ইরান প্রশ্নে মুসলিম দেশগুলোর নীরবতা: সমস্যাটি রাজনৈতিক নাকি কোরআন উপলব্ধির?

কেন মুসলিম বিশ্ব ইরানের পাশে নেই? আসল রহস্য কি কোরআন অনুধাবনে?

মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত কেন? নাযিলকৃত বিধান বাদ দিয়ে হায়রে হাদিস?

════════

এক নাম ‘মুসলিম’, পরিচয় শত শত: এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা:

আজকের মুসলিম বিশ্বকে দেখলে একটি প্রশ্ন অবধারিতভাবে মনে আসে: আমাদের পরিচয় কী? আমরা কি কেবলই ‘মুসলিম’? নাকি আমাদের পরিচয় আরও জটিল ও খণ্ডিত?

বাস্তবতা হলো, মুসলিমরা আজ শিয়া, সুন্নি, হানাফি, হাম্বলি, শাফিয়ি, মালিকি, মাজহাবী, লা-মাজহাবী, আহলে হাদিস, সালাফী, আহলে কুরআন, নানা ইমামী, তাবলিগি, জামায়াতি, হেফাজতি, জাকেরী, ভান্ডারী ইত্যাদি অসংখ্য দলে, মতে এবং পরিচয়ে বিভক্ত। এই বিভক্তির জাল এতই বিস্তৃত যে, আল্লাহর দেওয়া ‘মুসলিম’ (আত্মসমর্পণকারী) নামক মূল পরিচয়টিই আজ দলীয় পরিচয়ের নিচে চাপা পড়ে গেছে। 

এই বিভক্তির সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি হলো, এক গ্রুপ অন্য গ্রুপকে, একদল অন্য দলকে অবলীলায় ‘কাফের’, ‘মুশরিক’ বা ‘পথভ্রষ্ট’ বলে ফতোয়া দিয়ে বেড়ায়। 

তারা নিজেদের প্রাথমিক পরিচয় "মুসলিম" হিসেবে না দিয়ে, নিজ নিজ দলের পরিচয় দেয়।

এই বিভক্তির মূল কারণ হলো কোরআনের পাশাপাশি হাদিস, ফিকহ বা দলীয় মতাদর্শকে অনুসরণ করা।

প্রকৃত "মুসলিম" (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী) হলো সে-ই, যে একমাত্র অনুসরণীয় গ্রন্থ হিসেবে আল-কোরআনকে মানে (দ্র: ৪৩:৬৯)।

এই সংজ্ঞার আলোকে, উল্লিখিত দলগুলো কি "মুসলিম" হিসেবে গণ্য হতে পারে?

চলুন, বিষয়টি দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি!

১. "একমাত্র কোরআন" বা আয়াত-বিশ্বাসী দৃষ্টিভঙ্গি:

এর মূল ভিত্তি হলো কোরআনের কিছু নির্দিষ্ট আয়াত:

কোরআন স্বয়ংসম্পূর্ণ: "আমি কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো বিধানকর্তা সন্ধান করব, অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন?-(সূরা আল-আনআম, ৬:১১৪)।

কোরআনে সবকিছুর বর্ণনা আছে: ...আমি আপনার প্রতি গ্রন্থ নাযিল করেছি যেটি এমন যে তা প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা, হেদায়েত, রহমত এবং মুসলমানদের জন্যে সুসংবাদ-(সূরা আন-নাহল, ১৬:৮৯)।

অনুমান অনুসরণ করা নিষেধ: বস্তুতঃ তাদের অধিকাংশই শুধু অনুমানের অনুসরণ করে। আর সত্যের মোকাবেলায় অনুমান কোনই কাজে আসে না। (সূরা ইউনুস, ১০:৩৬)। (এই মতের অনুসারীরা হাদিসকে মানব-বর্ণিত এবং শতভাগ নিশ্চিত নয় বলে 'অনুমান' বা 'ধারণা' (Zann) হিসেবে দেখেন)।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে:

মুসলিম? মুসলিম কে?: যে ব্যক্তি (নিঃশর্তভাবে) শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাব অর্থাৎ কোরআনের কাছে আত্মসমর্পণ করে, সে-ই মুসলিম।

অন্যান্য দলের অবস্থান: যখন কোনো ব্যক্তি বা দল কোরআনের পাশাপাশি অন্য কোনো গ্রন্থ (যেমন: সহিহ বুখারি, আল-কাফি), কোনো ইমামের মত (যেমন: ইমাম আবু হানিফা), বা কোনো নেতার দর্শনকে ধর্মের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করে, তখন তারা আল্লাহর বিধানের সাথে শরিক বা অংশীদার স্থাপন করে। তারা কোরআনের "সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত" হওয়ার ঘোষণাকে কার্যত অস্বীকার করে।

