ফিতনা কি? What is Fitna?

আল-কুরআনের আলোকে ফিতনা: ঐশী বিধান থেকে মানব-রচিত গ্রন্থের দিকে বিচ্যুতির ভয়াবহতা

‘ফিতনা’ (فتنة) শব্দটি সমাজে বহুল প্রচলিত, কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ ও গভীরতা প্রায়শই সংকীর্ণ ব্যাখ্যার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে। ফিতনার স্বরূপ অনুধাবনের একমাত্র নির্ভুল মানদণ্ড হলো আল্লাহর নাযিলকৃত গ্রন্থ আল-কুরআন। কুরআন এই শব্দটিকে কোনো একক অর্থে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেছে, যা মানবজীবনের ঈমানী, সামাজিক ও নৈতিক পরীক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করে। এই প্রবন্ধে আমরা কেবলমাত্র আল-কুরআনের আয়াতের আলোকে ‘ফিতনা’র বহুমাত্রিক অর্থ বিশ্লেষণ করব এবং সেই আলোকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজব—দ্বীনের একমাত্র নাযিলকৃত বিধান আল-কুরআন থেকে মানুষকে বিচ্যুত করে মানব-রচিত বিভিন্ন গ্রন্থের দিকে ঠেলে দেওয়া এবং তার মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে দলাদলি ও বিরোধ সৃষ্টি করা কি একটি ভয়াবহ ফিতনা নয়?


প্রথম পর্ব: ‘ফিতনা’র বহুমাত্রিক অর্থ: একটি কুরআনি বিশ্লেষণ:

আল-কুরআন জুড়ে ‘ফিতনা’ শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মূলভাব হলো এমন কিছু যা খাঁটি ও ভেজালের মধ্যে পার্থক্য করে দেয়, ঠিক যেমন আগুন দিয়ে স্বর্ণকে পরিশুদ্ধ করা হয়। কুরআনের আলোকে ফিতনার প্রধান অর্থগুলো নিম্নরূপ:

১. পরীক্ষা ও যাচাই (Trial and Test):

ফিতনার সবচেয়ে মৌলিক অর্থ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। এই পরীক্ষা সম্পদ, সন্তান, বিপদ বা সুখ—যেকোনো রূপে আসতে পারে, যার মূল উদ্দেশ্য বান্দার ঈমান, ধৈর্য ও আনুগত্যকে যাচাই করা।

সূরা আল-আনকাবুত (২৯), আয়াত ২-৩: আল্লাহ প্রশ্ন করেন, "মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদেরকে পরীক্ষা (ইউফতানুন) করা হবে না? আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা (ফাতান্না) করেছিলাম। এর মাধ্যমে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন কারা সত্যবাদী এবং অবশ্যই জেনে নেবেন কারা মিথ্যাবাদী।" এখানে ঈমানের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পরীক্ষাকে অপরিহার্য বলা হয়েছে।


সূরা আল-আনফাল (৮), আয়াত ২৮: আল্লাহ সতর্ক করেন, "এবং জেনে রাখো যে, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি একটি পরীক্ষা (ফিতনা) মাত্র।" এই জাগতিক আকর্ষণগুলো মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার ক্ষমতা রাখে, তাই এগুলো এক বড় পরীক্ষা।


২. ফিতনা হত্যার চেয়েও গুরুতর: (Persecution and Social Unrest):

মানুষকে তার বিশ্বাস থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার জন্য অত্যাচার, নিপীড়ন চালানো এবং সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করাকে কুরআন হত্যার চেয়েও জঘন্য ফিতনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।


সূরা আল-বাকারাহ (২), আয়াত ১৯১ ও ২১৭: এই দুটি আয়াতে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, "...আর ফিতনা হত্যার চেয়েও গুরুতর (أَشَدُّ)" এবং "...ফিতনা হত্যার চেয়েও বড় (أَكْبَرُ)"। এখানে ফিতনা হলো সেই পরিস্থিতি, যেখানে মানুষকে তার আল কোরআন অনুযায়ী দ্বীন পালনে বাধা দেওয়া হয় এবং সমাজে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয় যা মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা হরণ করে।


