জান্নাতে যাওয়ার Short-Cut পথ! ঝাকাত-সাদাকা-খুমুস ২.৫% / ২০%? কোন খাতে, কত ব্যয়?

আর তারা, যাদের সম্পদের মধ্যে নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে; যাচনাকারী ও বঞ্চিতদের জন্য। আর যারা কর্মফল দিনকে সত্য মনে করে। এবং তারাও, যারা তাদের রবের আযাবের ব্যাপারে ভীত-70:24-25

আর তাদের সম্পদের মধ্যে রয়েছে যাচনাকারীদের ও বঞ্চিতের জন্য অধিকার। এবং দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীর মধ্যে রয়েছে বহু নিদর্শন; আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও। তবে কি তোমরা দেখবে না চোখগুলো খুলে?-51:19-21

📌খুমুস (২০%): কোরআনের নির্দেশনা ও বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি-


📌যাকাতের নির্ধারিত হার ২.৫% কোথা থেকে এলো?/ এর উৎস কী? এই হার: নির্ধারণের পেছনের কারণ ও প্রেক্ষাপট:


📌 ঝাকাত-সাদাকা- খুমুস কোন খাতে ব্যয় করবো?, কতটুকু পরমিাণ? কাকে দবে বা কে প্রাপ্য? এর আইনদাতা কি বলেন আর বান্দারা কী করেন?


📌 খুমুস কি? কতটুকু পরিমাণ দেব? কাকে দেব?/ কোন খাতে ব্যয় করবো?


📌 সাদাকা কি? কতটুকু পরিমাণ? কাকে দেব?/ কোন খাতে ব্যয় করবো?


📌 যাকাত কি? কতটুকু পরিমাণ? কাকে দেব? /কোন খাতে ব্যয় করবো?


প্রশ্ন: যাকাত পরিশোধের পরিমাণ কত?

💡উত্তর: কুরআনে যাকাতের তিনটি পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে -  

1. উপার্জনের এক-পঞ্চমাংশ – (আল কোরআন ৮:৪১)

    প্রযোজ্য হলে: Option

2. মৌলিক খরচের পর উদ্বৃত্ত অংশ – (আল কোরআন ২:২১৯)


প্রযোজ্য হলে: Option

3. অসচ্ছল অবস্থায় সামর্থ্য অনুযায়ী দান – (আল কোরআন ৩:১৩৪)

- - - - - - - - - - - -

তথ্যের উৎস: কোরআনই যথেষ্ট, কোনো বাড়তি উৎস প্রয়োজন নেই: প্রমাণ: 

  • আল  কোরআনেই সবকিছু বর্ণিত আছে: "(সূরা আল-আনআম :৩৮, আরও দ্র: ৩৯:২৩, ৬:114-১১৫, 17:89, 16:89) 

আল্লাহর প্রশ্ন: "তাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, আমরা তোমার ওপর কিতাব নাজিল করেছি, যা তাদের সামনে পাঠ করা হয়? নিশ্চয়ই এতে এমন এক সম্প্রদায়ের জন্য অনুগ্রহ এবং উপদেশ রয়েছে, যারা বিশ্বাস রাখে"(২৯:৫১)   আর আল কোরআনকে যথেষ্ট না মনে করা মানে রাসূলের অভিযোগের শিকার হওয়া: (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৩০)

ঝাকাত-সাদাকা- খুমুস

খুমুস (২০%): কোরআনের নির্দেশনা ও বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি:

যাকাতের নির্ধারিত হার ২.৫% কোথা থেকে এলো?/ এর উৎস কী?

এই হার: নির্ধারণের পেছনের কারণ ও প্রেক্ষাপট:

ইসলামে যাকাত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে আল কোরআনে যাকাতের নির্দিষ্ট হার (%) উল্লেখ করা হয়নি। আল কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে যাকাতের গুরুত্ব ও দানের নির্দেশনা থাকলেও, সেখানে ২.৫% হার নির্ধারণ করা হয়নি। তাহলে এই নির্দিষ্ট হার কোথা থেকে এলো? এটি কি আল্লাহর বিধান, নাকি পরে রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে সংযোজন করা হয়েছে? এই প্রশ্নের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারন, যাকাত-সাদাকার বিধানদাতা বলেন- "এটি একটি বরকতপূর্ণ গ্রন্থ, যা আমরা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা এর আয়াতগুলিতে চিন্তা-ভাবনা কর এবং বুদ্ধিমানরা উপদেশ গ্রহণ করে"-৩৮:২৯

আল কোরআনে যাকাতের উল্লেখ:

কোরআনে বহু স্থানে যাকাতের কথা এসেছে, তবে কোথাও নির্দিষ্ট হার উল্লেখ করা হয়নি, যেমন:

وَأَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُوا۟ ٱلزَّكَوٰةَ
"তোমরা ছলাত সমষ্টিকে প্রতিষ্ঠা কর [অহীর (প্রার্থনা বা অনুশীলনের) মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি সংযোগ স্থাপন কর] এবং ঝাকাত আদায় করবে/কর" (২:৪৩, ২:৮৩, ২:১১০, ১৯:৩১)

ধনসম্পদ থেকে সদকা (Wealth and Zakat):
آية: "خُذْ مِنْ أَمْوَٰلِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا"
"তাদের ধনসম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করো। সেটার মাধ্যমে তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে এবং তাদের উপকারে আসবে।" (সূরা তাওবা 9:103)

এমন বহু আয়াতে যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট হার বলা হয়নি। আল্লাহ চাইলে সরাসরি নির্দিষ্ট পরিমাণ বা হার উল্লেখ করতে পারতেন, যেমন সালাতের সময় নির্দিষ্ট করেছেন।

সালামুন আলা রসূল (সা.) কি যাকাতের হার নির্ধারণ করেছিলেন?