আল কোরআনের চশমায় তাকালে বোধে আসে-  কুরআনি "চশমা" বা সংজ্ঞা অনুযায়ী, যে কোনো দল যারা বলে "কোরআন ও সহিহ হাদিস মানতে হবে" বা "কোরআন ও ইমামদের কথা মানতে হবে"—তারা মুসলিম নয়। কারণ তারা আল্লাহর নির্দেশের সাথে মানুষের কথাকে শর্ত হিসেবে জুড়ে দিয়েছে। এই মতানুসারে, তারা "সুন্নি মুসলিম" বা "শিয়া মুসলিম" হতে পারে, কিন্তু কেবলই "মুসলিম" (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী) নয়।


কোরআনভিত্তিক সংজ্ঞা অনুযায়ী: উল্লিখিত কোনো দলই খাঁটি "মুসলিম" নয়, কারণ তারা কোরআনের সাথে মানব-রচিত উৎসকে যুক্ত করেছে। তাদের পরিচয় দলীয়, আত্মসমর্পণকারী নয়।


ঐতিহ্যবাহী, ব্যাপক সংজ্ঞা অনুযায়ী দাবী: তারা সবাই মুসলিম, কারণ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মানে (?)। তাদের মধ্যকার বিভেদ হলো ইসলামকে বোঝা ও পালন করার পদ্ধতিগত পার্থক্য। আসলে কি তাই?

মূল সমস্যা: বিচ্ছিন্নতা এবং দলীয় গোঁড়ামি—সেটি একটি অনস্বীকার্য সত্য। মুসলিমরা "আমরা মুসলিম" বলার চেয়ে "আমরা সুন্নি" বা "আমরা শিয়া" বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে অথচ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন:

১. একতাবদ্ধ থাকার সরাসরি নির্দেশ এবং বিভক্ত হতে নিষেধ:

আয়াত: আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমাদের উপর আল্লাহর সেই নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরের শত্রু ছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়গুলোকে জুড়ে দিয়েছেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে-(সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৩)

অনুধাবন: আল্লাহর রজ্জু (حَبْلِ اللَّهِ): এটি হলো আল-কোরআন এবং আল্লাহর মনোনীত দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা)। আল্লাহ একটি মাত্র রজ্জু বা পথ ধরতে বলেছেন, একাধিক নয়।

সরাসরি দুটি নির্দেশ: এই আয়াতে একটি ইতিবাচক (Positive) নির্দেশ—"আঁকড়ে ধরো" এবং একটি নেতিবাচক (Negative) নির্দেশ—"বিচ্ছিন্ন হয়ো না"—একসাথে দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ, শুধু কোরআন মানলেই হবে না, ঐক্যবদ্ধভাবে মানতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই দল-উপদলে বিভক্ত হওয়া যাবে না।


ঐক্য একটি নেয়ামত: আল্লাহ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ঐক্য হলো তাঁর পক্ষ থেকে একটি মহান অনুগ্রহ বা নেয়ামত।

২. যারা দ্বীনকে বিভক্ত করেছে, তাদের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই

আয়াত: নিশ্চয়ই যারা নিজেদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে (শিয়া) বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোনো দায়িত্ব তোমার উপর নেই। তাদের ব্যাপার আল্লাহর উপর ন্যস্ত। অতঃপর তিনিই তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দেবেন- (সূরা আল-আনআম, ৬:১৫৯)

অনুধাবন:

স্পষ্ট ঘোষণা: এই আয়াতটি অত্যন্ত কঠোর এবং সুস্পষ্ট। আল্লাহ তাঁর নবীকে (সাঃ) সরাসরি বলছেন যে, যারা ইসলামকে বিভক্ত করে বিভিন্ন দল বা "শিয়া" (شِيَعًا - Sects/Parties) তৈরি করেছে, তাদের সাথে নবীর কোনো সম্পর্ক নেই।

দায়মুক্তি: এটি নবীর (সা.আ.) জন্য একটি দায়মুক্তির ঘোষণা। অর্থাৎ, এই বিভক্তির দায় নবীর নয়, বরং যারা বিভক্তি সৃষ্টি করেছে, তাদের। আল্লাহ নিজেই তাদের বিচার করবেন।

আজকের দিনে যারা নিজেদের "শিয়া" বা "সুন্নি" ইত্যাদি নামে পরিচয় দেয়, এই আয়াতটি তাদের জন্য একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা।

