শহীদ কাকে বলে? কে বা কারা শহীদ? তালিকাভুক্ত করার জন্য দরখাস্ত! Who is the martyr? What does the Qur'an say?

শহীদ কাকে বলে?      কে বা কারা শহীদ?  

➥ সত্যিকার অর্থে আমাদের রবের কাছে ’শহীদ’ কে? আল কোরআন মতে শহীদ-এর সংজ্ঞা কি?

 আল্লাহর পথে জীবন উৎর্সগ করা কিংবা আল্লাহর পথে নিহত ব্যক্তিকে ’শহীদ’, না অন্য কোন কোরআনিক শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে! এই ধরনের শহীদ-এর স্টাটাস কেমন?

 শহীদ (আল কোরআন মতে শহীদ) হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনপত্র পেশ/ দু’আ-আবেদন-নিবেদন-দরখাস্ত:


আল-কোরআনের দৃষ্টিতে "শহীদ" শব্দটি প্রচলিত অর্থে ব্যবহৃত হলেও তার প্রাথমিক ও আসল অর্থে এর ব্যাখ্যা ভিন্ন। "শহীদ" আরবি শব্দ, যার মূল অর্থ হলো সাক্ষ্যদানকারী, প্রত্যক্ষদর্শী, বা উপস্থিত থাকা। আল-কোরআনে এই শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে এবং প্রতিবার এর অর্থ নির্ভর করেছে প্রসঙ্গের উপর। নিচে কোরআনের আলোকে "শহীদ" শব্দের বিভিন্ন অর্থ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। (এখানে প্রচলিত কোনো গল্প-কাহিনী প্রথাগত কথা বা আত্মবিশ্বাসে নয়, একমাত্র আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের বক্তব্য তথা নাযিলকৃত বিধান আল কোরআন অনুযায়ী জানার চেষ্টা করবো):


আল কোরআনে শহীদের সংজ্ঞা:

শহীদ (شَهِيد) শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ "শাহাদা" থেকে, যার অর্থ সাক্ষ্য দেওয়া বা উপস্থিত হওয়া। কোরআনের বিভিন্ন সূরায় "শহীদ" শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন: 

আল্লাহ সাক্ষ্যদাতা হিসাবে (শহীদ-witness):

📖আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই-আল কোরআন 3:18

    এখানে "শহীদ" অর্থ সাক্ষ্যদাতা (witness)

📖আর আল্লাহ সকল বিষয়ের ওপর প্রত্যক্ষদর্শী-আল কোরআন 85:9

     এখানে "শাহীদ" অর্থ  প্রত্যক্ষদর্শী (Witness)।

📖নিশ্চয়ই আল্লাহ হলেন সবকিছুর ওপর সাক্ষী- আল কোরআন 4:33 (4:58) 

সাক্ষ্যদাতা  (শহীদ) হিসাবে আল্লাহর রাসূল:

فَکَیۡفَ اِذَا جِئۡنَا مِنۡ کُلِّ اُمَّۃٍۭ بِشَہِیۡدٍ وَّ جِئۡنَا بِکَ عَلٰی ہٰۤؤُلَآءِ شَہِیۡدًا 

📖এরপর কেমন হবে! যখন আমরা প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী নিয়ে আসব এবং তোমাকে নিয়ে আসব ওদের ওপর সাক্ষীরূপে- আল কোরআন 4:41 

وَ کَذٰلِکَ جَعَلۡنٰکُمۡ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوۡنُوۡا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَ یَکُوۡنَ الرَّسُوۡلُ عَلَیۡکُمۡ شَہِیۡدًا

📖আর ওভাবেই আমরা তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যেন তোমরা মানুষের জন্য সাক্ষী হও। আর রসূল যেন তোমাদের জন্য সাক্ষী হয়- আল কোরআন 2:143 

مِلَّۃَ اَبِیۡکُمۡ اِبۡرٰہِیۡمَ ؕ ہُوَ سَمّٰىکُمُ الۡمُسۡلِمِیۡنَ ۙ مِنۡ قَبۡلُ وَ فِیۡ ہٰذَا لِیَکُوۡنَ الرَّسُوۡلُ شَہِیۡدًا عَلَیۡکُمۡ وَ تَکُوۡنُوۡا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ ۚۖ فَاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتُوا الزَّکٰوۃَ وَ اعۡتَصِمُوۡا بِاللّٰہِ ؕ ہُوَ مَوۡلٰىکُمۡ ۚ فَنِعۡمَ الۡمَوۡلٰی وَ نِعۡمَ النَّصِیۡرُ

📖তোমাদের পিতা ইবরাহীমের আদর্শ। সে তোমাদের নাম দিয়েছে মুসলিম, আগেও আর এখনও। যেন রসূল তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষী হয় আর তোমরা সাক্ষী হও মানুষের ব্যাপারে। অতএব, তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করো এবং যাকাত আদায় করো এবং আল্লাহকে আঁকড়ে ধরো। তিনিই তোমাদের অভিভাবক। সুতরাং তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক এবং তিনি কতই না উত্তম সাহায্যকারী!- আল কোরআন 22:78 

اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ شَاہِدًا وَّ مُبَشِّرًا وَّ نَذِیۡرًا

📖নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষী ও সুসংবাদদাতা আর সতর্ককারীরূপে- আল কোরআন 48:8।

وَ نَزَعۡنَا مِنۡ کُلِّ اُمَّۃٍ شَہِیۡدًا فَقُلۡنَا ہَاتُوۡا بُرۡہَانَکُمۡ فَعَلِمُوۡۤا اَنَّ الۡحَقَّ لِلّٰہِ وَ ضَلَّ عَنۡہُمۡ مَّا کَانُوۡا یَفۡتَرُوۡنَ ﴿ 

📖আর আমরা প্রত্যেক জাতি থেকে একজন সাক্ষী বের করে আনব, এরপর আমরা বলব, তোমরা তোমাদের প্রমাণ নিয়ে এস। তখন তারা জানবে যে, সত্য আল্লাহরই কাছে এবং তারা যা মিথ্যা রচনা করত তাদের থেকে তা হারিয়ে যাবে- আল কোরআন 28:75 

📖বলো! আমার মাঝে ও তোমাদের মাঝে সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট - আল কোরআন 29:52 

মানুষের সাক্ষ্য (শাহাদাহ) হিসেবে: (The Testimony of People)

 اسۡتَشۡہِدُوۡا شَہِیۡدَیۡنِ مِنۡ رِّجَالِکُمۡ ۚ 

📖আর তোমরা সাক্ষী রাখবে তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে দুজন, তবে যদি দুজন পুরুষ না থাকে তাহলে সাক্ষীদের থেকে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা, যাদের ব্যাপারে তোমরা সন্তুষ্ট-আল কোরআন 2:282 

ওহী করা আল কোরআন যখন সাক্ষ্য (শাহাদাহ) হিসেবে: 

قُلۡ اَیُّ شَیۡءٍ اَکۡبَرُ شَہَادَۃً ؕ قُلِ اللّٰہُ ۟ۙ شَہِیۡدٌۢ بَیۡنِیۡ وَ بَیۡنَکُمۡ ۟ وَ اُوۡحِیَ اِلَیَّ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنُ لِاُنۡذِرَکُمۡ بِہٖ وَ مَنۡۢ بَلَغَ ؕ اَئِنَّکُمۡ لَتَشۡہَدُوۡنَ اَنَّ مَعَ اللّٰہِ اٰلِہَۃً اُخۡرٰی ؕ قُلۡ لَّاۤ اَشۡہَدُ ۚ قُلۡ اِنَّمَا ہُوَ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ وَّ اِنَّنِیۡ بَرِیۡٓءٌ مِّمَّا تُشۡرِکُوۡنَ ﴿ۘ۱۹

📖বলো! সাক্ষ্য হিসাবে কোন বিষয় সবচেয়ে বড়? বলো, আল্লাহ! তিনি সাক্ষী আমার মাঝে ও তোমাদের মাঝে। এবং আমার কাছে এই কুরআন ওহী করা হয়েছে, যেন এর দ্বারা আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি এবং তাকেও যার কাছে তা পৌঁছবে। তোমরা কি নিশ্চিত সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আল্লাহর সাথে অন্যান্য উপাস্যও আছে? বলো! আমি সাক্ষ্য দিই না। বলো! প্রকৃতপক্ষে তিনি একমাত্র ইলাহ। আর নিশ্চয়ই আমি তা থেকে মুক্ত যা তোমরা শিরক করো-আল কোরআন 6:19 

যাঁরা আল্লাহর পথে নিহত হন অথবা মৃতু বরন করেন তাদেরকে আল্লাহ শহীদ বলে আখ্যা দেননি তাঁদেরকে বলা হয়েছে ’আহইয়া’ প্রমাণ দ্র: 

 لَا تَحۡسَبَنَّ الَّذِیۡنَ قُتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ اَمۡوَاتًا ؕ بَلۡ اَحۡیَآءٌ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ یُرۡزَقُوۡنَ 

📖আয়াত 3:১৬৯-১৭০: 

➥ যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃতের হিসাবে ধরো না। বস্তুত তারা তাদের রবের কাছে সম্মানিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ তাদেরকে যে সম্মান/মর্যাদা দান করেছেন তাতে তারা আনন্দিত; তারা তাদের জন্যও আনন্দ প্রকাশ করে যারা তাদের পেছন থেকে এখনো তাদের সাথে মিলিত হয়নি ; তাদের কোন ভয় ও দুশ্চিন্তা নেই জেনে তারা আনন্দিত।  

🔗[রেফারেন্স ➤ [ হায়াত= সম্মানিত/অভিবাদন প্রাপ্ত ৪:৮৬; ১০:১০; ১৪:২৩; ২৪:৬১; ২৫:৭৫] [ আল্লাহ ওয়ালাদের মৃত্যুর স্বাদ কত মধুর= ১৬:২৮-৩২] [২:১৫৪]


