ফিতরা: ফিতরা সম্পর্কে আল কোরআন কি কিছু বলে? তাহলে কোন কোন খাতের কথা বলে? আর আমরা কী করি?

আর যখন তাদেরকে বলা হলো, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুসরণ করো, তারা বলল, আমরা বরং সেটার অনুসরণ করি যার ওপর আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি। যদি এমন হয়, তাদের পূর্বপুরুষরা কিছুই বুঝত না এবং তারা সঠিকপথে চলত না, তবুও কি!-সূরা আল বাকারা ২:১৭০।

- - - - -  - - -  - - - - - - - 

আল কোরআনে ব্যয়ের খাতসমূহ: তবে ফিতরা—এটি কোথা থেকে এলো?

কোরআনে বিভিন্ন প্রকার আর্থিক লেনদেন ও দান-খয়রাতের খাত নির্ধারিত আছে। এগুলোর প্রতিটির ব্যাপারে আল্লাহ সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন এবং কোথায় ব্যয় করতে হবে, সেটিও নির্দিষ্ট করেছেন।

  1. সাদাকাহ (যাকাত) খাতসমূহ
  2. ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে ব্যয় করা)
  3. খুমুস (পঞ্চমাংশ কর)
  4. ইতআম/ত্বাআম (খাদ্য দান)
  5. মাউন (সামাজিক সাহায্য)
  6. রমাদানে ফিদইয়া (শারীরিক অসামর্থ্য ব্যক্তিদের জন্য মুক্তিপণ)
  7. ফসলের পরিশুদ্ধতা (উৎপাদিত শস্যের হক আদায় করা)
  8. করযে হাসানা (নিষ্কলুষ ঋণ)
  9. আনফাল ও ফাই (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ)
  10. কাফফারা (শপথ ভঙ্গ, হত্যার ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি)

"আল্লাহ বলেন: আমি কিতাবে কিছুই বাদ রাখিনি"-সূরা আল-আনআম ৬:৩৮

তাহলে ফিতরা? ফিতরা কি নাযিলকৃত বিধান আল কোরআনে আছে বা রাসূলকে এমন বিধান সম্পর্কে বলতে বলা হয়েছে? বিষয়টি জানা ও মানার জন্য একটু খতিয়ে দেখতে দোষ কি!


📌 আইনদাতা বা হুকুমদাতা, বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ!

إِنِ ٱلْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
“হুকুম দেওয়ার অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহর” (সূরা ইউসুফ ১২:৪০, ১২:৬৭), আরও দ্র: ৬:১১৪, ৬:৫৭
 اَلَا لَہُ الۡخَلۡقُ وَ الۡاَمۡرُ
➡️ “জেনে রাখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই”-আল-আরাফ 7:54 

বলো! প্রকৃতপক্ষে আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমার কাছে ওহী করা হয় যে, তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাতের আশা করে থাকে, তাহলে সে যেন সংশোধনের কাজ করে এবং তার রবের ইবাদতের সাথে যেন কাউকে শিরক না করে”-সূরা আল-কাহফ ১৮:১১০

➡️ এই আয়াত থেকে বোঝা যায়: ✅ ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য—তাঁর ইবাদতে কাউকে শরীক করা যাবে না।

📖 আর তোমরা সত্যকে অসত্যের সাথে মিশ্রিত কোরো না এবং তোমরা সত্যকে গোপন কোরো না, অথচ তোমরা জানো-সূরা আল-বাকারা ২:৪২


বিদআ (নতুন উদ্ভাবন Innovation):

ইসলামের মধ্যে এমন কিছু নতুন দ্বীনি কার্যক্রম বা আহসানুল হাদিস বিধান আল কোরআনে নেই, তাকে বলা হয় বিদআ। কুরআনে স্পষ্টভাবে নতুন উদ্ভাবন বা বিদআ সম্পর্কে সতর্কতা জ্ঞাপন করা হয়েছে, এবং এসবকে নিষিদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

📖 সূরা আল-মায়িদা (৫:৩)
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন (ধর্ম) পূর্ণ করে দিলাম, এবং আমি তোমাদের উপর আমার নিয়ামত (অভিসম্পূর্ণ রহমত) পূর্ণ করেছি, এবং আমি তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন (ধর্ম) হিসেবে পছন্দ করেছি।”
📖 (সূরা আল-মায়িদা ৫:৩)

