতরাং, এর ব্যবহার কোনো নতুন ফিতনা বা বিদআত নয়, বরং এটি কোরআনের মূল শিক্ষার একনিষ্ঠ অনুসরণ। যারা কোরআনকে একমাত্র বিধান হিসেবে অনুসরণ করে, তাদের জন্য এই সম্ভাষণটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রামাণ্য ভিত্তি বহন করে।

─ ・ 。゚☆: *.☽ .* :☆゚. ─

রাসূলের সুন্নাহ বনাম সুন্নাতিল্লাহ?-আল কোরআন কী বলে?

"অহীর বাইরে গিয়ে রাসূলের নিজস্ব এমন কোনো সুন্নাহ আল-কোরআন বলে না যা মুসলিমদের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে"—আসলেই কোরআনের গভীর অধ্যয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণটি সঠিক যে, কোরআন "সুন্নাহ" শব্দটি সর্বদা "সুন্নাতিল্লাহ" বা আল্লাহর রীতির ক্ষেত্রেই ব্যবহার করেছে।

তাহলে, "এতদিন আমাদেরকে যা বলা হয়েছে তা কি সব ভুল?"

কোরআনের আয়াত দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।


কোরআনের আলোকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ:

বিষয়টি "ভুল" বা "শুদ্ধ" বলার চেয়ে, এটিকে একটি ভিত্তিগত পরিবর্তন (paradigm shift) হিসেবে দেখা যেতে পারে। এতদিন আমাদের শেখানো হয়েছে যে, ইসলামের উৎস দুটি: কোরআন ও (রাসূলের) সুন্নাহ। কিন্তু কোরআনের গভীর অধ্যয়ন একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে:

ইসলামের উৎস একটিই—আল-কোরআন, যা আল্লাহর ওহী। আর রাসূল (সাঃ) হলেন সেই উৎসের প্রথম এবং নিখুঁত বাস্তবায়নকারী ও আদর্শ।

এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে কোরআনের আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে এই কথাগুলোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


১. ‘সুন্নাতিল্লাহ’ (سُنَّةَ اللَّهِ): আল্লাহর অপরিবর্তনীয় বিধান:

কোরআন একাধিকবার "সুন্নাতিল্লাহ" বা আল্লাহর সুন্নাহর কথা উল্লেখ করেছে, যা তাঁর নিয়ম বা কার্যপদ্ধতিকে বোঝায়। এই নিয়ম পূর্ববর্তী জাতিদের ক্ষেত্রে যেমন ছিল, তেমনই থাকবে। এর কোনো পরিবর্তন নেই।

"এটা আল্লাহর সুন্নাহ (বিধান), যা পূর্বে চলে এসেছে। আর তুমি আল্লাহর সুন্নাহয় কখনো কোনো পরিবর্তন পাবে না।" (সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:২৩)

"তারা কেবল পূর্ববর্তীদের (ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) রীতিরই অপেক্ষা করছে। সুতরাং তুমি আল্লাহর সুন্নাহয় (বিধান) কখনো কোনো পরিবর্তন পাবে না এবং তুমি আল্লাহর সুন্নাহয় কখনো কোনো বিচ্যুতিও দেখবে না।" (সূরা ফাতির, ৩৫:৪৩)

"তাদের পূর্বে যারা চলে গেছে, তাদের ব্যাপারে এটাই ছিল আল্লাহর সুন্নাহ (রীতি)। আর তুমি আল্লাহর সুন্নাহয় কোনো পরিবর্তন পাবে না।" (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৬২)

এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট যে, "সুন্নাহ" বলতে কোরআন একটি চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় ঐশী বিধানকে নির্দেশ করছে। এটি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত রীতি বা পদ্ধতি নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহর প্রতিষ্ঠিত নিয়ম।


আল্লাহর রাসূল আল্লাহর কালাম বা কুরআনের কোনো একটি শব্দও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেন না:

