ক্ষমা-রহমত-নাজাত-মুক্তি-দুশ্চিন্তামূক্ত জীবনের জন্য একখানামাত্র কিতাব তথা আল কোরআন যে চায় তাকেই দেয়া হয়। না চাইলে না- Choice is yours!

তারপর আদম তার প্রতিপালক রবের কাছ থেকে কিছু বাণী প্রাপ্ত হল, অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করলেন, নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবূলকারী, পরম দয়ালু।

আমি বললাম, ‘তোমরা সবাই অন্যত্র চলে যাও। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কোন হিদায়াত আসবে , তখন যারা আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে , তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্হও হবে না।

আর যারা আয়াত উপেক্ষা /অবজ্ঞা/ গোপন/ কুফরী করেছে অথবা আমার আয়াতসমূহতে (মানবরচিত কিতাবের মাধ্যমে) মিথ্যারোপ করেছে তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। [আয়াত ৪০-৪৬: বনি ইসরাইলদের শ্রেষ্ঠত্ব ও আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করানো]

(হুদা মানে আল্লাহর কিতাব তথা আল কোরআন দ্র: আয়াত  ২:২, ১৭:৯, ৩৯:২৩, ২৬:১৯৮)

̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙

 "...এবং তিনি তাকে পথ দেখান যে তাঁর দিকে অভিমুখী হয়।" (১৩:২৭)


এই আয়াতে "وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ أَنَابَ" (ওয়া ইয়াহদী ইলাইহি মান আনাব) অংশটিই আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর। এখানে "أَنَابَ" (আনাব) শব্দের অর্থ হলো—ফিরে আসা, অনুতপ্ত হওয়া বা অভিমুখী হওয়া। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে নিজের দিকে আসার পথ দেখিয়ে দেন (হিদায়েত দান করেন)।


১. সূরা আশ-শূরা, আয়াত ১৩:

এই আয়াতে আল্লাহ্‌র ইচ্ছা এবং বান্দার প্রচেষ্টার সমন্বয় দেখানো হয়েছে।


"...এবং যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে তিনি নিজের দিকে পথ দেখান।" ( ৪২:১৩)

এখানেও বলা হয়েছে যে, হিদায়েত তাদের জন্যই যারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে বা তাঁর অভিমুখী হয় (يُنِيبُ - ইউনিব)।


২. সূরা আল-আনকাবূত, আয়াত ৬৯:

এই আয়াতে প্রচেষ্টার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


"আর যারা আমার উদ্দেশ্যে কঠোর প্রচেষ্টা চালায়, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন।" (২৯:৬৯)


এখানে "جَاهَدُوا فِينَا" (জাহাদু ফীনা) অর্থ হলো—যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা-সাধনা করে। আল্লাহ ওয়াদা করছেন যে, তিনি এমন প্রচেষ্টাকারীদের অবশ্যই তাঁর পথ দেখাবেন।

আর বলো, সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। অতএব, যে চায় তাহলে সে যেন ঈমান আনে আর যে চায় তাহলে সে যেন কুফর করে-18:29


সারকথা:

কুরআনের এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে:

হিদায়েতের মালিক একমাত্র আল্লাহ।

তবে, আল্লাহ তাঁর হিদায়েত সেই বান্দাকেই দান করেন যে নিজে থেকে আন্তরিকভাবে হিদায়েত কামনা করে, আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং তাঁর পথে চলার জন্য চেষ্টা করে।


সুতরাং, হিদায়েত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পুরস্কার, যা বান্দার আন্তরিক ইচ্ছা ও প্রচেষ্টার পর আসে।

"হুদা" বা হিদায়েত চেয়ে প্রার্থনা-দুআ:

"হুদা" বা হিদায়েত চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা কুরআনের অন্যতম একটি মূল শিক্ষা। এই দু'আগুলোর গভীরতা এবং তাৎপর্য অনুধাবন করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


নিচে হিদায়েত চেয়ে করা কুরআনের শ্রেষ্ঠ দু'আগুলো এবং সেগুলোর ভাবার্থ ও অনুধাবন তুলে ধরা হলো:


১. শ্রেষ্ঠতম দু'আ: আল-ফাতিহা (সূচনা):

এটিই হিদায়েতের জন্য সবচেয়ে মৌলিক এবং শক্তিশালী দু'আ, যা আমরা প্রতিদিন বহুবার নামাযে পাঠ করি।

ٱهْدِنَا ٱلصِّرَٰطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ

صِرَٰطَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ ٱلْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا ٱلضَّآلِّينَ


উচ্চারণ: "ইহদিনাস সিরাত্বাল মুস্তাক্বীম। সিরাত্বাল্লাযীনা আন'আমতা 'আলাইহিম, গাইরিল মাগদূবি 'আলাইহিম ওয়ালাদ্ দ্বোয়াল্লীন।"


অর্থ: "আমাদেরকে সরল-সঠিক পথের হিদায়াত দিন তাদের পথ, যাদেরকে নিয়ামত দিয়েছেনযাদের উপর (আপনার) লানত আপতিত হয়নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়।  2:৬-৭)


