প্রশ্ন: সকল নবী-রাসূল কেন পুরুষ ছিলেন? কোরআন কী বলে?
১. রাসূল প্রেরণের বিষয়ে কোরআনের স্পষ্ট বক্তব্য:
কোরআনের তিনটি ভিন্ন সূরায় আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি রাসূল হিসেবে পুরুষদেরই পাঠিয়েছেন -সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩
"আর আমি আপনার পূর্বে কেবলমাত্র পুরুষদেরকেই (রিজালান) রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাদের প্রতি আমি ওহী প্রেরণ করতাম। সুতরাং তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করো।" সূরা আল-আম্বিয়া (২১), আয়াত ৭:
"আর আমি আপনার পূর্বে শুধু পুরুষদেরকেই (রিজালান) রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছিলাম, যাদের প্রতি আমি ওহী পাঠাতাম। অতএব তোমরা যদি না জানো তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করো" সূরা ইউসুফ (১২), আয়াত ১০৯
"আর আমি আপনার আগে জনপদবাসীদের মধ্য থেকে পুরুষদেরকেই (রিজালান) রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাদের কাছে আমি ওহী পাঠাতাম।"
এই তিনটি আয়াতে ব্যবহৃত "রিজালান" (رِجَالًا) শব্দটি আরবি ভাষায় পুরুষদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং, কোরআনের ভাষ্যমতে, আল্লাহ যাদেরকে রাসূল (জনগোষ্ঠীর কাছে বার্তা বাহক) হিসেবে পাঠিয়েছেন, তারা পুরুষ ছিলেন।
২. নারীদের প্রতি আল্লাহর 'ওহী' (ঐশী অনুপ্রেরণা):
যদিও রাসূল হিসেবে পুরুষদের পাঠানো হয়েছে, কোরআন এটাও স্পষ্ট করে যে, আল্লাহ নারীদের সাথেও কথা বলেছেন বা তাদের প্রতি 'ওহী' (বিশেষ অনুপ্রেরণা বা নির্দেশনা) পাঠিয়েছেন। তবে এই 'ওহী' নবুয়ত বা রিসালাতের দায়িত্ব ছিল না।
মূসা (সা.) এর মায়ের প্রতি ওহী:
"আর আমি মূসার মায়ের প্রতি ওহী (নির্দেশ) পাঠালাম যে, তাকে দুধ পান করাও..." (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৭)
এখানে "أَوْحَيْنَا" (আওহাইনা) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা নবীদের কাছে ওহী পাঠানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়।
মারইয়াম (আঃ) এর সাথে ফেরেশতার কথোপকথন:
"আর স্মরণ করো, যখন ফেরেশতারা বললো, ‘হে মারইয়াম, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন, তোমাকে পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীদের উপর তোমাকে নির্বাচিত করেছেন’।" (সূরা আলে ইমরান, ৩:৪২)
এ থেকে বোঝা যায়, নারীরা আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি নির্দেশনা বা সম্মান লাভ করেছেন, কিন্তু তাদেরকে রাসূলের প্রকাশ্য ও সামাজিক দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
৩. মর্যাদার মাপকাঠি লিঙ্গ নয়:
কোরআন অনুসারে আল্লাহর কাছে সম্মান বা মর্যাদার মাপকাঠি পুরুষ বা নারী হওয়া নয়, বরং তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও ন্যায়পরায়ণতা)। সূরা আল-হুজুরাত (৪৯), আয়াত ১৩:
"হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি... নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই সবচেয়ে সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।"
আল্লাহ কোরআনে পুরুষের পাশাপাশি নারীরও উত্তম উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া এবং ইমরান-কন্যা মারইয়ামকে সকল বিশ্বাসীর জন্য আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:১১-১২)।
সারসংক্ষেপ:
১. কোরআন স্পষ্টভাবে বলে যে, রাসূল হিসেবে যাদেরকে পাঠানো হয়েছে, তারা পুরুষ (রিজালান) ছিলেন।
২. তবে, আল্লাহ নারীদেরকেও (যেমন মূসার মা ও মারইয়াম) বিশেষ সম্মান দিয়েছেন এবং তাদের প্রতি 'ওহী' বা ঐশী নির্দেশনা পাঠিয়েছেন।
৩. আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড লিঙ্গ নয়, বরং তাকওয়া। সুতরাং রাসূল না হওয়াটা নারীর মর্যাদা কম বোঝায় না।
আল-কোরআনে বেশ কয়েকজন মহিয়সী ও মর্যাদাসম্পন্ন নারীর কথা অত্যন্ত সম্মানের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রধান কয়েকজনের বর্ণনা কোরআনের আয়াতসহ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) - ইমরানের কন্যা
মারইয়াম (সা.আ.) কোরআনে উল্লিখিত সর্বাধিক সম্মানিত নারী। তাঁর নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা (সূরা মারইয়াম, ১৯) নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তাঁকে বিশ্বের নারীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।
আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত ও পবিত্র ঘোষিত:
অনুবাদ: "আর স্মরণ করো, যখন ফেরেশতারা বললো, ‘হে মারইয়াম, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন, তোমাকে পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীদের উপর তোমাকে নির্বাচিত করেছেন’।" (সূরা আলে ইমরান, ৩:৪২)
সকল বিশ্বাসীর জন্য আদর্শ:
"এবং (আল্লাহ উদাহরণ দিচ্ছেন) ইমরান-কন্যা মারইয়ামের, যিনি তাঁর সতীত্ব রক্ষা করেছিলেন। অতঃপর আমি তার মধ্যে আমার পক্ষ থেকে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং তিনি তাঁর রবের বাণী ও কিতাবসমূহকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি ছিলেন অনুগতদের অন্যতম।"(সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:১২)
২. ফেরাউনের স্ত্রী:
অবিশ্বাসী ও অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান রেখেছিলেন। কোরআনে তাঁকে সকল মুমিন নর-নারীর জন্য আদর্শ হিসেবে পেশ করা হয়েছে।
ঈমানদারদের জন্য তাঁর আদর্শ ও দোয়া:
"আর আল্লাহ মুমিনদের জন্য ফেরাউনের স্ত্রীর উদাহরণ পেশ করছেন। যখন সে দোয়া করেছিল: ‘হে আমার রব, আমার জন্য আপনার কাছে জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফেরাউন ও তার কার্যাবলী থেকে রক্ষা করুন এবং আমাকে অত্যাচারী সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন’" (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:১১)
৩. সাবার রানী (ঐতিহাসিক নাম বিলকিস):
কোরআনে তাঁর নাম উল্লেখ না থাকলেও, তাঁকে একজন জ্ঞানী, বিচক্ষণ এবং শক্তিশালী শাসক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি অহংকার না করে সত্যকে গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার বর্ণনা:
(হুদহুদ পাখি বললো) "আমি এক নারীকে দেখলাম তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে সবকিছুই দেয়া হয়েছে এবং তার একটি বিশাল সিংহাসন আছে।" (সূরা আন-নামল, ২৭:২৩)
সত্য গ্রহণের ঘোষণা:
(রানী) বললো, "হে আমার রব, নিশ্চয়ই আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সুলাইমানের সাথে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।" (সূরা আন-নামল, ২৭:৪৪)
৪. মূসা (সা.)-এর মা
আল্লাহ তায়ালা সরাসরি তাঁর প্রতি 'ওহী' (বিশেষ নির্দেশনা) প্রেরণ করেছিলেন। তাঁর গভীর ঈমান ও আল্লাহর উপর আস্থার ঘটনা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।
আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি নির্দেশনা লাভ:
"আর আমি মূসার মায়ের প্রতি নির্দেশ (ওহী) পাঠালাম যে, ‘তাকে দুধ পান করাও। যখন তুমি তার ব্যাপারে আশঙ্কা করবে, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করবে এবং ভয় পেয়ো না, চিন্তাও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসূলদের একজন করব’।" (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৭)
৫. ইমরানের স্ত্রী (মারইয়ামের মা):
তাঁর আন্তরিক দোয়া এবং নিজের সন্তানকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করার মহৎ আকাঙ্ক্ষার কথা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, যা আল্লাহ কবুল করেছিলেন।
সন্তানকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করার মানত:
অনুবাদ: "স্মরণ করো, যখন ইমরানের স্ত্রী বললো, ‘হে আমার রব, আমার গর্ভে যা আছে, আমি তা একান্ত আপনার জন্য উৎসর্গ করার মানত করলাম। সুতরাং আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’।" (সূরা আলে ইমরান, ৩:৩৫)
৬. নবী (সা.)-এর স্ত্রীগণ:
আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীদেরকে "উম্মাহাতুল মু'মিনীন" অর্থাৎ "মুমিনদের মাতা" হিসেবে আখ্যায়িত করে এক বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন।
মুমিনদের মাতা হিসেবে ঘোষণা:
"নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা।" (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৬)
এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, আল-কোরআন নারীদের উচ্চ মর্যাদা দিয়েছে এবং তাদের ঈমান, প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও মর্যাদাকে মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
