কান ফোঁড়ানো, নাক ফোঁড়ানো, খাৎনা থেকে খাসিকরণ-জিএম ফুড-হাইব্রিড ফুড: সীমা কোথায়? কোনটি বৈধ, কোনটি সৃষ্টির বিকৃতি?-আল কোরআনের আলোকে অনুধাবন

🌱 আপনার খাবার ও সৌন্দর্যে শয়তানের হস্তক্ষেপ? কোরআনের দুটি আয়াত যা আপনাকে ভাবাবে-

🍔আমরা কি অজান্তেই শয়তানের অনুসারী? ‘সৃষ্টির পরিবর্তন’ নিয়ে কোরআনের চূড়ান্ত সতর্কবাণী-

🍋"আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন নেই" -এই ঐশী ঘোষণার বিরুদ্ধে শয়তানের চ্যালেঞ্জ ও আজকের বাস্তবতা-

😈যে চক্রান্তে জড়িয়ে পড়ছে মানবজাতি: কোরআনের আলোয় ‘আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন’-এর ভয়াবহ রূপ-

🌸সৌন্দর্য চর্চা ও আধুনিক বিজ্ঞান: স্রষ্টার নিয়ামত নাকি শয়তানের চক্রান্ত?-

🍎কোরআন, জিএম ফুড এবং বিউটি ইন্ডাস্ট্রি: শয়তানের যে ফাঁদ কোরআন ১৪০০ বছর আগেই উন্মোচন করেছে-

⚡️সূরা নিসা ১১৯: শয়তানের যে প্রতিশ্রুতি আজ বিজ্ঞান ও ব্যবসার নামে বাস্তবায়িত হচ্ছে-

📖প্রকৃত কল্যাণ কোথায়? স্রষ্টার অপরিবর্তনীয় সৃষ্টি নাকি মানুষের তৈরি বিকৃতি? - একটি কোরআনিক বিশ্লেষণ-

নিচের দিকে ভিডিও লিংক দেয়া আছে-

নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে-সূরা আত-ত্বীন ৯৫:৪


মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু এক সুনির্দিষ্ট বিধান ও ভারসাম্য অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। এই নিখুঁত সৃষ্টির স্রষ্টা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি তাঁর সৃষ্টিকে সর্বোত্তম গঠনে এবং এক বিশেষ প্রাকৃতিক নিয়মে (ফিতরাত) তৈরি করেছেন। এই ঐশী বিধানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে শয়তানের চিরন্তন চক্রান্ত, যার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে দিয়ে আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি ও পরিবর্তন ঘটানো। এই প্রবন্ধে আমরা সূরা আর-রূম এর ৩০ নম্বর আয়াত এবং সূরা আন-নিসা এর ১১৯ নম্বর আয়াতের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করব এবং দেখব কীভাবে স্রষ্টার নির্দেশনা থেকে বিচ্যুত হয়ে মানুষ শয়তানের ফাঁদে পা দেয়। আমাদের একমাত্র উৎস হবে আল-কোরআন, কারণ চূড়ান্ত সত্য ও কল্যাণ শুধুমাত্র স্রষ্টার কালামেই নিহিত।

ঐশী মূলনীতি – “আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই”

আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি জগতের জন্য একটি অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মানুষসহ সকল সৃষ্টি এই বিধানের অধীন। এই বিধানকেই ‘ফিতরাত’ বলা হয়েছে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত বিশুদ্ধ প্রকৃতি। আল্লাহ বলেন:

“অতএব, তুমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজ চেহারাকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর সেই ফিতরাতের অনুসরণ কর, যে ফিতরাতের উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল-সঠিক দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না” (সূরা আর-রূম, ৩০:৩০)

এই আয়াতে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত সুস্পষ্ট:

  1. দ্বীনে হানীফ (একনিষ্ঠ দ্বীন): আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থাই হলো সরল ও একনিষ্ঠ পথ।

  2. ফিতরাতাল্লাহ (আল্লাহর ফিতরাত): আল্লাহ মানুষকে একটি বিশুদ্ধ ও প্রাকৃতিক স্বভাবের উপর সৃষ্টি করেছেন, যার মূল ভিত্তি হলো এক আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ।