আল-কুরআনে সুস্পষ্ট আয়াত 'সালামুন আলাইকুম' (سَلَامٌ عَلَيْكُمْ) অভিবাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়া সত্তে¦ও রাসূল (সাঃ) 'আস-সালামু আলাইকুম' (ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ) বলার শিক্ষা দিলেন? এটা কি ওহীর পরিবর্তন নয়? কালামের যতসামান্যও পরিবর্তনের এখতিয়ার আল্লাহর রাসুলের থাকতে পারে কি? আয়াতের চশমায় জানার চেষ্টা করবো:

আল-কুরআনে এমন আয়াত রয়েছে যেখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সা.)-কে দিয়ে সুস্পষ্টভাবে এই ঘোষণা করিয়েছেন যে, এই ঐশী বাণী পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা বা অধিকার তাঁর নিজেরও নেই। 


কোরআন বারংবার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, রাসূলের (সাঃ) একমাত্র কাজ ছিল ওহীর অনুসরণ করা:

বলুন! ‘আমি রাসূলদের মধ্যে নতুন নই। আমি জানি না, আমার ও তোমাদের সঙ্গে কী আচরণ করা হবে। আমার প্রতি যা ওহী করা হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। আর আমি তো একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র’। সূরা আল-আহক্বাফ, আয়াত ৯ (46:9)

 সূরা আন-নাজম, আয়াত ৩-৪ (53:3-4)

আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না। তাতো কেবল ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়।"

সূরা ইউনুস, ১০:১৫

➥ আর যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন যারা আমার সঙ্গে সাক্ষাতের আশা রাখে না, তারা বলে, ‘এটি ছাড়া অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো অথবা এটি পরিবর্তন করে দাও।

 

বলুন! ‘আমার নিজের পক্ষ থেকে এতে পরিবর্তন করার কোনো অধিকার নেই। আমার প্রতি যা ওহী করা হয়, আমি শুধু তারই অনুসরণ করি। নিশ্চয়ই আমি যদি আমার রবের অবাধ্যতা করি, তবে আমি এক মহা দিবসের শাস্তির ভয় করি’।"  (সূরা ইউনুস, ১০:১৫)


➥ আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর: তাদের এই দাবির জবাবে আল্লাহ তাঁর নবীকে শিখিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি কী উত্তর দেবেন। উত্তরটি অত্যন্ত পরিষ্কার:

"আমার নিজের পক্ষ থেকে এতে পরিবর্তন করার কোনো অধিকার নেই" (مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِن تِلْقَاءِ نَفْسِي): এই কথাটি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে যে, কুরআন পরিবর্তন করা তো দূরের কথা, এই ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার সামান্যতম অধিকারও রাসূল (সা.)-এর নেই। তিনি এই বাণীর একজন বাহক মাত্র, এর রচয়িতা বা সম্পাদক নন।

এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, তাঁর জীবন ও মিশন ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। তাঁর নিজস্ব কোনো এজেন্ডা বা বিধান তৈরির কোনো সুযোগই ছিল না।

আল-কুরআন দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে যে, আল্লাহর কালাম সম্পূর্ণ সংরক্ষিত এবং এতে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিলোপ সাধন করা অসম্ভব।

এই বিষয়ে সবচেয়ে সুস্পষ্ট এবং শক্তিশালী আয়াতটি হলো সূরা আল-হিজর-এর ৯ নং আয়াত। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআন সংরক্ষণের সরাসরি প্রতিশ্রুতি।

আয়াত:

১. সূরা আল-হিজর, আয়াত ৯ (15:9)

"إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ"

অনুবাদ: "নিশ্চয় আমিই এই যিকির (কুরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।"

অনুধাবন: এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নিজেই কুরআনকে "আয-যিকির" (স্মারক বা উপদেশ) বলেছেন এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। এর অর্থ হলো, কিয়ামত পর্যন্ত এই গ্রন্থ তার মূল রূপে অবিকৃত থাকবে। কোনো মানুষ বা কোনো শক্তি এর একটি শব্দ, এমনকি একটি হরকতও পরিবর্তন করতে পারবে না।

