সূরা আল-বাকারা ২:৬২
📜 নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদি হয়েছে ও নাসারারা আর সাবেঈরা - যারাই আল্লাহর প্রতি ও শেষদিনের প্রতি ঈমান আনবে এবং আমলে সলেহ করবে, তাহলে তাদেরই জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান। আর তাদের ওপর কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না -আল-বাকারা 2:62
সূরা আল হাজ্জ 22:17
📜 নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইয়াহুদি হয়েছে এবং যারা সাবেঈ ও খৃস্টান ও অগ্নিপুজক এবং যারা শিরক করেছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপরে প্রত্যক্ষদর্শী-সূরা আল হাজ্জ 22:17
(Indeed, those who have believed and those who were Jews or Sabeans or Christians—whoever of them believed in Allah and the Last Day and did righteousness—no fear will there be concerning them, nor will they grieve.)
আল-মায়িদাহ 5:69
📜 নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও যারা ইহুদি হয়েছে আর সাবেয়ীরা ও নাসারারা- যারা আল্লাহর ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আমলে সলেহ করেছে, তাহলে তাদের ওপর কোনো ভয় নেই আর না তারা দুঃখিত হবে। আল-মায়িদাহ 5:69
পাতা ছেঁড়া কেন কুরআনের শিক্ষার পরিপন্থী?
যখন কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় বা স্বপ্রনোদিত হয়ে তার বিশ্বাস পরিবর্তন না করলে জোড় করে বিশ্বাসের কোনো পাতা ছিঁড়ে ফেলে, তখন সে মূলত ঘোষণা করে: "এই কথাগুলো মূল্যহীন, বাতিল এবং এর কোনো গুরুত্ব নেই।" এই কাজটি করার মাধ্যমে সে নিজেকে ঐশী বিচারকের আসনে বসিয়ে দেয়। সে আল্লাহর ভূমিকার উপর হস্তক্ষেপ করে, যা কুরআনের দৃষ্টিতে চরম ঔদ্ধত্য ও অহংকার।
কুরআন অহংকারীকে প্রচণ্ড অপছন্দ করে:
পাতা ছেঁড়া বা কোনো জ্ঞানকে ধ্বংস করা দম্ভের এক নির্লজ্জ প্রকাশ। এটি বিনয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত, যা একজন মু'মিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।
আল কুরআন পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোর সত্যায়নকারী:
কুরআন নিজেকে বিচ্ছিন্ন কোনো গ্রন্থ হিসেবে পরিচয় দেয় না, বরং পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোর (যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল) সত্যায়নকারী ও সংরক্ষক হিসেবে ঘোষণা করে।
আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যা তার পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর উপর সংরক্ষক (মুহাইমিন)। (সূরা আল-মায়েদাহ, ৫:৪৮)
যে কিতাব নিজেকে পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থগুলোর সত্যায়নকারী বলে দাবি করে, সেই কিতাবের অনুসারীরা কীভাবে সেই গ্রন্থগুলোকে অসম্মান করতে পারে? কোনো কিছুর মূলকে (Source) অস্বীকার বা অসম্মান করে তার সত্যায়নকারীকে (Confirmer) পুরোপুরি মানা যায় না। পাতা ছেঁড়া সেই অসম্মানেরই একটি চূড়ান্ত রূপ।
'পাতা ছেঁড়া' কেবল একটি কাগজের টুকরো নষ্ট করা নয়। এটি একটি মানসিকতার প্রতিফলন। এটি সেই মানসিকতা যা বলে: "আমিই সঠিক, বাকি সব ভুল" এবং "বিচার করার অধিকার আমার আছে।
আল কুরআন আমাদের শেখায় বিনয়, জ্ঞানার্জন এবং respectful dialogue বা উত্তম পন্থায় বিতর্ক করতে (সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৫)। এটি আমাদের অন্যের বিশ্বাসকে ছিঁড়ে ফেলার পরিবর্তে নিজের বিশ্বাসকে প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে বলে।