৩. পথভ্রষ্টতা, শিরক ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র (Misguidance, Shirk and Internal Discord):

আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া, শিরকে লিপ্ত হওয়া এবং বিশ্বাসীদের মধ্যে বিভেদ ও ষড়যন্ত্র তৈরি করাও ফিতনা।


সূরা ত্বহা (২০), আয়াত ৮৫: মূসা (আঃ)-এর অনুপস্থিতিতে সামেরীর মাধ্যমে বনী ইসরাইলের বাছুর পূজায় লিপ্ত হওয়াকে আল্লাহ একটি পরীক্ষা বা ফিতনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, "আমি তোমার জাতিকে পরীক্ষায় (ফাতান্না) ফেলেছি এবং সামেরী তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।"


সূরা আত-তাওবাহ (৯), আয়াত ৪৭: মুনাফিকদের প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, "তারা তোমাদের মাঝে ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ছুটোছুটি করত..." এখানে অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও ষড়যন্ত্রকে ফিতনা বলা হয়েছে।

════════ 

দ্বিতীয় পর্ব: ঐশী বিধান থেকে বিচ্যুতি এবং দলাদলি: কুরআনের চোখে মারাত্মক ফিতনা-

কুরআনে বর্ণিত ফিতনার এই ব্যাপক অর্থ অনুধাবন করার পর, এখন আমরা মূল প্রশ্নটির দিকে আলোকপাত করতে পারি। যখন দ্বীনের ভিত্তি হিসেবে একমাত্র নাযিলকৃত বিধান আল-কুরআনকে পাশ কাটিয়ে মানব-রচিত বিভিন্ন গ্রন্থকে ধর্মের উৎস বানানো হয় এবং তার ফলস্বরূপ উম্মাহর মধ্যে বিভক্তি ও সংঘাত তৈরি হয়, তখন তা কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সুস্পষ্ট ও মারাত্মক ফিতনা। এর সপক্ষে কুরআনের নিম্নোক্ত যুক্তিগুলো অকাট্য:


১. আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান থেকে বিচ্যুত করার প্রচেষ্টাই ফিতনা:

কুরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে, আল্লাহর একমাত্র নাযিলকৃত বিধান থেকে মানুষকে সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টাই হলো ফিতনা।


সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত ৫:৪৯ 

আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিচ্ছেন, "...এবং তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকো, যেন তারা তোমাকে আল্লাহর নাযিল করা কোনো বিধান থেকে বিচ্যুত (ইয়াফতিনুকা) করতে না পারে।" এখানে ‘ইয়াফতিনুকা’ শব্দটি সরাসরি ‘ফিতনা’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘তোমাকে ফিতনায় ফেলতে না পারে’। যখন মানব-রচিত কোনো গ্রন্থকে এমন মর্যাদা দেওয়া হয় যে তা কুরআনের কোনো বিধানকে আড়াল করে দেয় বা সে বিষয়ে ভিন্ন পথ দেখায়, তখন তা এই আয়াতের আলোকে সরাসরি মানুষকে ফিতনায় ফেলার শামিল।


২. দ্বীনের মধ্যে বিভেদ ও দলাদলি সৃষ্টি করা শিরকের সমতুল্য:

কুরআন দ্বীনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে এবং এটিকে মুশরিকদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সূরা আর-রূম (৩০), আয়াত ৩১-৩২: আল্লাহ বলেন-

 "...এবং তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। তাদের মতো, যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে (শিয়া) পরিণত হয়েছে। প্রত্যেক দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়ে উল্লসিত।" 

যখন মুসলিমরা কুরআনকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন মানব-রচিত গ্রন্থকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন মাযহাব, তরিকা ও ফিরকায় বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং প্রত্যেকে নিজেদের মতবাদকেই একমাত্র সঠিক বলে আঁকড়ে ধরে, তখন তারা কার্যত এই আয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়।