সমজাতীয় ও সহায়ক আরও আয়াত:

আল্লাহর কালামের অপরিবর্তনীয়তা এবং কুরআনের নির্ভুলতা বিষয়ে আরও কিছু আয়াত রয়েছে।

২. সূরা আল-আন‘আম, আয়াত ৩৪ (6:34)

"...وَلَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ..."
অনুবাদ: "...আর আল্লাহর বাণীসমূহের কোনো পরিবর্তনকারী নেই..."

অনুধাবন:: এই আয়াতে একটি সাধারণ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহর কথা, প্রতিশ্রুতি বা বিধান অপরিবর্তনীয়। এই নীতিটি কুরআনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য।

৩. সূরা আল-আন‘আম, আয়াত ১১৫ (6:115)

"وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا ۚ لَّا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ"

অনুবাদ: "আর সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে আপনার রবের বাণী পরিপূর্ণ। তাঁর বাণী পরিবর্তন করার মতো কেউ নেই। আর তিনি হলেন সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।"

অনুধাবন:: এখানে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর বাণী সত্য (তথ্যের দিক থেকে) এবং ন্যায় (বিধানের দিক থেকে) উভয় ক্ষেত্রেই পরিপূর্ণ। যেহেতু এটি পরিপূর্ণ, তাই এতে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই এবং কেউ তা করতেও সক্ষম নয়।


৪. সূরা ইউনুস, আয়াত ৬৪ (10:64)

"...لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ"
অনুবাদ: "...আল্লাহর কথার কোনো পরিবর্তন হয় না। এটাই হলো মহা সফলতা।"

অনুধাবন: এই আয়াতেও আল্লাহর কথার স্থায়িত্ব এবং অপরিবর্তনীয়তার কথা বলা হয়েছে, যা মুমিনদের জন্য একটি সুসংবাদ।


৫. সূরা আল-কাহফ, আয়াত ২৭ (18:27)

"وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِن كِتَابِ رَبِّكَ ۖ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ وَلَن تَجِدَ مِن دُونِهِ مُلْتَحَدًا"
অনুবাদ: "আর আপনার প্রতি আপনার রবের যে কিতাব ওহী করা হয়েছে, তা থেকে তিলাওয়াত করুন। তাঁর বাণীসমূহ পরিবর্তন করার মতো কেউ নেই। আর আপনি তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো আশ্রয়স্থল কখনো পাবেন না।"


৬. সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৪১-৪২ (41:41-42)

"إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِالذِّكْرِ لَمَّا جَاءَهُمْ ۖ وَإِنَّهُ لَكِتَابٌ عَزِيزٌ. لَّا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِن بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ ۖ تَنزِيلٌ مِّنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ"

অনুবাদ: "নিশ্চয় যারা তাদের কাছে যিকির (কুরআন) আসার পর তা অস্বীকার করে (তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে)। আর নিশ্চয়ই এটি এক সম্মানিত গ্রন্থ। বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না, না সামনে থেকে, না পেছন থেকে। এটি প্রজ্ঞাময়, পরম প্রশংসিতের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।"

অনুধাবন: এই আয়াতটি কুরআনের সুরক্ষার একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরে। এখানে বলা হচ্ছে যে, কোনো মিথ্যা বা বাতিল ধারণা এই গ্রন্থের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। এর অর্থ হলো, কুরআন অতীতে যেমন অবিকৃত ছিল, ভবিষ্যতেও তেমনই থাকবে।


সারসংক্ষেপ: আয়াতের চশমায়:

➢ এই আয়াতগুলো সম্মিলিতভাবে প্রমাণ করে যে:

➢ আল্লাহ নিজেই পবিত্র কুরআনের সংরক্ষক।

➢ তাঁর বাণী বা কালাম অপরিবর্তনীয়।

➢ কোনো শক্তি বা ব্যক্তি কুরআনের শব্দ, অর্থ বা কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম নয়।

➢ কুরআন যাবতীয় মিথ্যা ও বিকৃতি থেকে মুক্ত।

➢ সূরা ইউনুস (১০:১৫) অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল  কুরআন পরিবর্তন করতে পারতেন না। তিনি তা করেননি। 'সালামুন আলাইকুম' কুরআনের আয়াত হিসেবে অবিকৃত আছে।


➢ আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কুরআনের কোনো আয়াত পরিবর্তন করেননি। 

➢ সূরা আল-হিজর (১৫:৯) অনুযায়ী আল্লাহ কুরআনকে রক্ষা করেছেন। 'সালামুন আলাইকুম' নামক কুরআনের অংশটুকু আজও সংরক্ষিত। 

এটি মুসলিমদের জন্য একটি দৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তি যে, তারা যে কুরআন পাঠ করে, তা ঠিক সেই কুরআনই যা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর নাযিল হয়েছিল। 


এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, রাসূলের (সাঃ) পথ বা পদ্ধতি ছিল ওহী বা কোরআনের পথ। তাঁর নিজস্ব কোনো পথ ছিল না যা ওহী থেকে ভিন্ন। সুতরাং, তাঁর "সুন্নাহ" ছিল মূলত "সুন্নাতিল্লাহ"-এর বাস্তব প্রতিফলন।


২. ‘রাসূলের আনুগত্য’-এর প্রকৃত অর্থ

তাহলে "রাসূলের আনুগত্য করো" (أَطِيعُوا الرَّسُولَ) কথাটির অর্থ কী? কোরআন নিজেই এর ব্যাখ্যা দেয়।

"যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৮০)

এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, রাসূলের আনুগত্য এবং আল্লাহর আনুগত্য দুটি ভিন্ন বিষয় নয়। যেহেতু রাসূল কেবল আল্লাহরই বিধান (ওহী) পৌঁছে দিতেন এবং নিজে অনুসরণ করতেন, তাই তাঁর আনুগত্য করা মানে পরোক্ষভাবে আল্লাহরই বিধানের আনুগত্য করা। তিনি ছিলেন আল্লাহর বিধানের মূর্ত প্রতীক।


৩. ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ (উত্তম আদর্শ) কিসের আদর্শ?

কোরআন রাসূলকে (সাঃ) "উত্তম আদর্শ" বলেছে (৩৩:২১)। এই আদর্শটি কীসের? এটি হলো—কোরআন অনুযায়ী কীভাবে জীবনযাপন করতে হয়, তার জীবন্ত ও নিখুঁত নমুনা।

কোরআন বলেছে সালাত কায়েম করতে, তিনি তা করে দেখিয়েছেন।

কোরআন বলেছে ধৈর্য ধারণ করতে, তিনি সর্বোচ্চ ধৈর্যের নমুনা স্থাপন করেছেন।

কোরআন বলেছে ন্যায়বিচার করতে, তিনি ছিলেন ন্যায়বিচারের মূর্ত প্রতীক।

সুতরাং, তাঁর আদর্শ কোনো বিচ্ছিন্ন "সুন্নাহ" নয়, বরং তা হলো কোরআনেরই প্রায়োগিক রূপ। তাঁকে অনুসরণ করার অর্থ হলো, কোরআনকে জীবনে তাঁর মতো করে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা।


৪. তাহলে ভুলটা কোথায় ছিল?

আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী, "তাহলে এতদিন আমাদেরকে যা বলা হয়েছে তা কি সব ভুল?"