অনুধাবন:

ইহদিনা (আমাদেরকে পথ দেখান): এখানে "আমাদেরকে" শব্দটি ব্যবহার করে جمع (বহুবচন) রূপে দু'আ করা হয়েছে। এটি একদিকে বিনয় প্রকাশ করে, অন্যদিকে নিজের সাথে পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য হিদায়েত কামনা করা হয়।


আস-সিরাত আল-মুস্তাকিম (সরল-সঠিক পথ): এটি শুধু একটি সাধারণ পথ নয়, বরং একমাত্র সত্য, ভারসাম্যপূর্ণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি পর্যন্ত পৌঁছানোর সবচেয়ে (সরাসরি) পথ। এই পথে কোনো বক্রতা নেই।


এটি একটি চলমান প্রার্থনা: আমরা একবার হিদায়েত পাওয়ার পরও এই দু'আ করি। কারণ হিদায়েতের উপর টিকে থাকা বা অবিচল থাকাও আল্লাহর একটি বিশেষ অনুগ্রহ। প্রতিদিনের এই দু'আ আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর নির্দেশনার মুখাপেক্ষী।


উদাহরণসহ পথ চাওয়া: আমরা কেবল "সরল পথ" চেয়েই থামি না, বরং সেই পথের পথিকদের উদাহরণও দেই—নবী, সিদ্দিক, শহীদ এবং صالح (সৎকর্মশীল) ব্যক্তিরা, যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। এটি আমাদের লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।


২. হিদায়েত পাওয়ার পর তাতে অবিচল থাকার দু'আ: 

ঈমান আনার পর বা সঠিক পথ পাওয়ার পর সবচেয়ে বড় ভয় হলো পথভ্রষ্ট হয়ে যাওয়া। এই দু'আটি সেই ভয় থেকে মুক্তির জন্য।


رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ ٱلْوَهَّابُ

উচ্চারণ: "রাব্বানা লা তুযিগ্ কুলূবানা বা'দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাবলানা মিল্লাদুনকা রাহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্‌হাব।"


অর্থ: "হে আমাদের রব, সরল পথ দেখানোর পর আমাদের অন্তরকে বক্র করে দিবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।" (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৩:৮)


অনুধাবন:

অন্তর বক্র হওয়ার ভয়: এই দু'আটি জ্ঞানীদের (উলুল আলবাব) দু'আ। তারা জানেন যে, জ্ঞান বা ঈমানই যথেষ্ট নয়, আল্লাহর রহমত ছাড়া অন্তর যেকোনো মুহূর্তে বক্র হয়ে যেতে পারে। এটি আত্ম-অহংকার থেকে রক্ষা করে।


আল্লাহর রহমতের উপর নির্ভরতা: হিদায়েতের উপর টিকে থাকার জন্য আমরা নিজেদের যোগ্যতা বা আমলের উপর নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর করুণা বা "রহমত" এর উপর নির্ভর করি।


আল্লাহর গুণবাচক নামের ব্যবহার: "আল-ওয়াহ্‌হাব" (মহাদাতা) নাম ধরে ডাকার মাধ্যমে আমরা স্বীকার করি যে, কোনো প্রতিদান ছাড়াই তিনি দান করেন। হিদায়েত ও তার উপর অবিচলতা তাঁরই শ্রেষ্ঠ দান।


৩. প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সঠিক পথ ও সমাধান চেয়ে দু'আ: 

এটি আসহাবে কাহফ (গুহাবাসীদের) দু'আ, যারা ঈমান বাঁচাতে জালিম শাসকের থেকে পালিয়ে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।

رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا

উচ্চারণ: "রাব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতাও ওয়া হাইয়্যি' লানা মিন আমরিনা রাশাদা।"


অর্থ: "হে আমাদের রব, আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন এবং আমাদের বিষয়টিকে সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করে দিন।" (সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ১৮:১০)


অনুধাবন:

রহমত ও সঠিক পথনির্দেশনা: যখন চারদিকের পথ বন্ধ মনে হয়, তখন এই দু'আ করা হয়। তারা শুধু আশ্রয় চাননি, বরং চেয়েছেন যেন আল্লাহ তাদের কঠিন পরিস্থিতিকে মঙ্গলের দিকে ঘুরিয়ে দেন এবং সঠিক পথ ("রাশাদা") দেখান।


সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ: এই দু'আয় আল্লাহর পরিকল্পনার উপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ পায়। আমরা শুধু আমাদের সমস্যা বলি, আর সমাধান তাঁর হাতে ছেড়ে দেই।


সারকথা:

কুরআনে হুদা বা হিদায়েত চাওয়ার দু'আগুলো আমাদের শেখায় যে:


হিদায়েত আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত এবং এর জন্য নিরন্তর প্রার্থনা করতে হয়।


শুধু পথ পাওয়াই নয়, সেই পথে অবিচল থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


জীবনের প্রতিটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছেই সঠিক পথের দিশা চাইতে হবে।


দু'আ করার মাধ্যমে আমরা নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করি এবং আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতি আস্থা স্থাপন করি।

Dua Video






Post a Comment (0)
Previous Post Next Post