সুতরাং, একজন কুরআনের অনুসারীর কাজ পাতা ছেঁড়া নয়, বরং জ্ঞানকে সম্মান করা, অধ্যয়ন করা এবং চূড়ান্ত বিচারের ভার মহান আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে নিজের কর্ম ও বিশ্বাসকে পরিশুদ্ধ রাখা।
"পরমতসহিষ্ণুতা" বা Tolerance for other opinions/beliefs -
কুরআনের চোখে স্বাধীনতা: ইচ্ছার স্বাধীনতা এবং পরিণামের দায়বদ্ধতা
মূলনীতি:
আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে নির্দেশ দিয়ে মানবজাতিকে এক চিরন্তন সত্য জানিয়ে দিচ্ছেন:
বলো, ‘সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং যার ইচ্ছা ঈমান আনুক এবং যার ইচ্ছা কুফরি করুক।’ নিশ্চয় আমি যালিমদের জন্য আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি, যার বেষ্টনী তাদের পরিবেষ্টন করে রাখবে। (সূরা আল-কাহফ, ১৮:২৯)
কুরআনের আরও অনেক আয়াতে এই 'ইচ্ছার স্বাধীনতা' এবং 'ধর্মীয় জবরদস্তিহীনতা'র নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
কুরআনের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা কোনো লাগামহীন অধিকার নয়, বরং এটি একটি দায়বদ্ধ আমানত । আল্লাহ আমাদের বিবেক, বুদ্ধি এবং সত্যকে গ্রহণ বা বর্জন করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। আমাদের কাজ হলো—
সত্যকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা। কারো উপর নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে না দেওয়া। প্রত্যেকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সম্মান করা। এবং নিজের সিদ্ধান্তের পরিণামের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে সর্বদা সচেতন থাকা।
আল কোরআনের আলোকে পরমতসহিষ্ণুতার মূল ভিত্তিগুলো তুলে ধরা হলো:
১. বিশ্বাসের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা (No Compulsion in Faith)
দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয়ই সঠিক পথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।
২. পারস্পরিক শ্রদ্ধার নীতি (Principle of Mutual Respect)/ তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার"
তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য এবং আমার জন্য আমার দ্বীন-(সূরা আল-কাফিরূন, আয়াত: 106:৬)
৩. ভিন্নমতের উপাস্যদের অসম্মান করতে নিষেধ (Prohibition of Blasphemy)
তোমরা তাদের গালি দিও না, যাদের তারা আল্লাহকে ছেড়ে ডাকে। তাহলে তারাও শত্রুতা করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে। (সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১০৮)
৪. প্রজ্ঞা ও উত্তম পন্থায় (Dialogue with Wisdom)
তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়।
৫. ভিন্নতা আল্লাহরই পরিকল্পনা (Diversity as a Divine Plan)
আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তবে তোমাদের এক জাতিতে পরিণত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা কর।
৬. অমুসলিমদের সাথে ন্যায় ও সদ্ব্যবহার (Justice and Kindness to Non-Muslims)
আল্লাহ তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার ও ন্যায়বিচার করতে নিষেধ করেন না, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়নি। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।
সহিষ্ণুতা মানে কি সব মতকে সত্য বলে মেনে নেয়া?