➡️ এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে ইসলাম সম্পূর্ণ ও পূর্ণ হয়ে গেছে, এবং নতুন কিছু উদ্ভাবন বা পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই।


এবারে উল্লেখিত খাতসমূহের বিস্তারিত:


আল কুরআনে আল্লাহর নির্দেশ:

“আর তারা, যাদের সম্পদের মধ্যে নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে; যাচনাকারী ও বঞ্চিতদের জন্য। আর যারা কর্মফল দিনকে সত্য মনে করে। এবং তারা, যারা তাদের রবের আযাবের ব্যাপারে ভীত!”-সূরা আল মুফফিকুন (70:24-25)

“আর তাদের সম্পদের মধ্যে রয়েছে যাচনাকারীদের ও বঞ্চিতের জন্য অধিকার। এবং দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীর মধ্যে রয়েছে বহু নিদর্শন; আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও। তবে কি তোমরা দেখবে না চোখগুলো খুলে?” – সূরা আয-যারিয়াত (51:19-21)

1. ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে ব্যয় করা)

“যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি শস্যবীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ বের হয় এবং প্রতিটি শীষে একশটি করে দানা থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহু গুণ বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।”
📖 (সূরা আল-বাকারা: ২৬১)

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা উত্তম বস্তু ব্যয় করো, যা তোমরা অর্জন করেছ এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি।”
📖 (সূরা আল-বাকারা: ২৬৭)

ইনফাক সম্পর্কিত আরও যেসব আয়াত: ২:২৬১, ২:২৬৭, ২:২৭১, ২:২৭৪, ৩:১৩৪, ৪:৩৭, ১০৭:৩, ২:২১৫, ২:২১৯, ৫৭:১১, ৬৩:৯

📌 ইনফাকের খাত:
• আল্লাহর পথে
• দরিদ্র-মিসকিন
• ইয়াতিম
• আত্মীয়স্বজন
• মুক্তিপ্রাপ্ত দাস
• ঋণগ্রস্ত
• মুজাহিদ


2. খুমুস (পঞ্চমাংশ কর)

"তোমরা যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো, তবে জেনে রাখো, যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ, রাসূল, আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য।"
📖 (সূরা আল-আনফাল: ৪১)
📌 যুদ্ধলব্ধ সম্পদের পাঁচভাগের একভাগ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করতে হয়।


3. যাকাত (সাদাকাহ) খাতসমূহ

"সাদাকাহ তো কেবল ফকির-মিসকিন, যাকাত আদায়কারীদের, যাদের মন আকৃষ্ট করতে হয়, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত।"
📖 (সূরা আত-তওবা: ৬০)

📌 যাকাতের আটটি খাত:

 ১. ফকির (দরিদ্র)

যাদের সম্পদ নেই বা অত্যন্ত সীমিত আয়ে জীবনযাপন করে।

২. মিসকিন (অসহায়)

যারা এতটাই অভাবগ্রস্ত যে মৌলিক চাহিদাও মেটাতে পারে না।

 ৩. আমিলীন (সাদাকা সংগ্রহ ও বিতরণের কর্মচারী)

যারা জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের দায়িত্ব পালন করে।

৪. মুআল্লাফাতুল কুলুব (যাদের অন্তর ইসলাম গ্রহণের দিকে আকৃষ্ট করা প্রয়োজন)

যাদের ইসলামের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করা হয়।

৫. রিকাব (দাস মুক্তির জন্য)

যারা দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য সাহায্যের প্রয়োজন।

৬. গারিমীন (ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি)

যারা বৈধ কারণে ঋণে জর্জরিত হয়ে গেছে এবং পরিশোধ করতে পারছে না।

 ৭. ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে ব্যয় করা)

 আল কোরআন ভিত্তিক দাওয়াত, শিক্ষা ও অন্যান্য ইসলামী কাজে ব্যয় করা হয়।

 ৮. ইবনুস সাবিল (পথিক বা মুসাফির)

যারা ভ্রমণের পথে বিপদে পড়েছে এবং সহায়তা প্রয়োজন।


4. ইতআম/ত্বাআম (খাদ্য দান):