  3. লা তাবদীলা লিখাল্ক্বিল্লাহ (আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন নেই): আল্লাহর এই সৃষ্টিগত বিধান বা প্রাকৃতিক নিয়ম অপরিবর্তনীয়। এই ‘খাল্ক্বাল্লাহ’ বা আল্লাহর সৃষ্টি কেবল শারীরিক গঠন নয়, বরং এর অন্তর্ভুক্ত হলো প্রাকৃতিক নিয়ম, মানুষের আধ্যাত্মিক স্বভাব এবং আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান।

আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকে যে কতটা নিখুঁত ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তৈরি করেছেন, তার প্রমাণ কোরআনের বহু আয়াতে বিদ্যমান। তিনি মানুষকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন:

“তিনিই সাত আসমান স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে তুমি কোনো ত্রুটি দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখ, কোনো ফাটল দেখতে পাও কি?” (সূরা আল-মুলক, ৬৭:৩)

এমনকি মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কেও আল্লাহ বলেন:

“আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম গঠনে” (সূরা আত-তীন, ৯৫:৪)

এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সৃষ্টি তার মৌলিক অবস্থায় নিখুঁত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং কল্যাণকর। এতে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ বা পরিবর্তন মানেই সেই ভারসাম্যকে নষ্ট করা।

দ্বিতীয় অধ্যায়: শয়তানের প্রতিশ্রুতি – “আমি তাদের আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করতে নির্দেশ দেব”

আল্লাহর এই নিখুঁত বিধানের বিরুদ্ধেই শয়তানের বিদ্রোহ। মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য সে যে সব পদক্ষেপ নেবে, তার একটি পরিষ্কার চিত্র আল্লাহ কোরআনে তুলে ধরেছেন। বিতাড়িত হওয়ার পর শয়তান আল্লাহকে বলেছিল:

“এবং আমি অবশ্যই তাদের পথভ্রষ্ট করব, তাদের মধ্যে মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করব, আমি তাদের নির্দেশ দেব, ফলে তারা পশুর কান চিরে ফেলবে এবং আমি তাদের নির্দেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করে দেবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে, সে সুস্পষ্ট ক্ষতিতে পতিত হয়।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১১৯)

এই আয়াতে শয়তানের কর্মপন্থা অত্যন্ত পরিষ্কার:

  1. পথভ্রষ্ট করা (لَأُضِلَّنَّهُمْ): সত্য পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।

  2. মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করা (لَأُمَنِّيَنَّهُمْ): মানুষের মনে এমন সব কামনা-বাসনা তৈরি করা যা ক্ষতিকর ও ভিত্তিহীন। যেমন—অস্থায়ী সৌন্দর্য, অতিরিক্ত ভোগবিলাস, মিথ্যা আভিজাত্য ইত্যাদি।

  3. নির্দিষ্ট বিকৃতি (فَلَيُبَتِّكُنَّ آذَانَ الْأَنْعَامِ): মুশরিকরা তাদের দেবতাদের নামে পশু উৎসর্গ করার চিহ্ন হিসেবে পশুর কান কেটে দিত। এটি একটি প্রতীকী উদাহরণ, যা আল্লাহর দেওয়া হালাল পশুকে তাঁর বিধানের বাইরে ব্যবহার করে বিকৃত করার নামান্তর।

  4. সাধারণ বিকৃতি (فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ): এটি একটি ব্যাপক ঘোষণা। আল্লাহর যে কোনো সৃষ্টিকে—তা শারীরিক, প্রাকৃতিক বা আধ্যাত্মিক যাই হোক না কেন—বিকৃত করার নির্দেশ দেওয়া শয়তানের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত।

তৃতীয় অধ্যায়: সৃষ্টিতে পরিবর্তনের আধুনিক রূপ ও কোরআনের নির্দেশনা

শয়তানের এই প্রতিশ্রুতি আজ নানা রূপে বাস্তবায়িত হচ্ছে। মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির নামে কিংবা সৌন্দর্য ও ব্যবসার দোহাই দিয়ে আল্লাহর সৃষ্টিতে যে পরিবর্তন আনছে, তার কিছু উদাহরণ কোরআনের মূলনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করা যায়।

১. সৌন্দর্য ও শারীরিক পরিবর্তন:
আল্লাহ মানুষকে "আহসানি তাক্বওয়ীম" বা সুন্দরতম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। তিনি সাজসজ্জা বা সৌন্দর্য চর্চাকে নিষেধ করেননি, বরং এটিকে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

“বলুন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্য ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে?’” (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৩২)