৩. দ্বীনকে বিভক্ত করা মুশরিকদের কাজ:

...এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। তাদের মতো, যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে পরিণত হয়েছে। প্রত্যেক দলই নিজদের যা আছে, তা নিয়ে আনন্দিত-(সূরা আর-রূম, ৩০:৩১-৩২)

অনুধাবন: 

বিভক্তি একটি শিরক: এই আয়াতে দ্বীনকে বিভক্ত করাকে সরাসরি শিরকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কারণ, আল্লাহর দ্বীন এক ও অখণ্ড। একে বিভক্ত করার অর্থ হলো—আল্লাহর বিধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি (ইমাম, আলেম, নেতা) বা গ্রন্থের (হাদিস, ফিকহ) আনুগত্যকে অপরিহার্য করে তোলা, যা এক প্রকার অংশীদারিত্ব স্থাপন।

দলীয় অহংকার: "প্রত্যেক দলই নিজদের যা আছে, তা নিয়ে আনন্দিত" (كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ)—এই অংশটি বর্তমান বাস্তবতার নিখুঁত চিত্রায়ন। প্রতিটি দল (শিয়া, সুন্নি, হানাফি, আহলে হাদিস ইত্যাদি) নিজেদের মতবাদকেই সঠিক মনে করে এবং তা নিয়ে গর্ব করে, যা বিভক্তিকে আরও মজবুত করে।

৪. সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পরেও বিভক্ত হতে নিষেধ

আয়াত: "আর তাদের মতো হয়ো না, যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে এবং সুস্পষ্ট প্রমাণসমূহ (আল-কোরআন) আসার পরেও মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে। আর তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি- (সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৫)

অনুধাবন: 

সুস্পষ্ট প্রমাণ (الْبَيِّنَاتُ): এখানে সুস্পষ্ট প্রমাণ বলতে আল-কোরআনকে বোঝানো হয়েছে, যা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী।

গুরুতর অপরাধ: কোরআন নাযিল হওয়ার মাধ্যমে যখন দ্বীন পূর্ণ ও সুস্পষ্ট হয়ে গেছে, তারপর দলাদলি বা মতবিরোধ করা একটি গুরুতর অপরাধ, যার জন্য "মহা শাস্তি"-র ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

৫. বিভেদের পরিণতি: ব্যর্থতা ও শক্তিহীনতা

আয়াত: "আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং পরস্পরে ঝগড়া-বিবাদ করো না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন-(সূরা আল-আনফাল, ৮:৪৬)

অনুধাবন: 

বাস্তব পরিণতি: এই আয়াতে বিভেদ ও বিবাদের পার্থিব পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে। এর ফলে মুসলিম উম্মাহ ব্যর্থ হবে (فَتَفْشَلُوا) এবং তাদের শক্তি ও প্রভাব (رِيحُكُمْ) চলে যাবে।

বর্তমান চিত্র: আজকের মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালে এই আয়াতের সত্যতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।  বিবাদের কারণে তারা আজ বিশ্বজুড়ে দুর্বল ও শক্তিহীন।

এই আয়াতগুলো থেকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামে শিয়া, সুন্নি বা অন্য কোনো নামে দল তৈরি করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ (হারাম) এবং এটি আল্লাহর নির্দেশের সরাসরি লঙ্ঘন। আল্লাহর নির্দেশ হলো—একমাত্র কোরআনকে আঁকড়ে ধরে "মুসলিম" হিসেবে ঐক্যবদ্ধ থাকা।

এর মূল কারণ হলো, কোরআনকে ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু না বানিয়ে, এর সাথে হাদিস, ফিকহ, ইমাম বা নেতার মতাদর্শকে এমনভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে, সেগুলোই মূল পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, আজ আমরা এমন এক উম্মাহ, যার নাম এক—মুসলিম, কিন্তু পরিচয় শত শত। প্রত্যেক দলই নিজেদের মত ও পথকে শ্রেষ্ঠ ভেবে অন্যকে ভুল বা বিচ্যুত মনে করছে, যা কোরআনের ভাষায় "প্রত্যেক দলই নিজদের যা আছে, তা নিয়ে আনন্দিত" (সূরা আর-রূম, ৩০:৩২)—এই ভয়াবহ বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

এই শত শত পরিচয়ের ভিড়ে আল্লাহ প্রদত্ত সেই মূল পরিচয়—‘মুসলিম’—আজ কোথায় হারিয়ে গেছে? এটিই আজ প্রত্যেক চিন্তাশীল মানুষের প্রধান প্রশ্ন।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post