অনেকের বিশ্বাস, সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা.) যাকাতের হার নির্ধারণ করেছিলেন। তবে কোরআন স্পষ্টভাবে বলে যে, রসূল (সা.) নতুন বিধান প্রণয়ন করতে পারেন না, বরং তিনি কেবল আল্লাহর বিধান প্রচার করেন।

আয়াত:
"হে রসূল! তোমার প্রতি তোমার রবের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা পৌঁছে দাও; আর যদি তুমি তা না পৌঁছে দাও, তবে তোমার রিসালাতের দায়িত্ব সম্পূর্ণ হয়নি" (সূরা আল মায়েদা ৫: 67)

  1. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও বিধান আরোপ: ইসলামে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য বিধান প্রণয়ন করার অধিকার নেই। আল কোরআন এ ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়:
    آية: "إِنِ ٱلْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ"
    "বিধান শুধুমাত্র আল্লাহর।" (সূরা আনআম 6:57)
  2. অবশ্যই কোরআনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়: কোরআন যা নির্দেশ করে, তার সাথে কোনো অন্যথা হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
    آية: "وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنزَلَ ٱللَّهُ"
    "তুমি তাদের মধ্যে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছে, তার ভিত্তিতে বিচার কর" (সূরা মায়েদা 5:49)

3. রাসূলের বিধান:
آية: "وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلْهَوَىٰ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ"
"তিনি নিজের ইচ্ছায় কিছু বলেন না। এটি তো শুধুমাত্র এক Divine Revelation।" (সূরা নাজম 53:3-4)

وَ اُوۡحِیَ اِلَیَّ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنُ لِاُنۡذِرَکُمۡ بِہٖ وَ مَنۡۢ بَلَغَ ؕ

4. এবং আমার কাছে এই কুরআন ওহী করা হয়েছে, যেন এর দ্বারা আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি এবং তাকেও যার কাছে তা পৌঁছবে-6:19

এতে বোঝা যায় যে, সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা.) নিজে যাকাতের এই হার (%) নির্ধারণ করেননি। তাহলে যাকাতের এই নির্দিষ্ট হার (২.৫%) নির্ধারণ করলো কে? কোথা থেকে, কিভাবে এলো?

আল কুরআনুল মাবিন-এ  যাকাতের জন্য একটি নির্দিষ্ট হার উল্লেখিত নেই। যাকাত আদায়ের জন্য কিছু মৌলিক নীতি এবং উপায় দেওয়া হয়েছে। কথিত ইসলামী ইতিহাসে, উমাইয়া এবং আব্বাসী শাসনামলে যাকাতের হার ২.৫% নির্ধারণ করা হয়, যা পরবর্তীতে প্রথা হয়ে যায়।

উমাইয়া শাসনামল নির্দিষ্ট হার প্রতিষ্ঠা

ইসলামের প্রথম যুগে যাকাত ছিল একটি সাধারণ দান ব্যবস্থা, যার পরিমাণ নির্ধারণ ছিল ব্যক্তি ও সমাজের ওপর নির্ভরশীল। তবে উমাইয়া শাসনের (৬৬১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ) সময়ে যাকাতের হার ২.৫% নির্ধারণ করা হয়। উমাইয়ারা ইসলামি রাজত্বকে একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং রাজস্ব সংগ্রহ সহজ করতে তারা যাকাতের নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করে। যেহেতু খিলাফত একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল, তাই কর ব্যবস্থাকে সহজ করতে নির্দিষ্ট হার প্রতিষ্ঠা করা হয়।

আব্বাসীয় যুগে (৭৫০-১২৫৮) করব্যবস্থা যাকাত

আব্বাসীয় খলিফারা (বিশেষ করে হারুন আল রশিদ ও মামুনের সময়) পূর্ববর্তী ব্যবস্থাকে আরো সুসংগঠিত করেন। তারা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ও যাকাত আদায়ের নিয়ম চালু করেন। অর্থাৎ, এটি ইসলামী বিধানের পরিবর্তে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে কার্যকর হয়েছিল।

পরবর্তী ইসলামি শাসন যাকাতের হার প্রতিষ্ঠা

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিভিন্ন ফকিহ (ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ) ও শাসকরা যাকাতের হারকে আরও সুসংগঠিত করেন। শাফেয়ি, হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মাজহাবের অনুসারীরা বিভিন্ন সূত্রের ওপর ভিত্তি করে ২.৫% হারকে প্রচলিত করেন।

কোরআনের নির্দেশনা বনাম প্রচলিত হার

কোরআন অনুসারে যাকাতের হার নির্ধারণ করা হয়নি। বরং আল্লাহ প্রতিটি ব্যক্তির উপার্জন ও সামর্থ্য অনুযায়ী দান করতে বলেছেন:
وَيَسْـَٔلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ قُلِ ٱلْعَفْوَ
"তারা জিজ্ঞেস করে, কতটুকু ব্যয় করবে? বলো, তোমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশ।" (সূরা আল-বাকারা ২:২১৯)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে দেখায় যে, যাকাতের নির্দিষ্ট হার নেই। বরং এটি মানুষের সামর্থ্য ও প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

যাকাত বনাম খুমুস: প্রকৃত হার কী হওয়া উচিত?