কিন্তু যখন এই সৌন্দর্য চর্চা আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি অসন্তুষ্টি, অকৃতজ্ঞতা এবং শয়তানের প্ররোচিত ‘মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা’ (উমনিয়্যাহ) থেকে উদ্ভূত হয়, তখন তা সীমা লঙ্ঘন করে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে শরীরে স্থায়ী পরিবর্তন আনা, যেমন—সৌন্দর্যের নামে মুখমণ্ডলে স্থায়ী দাগ তৈরি করা, নাক-কান বা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অপ্রয়োজনে কেটে ফেলা—এগুলো আল্লাহর দেওয়া নিখুঁত গঠনকে বিকৃত করার শামিল হতে পারে। এর পেছনের উদ্দেশ্য যদি হয় আল্লাহর সৃষ্টিকে হেয় করা বা নিছক প্রবৃত্তির অনুসরণ, তবে তা শয়তানের দেখানো পথ।

২. প্রাণিজগতে হস্তক্ষেপ:
সূরা আন-নিসার ১১৯ নম্বর আয়াতে পশুদের কান কেটে বিকৃত করার কথা সরাসরি উল্লেখ আছে। এটি ছিল একটি পৌত্তলিক প্রথা। একইভাবে, মাংসের স্বাদ বা পরিমাণ বৃদ্ধির নামে পশুকে খাসি করানো বা জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করা, যা পশুর স্বাভাবিক জীবনচক্রকে ব্যাহত করে, তা "আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন" করার আওতায় পড়ে। আল্লাহ পশুকে মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাদের উপর অপ্রয়োজনীয় কষ্ট বা বিকৃতি চাপানোর জন্য নয়।

“এবং চতুষ্পদ জন্তুগুলোকেও তিনি সৃষ্টি করেছেন; তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে উষ্ণতা ও বহুবিধ উপকার এবং তা থেকে তোমরা আহার কর” (সূরা আন-নাহল, ১৬:৫)

নাকি তারা দেখে না যে, আমাদের হাতসমূহ যা তৈরি করেছে সেসব থেকে আমরা, আমরাই তাদের জন্য বহু গবাদিপশু সৃষ্টি করেছি! অথচ তারাই সেগুলোর অধিকারী-সূরা ইয়াসীন 36:71

৩. খাদ্য ও প্রকৃতিতে পরিবর্তন (জিএম ও হাইব্রিড ফুড):

আল্লাহ জমিনে মানুষের জন্য পবিত্র ও উত্তম (তৈয়্যিব) খাবারের ব্যবস্থা করেছেন।

 “হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে খাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু” (সূরা আল-বাকারাহ, ২:১৬৮)

একচেটিয়া ব্যবসা, অতি মুনাফার লোভ এবং খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে যখন বীজের স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে জিএম (Genetically Modified) বা হাইব্রিড জাত তৈরি করা হয়, তখন তা আল্লাহর প্রাকৃতিক ভারসাম্যের উপর একটি বড় আঘাত। এই ধরনের খাদ্য অনেক ক্ষেত্রে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি তৈরি করে, যা আল্লাহর দেওয়া ‘তৈয়্যিব’ বা পবিত্র খাবারের ধারণার পরিপন্থী। यह আল্লাহর সৃষ্টিতে এমন এক পরিবর্তন, যা প্রকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করে। আল্লাহ বলেন:

“এবং তিনি আসমানকে সুউচ্চ করেছেন এবং স্থাপন করেছেন ভারসাম্য (মীযান), যাতে তোমরা ভারসাম্যে সীমা লঙ্ঘন না কর।” (সূরা আর-রহমান, ৫৫:৭-৮)

প্রকৃতিতে জেনেটিক পরিবর্তন এই ভারসাম্যের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।


সুন্নাতে খাতনা? (প্রতীকি ছবি)

৪. খাতনা প্রসঙ্গ:

আপনার প্রশ্নে উল্লিখিত "অপ্রয়োজনে খাতনা" বিষয়ে বলতে গেলে, এটি কোরআনে সরাসরি আলোচিত কোনো বিষয় নয়। যেহেতু আপনার অনুরোধ ছিল কেবলমাত্র কোরআনের আয়াত দিয়ে বিশ্লেষণ করার, তাই আমাদের স্বীকার করতে হবে যে কোরআনে খাতনার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো সুস্পষ্ট আয়াত নেই। কোরআন ইবরাহীম (আঃ)-এর ملت বা আদর্শ অনুসরণ করতে বলে (সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৩), কিন্তু খাতনা সেই আদর্শের অংশ কি না, তার বর্ণনা কোরআনে অনুপস্থিত। সুতরাং, এই নির্দিষ্ট বিষয়টিকে "আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন" এর শয়তানি চক্রান্তের সাথে মেলানো বা না মেলানো—কোনোটিই সরাসরি কোরআনের ভাষ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায় না।

