আল-কুরআনের কোনো শব্দ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন বা বিকৃত করা, এর উচ্চারণ বদলে দেওয়া, বিকল্প কোনো শব্দ ব্যবহার করা কিংবা কুরআনের বিধানের পরিবর্তে অন্য কোনো আমল চালু করা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি অত্যন্ত গুরুতর পাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে এটি কুফর (অবিশ্বাস) হিসেবে গণ্য হয়।
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
অর্থ: "আমিই এই উপদেশ (কুরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।" (সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯)
পরিণতি ও সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ: দীনের ক্ষেত্রে এর পরিণতি হলো:
অতঃপর তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদের উপর অভিসম্পাত করেছি এবং তাদের অন্তরকে কঠোর করে দিয়েছি। তারা শব্দগুলোকে তার স্থান থেকে বিকৃত করে। (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ১৩)
ইহুদীদের মধ্যে কিছু লোক কথাকে তার স্থান থেকে বিকৃত করে এবং বলে, ‘শুনলাম ও অমান্য করলাম’... তারা জিহ্বাকে বিকৃত করে এবং দীনের প্রতি উপহাস করে এ কথা বলে। (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৬)
সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং বলে, ‘এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে’, যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ উপার্জন করতে পারে। সুতরাং তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের দুর্ভোগ এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্যও তাদের দুর্ভোগ। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৭৯)
উচ্চারণ বিকৃত করা: যদি কেউ তাজউইদ না জানার কারণে বা অনারব হওয়ার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল উচ্চারণ করে, তবে তা ক্ষমার যোগ্য। কিন্তু যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে উপহাস করে বা অর্থ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে উচ্চারণ বিকৃত করে, তবে তা উপরোক্ত আয়াতগুলোর আওতায় পড়বে এবং কুফরের শামিল হবে।বিকল্প ব্যবহার বা পরিবর্তে অন্য আমল: কুরআনের কোনো আয়াত বা বিধানের পরিবর্তে অন্য কিছুকে সমকক্ষ মনে করা বা উত্তম মনে করে তা দিয়ে আমল করা শিরক এবং বিদ'আত। যেমন, কেউ যদি সালাতে কুরআনের সূরার পরিবর্তে নিজের বানানো কোনো দোয়া বা কবিতা পাঠ করাকে জায়েজ বা উত্তম মনে করে, তবে সে আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করলো। এটি সরাসরি পথভ্রষ্টতা।
ঈমানহারা হওয়া (কুফর)। আল্লাহর অভিশাপ ও ক্রোধের শিকার হওয়া। অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া এবং হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হওয়া। জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করা।
কুরআনের বাইরে কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজনের অবকাশ নেই:
কুরআন নিজেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সম্পূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণা করে। তাই এর বাইরে থেকে কোনো কিছু সংযোজন করা বা এর কোনো অংশকে পরিবর্তন করার প্রয়োজন বা অনুমতি—কোনোটিই নেই -সূরা আল-আন'আম, আয়াত ১১৫
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا ۚ لَّا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
অর্থ: আর আপনার রবের বাণী (কালিমা) সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে পরিপূর্ণ। তাঁর বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
এই আয়াতে تَمَّتْ (পরিপূর্ণ) শব্দটিই প্রমাণ করে যে, এতে কোনো অপূর্ণতা নেই যার জন্য সংযোজন বা পরিবর্ধন প্রয়োজন হতে পারে।
মূল ধারণা
আল-কুরআনের কালিমা/আয়াত/শব্দ বদল ও বিকৃতি বিষয়ক আয়াত:
পূর্ববর্তী কিতাব বিকৃত করার অভিযোগ:
...অথচ তাদের একটি দল ছিল যারা আল্লাহর কালাম শুনত, অতঃপর তা বোঝার পর জেনেশুনে তা বিকৃত করত । -সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত 2:৭৫
সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত 2:৭৯নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তারপর বলে, ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে’ , যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ উপার্জন করতে পারে।...
৩. ইবাদতে কুরআনের শব্দের বিকৃতি বা বিকল্প ব্যবহার নিষিদ্ধ (তাহরীফ):
আল্লাহর নাযিলকৃত শব্দকে তার সঠিক প্রেক্ষাপট ও অর্থ থেকে সরিয়ে দেওয়া বা শব্দের মারপ্যাঁচে বিকৃত করা একটি গুরুতর অপরাধ। পূর্ববর্তী জাতিদের এই অভ্যাস সম্পর্কে কুরআন সতর্ক করেছে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقُولُوا رَاعِنَا وَقُولُوا انظُرْنَا وَاسْمَعُوا...
ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা ‘রঈনা’ বোলো না, আর তোমরা বলো ‘উনযুরনা’ এবং শুনো। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি- সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত 2:১০৪
প্রাসঙ্গিকতা: ইহুদিরা ‘রা‘ইনা’ শব্দটি বিকৃত উচ্চারণে বলত, যা একটি অপমানজনক অর্থ দিত। আল্লাহ শব্দটিই পরিবর্তন করে দিলেন, যাতে বিকৃতির সুযোগ না থাকে। এটি প্রমাণ করে, শব্দের পবিত্রতা রক্ষা করা কতটা জরুরি।
...আমি তাদের অন্তরকে কঠিন করে দিয়েছি। তারা শব্দগুলোকে (আল্লাহর বাণীকে) তার স্থান থেকে পরিবর্তন করে দেয়... -সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত ১৩
প্রাসঙ্গিকতা: এটি ‘তাহরীফ’ বা বিকৃতির সরাসরি প্রমাণ এবং এর পরিণাম হলো—অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া।
(উল্লেখিত ৭:১৬২, ৫৮:৮, ৫:৪১ আয়াতগুলোও এই একই ধরনের বিকৃতির উদাহরণ ও নিন্দা করে।)
৪. জিহ্বা দ্বারা বিকৃত করা এবং সত্য গোপন করা:
আর নিশ্চয় তাদের মধ্যে একদল আছে, যারা কিতাবকে জিহ্বা দ্বারা বিকৃত করে , যাতে তোমরা সেটাকে কিতাবের অংশ মনে কর, অথচ তা কিতাবের অংশ নয়।... সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৭৮
৫. আল্লাহর নির্দেশ বদলে ফেলার ঘটনা:
আর যখন আমরা বললাম, তোমরা এই জনপদে প্রবেশ করো। এরপর তোমরা সেখান থেকে যেভাবে চাও স্বাচ্ছন্দে আহার করো। আর তোমরা নত অবস্থায় দরজায় প্রবেশ করো এবং বলো, মাফ চাই, আমরা তোমাদেরকে তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিব। আর অবশ্যই আমরা সৎকর্মপরায়ণদের বাড়িয়ে দিব।
কিন্তু যারা যালিম ছিল, তাদেরকে যা বলা হয়েছিল, তার পরিবর্তে তারা অন্য কথা বলল । সুতরাং আমি যালিমদের উপর তাদের অবাধ্যতার কারণে আকাশ থেকে শাস্তি নাযিল করলাম। সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত 58-৫৯
ইহুদিদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা শব্দগুলোকে তার স্থান থেকে বিকৃত করে এবং বলে, ‘শুনলাম ও অমান্য করলাম’...
প্রাসঙ্গিকতা: এখানেও সরাসরি শব্দ পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে এবং তাদের অবাধ্যতার মানসিকতা তুলে ধরা হয়েছে।
আল-কুরআন পরিবর্তন করার দাবি ও তার জবাব:
...যারা আমার সাক্ষাতের আশা রাখে না, তারা বলে: -সূরা ইউনুস, আয়াত ১৫‘এই কোরআনের পরিবর্তে অন্য কোরআন আনুন, অথবা একে পরিবর্তন করুন’ । বলুন (হে নবী), ‘আমার নিজের পক্ষ থেকে এটি পরিবর্তন করার কোনো অধিকার নেই। আমি তো কেবল তাই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহী হিসেবে নাযিল করা হয়’
আল্লাহর কালিমা অপরিবর্তনীয় এবং কুরআনের সুরক্ষা/ কুরআনের বাইরে কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজনের অবকাশ নেই
আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তনীয়:
... সূরা আল-আন'আম, আয়াত ৩৪:আর আল্লাহর বাণীসমূহের (প্রতিশ্রুতিসমূহের) পরিবর্তনকারী কেউ নেই .." -
...আল্লাহর বাণীসমূহের কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই তো মহাসাফল্য"
প্রসঙ্গ: এই আয়াতে ঈমানদারদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সুসংবাদকে আল্লাহর অপরিবর্তনীয় "কালিমাত" বা বাণী বলা হয়েছে।
...তাঁর বাণী পরিবর্তন করার মত কেউ নেই এবং তাঁকে ছাড়া আপনি কখনো কোনো আশ্রয়স্থল পাবেন না। সূরা আল-কাহফ, আয়াত ২৭
কুরআনের আয়াত বিকৃতকারীদের পরিচয় ও পরিণাম:
যারা আল্লাহর আয়াতে বিকৃতি বা বক্রতা অনুসন্ধান করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর হুঁশিয়ারি।
নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহে বিকৃতি (ইলহাদ) সাধন করে, তারা আমার অগোচরে নয়। যে ব্যক্তিকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে সে কি উত্তম, না যে কিয়ামতের দিন নিরাপদে আসবে? তোমরা যা ইচ্ছা কর; তোমরা যা কর, নিশ্চয় তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা। সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৪০
প্রাসঙ্গিকতা: يُلْحِدُونَ (ইলহাদ) শব্দের অর্থ হলো—সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া, বক্রতা বা বিকৃতি সাধন করা। আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই বিকৃতকারীদের শেষ পরিণাম জাহান্নাম।
এই আয়াতগুলো থেকে এটা পরিষ্কার যে, যদিও পূর্ববর্তী কিতাবগুলো মানুষের হাতে বিকৃত হয়েছিল, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সর্বশেষ ও চূড়ান্ত গ্রন্থ আল-কুরআনকে কিয়ামত পর্যন্ত সব ধরনের পরিবর্তন ও বিকৃতি থেকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছেন।