যেহেতু কোরআনে নির্দিষ্ট কোনো হার নেই, তাই প্রকৃতপক্ষে খুমুসের ধারণা অধিক গ্রহণযোগ্য হতে পারে। খুমুসের ক্ষেত্রে আল্লাহ কোরআনে স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করেছেন যে, যে কোনো আয় থেকে ২০% (এক-পঞ্চমাংশ) প্রদান করতে হবে:


فَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِن شَيْءٍ فَإِنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ
"তোমরা যা কিছু লাভ কর, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর জন্য।" (সূরা আল-আনফাল ৮:৪১)
এটি যুদ্ধলব্ধ সম্পদের জন্য নির্দিষ্ট নয়, বরং সকল আয় ও অর্জনের জন্য প্রযোজ্য। তাই যদি নির্দিষ্ট হার মানতে হয়, তবে ২০% খুমুসই কোরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ২.৫% যাকাত নয়।

শিক্ষা:

  • কোরআনে যাকাতের হার নির্দিষ্ট করা হয়নি, বরং মানুষের সামর্থ্য অনুযায়ী দানের কথা বলা হয়েছে।
  • সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা.) নতুন বিধান প্রণয়নের এখতিয়ার রাখতেন না, তাই তিনি যাকাতের নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করেননি।
  • উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকদের সময়ে যাকাতের হার ২.৫% নির্ধারণ করা হয়, যা পরে প্রচলিত হয়ে যায়।
  • কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, খুমুস (২০%) প্রকৃত হার হতে পারে, যা সকল আয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

অতএব, প্রচলিত ২.৫% যাকাতের হার মূলত ইসলামের প্রাথমিক বিধান নয়, বরং এটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধার্থে পরবর্তী সময়ে গঠিত হয়েছে। প্রকৃত ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ফিরে যেতে হলে, কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী দান ও সম্পদ বণ্টনের নীতি অনুসরণ করাই শ্রেয়। 

খুমুস কি?

খুমুস (২০%): কোরআনের নির্দেশনা ও বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি

খুমুস (خُمُسْ) অর্থ "এক-পঞ্চমাংশ" বা ২০% সম্পদ প্রদান। এটি মূলত সূরা আল-আনফাল (৮:৪১)-এ উল্লেখিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করতে হবে। তবে কোরআনের নির্দেশনা অনুসারে খুমুস কেবল যুদ্ধলব্ধ সম্পদের জন্যই নয়, বরং যেকোনো আয় (যেমন বেতন, ব্যবসায়িক লভ্যাংশ, খনিজ সম্পদ) থেকেও ২০% প্রদান করা উচিত। কারণ, কোরআনে যাকাতের কোনো নির্দিষ্ট হার উল্লেখ নেই, বরং এটি পরবর্তীতে উমাইয়া ও অন্যান্য শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ২.৫% নির্ধারণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে, খুমুসই হলো প্রকৃত অর্থে আল্লাহর নির্ধারিত সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা।


খুমুসের মূল কোরআনিক আয়াত:

📖 "আর জেনে রাখ, তোমরা যদি কোনো কিছু গনীমত (যা কিছু অর্জিত লাভ/সম্পদহিসেবে পাও, তবে তার এক-পঞ্চমাংশ (খুমুস) আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য, তাঁর আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত..." সূরা আল-আনফাল (৮:৪১)

এখানে "غَنِمْتُمْ" (গনীমত) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা সাধারণত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বোঝায়। তবে কিছু ব্যাখ্যাকারী মনে করেন, "গনীমত" শুধু যুদ্ধলব্ধ সম্পদের জন্য নয়, বরং যেকোনো ধরণের আয়ও হতে পারে।


গনীমত এর আয়াত ও প্রমাণ: গনীমত: একটি বিস্তৃত:

আল কোরআনে গনীমত শব্দের প্রাসঙ্গিকতা বুঝতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়াত উল্লেখ করা হলো:

গনীমত (غنيمة) শব্দটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার অর্থ কেবল যুদ্ধে অর্জিত সম্পদ নয়। বরং এটি যে কোনো ধরনের অর্জন বা উপার্জনকে বোঝায়। ইসলামে গনীমত শব্দটি মূলত “গানাম” (غنم) থেকে এসেছে, যার অর্থ ছাগলের পাল বা ভেড়ার পাল। এটি বোঝায় যে, যে কোনো সহজলভ্য বা কষ্টসাধ্য আয়ের জন্য এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

1.      সূরা আল-আনফাল (:৬৯)

فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَالًا طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
অর্থ: অতএব, তোমরা যা লাভ করেছ, তা থেকে শুদ্ধ ও পবিত্র হিসেবে খাদ্য ভক্ষণ কর এবং আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলো; নিশ্চয় আল্লাহ মহা ক্ষমাশীল, পরম করুণাশীল।

এই আয়াতে দেখা যায়, "গনীমত" শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে উপার্জিত ও বৈধ আয়ের জন্য।

2.      সূরা আল-আনফাল (:৪১)

فَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِن شَيْءٍ فَإِنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَىٰ
অর্থ: জানো, তোমরা যা কিছু লাভ করেছ, তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য এবং নিকট আত্মীয়দের জন্য।