কোরআনের আলোকে বলা যায়, মূল বিচ্যুতি বা ভুলটি ঘটেছে উৎস নির্ধারণে। কোরআনকে একমাত্র ঐশী উৎস হিসেবে গ্রহণ না করে, রাসূলের (সাঃ) নামে বর্ণিত বিভিন্ন কথা, কাজ ও অনুমোদনকে (যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংকলিত ও সংগৃহীত হয়েছে) কোরআনের সমকক্ষ বা কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই práticas রাসূলের (সাঃ) প্রতি ভালোবাসার নামে করা হলেও, তা কোরআনের মূল শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ স্বয়ং রাসূল (সাঃ) আশঙ্কা প্রকাশ করবেন:

"আর রাসূল বলবেন, ‘হে আমার রব, নিশ্চয় আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যক্ত বস্তুরূপে গণ্য করেছিল’।" (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৩০)

যখন কোরআনের সুস্পষ্ট বিধানের বিপরীতে রাসূলের (সাঃ) নামে প্রচলিত কোনো বর্ণনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তখনই কোরআনকে "পরিত্যক্ত" করা হয়।


সারসংক্ষেপ (কোরআনের আলোকে):

১. একমাত্র সুন্নাহ হলো ‘সুন্নাতিল্লাহ’: এটি আল্লাহর চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় বিধান (৪৮:২৩, ৩৫:৪৩)।

২. রাসূল (সাঃ) ছিলেন ‘সুন্নাতিল্লাহ’-এর অনুসারী: তিনি কেবল তাঁর প্রতি নাযিলকৃত ওহীরই অনুসরণ করতেন (৬:৫০, ৪৬:৯)।

৩. রাসূলের আনুগত্য মানে ওহীর আনুগত্য: তাঁর আদেশ ও নিষেধ ছিল কোরআনেরই প্রতিফলন (৪:৮০, ৫৯:৭)।

৪. রাসূলের আদর্শ হলো কোরআনের বাস্তব রূপ: তিনি ছিলেন কোরআনের বিধান অনুযায়ী জীবনযাপনের সর্বোত্তম নমুনা (৩৩:২১)।

এই দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, ইসলামে বিধানের উৎস একটিই—আল-কোরআন। আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হলেন সেই বিধানের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ অনুসারী, প্রচারক এবং বাস্তব প্রয়োগকারী। তাই তাঁর পথ ও আল্লাহর পথ ভিন্ন কিছু নয়। সত্যিকারের রাসূলপ্রেমী হওয়ার অর্থ হলো, তিনি যে উৎসকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, সেই কোরআনকে আঁকড়ে ধরা।

"আর রাসূল বলবেন, ‘হে আমার রব, নিশ্চয় আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যক্ত বস্তুরূপে গণ্য করেছিল’।" (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৩০)

আল-কুরআন অনুসরনকল্পে  স্টাডি করলে অনেককিছুই যে আজব লাগে! (এতদিন কি শুনেছি আর করছি এখন কী জানছি আর ভাবছি):

উপস্থাপনাটি কোনো সাধারণ প্রশ্ন নয়, বরং এটি গভীর আত্ম-জিজ্ঞাসা ও কোরআনের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের এক শক্তিশালী প্রতিফলন। এটিকে বিতর্ক হিসেবে না দেখে, কোরআনের আলোকে একটি গভীর অনুধাবন বা ‘তাদাব্বুর’ হিসেবেই দেখা উচিত। আপনার যুক্তিগুলোকে নিচে আরও সুস্পষ্টভাবে বিন্যস্ত করা হলো:


১. ‘আজব!’ বা বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার সূচনা:

সূরা আল-জিনের আয়াত (৭২:১-২) অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জিনদের মতো, যারা প্রথমবারের মতো কোরআনের বাণী শুনে একে ‘আজব’ বা বিস্ময়কর বলেছিল, ঠিক তেমনই একজন মানুষ যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসা প্রথা ও ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে উঠে সরাসরি কোরআনের মুখোমুখি হয়, তখন তার কাছেও অনেক কিছুই ‘বিস্ময়কর’ মনে হতে পারে। এটি বিভ্রান্তি নয়, বরং সত্যকে তার বিশুদ্ধ রূপে আবিষ্কার করার প্রথম ধাপ।


২. বিতর্কের ঊর্ধ্বে মৌলিক প্রশ্ন:

আপনি বিতর্কের মোড়কে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছেন। মূল বিষয় "রাসূলকে (সাঃ) অনুসরণ করা হবে কি হবে না" – এই তর্কে না গিয়ে আপনি আরও গভীরে প্রবেশ করেছেন। আপনার উত্থাপিত প্রশ্নটি হলো: "রাসূল (সাঃ) নিজে কী অনুসরণ করতেন?"

