"আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না"—এটি কি কোরআনের আয়াত?
এটি সরাসরি কোরআনের কোনো আয়াত নয়, বরং একটি মানুষের কথিত হাদিস। তবে, আল কোরআনে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব নিয়ে অনেক আয়াত রয়েছে, যা আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্কের সঠিক মূল্য বুঝতে সহায়তা করে।
আত্মীয়তার সম্পর্কের সঠিক গুরুত্ব এবং তা কেন বজায় রাখতে হবে, তা শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন। যিনি এই সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কাছ থেকে বিস্তারিত না জানলে, আমাদের দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে—এটি বিশেষত বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।
কিছু মূল প্রশ্ন:
- আত্মীয় ও নিকট আত্মীয় কারা?
- আত্মীয়তার সম্পর্ক কেন বজায় রাখা উচিত?
- আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মূল কারণ কী?
- কিভাবে নিকট আত্মীয়দের সতর্ক করতে হবে?
- কোন শ্রেণির মানুষের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত?
- কোরআনে উল্লেখিত উত্তরাধিকারী শ্রেণী:
কুরআনের আলোকে আত্মীয়তার শ্রেণীবিভাগ:
-
রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় (Blood Relatives):
- সূরা আল-আনফাল (৮:৭৫)
- সূরা আন-নিসা (৪:১), (৪:৭)
- সূরা আল-আহযাব (৩৩:৬)
-
সাধারণ আত্মীয়-স্বজন (General Relatives):
- সূরা আন-নিসা (৪:৩৬)
- সূরা আল-বাকারা (২:৮৩)
- সূরা আত-তওবা (৯:২৪)
-
বৈবাহিক আত্মীয়তা (Marriage & In-Law Relationships):
- সূরা আল-ফুরকান (২৫:৫৪)
- সূরা আন-নূর (২৪:৩২)
-
বংশধর/বংশগত সম্পর্ক (Lineage & Descendants):
- সূরা আল-ফুরকান (২৫:৫৪)
- সূরা আন-নিসা (৪:৯)
-
মাহরাম ও নিষিদ্ধ বিবাহ সম্পর্ক (Prohibited Marriages & Mahram Relations):
- সূরা আন-নিসা (৪:২৩)
- সূরা আল-আহযাব (৩৩:৫০)
- সূরা আন-নূর (২৪:৬১)
-
দুধ সম্পর্কীয় আত্মীয় (Milk-Kinship Relations):
- সূরা আন-নিসা (৪:২৩)
-
উত্তরাধিকার ও সম্পত্তিতে আত্মীয়দের অধিকার (Inheritance & Financial Rights of Relatives):
- সূরা আন-নিসা (৪:১১-১২)
- সূরা আল-বাকারা (২:১৮০)
আত্মীয় ও নিকট আত্মীয় কারা?
আল কোরআনে আত্মীয়তার বিভিন্ন সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন—
- পিতা-মাতা: (সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩)
- সন্তান: (সূরা আল-কাহাফ ১৮:৪৬)
- ভাই-বোন: (সূরা আল-আরাফ ৭:১৫০-১৫১)
- দাদা-দাদি, নানা-নানী, চাচা, মামা, খালা, ফুফু: (সূরা আন-নিসা ৪:১, ৪:২৩, ২৪:৬১)
- স্বামী-স্ত্রী: (সূরা আর-রুম ৩০:২১)
রক্তের সম্পর্কীয় আত্মীয় (أَرْحَامَ) সাধারণত সরাসরি রক্তের সম্পর্কের মাধ্যমে সম্পর্কিত আত্মীয়দের বোঝায়, যেমন পিতা-মাতা, নানা-নানী, সন্তান, ভাই-বোন, মামা, ফুফু ইত্যাদি।
নিকট আত্মীয় (قُرْبَى) তাদের বোঝায় যারা রক্তের সম্পর্কের পাশাপাশি পারিবারিক বা সামাজিক দিক থেকে নিকটবর্তী বা গুরুত্বপূর্ণ, যেমন চাচা, চাচি, মামা, মামী, দাদা-দাদি, ফুফু-ফুফা, এবং তাঁদের ঔরসজাত সন্তান।
চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো ভাই-বোনদের সম্পর্ক কোরআনে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, তাদেরও আত্মীয় হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, এবং তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার, সদয় আচরণ এবং সম্পর্ক বজায় রাখা কোরআনে নির্দেশিত।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব:
আত্মীয়তার সম্পর্ক শুধু পারিবারিক সম্পর্ক নয়, এটি সামাজিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে আত্মীয়দের প্রতি সদয় আচরণ এবং সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে বার বার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর বিধান মেনে চলা, পারস্পরিক সহানুভূতি বজায় রাখা এবং কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা আমাদের ঈমানের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং জান্নাতে প্রবেশের পথ সুগম করে।
নিকটতম স্বজনদেরকে সতর্ক করতে বলা হয়েছে:
এবং তুমি তোমার নিকটতম স্বজনদেরকে সতর্ক করো-২৬:২১৪
আত্মীয়দের সতর্ক করতে কিভাবে হবে?