এখানে গনীমতের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, এটি কেবল যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নয় বরং সমাজের জন্য একটি সম্পদ, যা সঠিকভাবে বণ্টন করতে হবে।

3.      সূরা আল-হাদিদ (:৯৪)

فَعِنْدَ اللَّهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ
অর্থ: আল্লাহর কাছে প্রচুর গনীমত, অর্থাৎ প্রচুর ধন সম্পদ রয়েছে।

এই আয়াতে আল্লাহর কাছে সকল ধরনের ধন-সম্পদের উল্লেখ রয়েছে, যা যুদ্ধের বাইরেও অন্তর্ভুক্ত।

4.      সূরা আল-ফাতহ (৪৮:২০)

وَعَدَكُمُ اللَّهُ مَغَانِمَ كَثِيْرَةً
অর্থ: আল্লাহ তোমাদেরকে প্রচুর গনীমতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এটি বোঝায় যে, আল্লাহ মানুষের জন্য বৈধ ও পবিত্রভাবে অর্জিত সম্পদের আশ্বাস দিয়েছেন।

"গনীমত" শব্দের ব্যাপক অর্থের মধ্যে আসলেই শুধুমাত্র যুদ্ধে অর্জিত সম্পদ অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি যে কোনো ধরনের অর্জিত সম্পদকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতে পারে, বিশেষ করে যখন তা অন্যের কাছ থেকে অধিকারিত হয়। এর একটি বিস্তৃত ও আভিধানিক অর্থ রয়েছে, যা কোনোকিছুর লাভ বা অধিকারীকরণের সাথে সম্পর্কিত।  আবিধানিক আরবি ভাষায় "গনীমত" (غنيمة) শব্দটির অর্থ হলো "লাভ" বা "অর্জন"। এটি মূলত ফায়ল (ফায়ল হলো যে ক্রিয়া বা কাজ করা হয়) যা সম্পদ লাভের বা কোনো কিছু অর্জনের প্রক্রিয়াকে বোঝায়।  গনীমতের মধ্যে শুধু যুদ্ধে অর্জিত সম্পদই নয়, বরং অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের প্রাপ্তি, যেমন:

  • খনিজ সম্পদ: যেমন তেল, গ্যাস, খনিজ খনন ইত্যাদি, যা প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত হয়।
  • উপার্জিত বেতন: ব্যক্তিগত কাজের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ, যা একজনের শ্রমের প্রতিফলন।
  • ব্যবসার লভ্যাংশ: ব্যবসার মাধ্যমে প্রাপ্ত লাভ, যা বিনিয়োগ ও পরিচালনার ফলস্বরূপ।

এইসব ক্ষেত্রেই গনীমত শব্দটি প্রযোজ্য হতে পারে, কারণ এগুলি সবই মানুষের কাজ বা সম্পদ লাভের ফল।

আল কোরআনে যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি হলো যে কোনো ধরনের অর্জন বা সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও বণ্টন করার দায়িত্ব সমাজের উপর রয়েছে। তাই গনীমত বলতে কেবল যুদ্ধের সম্পদ নয়, বরং যেকোনো বৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বোঝানো হয়, যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সঠিক বণ্টন করা সম্ভব।

এটি সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিহাসের আলোকে খুমুস যাকাত

(১) খুমুস বনাম যাকাত: প্রাথমিক ইসলামী সমাজে খুমুসের প্রচলন ছিল অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য। যাকাত একটি সাধারণ দান হিসেবেও ব্যবহৃত হতো, তবে কোরআনে এর হার নির্দিষ্ট করা হয়নি। পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফারা রাজনৈতিক স্বার্থে ২.৫% যাকাত হার নির্ধারণ করেন, যা কোরআনের মূল শিক্ষার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।

(২) ইসলামের প্রাথমিক যুগে খুমুসের প্রয়োগ: সালামুল আলা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময় শুধু যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নয়, বরং ব্যবসায়িক লভ্যাংশ, খনিজ সম্পদ ও উপহার থেকেও খুমুস আদায় করা হতো। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, খলিফা আলী (রা.) ও আহলে বাইত এই নীতিকে সমর্থন করেছেন।

(৩) বর্তমান মুসলিম সমাজে খুমুসের প্রাসঙ্গিকতা: শিয়া সম্প্রদায়ের অনেক অনুসারী এখনো তাদের আয়ের ২০% খুমুস হিসাবে দেন, যা ইসলামের শুরুর দিকের ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুন্নি সমাজেও কিছু ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।


খুমুস যেকোনো আয় থেকে দিতে হবেএর পক্ষে যুক্তি:

১. কোরআনিক নির্দেশনা: কোরআনে সঠিকভাবে উপার্জিত অর্থের ওপর খুমুস প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল যুদ্ধলব্ধ সম্পদের জন্য নয়, বরং যেকোনো বৈধ আয়ের জন্য প্রযোজ্য, যেমন ব্যবসার লভ্যাংশ, বেতন ও খনিজ সম্পদ।

فَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِن شَيْءٍ فَإِنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ
(সূরা আল-আনফাল ৮:৪১)

এই আয়াতটি বোঝায় যে, "যা কিছু তুমি লাভ করেছ, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর জন্য।" এটি যুদ্ধের বাইরে সকল আয়ের ওপর খুমুসের ব্যতিক্রমী প্রয়োগকে নির্দেশ করে।

(১) কোরআনে "গনীমত" শব্দের প্রসারিত অর্থ: কিছু ব্যাখ্যাকারী বলেন যে, "গনীমত" শব্দ শুধু যুদ্ধলব্ধ সম্পদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, বরং যেকোনো ধরণের আয় বা লাভের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

