কিছু অজানা কথা: কথিত হাদিস লিখন ও প্রচারে নিষেধাজ্ঞা: একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

নবী মুহাম্মদ (সা.আ.)  কর্তৃক হাদিস লিখতে নিষেধ করা এবং লিখিত হাদিস পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ-

হাদিস বা সুন্নাহ হিসাবে যা মনে করা হয় তা কিন্তু এর সংকলন ও প্রচারে স্বয়ং নবী মুহাম্মদ (সা.আ.) এবং পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদিন, বিশেষ করে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা), হাদিস বর্ণনা ও লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন। আল কোরআনের-এর বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং পবিত্র কুরআনের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ রাখার জন্যই ছিল।


নবী (সা.আ.) কর্তৃক হাদিস লিখতে নিষেধাজ্ঞা:

যখন কুরআন নাযিল হচ্ছিল, তখন নবী মুহাম্মদ (সা.আ.) তাঁর সাহাবীদের কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু লিখতে নিষেধ করেছিলেন। এর মূল কারণ ছিল, যেন মানুষের কথার সাথে আল্লাহর বাণী (কুরআন) মিশে না যায় এবং কোনো ধরনের বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়।


নবী মুহাম্মদ (সা.আ.) কর্তৃক হাদিস লিখতে নিষেধ করা এবং লিখিত হাদিস "মুছে ফেলা" বা "বিলুপ্ত করা" (محو) ফেলার নির্দেশ:

বিশিষ্ট সাহাবী আবু সাঈদ খুদরি (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.আ.) বলেছেন:


"তোমরা আমার পক্ষ থেকে (কুরআন ব্যতীত) কোনো কিছু লিখো না। যে ব্যক্তি আমার পক্ষ থেকে কুরআন ছাড়া অন্য কিছু লিখেছে, সে যেন তা মুছে ফেলে (فليمحه)।  আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা প্রস্তুত করে নেয়।"

সূত্র: গ্রন্থ: সহীহ মুসলিম  কিতাব: আয-যুহদ ওয়া আর-রাকাইক (দুনিয়াবিমুখিতা ও কোমলতা অধ্যায়), হাদিস নম্বর: ৩০০৪


তাদেরই কথিত এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নবী (সা.আ.) তাঁর হাদিস লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন। এই নির্দেশের পেছনে মূল حکمت (প্রজ্ঞা) ছিল:

কুরআনের বিশুদ্ধতা রক্ষা: সে সময় অহী লেখকগণ (কাতিবে অহী) কুরআন লিপিবদ্ধ করছিলেন। একই সাথে হাদিস লেখা হলে মানুষের মনে আল্লাহর বাণী এবং নবীর বাণীর মধ্যে মিশ্রণের আশঙ্কা ছিল।


খলিফা ওমর (রা)-এর কঠোর নীতি:

খলিফা ওমর (রা) তাঁর খিলাফতকালে হাদিস বর্ণনার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি শুধুমাত্র আবু হোরায়রা (রা) নন, বরং বড় বড় সাহাবীদেরও হাদিস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনে কঠোর হওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।

হাদিসের রেফারেন্স ও ঐতিহাসিক বর্ণনা:

ইমাম যাহাবী (র) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "তাযকিরাতুল হুফফাজ" এবং "সিয়ারু আ'লামিন নুবালা"-তে এই ঘটনাগুলো সংকলন করেছেন।


তিনজন সাহাবীকে মদিনায় আটকে রাখা:

ইমাম যাহাবী (র) বর্ণনা করেন যে, ওমর (রা) তিনজন প্রখ্যাত সাহাবী—আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), আবু দারদা (রা) এবং আবু যার গিফারী (রা)-কে হাদিস বর্ণনার কারণে মদিনায় আটকে রেখেছিলেন।


কারাযা ইবনে কা'ব (রা) বলেন, "ওমর (রা) যখন আমাদের ইরাকে পাঠাচ্ছিলেন, তখন তিনি আমাদের সাথে কিছুদূর এগিয়ে এসে বললেন, 'তোমরা কি জানো আমি কেন তোমাদের সাথে এসেছি?' আমরা বললাম, 'আমাদের সম্মান করার জন্য।' তিনি বললেন, 'এর পাশাপাশি আরেকটি কারণ হলো, তোমরা এমন এক জনপদে যাচ্ছ যেখানে মানুষ গুনগুন করে কুরআন তিলাওয়াত করে। তোমরা হাদিস বর্ণনা করে তাদের কুরআন থেকে বিমুখ করো না। তাই আমি তোমাদের সাথে আছি।'"


বর্ণনা অনুযায়ী, এই সাহাবীগণ অধিক হাদিস বর্ণনা শুরু করলে ওমর (রা) তাদের মদিনায় ডেকে পাঠান এবং বলেন:

"ما هذه الأحاديث التي قد أفشيتم عن رسول الله؟"

অর্থ: "এসব কী হাদিস যা তোমরা রাসূল (সা.আ.) এর নামে সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছ?"

এরপর তিনি তাঁদের ওমরের (রা) মৃত্যু পর্যন্ত মদিনার বাইরে যেতে দেননি।

সূত্র: আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন (হাকিম), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১১০; তাযকিরাতুল হুফফাজ (যাহাবী)।


আবু হোরায়রা (রা)-কে হুমকি: ঘটনার বিবরণ ও

 হাদিসের সূত্র:

এই ঘটনাটির বর্ণনা বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে এসেছে। ইমাম যাহাবী (র)-এর বিখ্যাত গ্রন্থ "সিয়ারু আ'লামিন নুবালা" এবং ইবনে কাসির (র)-এর "আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া"-তে এর বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

একটি বর্ণনায় এসেছে, ওমর (রা) আবু হোরায়রা (রা)-কে ডেকে বলেন:

"হয় তুমি আল্লাহর রাসূল  থেকে হাদিস বর্ণনা করা ছেড়ে দেবে, নতুবা আমি তোমাকে 'দাওস' (তাঁর গোত্রের) দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেব।"


অন্য একটি বর্ণনায় বেত্রাঘাতের হুমকির কথা উল্লেখ আছে:

আবু হোরায়রা (রা) নিজেই বলেন, "আমি তোমাদের এমন অনেক হাদিস বর্ণনা করি, যা যদি আমি ওমরের সময় বলতাম, তাহলে তিনি তাঁর চাবুক (দুররা) দিয়ে আমাকে আঘাত করতেন।" (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা)


ওমর (রা)-এর এই কঠোর নীতির কারণ:

তিনি চাইতেন মুসলিম উম্মাহর মূল ভিত্তি ও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হোক আল-কুরআন। হাদিস চর্চা যেন মানুষকে কুরআন থেকে গাফেল না করে ফেলে, এটাই ছিল তাঁর প্রধান আশঙ্কা।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post