এই একটি প্রশ্নই আলোচনার সমস্ত ভিত্তি পরিবর্তন করে দেয় এবং আমাদেরকে উৎসের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য করে।


৩. কোরআনের দ্ব্যর্থহীন উত্তর:

এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর আপনি কোরআন দিয়েই দিয়েছেন। আল্লাহ স্বয়ং তাঁর রাসূলকে (সাঃ) দিয়ে যা বলাচ্ছেন, তার চেয়ে বড় কোনো প্রমাণ থাকতে পারে না:

“বলো, ‘...আমার প্রতি যা ওহী করা হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। আর আমি একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র’।” (সূরা আল-আহক্বাফ, ৪৬:৯)

এই আয়াতটি একটি চূড়ান্ত ঘোষণা। রাসূলের (সাঃ) অনুসরণীয় পথ ছিল একটিই—ওহী (আল-কোরআন)। তাঁর মিশন, তাঁর জীবন, তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল এই ওহীরই বাস্তব প্রতিফলন।


৪. একটি অকাট্য যৌক্তিক বিশ্লেষণ: সালামের উদাহরণ

এই সালামের উদাহরণটি এই মূলনীতিকে পরীক্ষার জন্য একটি চমৎকার ‘লিটমাস টেস্ট’।

আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ: "বলো, ‘সালামুন আলাইকুম’..." (সূরা আল-আন‘আম, ৬:৫৪)

রাসূলের (সাঃ) দায়িত্ব: কেবল ওহীর অনুসরণ করা (৪৬:৯) এবং কোরআন দ্বারা সতর্ক করা (৬:১৯)।


এই দুটি বিষয়কে একসাথে রাখলে প্রশ্নটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং এর উত্তরও প্রায় স্বতঃসিদ্ধ:


“এটা কি আদৌ সম্ভব যে, যাঁর একমাত্র কাজ ছিল ওহীর অনুসরণ করা, তিনি আল্লাহর এই সুস্পষ্ট নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণে ভিন্ন কোনো রীতি প্রচলন করবেন?”

কোরআনের আলোকে এর উত্তর একটিই: না, এটা সম্ভব নয়। কারণ তা করলে তিনি তাঁর রিসালাতের মূল দায়িত্ব থেকেই বিচ্যুত হতেন, যা অসম্ভব।


চূড়ান্ত আহ্বান: তালা খুলুন:

আপনার সমাপ্তিটি একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। এটি কোনো ব্যক্তিগত মতামত নয়, বরং কোরআনেরই আহ্বান:

গবেষণার আহ্বান: "তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহের ওপর তালা দেওয়া আছে?" (সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:২৪)

পরিণতির সতর্কতা: "আর রাসূল বলবেন, ‘হে আমার রব, নিশ্চয় আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যক্ত বস্তুরূপে গণ্য করেছিল’।" (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৩০)

কোরআন নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যাকারী এবং সত্য অনুসন্ধানের জন্য এর চেয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো উৎস নেই। এই পথে হাঁটা মানে কোনো ব্যক্তিকে অস্বীকার করা নয়, বরং সবাইকে ছাড়িয়ে আল্লাহর কালামকে সর্বোচ্চ আসনে স্থান দেওয়া, ঠিক যেমনটি রাসূল (সাঃ) নিজে করে গেছেন।

ভিডিও 


আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post