(২) খুমুস কেবল যুদ্ধের জন্য সীমিত নয়: ৮:৪১ আয়াতে "আল্লাহ, রাসূল, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন মুসাফিরদের জন্য" খুমুস ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। এটি যুদ্ধের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের দিকে ইঙ্গিত করে।

(৩) আয় সম্পদের ভারসাম্য: যাকাতের মতো খুমুসও ধনী-গরিবের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের একটি নীতিমালা, যা সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।

(৪) যাকাতের হার কোরআনে নির্ধারিত নয়: কোরআনে যাকাতের হার উল্লেখ নেই। এটি মূলত উমাইয়া ও অন্যান্য শাসকরা রাজনৈতিক স্বার্থে ২.৫% নির্ধারণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে, ২০% খুমুসই হল আল্লাহর নির্ধারিত ন্যায়সঙ্গত সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা।


খুমুস ফরজ নাকি ঐচ্ছিক?

কিছু মানুষ মনে করেন, খুমুস শুধু যুদ্ধলব্ধ সম্পদের জন্য ফরজ। তবে কোরআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গনীমত শুধুমাত্র যুদ্ধের জন্য নয়, বরং যেকোনো ধরণের আয়কে বোঝায়

যেহেতু কোরআনে যাকাতের কোনো নির্দিষ্ট হার নেই, তাই প্রকৃত ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় খুমুসের ২০% হারই গ্রহণযোগ্য।

যারা কোরআনের অনুসারী হয়ে ২০% খুমুস দিতে চান, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর বিধান মেনে চলছেন। এটি শুধু ঐচ্ছিক নয়, বরং কোরআন অনুযায়ী ফরজ।

সুতরাং, যারা খুমুসকে শুধুমাত্র যুদ্ধলব্ধ সম্পদের জন্য সীমাবদ্ধ রাখতে চান, তারা প্রকৃত কোরআনিক নির্দেশনার সাথে দ্বিমত করছেন। প্রকৃতপক্ষে, যেকোনো আয়ের উপর খুমুস প্রযোজ্য হওয়া উচিত।


আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন খুমুস যেকোনো আয়ের উপর ফরজ হওয়া উচিত? নিচে কমেন্ট করে জানান!

হ্যাঁ! অবশ্যই, খুমুস যেকোনো আয়ের উপর ফরজ হওয়া উচিত।


আল-কুরআনের আলোকে যাকাত সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর:

প্রশ্ন : যাকাত সদাকাহর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: যাকাত হলো আত্মশুদ্ধির একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা, আর সদাকাহ যাকাতের অর্থনৈতিক দিককে প্রকাশ করে। অর্থাৎ, যাকাতের ব্যাপকতা বেশি, আর সদাকাহ হলো আল্লাহর পথে ব্যয়ের একটি অংশ – (৯:১০৩, ২৩:৪)।

প্রশ্ন : যাকাত পরিশোধের পরিমাণ কত?

উত্তর: কুরআনে যাকাতের তিনটি পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে –

  1. পাঁচের এক ভাগ – (৮:৪১)
  2. মৌলিক খরচের পর উদ্বৃত্ত অংশ – (২:২১৯)
  3. অসচ্ছল অবস্থায় সামর্থ্য অনুযায়ী দান – (৩:১৩৪)

প্রশ্ন : যাকাত কি শুধু ধনী মুসলিমদের জন্য আবশ্যক?
উত্তর: কুরআনের দৃষ্টিতে যাকাত শুধু বিত্তবানদের জন্য নয়, বরং ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলের জন্য ফরজ – (২:৩, ২:৪৩, ২:১৭৭, ২৪:১, ২৮:৮৫)।

প্রশ্ন : যাকাত পরিশোধ না করলে কী ক্ষতি হবে?
উত্তর: যারা যাকাত পরিশোধ করে না, আল্লাহ তাদের কাফির হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন – (৪১:৭)।

প্রশ্ন : যাকাত বা খুমুস কখন পরিশোধ করতে হবে?
উত্তর: যখনই আয় হবে, তখনই যাকাত বা খুমুস পরিশোধ করা আবশ্যক – (৬:১৪১)।

প্রশ্ন : স্বর্ণ রৌপ্যের যাকাত কীভাবে পরিশোধ করতে হবে?

উত্তর: স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত টাকা-পয়সা দ্বারা পরিশোধ করা যাবে না। বরং তা অবশ্যই স্বর্ণ ও রৌপ্য দ্বারাই পরিশোধ করতে হবে – (৯:৩৪-৩৫)।

প্রশ্ন : যাকাত বা খুমুসের নিসাব কত? কত পরিমাণ সম্পদ হলে পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক?
উত্তর: কুরআনের আলোকে নিসাব নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আয় হলে তা আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ম অনুযায়ী ব্যয় করতে হবে। উদ্বৃত্ত থাকলে তা আল্লাহর পথে দান করতে হবে, এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করা আবশ্যক – (২:২১৯, ৮:৪১, ৩:১৩৪)।
অর্থাৎ, নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের শর্ত ছাড়াই, সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর পথে ব্যয় করা ফরজ।