আল্লাহর বিধান অনুযায়ী, আত্মীয়দের সতর্ক করতে হবে শুধুমাত্র কোরআনের আয়াত দিয়ে, নিজের মনগড়া ব্যাখ্যায় নয়।
- সূরা আশ-শুআরা (২৬:২১৪, 26:191-214)
- সূরা আল-আন'আম (১৮:২৭)
- সূরা আন-নাহল (১৬:১২৫)
সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলা হয়েছে কাদের সাথে?
কুরআনে কিছু শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে এবং তাদের থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে, যেমন:
- আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধীরা (সূরা মুজাদিলা ৫৮:২২)
- মুনাফিক ও প্রতারকরা (সূরা আন-নিসা ৪:৮৮-৮৯)
- আল্লাহর আয়াত নিয়ে বিদ্রূপকারীরা (সূরা আল-আন'আম ৬:৬৮)
- সীমালঙ্ঘনকারী ও অত্যাচারীরা (সূরা আন-নামল ২৭:৪৮-৪৯)
- গীবতকারী ও অশ্লীল বক্তারা (সূরা কাওসার ৬৮:১০-১১)
সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য নির্দেশিত ব্যক্তিরা:
কুরআন যাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বলেছে তারা হলেন:
- সত্যবাদী ও সৎকর্মশীলরা (সূরা আত-তওবা ৯:১১৯)
- আল্লাহভীরুদের সঙ্গে (সূরা আল-কাহাফ ১৮:২৮)
- জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবানদের সঙ্গে (সূরা আল-আন'আম ৬:১২২)
- আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীরা (সূরা আল-মায়েদা ৫:৫৬)
- নম্র, ধৈর্যশীল ও বিনয়ীদের সঙ্গে (সূরা লুকমান ৩১:১৮-১৯)
এভাবে কুরআনে আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব, তা বজায় রাখার নির্দেশনা এবং সম্পর্কের সঠিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, যা আমাদের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে।
কোরআনে উল্লেখিত উত্তরাধিকারী শ্রেণী:
পিতামাতা (Father and Mother):
- যদি কোনো সন্তান না থাকে, তাহলে পিতামাতা সম্পত্তির এক অংশ পাবেন।
- যদি সন্তান থাকে, তবে পিতামাতা তাদের অংশের একটি নির্দিষ্ট অংশ পাবেন। (সূরা আন-নিসা ৪:১১-১২)
সন্তান (Children):
- সন্তানরা (পুরুষ ও মহিলা) নির্দিষ্ট অংশের অধিকারী। পুরুষ সন্তানদের অংশ সাধারণত মেয়েদের তুলনায় দ্বিগুণ হয়। (সূরা আন-নিসা ৪:১১-১২)
স্ত্রী (Wife):
- স্ত্রীরা স্বামীর সম্পত্তির কিছু অংশ পাবেন। (সূরা আন-নিসা ৪:১২)
ভাই-বোন (Siblings):
- ভাই-বোনদেরও কিছু অংশ পাওয়া যায় যদি পিতা-মাতা বা সন্তান না থাকে। (সূরা আন-নিসা ৪:১২)
দাদা-দাদি, নানী-নানা (Grandparents):
- যদি সন্তান না থাকে, তাহলে দাদা-দাদি বা নানী-নানিরাও কিছু অংশ পেতে পারেন। (সূরা আন-নিসা ৪:১২)
স্বামী (Husband):
- স্বামীও স্ত্রীর মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট অংশ পাবেন। (সূরা আন-নিসা ৪:১২)
এই আয়াতগুলোতে উত্তরাধিকারী সম্পর্কিত বিস্তারিত নিয়ম দেওয়া হয়েছে এবং নির্দিষ্টভাবে আল্লাহ প্রত্যেক আত্মীয়ের জন্য তাদের প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ করেছেন।