১. নারীর গালে বা চেহারার অন্যান্য অংশে যে কর্তনচিহ্ন বা দাগ দেখা যায়: 

অনেক আফ্রিকান মুসলিমের তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ধর্মীয় পরিচয় পাশাপাশি চলে। আফ্রিকান অনেক নারীর (এবং কিছু ক্ষেত্রে পুরুষদেরও) গালে বা চেহারার অন্যান্য অংশে যে কর্তনচিহ্ন বা দাগ দেখা যায়, সেগুলোকে ইংরেজিতে "স্কারিফিকেশন" (Scarification) বা "ট্রাইবাল মার্কস" (Tribal Marks) বলা হয়। এগুলি কোনো এলোমেলো আঘাতের চিহ্ন নয়, বরং এর পেছনে গভীর সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক (কুসংস্কার) তাৎপর্য রয়েছে।

যেটি আমি ২০১২ সালে হজ্জব্রত পালনকালে মক্কাতেও আফিকান অনেক নারীদের এমন চিহ্ন বা দাগ দেখেছি-আমাকে অনেক ভাবাত এবং আল কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাপারে অজ্ঞতার ফলে বিষয়টি নিয়ে কারও সংগে শেয়ারও করতে পারিনি।

আফ্রিকান ওসব মুসলিম নর-নারীরাও হয়তো আল কোরআনের ব্যাপারে অজ্ঞ, যেমন আল্লাহ বলেন-

হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক মুত্তাকি (খোদাভীরু)। (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩)

নাক-কান ফোঁড়ানো:

সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য স্বর্ণালংকার পরার উদ্দেশ্যে নাক ও কান ফোঁড়ানো এখানকার একটি বহুল প্রচলিত প্রথা এবং মুসলিম নারীরাও ব্যাপকভাবে এটি অনুসরণ করেন।

আমাদের প্রশ্নটি হলো—এটি কি কুরআনের "সৃষ্টিকে বিকৃত" করার আয়াত না মানারই ফলাফল?  বিষয়টি সরাসরি হ্যাঁ বা না বলার চেয়ে একটু গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন

মূলনীতি: আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন:  উল্লেখিত কুরআনের আয়াতটিই এই আলোচনার মূল ভিত্তি:

শয়তানের উক্তি: "...আমি অবশ্যই তাদেরকে নির্দেশ দেব, যার ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করবে।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৯)

এই আয়াতের উপর ভিত্তি করে, অপ্রয়োজনীয় এবং স্থায়ীভাবে শারীরিক পরিবর্তন করা, যা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করে (যেমন: উল্কি আঁকা)।
উল্কি
১. উদ্দেশ্য (Intention):

উল্কি: এর মূল উদ্দেশ্য হলো শরীরের চামড়ায় স্থায়ী নকশা করা, যা সৃষ্টিকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করে। উল্কি অপসারণ করা প্রায় অসম্ভব এবং এটি ত্বকের অংশ হয়ে যায়।

নাক-কান ফোঁড়ানো:  অলংকার পরার জন্য একটি পথ তৈরি করা। অলংকার পরা নিজেই একটি অস্থায়ী সৌন্দর্য, যা খোলা ও পরা যায়। দৃশ্যত: মনে হতে পারে নাক-কান ফোঁড়ানোকে যীনাতেরই একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়, যতক্ষণ তা পর্দার বিধান লঙ্ঘন না করে।  কিন্তু শাররীক এমন ক্ষতসৃষ্টি করে এটা কতটা প্রয়োজন তা ভাবনায় থাকতে হবে।

তাহলে  গভীর উপলব্ধিতে সমস্যাটি কোথায়?