প্রশ্ন : কোন কোন সম্পদ বা পণ্যের যাকাত খুমুস দিতে হবে?
উত্তর: হালাল সকল সম্পদ ও পণ্যের যাকাত-খুমুস দিতে হবে। কুরআনের বিধান অনুসারে, যেকোনো সম্পদের পাঁচ ভাগের এক ভাগ (খুমুস) বা মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অংশ ব্যয় করতে হবে। অসচ্ছল অবস্থায়ও সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর পথে ব্যয় করা উচিত – (৮:৪১, ২:২১৯)।

প্রশ্ন : শাড়ি-লুঙ্গি-গামছা দ্বারা যাকাত/সাদাকাহ/খুমুস পরিশোধ করা যাবে কি?
উত্তর: যেকোনো পোশাক যেমন শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ইত্যাদি দান করা যায়। তবে নিম্নমানের বা কম মূল্যের জিনিস দিয়ে যাকাত পরিশোধ করা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, আল্লাহ প্রত্যেককে তার সামর্থ্য ও মান অনুযায়ী উত্তম বস্তু ব্যয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। নিম্নমানের বা নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করা নিষিদ্ধ – (২:২৬৭, ৫:৮৯)।
তবে যারা লুঙ্গি-গামছা-শাড়ির ব্যবসা বা উৎপাদন করে, তারা তাদের মান অনুযায়ী এসব পণ্য যাকাত হিসেবে দিতে পারবে।

যাকাত তথা সাদাকাহর খাতসমূহ:

আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِيْنَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيْلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيْلِ فَرِيْضَةً مِّنَ اللهِ وَاللهُ عَلِيْمٌ حَكِيمٌ.

নিশ্চয়ই সাদাকাহ তথা যাকাত নির্ধারিত হয়েছে
1️⃣ দরিদ্রদের জন্য (ফকির),
2️⃣ নিঃস্বদের (মিসকিন),
3️⃣ যাকাত উত্তোলনের জন্য নিয়োগকৃত কর্মীদের জন্য,
4️⃣ যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা প্রয়োজন,
5️⃣ দাস মুক্তির জন্য,
6️⃣ ঋণগ্রস্তদের জন্য,
7️⃣ আল্লাহর পথে (কুরআনের বিধান প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের প্রচার) ব্যয় করার জন্য,
8️⃣ পথযাত্রী (মুসাফির) যারা অসহায় অবস্থায় পড়েছে তাদের জন্য।

📖এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অর্থনৈতিক অধিকার। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়" (সূরা আত-তাওবা: ৯:৬০) 

 

খুমুস এর খাতসমূহ:

وَاعْلَمُوْا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُوْلِ وَلِذِيْ الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِيْنِ وَابْنِ السَّبِيْلِ إِنْ كُنْتُمْ آمَنتُمْ بِالله وَمَا أَنزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.

অর্থঃ আর তোমরা খুব ভালভাবে জেনে নাও অর্থাৎ বাস্তবায়নের জন্য জ্ঞানলাভ কর যে, তোমরা অবশ্যই যে কোন কিছু থেকে তোমরা যা কিছু আয় রূপে / উপার্জনরূপে পেয়েছে অবশ্যই আল্লাহর জন্যই তার এক পঞ্চমাংশ ও রসূলের জন্য নিকট আত্মীয়, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের ও আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য-8:41

 

✅আনফাল্ এর খাতসমূহ:

يَسْأَلُونَكَ عَن الْأَنفَالِ قُلِ الْأَنفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُوْلِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَأَطِيْعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِن كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ.

হে রসূল! তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করছে/করবে যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ তথা আল্লাহ্ বিশেষ অনুগ্রহ সম্পর্কে। উত্তরে তুমি বলে দাওঃ যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ আল্লাহ্ ও রসূলের জন্যই নির্ধারিত-8:1

✅ ফাই এর খাতসমূহ :

مَاۤ اَفَآءَ اللّٰہُ عَلٰی رَسُوۡلِہٖ مِنۡ اَہۡلِ الۡقُرٰی فَلِلّٰہِ وَ لِلرَّسُوۡلِ وَ لِذِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡیَتٰمٰی وَ الۡمَسٰکِیۡنِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ۙ کَیۡ لَا یَکُوۡنَ دُوۡلَۃًۢ بَیۡنَ الۡاَغۡنِیَآءِ مِنۡکُمۡ ؕ وَ مَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡہُ ٭ وَ مَا نَہٰىکُمۡ عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ۘ

যা আল্লাহ জনপদবাসীর থেকে তাঁর রসূলের কাছে ‘ফায়’ দিয়েছেন তবে তা আল্লাহর জন্য ও তাঁর রসূলের জন্য এবং নিকটাত্মীয়ের ও ইয়াতিমদের ও মিসকিনদের এবং পথিকের জন্য। যাতে তা তোমাদের মধ্য থেকে ধনীদের মাঝে আবর্তিত না হয়। আর রসূল তোমাদের কাছে যা নিয়ে এসেছেন এরপর তোমরা তা গ্রহণ করো এবং যা তোমাদের নিষেধ করেছেন তখন তা থেকে তোমরা বিরত থাক। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর-59:7  

ইনফাক-এর খাতসমূহ:

(২:৮৩, ২:১৭৭, ৪:৩৬, ৬৯:৩৪, ১০৭:৩, ৯৩:১০)

📖 আল্লাহ বলেন:

"উদয়াচলের অস্তাচলের দিকে তোমাদের চেহারা ফেরানোতে কোনো পুণ্য নেই। বরং পুণ্য হলো, যে ঈমান আনে আল্লাহতে, শেষ দিনে, মালাকগণ, কিতাবসমূহ নবীগণের প্রতি; এবং যে নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন, পথিক, যাচনাকারী, দাসমুক্তির খাতে সম্পদ দান করে- সেটার ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও।
আর যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে, তাদের অঙ্গীকারের ব্যাপারে পূর্ণ থাকে, যখন তারা অঙ্গীকার করে; এবং অভাব, অসুস্থতা সংকটের সময় ধৈর্য ধারণ করে। ওরাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকী।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১৭৭)

ইনফাকের খাতসমূহ:

  • নিকটাত্মীয়দের জন্য
  • ইয়াতিমদের জন্য
  • মিসকিনদের জন্য
  • পথিকদের জন্য
  • যাচনাকারীদের জন্য
  • দাসমুক্তির খাতে
  • সালাত প্রতিষ্ঠার জন্য
  • যাকাত আদায়ের জন্য 

ইনফাক বা খরচের বিভিন্ন দিক:

  • আল্লাহর পথে খরচ করা – (২:২৫৪, ২:২৬৭)
  • আল্লাহ্ প্রদত্ত রিজিক থেকে খরচ করা – (২:৩)
  • পিতা-মাতার জন্য খরচ করা – (২:২১৫)
  • সর্বাধিক প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে খরচ করা – (৩:৯২)
  • মুত্তাকী হওয়ার পূর্বশর্ত হলো আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক থেকে খরচ করা – (২:৩)
  • খরচের ভারসাম্য রক্ষা করা – (১৭:২, ১৭:৩, ২৫:৬৭)
  • কাফিররাই আল্লাহর পথে খরচের ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করে – (৩৬:৪৭)
  • পবিত্র ও হালাল আয় থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করা – (২:৬৭)
  • স্বামী তার স্ত্রীর জন্য খরচ করবে – (৪:৩৪)

অপরিহার্য / আবশ্যক ইনফাকের বিধানঃ
আর হে রসূল! তারা তোমার কাছে প্রশ্ন করে-করবে কি বা কত তারা খরচ করবে? হে নবী তুমি উত্তরে বলে দাও, যা মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ব থাকবে তা অবশ্যই ব্যয় করতে হবে। এভাবেই আল্লাহ্ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর বিধানসমূহকে, যাতে নিশ্চিতভাবে তোমরা গবেষণা করতে থাক-২:২১৯ 

আনফাল শব্দের বিশ্লেষণ

আনফাল শব্দের ব্যুৎপত্তি:
"আনফাল" (الأنفال) শব্দটি আরবি, যা "নাফল" (نفل) শব্দের বহুবচন। কুরআনে "নাফল" মূলধারায় চারটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

আনফালের শাব্দিক অর্থ:

  • বিশেষ দায়িত্ব কর্তব্য – (১৭:৭৯)
  • বিশেষ অনুগ্রহ – (৮:১)
  • আবশ্যক কর্মের অতিরিক্ত কোনো কাজ – (১৭:৭৯)
  • যুদ্ধলব্ধ সম্পদ – (৮:১)
  • বিশেষ উপহার – (২১:৭২)

আনফালের শারঈ সংজ্ঞা:
কুরআনের আলোকে, আনফাল বলতে বোঝায় আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানে পরিচালিত যুদ্ধে অর্জিত ধন-সম্পদ বা আসবাবপত্র

আনফাল সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্য:

📖"তারা তোমাকে যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলে দাও, আনফাল আল্লাহ তাঁর রাসূলের জন্য নির্ধারিত। অতএব, আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক রাখো, আর আল্লাহ তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও"  (৮:১) 

ফাই (الفيء) শব্দের বিশ্লেষণ

ফাই-এর শাব্দিক অর্থ:

  • ফিরে আসা – (৪৯:৯)
  • পিছনে ফিরে যাওয়া
  • স্থান পরিবর্তন করা
  • শপথ নিয়ে ব্রত গ্রহণ করা তথা সঠিক দায়িত্ব পালন করা – (৪৯:৯)
  • কোনো কিছু কর্তৃত্ব বা দখলে আসা
  • সাধারণভাবে কোনো কিছু লাভ করা
  • বিনা কষ্টে বা বিনা পরিশ্রমে কিছু অর্জন করা – (৫৯:৭)
  • আল্লাহর অশেষ দয়ায় যুদ্ধের ময়দানে কিছু অর্জন করা – (৫৯:৭)

ফাই-এর শারঈ সংজ্ঞা:
কুরআনের বিধান অনুযায়ী, আল্লাহর নির্দেশে পরিচালিত যুদ্ধে, বিনা সংঘর্ষে, বিনা কষ্টে এবং শান্তিপূর্ণভাবে অর্জিত ধন-সম্পদকে ফাই বলা হয় – (৫৯:৭)।

সাদাকাহ্ এর শারয়ী সংজ্ঞা:

সাদাকাহ্ হল ঝাকাতের অর্থনৈতিক দিক, যা আল কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করা হয়।
📖 প্রমাণ: (সূরা আল-বাকারা ২:২৮০, সূরা আল-মুনাফিকুন ৬৩:১০, সূরা আত-তাওবা ৯:১০৩, সূরা আল-বাকারা ২:২৬৩)

সাদাকাহ্ প্রদানকারীকে মুতাছাদ্দিক বলা হয়। (সূরা আল আহজাব ৩৩:৩৫)

সাদাকাহ্ এর অর্থ:

  • সত্য কথা বলা
  • সত্যবাদিতা
  • নিশ্চিত আস্থা ও বিশ্বাস
  • সত্যবাদি হওয়া
  • সত্য বিধান গ্রহণ করা
  • বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য হওয়া
  • বদান্যতা

করযে হাসানা কী?