সূরা আল-আনআম (৬), আয়াত ১৫৯: এই আয়াতে দ্বীন বিভক্তকারীদের থেকে আল্লাহ তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত ঘোষণা করেছেন। এটি প্রমাণ করে, এই বিভেদ সৃষ্টিকারী কাজ আল্লাহর কাছে কতটা ঘৃণিত।


৩. আল্লাহর ‘রজ্জু’ ছেড়ে দিয়ে বিচ্ছিন্ন হওয়া:

কুরআন মুসলিমদের ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে একটি মাত্র উৎসকে নির্ধারণ করে দিয়েছে, আর তা হলো ‘আল্লাহর রজ্জু’।

সূরা আলে-ইমরান (৩), আয়াত ১০৩: 

"আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে (حَبْلِ اللَّهِ) দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না..." ‘আল্লাহর রজ্জু’ বা দড়ি নিঃসন্দেহে আল-কুরআন, যা আকাশ থেকে জমিনে প্রসারিত আল্লাহর হেদায়েতের মাধ্যম। এই এক ও অভিন্ন রজ্জু ছেড়ে দিয়ে যখন বহুসংখ্যক মানব-রচিত গ্রন্থকে আঁকড়ে ধরা হয়, তখন বিভেদ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। এই বিভেদই হলো সামাজিক ও ধর্মীয় ফিতনা, যা উম্মাহর শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়।


ফিতনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে বলা হয়েছে:

আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যাতে ফিতনা না থাকে এবং দ্বীন আল্লাহর জন্যই হয়ে যায়। তবে যদি তারা বিরত হয়, তাহলে জালিমদের বিরুদ্ধে ছাড়া কোনো শত্রুতা নেই-২:১৯৩, ৮:৩৯


উপসংহার

উপরিউক্ত কুরআনি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ‘ফিতনা’ কেবল বাহ্যিক নির্যাতন বা ব্যক্তিগত পরীক্ষা নয়, বরং এটি একটি গভীর অভ্যন্তরীণ ও সামাজিক ব্যাধিও। আল্লাহর নাযিলকৃত, সংরক্ষিত ও সুস্পষ্ট বিধান আল-কুরআন থেকে মুসলিমদের বিচ্যুত করে মানব-রচিত অনিশ্চিত ও মতভেদপূর্ণ গ্রন্থের দিকে আহ্বান করা—কুরআনের ভাষায় একটি বহুমুখী ফিতনা।


এটি একটি পথভ্রষ্টতার ফিতনা, কারণ তা মানুষকে আল্লাহর সুস্পষ্ট নূর থেকে মানুষের মনগড়া ব্যাখ্যার অন্ধকারে ঠেলে দেয়।


এটি একটি বিশৃঙ্খলা ও বিভেদের ফিতনা, কারণ এটি মুসলিম উম্মাহকে শতধা বিভক্ত করে তাদের ঐক্য ও শক্তিকে ধ্বংস করে দেয়।


এবং এটি একটি ঈমানী পরীক্ষা (ফিতনা), যেখানে আল্লাহ যাচাই করে নেন কারা শত মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল তাঁর নাযিলকৃত কিতাবকে আঁকড়ে ধরে থাকে।


সুতরাং, যে কোনো প্রচেষ্টা যা মুসলিমদেরকে তাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি আল-কুরআন থেকে সরিয়ে দিয়ে দলাদলি ও বিরোধের দিকে ঠেলে দেয়, তা নিঃসন্দেহে কুরআনের সংজ্ঞানুসারে একটি গুরুতর ফিতনা। এই ফিতনা থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো সকল প্রকার মানব-রচিত মতবাদের ঊর্ধ্বে উঠে একতাবদ্ধভাবে কেবল আল্লাহর রজ্জু—আল-কুরআনকে—দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা।


আর চরম জ্ঞান আপনার রবের কাছে-৭৯:৪৪

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post