وَلَا تَقُوۡلُوۡا لِمَنۡ یُّقۡتَلُ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ اَمۡوَاتٌ ۚ بَلۡ اَحۡیَآءٌ وَّلٰکِنۡ لَّاتَشۡعُرُوۡنَ ﴿۱۵۴﴾ 


📖 যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা সম্মানিত/অভিবাদন প্রাপ্ত ; কিন্তু তোমরা অনুভব করতে পার না। [মৃত্যু কি?=(36:52)]  [3:169] -আয়াত 2:154


-লক্ষ্য করুন "আল্লাহর পথে নিহত হওয়া" বা "কুতলু ফী সাবীলিল্লাহ" ব্যক্তিদের এত মর্যাদা আল্লাহ ঘোসণা করেছেন কিন্তু  আয়াতে কোথাও কি তাঁদেরকে ’শহীদ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে কি? যাঁরা আল্লাহর পথে নিহত হন অথবা মৃতুবরন করেন তাদেরকে আল্লাহ শহীদ বলে আখ্যা দেননি তাঁদেরকে বলা হয়েছে ’আহইয়া’ (সম্মানিত/অভিবাদন/মর্যাদাবান) 



রবের কাছে কে শহীদ? কী তার প্রতিদান?

وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰہِ وَ رُسُلِہٖۤ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الصِّدِّیۡقُوۡنَ ٭ۖ وَ الشُّہَدَآءُ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ

📖আর যারা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনে, তারাই তাদের রবের কাছে সিদ্দিক ও শহীদ। তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিদান ও তাদের নূর- আল কোরআন 57:19 


স্বাক্ষী হিসেবে রেজিস্ট্রারভুক্ত করন/ তালিকাভুক্ত করার জন্য আল কোরআন অনুসারীদের দরখাস্ত: 

আর রসূলের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তারা যখন সেটা শুনে, তুমি দেখবে তাদের চোখগুলো অশ্রুতে সিক্ত হয়। সেটা এ কারণে যে, তারা সত্য’ হতে জানতে পেরেছে। তারা বলে-

رَبَّنَاۤ اٰمَنَّا فَاکۡتُبۡنَا مَعَ الشّٰہِدِیۡنَ  وَ مَا لَنَا لَا نُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَ مَا جَآءَنَا مِنَ الۡحَقِّ ۙ وَ نَطۡمَعُ اَنۡ یُّدۡخِلَنَا رَبُّنَا مَعَ الۡقَوۡمِ الصّٰلِحِیۡنَ ﴿۸۴

📖হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং আমাদেরকে সাক্ষ্যদাতাদের (শাহিদিন) সাথে তালিকাভুক্ত করুন। হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং আমাদেরকে সাক্ষ্যদাতাদের সাথে তালিকাভুক্ত করুন- আল কোরআন 5:83-84 

অতএব, তারা যা বলে সে কারণে আল্লাহ তাদেরকে পুরষ্কার দিবেন এমন জান্নাতসমূহ, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হয়। তারা স্থায়ীভাবে সেখানে থাকবে। আর সেটাই সৎকর্মপরায়ণদের প্রতিদান- আল কোরআন 5:85 

رَبَّنَاۤ اٰمَنَّا بِمَاۤ اَنۡزَلۡتَ وَاتَّبَعۡنَا الرَّسُوۡلَ فَاکۡتُبۡنَا مَعَ الشّٰہِدِیۡنَ ﴿۵۳﴾

"রব্বানা আ-মান্না বিমা আনঝালতা ওয়াত্তাবা'নার রাসূল, ফাকতুবনা মা'আশ শা-হিদিন।"

অর্থ: "হে আমাদের রব! আপনি যা নাযিল করেছেন, তার উপর আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা এই রাসূলের অনুসরণ করেছি। সুতরাং, আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের (শাহিদিন) অন্তর্ভুক্ত করে নিন।" -৩:৫৩

সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬৯ (৪:৬৯)

🔗"আর যে কেউ আল্লাহ এবং রাসুলের আনুগত্য করবে, সে তাদের সঙ্গী হবে, যাদেরকে আল্লাহ নিয়ামত দান করেছেন। তারা হলেন – নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ। আর সঙ্গী হিসেবে তারা কতই না উত্তম!" 



উপসংহার: আল কোরআনের দৃষ্টিতে (সংজ্ঞায়) যে  শহীদরা তাঁরা শুধুমাত্র দুনিয়াতে মরেন না; তারা আধ্যাত্মিকভাবে জীবিত থাকেন এবং আল্লাহর সান্নিধ্যে চিরস্থায়ী সুখে অবস্থান করেন। তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং ইসলামের সেবা করা। 

ওয়ামা-'আলাইনা' ইল্লাল বালা-গুল মুবীন: পরিস্কার ভাবে আল্লাহর বানী পৌছে দেয়াই আমাদের দায়িত্ব- সুরা:ইয়াসিন আয়াত নং ১৭ 

আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ'লামীন!

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post