"তারা আল্লাহর ভালোবাসায় দরিদ্র, ইয়াতিম ও বন্দীদেরকে খাদ্য খাওয়ায়।"
(সূরা আদ-দাহর: ৮), আরও দ্র: আয়াত 90:14-16, 107:1-7, 102:1, 70:24-25

 📌 ইসলামে খাদ্যদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।


5. মাউন (সামাজিক সাহায্য):

"তারা মিসকিনদের খাদ্য দানে উৎসাহিত করে না, আর তারা ছোটখাটো উপকারমূলক বস্তু দিতেও বিরত থাকে।"
📖 (সূরা আল-মাউন: ৩-৭)
📌 মাউন বলতে দরিদ্রদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সাহায্য বুঝানো হয়।


6. রমাদানে ফিদইয়া (শারীরিক অসামর্থ্য ব্যক্তিদের জন্য মুক্তিপণ)

"যারা রোযা রাখতে সক্ষম নয়, তাদের জন্য পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাওয়ানো (ফিদইয়া) নির্ধারিত।"
📖 (সূরা আল-বাকারা: ১৮৪)
📌 যারা রোযা রাখতে পারে না, তাদের জন্য ফিদইয়া দেওয়া বাধ্যতামূলক।


7. ফসলের পরিশুদ্ধতা (উৎপাদিত শস্যের হক আদায় করা):

"ফসল কাটার দিন তার হক (যাকাত) আদায় করো।"
📖 (সূরা আল-আনআম: ১৪১)
📌 উৎপাদিত ফসল থেকেও দান করতে হয়।


8. করযে হাসানা (নিষ্কলুষ ঋণ):

"কে আছেন, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, যাতে আল্লাহ তা দ্বিগুণ-চতুর্গুণ বাড়িয়ে দেন? আল্লাহ সংকীর্ণ করেন এবং প্রশস্ত করেন, এবং তোমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।"
📖 (সূরা আল-বাকারা: ২৪৫)
📌 এটি একটি পবিত্র ঋণ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দেওয়া হয়।


9. আনফাল ও ফাই (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ)

(ক) আনফাল:
"তারা তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে। বলো, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক করো।"
📖 (সূরা আল-আনফাল: ১)

(খ) ফাই:
"আল্লাহ তাঁর রাসূলকে যে সম্পদ দিয়েছেন, তা আল্লাহ, রাসূল, আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য। যাতে এটি কেবল ধনী লোকদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।"
📖 (সূরা আল-হাশর: ৭)
📌 ফাই সম্পদ বিশেষভাবে রাসূল ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ।


10. কাফফারা (শপথ ভঙ্গ, হত্যার ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি)

কসম ভঙ্গ, হত্যা, স্ত্রীকে জিহার করা ইত্যাদির জন্য কাফফারা নির্ধারিত।
📌 যেমন:
• কসম ভঙ্গ: ১০ জন মিসকিনকে খাওয়ানো / তিন দিন রোযা। (সূরা আল-মায়েদা: ৮৯)
• জিহার: দাস মুক্ত করা / ৬০ দিন রোযা / ৬০ জন দরিদ্রকে খাওয়ানো। (সূরা আল-মুজাদিলা: ২-৪)


তবে, ফিতরা কি কোরআনে আছে?

📌 কোরআনে "ফিতরা" নামে কোনো আলাদা খাত নেই। বরং যাকাত, ইতআম, ফিদইয়া ও অন্যান্য খাত রয়েছে, যেখানে দরিদ্রদের খাদ্যদান করা হয়।


✅ সুতরাং, রমাদানের শেষে "ফিতরা" নামক নতুন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা কোরআনের বিধান নয়। বরং সাদাকা (যাকাত), ফিদইয়া, মাউন, ইতআম ইত্যাদি খাতে ব্যয় করাই কোরআনের নির্দেশ।


📌 মানুষ যদি প্রকৃত কোরআনের নির্দেশিত খাত অনুযায়ী দান-খয়রাত করতো, তাহলে সমাজে দরিদ্রতা কমতো এবং ধর্মের নামে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা লাগতো না।


কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীন (ধর্ম) সম্পূর্ণ করেছেন এবং তাঁর বিধানসমূহ সম্পূর্ণরূপে প্রণীত হয়েছে। ফলে, কোনো নতুন কিছু উদ্ভাবন বা নতুন বিধান সংযোজন ইসলামে Accesses নাই এবং শিরক হিসেবে গণ্য করা হবে।





Video-2


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post