অন্য যারা ভিন্ন বিশ্বাস পোষণ করে, তাদের সেই বিশ্বাসের অধিকারকে সম্মান করতে হবে।তাদের সাথে আচরণে ন্যায়বিচার ও মানবিকতা বজায় রাখতে হবে।তাদের বিশ্বাস বা উপাস্যদের অসম্মান করা যাবে না ।তাদের সাথে জোর-জবরদস্তি করা যাবে না।
সারসংক্ষেপ:
ব্যক্তিগত বিশ্বাসে স্বাধীনতা। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুন্দর সংলাপ। সকলের প্রতি ন্যায়বিচার ও মানবিক আচরণ। চূড়ান্ত বিচারের ভার আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া।
১. অন্য ধর্মের উপাস্যদের গালি দিতে সরাসরি নিষেধ
তোমরা তাদের গালি দিও না, যাদের তারা আল্লাহকে ছেড়ে ডাকে। তাহলে তারাও শত্রুতা করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে। (সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১০৮)
তাৎপর্য: এই আয়াতটি একটি সার্বজনীন নীতি স্থাপন করে: অসম্মান বা গালিগালাজ কেবল পাল্টা অসম্মানই ডেকে আনে এবং এটি দাওয়াত বা সত্য প্রচারের পদ্ধতি হতে পারে না।
৪. বিতর্কের পদ্ধতি: حکمت (প্রজ্ঞা) ও উত্তম উপদেশ
তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়। (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫)
তাৎপর্য: "উত্তম পন্থায় বিতর্ক" করার নির্দেশনার মধ্যে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতা অন্তর্ভুক্ত।
৫. বিচারের ভার মানুষের নয়, আল্লাহর হাতে:
নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদি, সায়িবী, খ্রিস্টান, অগ্নিপূজক এবং যারা শিরক করেছে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। (সূরা আল-হজ্জ, আয়াত: ১৭)
তাৎপর্য: বিভিন্ন ধর্ম ও মতের অনুসারীদের মধ্যে বিচার মানুষ করবে না, বরং আল্লাহ করবেন। তাই দুনিয়াতে কাউকে তার বিশ্বাসের জন্য অসম্মান করার অধিকার মানুষের নেই।
৬. কর্ম ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে পুরস্কারের ঘোষণা: গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে
নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে (মুসলিম), এবং যারা ইহুদি, নাসারা (খ্রিস্টান) ও সাবিঈন—(তাদের মধ্যে) যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার রয়েছে। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে (মুসলিম), এবং যারা ইহুদি, সাবিঈন ও নাসারা (খ্রিস্টান)—(তাদের মধ্যে) যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
সার্বজনীন মূলনীতি: এই আয়াত দুটি একটি মৌলিক নীতি স্থাপন করে যে, মুক্তি বা আল্লাহর পুরস্কার কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর ভিত্তি হলো তিনটি বিষয়: ১) আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ বিশ্বাস, ২) পরকালের প্রতি বিশ্বাস এবং ৩) সৎকর্ম।অসম্মানের সুযোগ রদ: যে আল্লাহ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর সৎকর্মশীল ও একত্ববাদে বিশ্বাসীদের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দিচ্ছেন, তাঁর কোনো বান্দার কি অধিকার থাকতে পারে সেই গোষ্ঠী বা তাদের বিশ্বাসকে অসম্মান করার? এই আয়াতগুলো মানুষকে অন্যের প্রতি ঘৃণা বা অসম্মানের পরিবর্তে তাদের ভালো কাজের মূল্যায়ন করতে শেখায়। এটি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতাকে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা দেয়।
মতপার্থক্য থাকবে: আল্লাহ নিজেই মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের ভিন্নতা রেখেছেন।আচরণ হবে уважительное (সম্মানজনক): ভিন্নমতের মানুষের সাথে আচরণ হবে মার্জিত, যুক্তিশীল এবং সহানুভূতিশীল।সমালোচনা ও অসম্মান এক নয়: কোরআন বিভিন্ন ভ্রান্ত বিশ্বাসের সমালোচনা করেছে, কিন্তু তা যুক্তির মাধ্যমে, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে গালি বা অসম্মান করে নয়।চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর: কে সঠিক আর কে ভুল, সেই বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই কোরআনের নির্দেশ।মূল্যায়ন হবে বিশ্বাস ও কর্মের ভিত্তিতে: গোষ্ঠী বা নাম দিয়ে নয়, আল্লাহ মানুষের বিচার করবেন তার অন্তরের বিশ্বাস ও বাহ্যিক সৎকর্ম দিয়ে।