 এই পর্যবেক্ষণটি অন্য একটি গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে, আর তা হলো:

"সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ বনাম দ্বীনের জ্ঞানভিত্তিক অনুসরণ"

সমস্যাটি হলো, উপমহাদেশের অধিকাংশ মুসলিম নারী এই কাজটি কোনো নাযিলকৃত অহীর  অনুশীলনীর আলোকের জ্ঞান  বা অনুমোদনের ভিত্তিতে করেন না। তারা এটি করেন কারণ:

"এটা আমাদের ঐতিহ্য।"
"আমার মা, দাদি, সবাই করেছেন।"
"বিয়েতে নাকফুল না পরলে কেমন দেখায়!"
"এটা সৌন্দর্যের প্রতীক"...ইত্যাদি

অর্থাৎ, কাজটি 'দ্বীনের অংশ' হিসেবে না করে বরং সাংস্কৃতিক প্রথা ও সামাজিক চাপের বশবর্তী হয়ে 'প্রথার অংশ' হিসেবে করা হয়। এখানে কুরআনের আয়াত বা  বিধান নিয়ে চিন্তা করার সুযোগই থাকে না।  মানুষ জানেই না যে, এই বিষয়ে ইসলামের অবস্থান কী বা এর সাথে কোনো আয়াতের সম্পর্ক আছে কি না। কারণ, কোনো কাজ করার আগে তার ইসলামী বিধান সম্পর্কে জানা এবং সেই অনুযায়ী আমল করাই হলো প্রকৃত ঈমানের পরিচয়।

সুতরাং, মুসলিম নামধারী অনেকেই দ্বীনের গভীরতা না বুঝে শুধুমাত্র লোকদেখানো বা বংশানুক্রমিক প্রথা অনুসরণ করেন, যা ঈমানের দুর্বলতারই পরিচায়ক। কাজটি নিজে জায়েজ হলেও, এর পেছনের অজ্ঞতা ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ অবশ্যই একটি চিন্তার বিষয়।

চতুর্থ অধ্যায়: সমাধান কোন পথে? স্রষ্টার নির্দেশনাই একমাত্র অবলম্বন

প্রবন্ধের মূল আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, মানুষ তার সীমিত জ্ঞান দ্বারা নিজের প্রকৃত কল্যাণ অনুধাবন করতে অক্ষম। যখনই সে স্রষ্টার নির্দেশনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখনই শয়তানের পাতা ফাঁদে পা দেয়। তার মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ও প্ররোচনা মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি অকৃতজ্ঞ করে তোলে এবং সে নিজের হাতেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনে।

“মানুষের কৃতকর্মের ফলে স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে” (সূরা আর-রূম, ৩০:৪১)

এর একমাত্র সমাধান হলো আল্লাহর কিতাব আল-কোরআনকে আঁকড়ে ধরা এবং এর প্রতিটি আয়াত নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা (তাদাব্বুর) করা।

“তারা কি কোরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না, নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?” (সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭:২৪)

কোরআনই হলো সেই কষ্টিপাথর, যা দিয়ে যাচাই করা যায় কোনটি আল্লাহর অনুমোদিত কল্যাণকর ব্যবহার এবং কোনটি শয়তানের প্ররোচিত ক্ষতিকর পরিবর্তন।

উপসংহার

সূরা আর-রূম ৩০:৩০ এবং সূরা আন-নিসা ৪:১১৯ এর দ্বান্দ্বিক চিত্রটি মানবজীবনের এক মৌলিক বাস্তবতা। একদিকে রয়েছে আল্লাহর নিখুঁত, ভারসাম্যপূর্ণ ও অপরিবর্তনীয় সৃষ্টিবিধান। অন্যদিকে রয়েছে সেই বিধানকে বিকৃত করার জন্য শয়তানের নিরন্তর প্রচেষ্টা। সৌন্দর্য চর্চা, প্রযুক্তি বা ব্যবসার নামে মানুষ যখন আল্লাহর দেওয়া সীমা লঙ্ঘন করে এবং তাঁর সৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনে, তখন সে নিজের অজান্তেই শয়তানের অনুসারী হয়ে যায় এবং সুস্পষ্ট ক্ষতির মধ্যে নিপতিত হয়। প্রকৃত ও চিরস্থায়ী কল্যাণ কেবল স্রষ্টার নির্দেশনার মধ্যেই নিহিত। তাই মানবজাতির একমাত্র মুক্তির পথ হলো সকল প্রকার انسانی মতামত ও দর্শনের ঊর্ধ্বে উঠে কেবলমাত্র মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের দিকে ফিরে আসা এবং জীবন ও জগতের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার নির্দেশনাকে মেনে নেওয়া।

ভিডিও: মুসলিম নামধারী কিতাবহীন এক অজ্ঞজাতীর কাজকারবারের নমুনা দেখুন, ক্লিক করুন এখানে- 

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post