"করযে হাসানা" (قرض حسن) দুটি আরবি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত—
🔹 "করজ" (قرض) অর্থ: কর্তন করা, বিলিয়ে দেওয়া, খরচ করা, উৎসর্গ করা, উত্তমভাবে ব্যয় করা।
🔹 "হাসানা" (حسن) অর্থ: সুন্দর, ভালো, উত্তম।

📖 আল-কুরআনের আলোকে করযে হাসানা:


করযে হাসানা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ধন-সম্পদ ও জীবন আল্লাহর পথে সর্বোত্তমভাবে ব্যয় করা

📌 প্রমাণ: (সূরা আল-বাকারা ২:২৪৫, সূরা আল-মায়েদা ৫:১২, সূরা আল-হাদীদ ৫৭:১১, ১৮, সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১৭, সূরা আল-মুজ্জাম্মিল ৭৩:২০)

করযে হাসানার পুরস্কার:

বহুগুণ পুরস্কার দেওয়া হবে(সূরা আল-বাকারা ২:২৪৫, সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১৭)
অপরাধসমূহ ক্ষমা করা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে(সূরা আল-মায়েদা ৫:১২)
সম্মানজনক পুরস্কার দেওয়া হবে(সূরা আল-হাদীদ ৫৭:১১, ১৮)


 ✅যাকাতের শাব্দিক অর্থ:

  • পবিত্রতা আত্মশুদ্ধি: অর্থ ও সম্পদ ব্যয়ের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা – (৯:১০৩)
  • বৃদ্ধি সমৃদ্ধি: বৃদ্ধি পাওয়া, উন্নতি সাধন করা – (৩০:৩৯, ১৬:৯২)
  • পরিশুদ্ধতা বিশুদ্ধতা: পরিশুদ্ধ হওয়া, পবিত্র হওয়া – (৯:১০৩, ২:১২৯, ১৯:৩)
  • উত্তমরূপে বৃদ্ধি পাওয়া-১৬:৯২।
  • বিশুদ্ধ করা-২:১২৯।
  • উন্নয়ন প্রাণবন্ততা: কোনো কিছুকে প্রাণবন্ত করা, উন্নতি সাধন করা – (৯১:৯)
  • অভাবী দরিদ্রদের অধিকার: দানশীলতা ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা – (৭০:২৪-২৫, ৫১:১৯, ২৩:৪)
  • প্রশাসনিকভাবে কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা: সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা – (২২:৪৪)
  • কার্যকরী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা-২৩:৪।
  • উন্নতি সাধনকরা-৯১: ৯।
  • কোন কিছু প্রাণবন্ত করা-৯১:৯।
  • - - - - - - - - - - - - - - -

কুরবানির গোশত বণ্টনের খাতসমূহ:

لِّيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُوْمَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِّنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَكُلُوْا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ

“যাতে তারা নিজেদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে, যখন তিনি তাদের চতুষ্পদ জন্তু কুরবানির জন্য দান করেছেন। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাবগ্রস্তদেরও আহার করাও” 📖 (সূরা আল-হাজ্জ: ২২:২৮, ৩৬)

কুরবানির গোশত বণ্টনের নিয়ম:

1️⃣ নিজের জন্য – পরিবার-পরিজনসহ উপভোগ করা।
2️⃣ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের জন্য – যারা নিজেরা কুরবানি দিতে অক্ষম।
3️⃣ আত্মীয়, প্রতিবেশী ও সমাজের অন্যান্যদের জন্য – বিশেষত যারা অভাবগ্রস্ত নয়, তবুও তাদের সঙ্গে সম্প্রীতি ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বিতরণ করা।

কুরবানির অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক:

সকল নবী-রাসূলের প্রশাসনিক কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য ছিল ওহীভিত্তিক কল্যাণমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন, সালাত প্রতিষ্ঠা ও যাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা
📖 (সূরা আল-আম্বিয়া: ২১:৭৩)

- - - - - - - - - - -  - - -

মৃত্যুর সময়  Time Petition:

ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদেরকে যেন তোমাদের সম্পদ আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে, আর না তোমাদের সন্তানসন্ততিও। আর যারা সেটা করে, তাহলে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।  আর আমরা তোমাদের যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে তোমরা ব্যয় করো তোমাদের কারো মৃত্যু আসার আগেই। তখন সে বলবে, হে আমার রব! আপনি আমাকে কেন নিকটবর্তী সময় পর্যন্ত সুযোগ দিলেন না! তাহলে আমি সাদাকা করতাম এবং আমি হতাম সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত! আর আল্লাহ কখনও কাউকে অবকাশ দেন না, যখন তার নির্দিষ্ট সময় এসে যায়। আর আল্লাহ সে বিষয়ে অন্তর্নিহিত জ্ঞানসম্পন্ন, যা তোমরা করো-সূরা আল মুনাফিকুন 63:9-11


No Tension!!
“যারা নিজেদের ধন-সম্পদ দিনে ও রাতে, গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তাদের প্রতিদান তাদের রবের কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না”-(সূরা আল-বাকারা ২:২৭৪)

Video

https://www.facebook.com/reel/613079878139361

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post