শরীয়া: আল-কোরআনই একমাত্র শরীয়া! শরীয়ত প্রণয়নে মানুষের হস্তক্ষেপকে সরাসরি শিরক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে- (Shariah)

হ্যাঁ, আল-কোরআন নিজেকেই শরীয়া বা জীবনবিধানের মূল এবং চূড়ান্ত উৎস হিসেবে উপস্থাপন করে। 


শরীয়ত বা আইন প্রণয়নের সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার। মানুষ নিজের পক্ষ থেকে কোনো ধর্মীয় বিধান তৈরি করতে পারে না।


শরীয়তের বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ সু.তা. যা নাযিলকৃত কিতাবেই রয়েছে-শরীয়ত প্রণয়নে মানুষের হস্তক্ষেপকে সরাসরি শিরক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে-


আল-কোরআন নিজেকে একমাত্র, চূড়ান্ত এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধানগ্রন্থ হিসেবে উপস্থাপন করে। কোনো মুসলিমের জন্য  কোরআনের এই মর্যাদাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।


আসুন, আপনার এই দৃঢ় অবস্থানকে কোরআনের আয়াত দিয়েই আরও মজবুতভাবে বিশ্লেষণ করি। যে আয়াতগুলো কোরআনকে শরীয়ার একমাত্র চূড়ান্ত উৎস প্রমাণ করে:

সূরা আশ-শূরা (অধ্যায় ৪২), আয়াত ১৩

شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ

তিনি তোমাদের জন্য সেই দ্বীনকেই বিধান (শরীয়া) হিসেবে দিয়েছেন, যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন এবং যা আমি (আল্লাহ) তোমার প্রতি ওহী করেছি, আর যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা এবং ‘ঈসাকে। (নির্দেশটি হলো) তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং এতে বিভক্ত হবে না।

সুতরাং, "শার‘আ লাকুম" এর অর্থ হলো: "তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য বিধান দিয়েছেন।

শরীয়ত হিসেবে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা:

...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম-সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩


তাৎপর্য: এই আয়াত প্রমাণ করে যে, ইসলামী শরীয়ত মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনবিধান।


সকল নবীর দ্বীনের মৌলিক ঐক্য:
এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, সালামুন আলা নূহ থেকে শুরু করে সালামুন আলা ইবরাহীম, সালামুন আলা মূসা , ‘ঈসা  (সা:) এবং সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ  (সা:) পর্যন্ত সকল প্রধান নবীর মূল বার্তা বা দ্বীন একই ছিল। শরীয়তের শাখাগত কিছু পার্থক্য থাকলেও, মৌলিক আকিদা (বিশ্বাস) এবং উদ্দেশ্য (দ্বীন প্রতিষ্ঠা) ছিল অভিন্ন। এটি ইসলামের বিশ্বজনীনতার প্রমাণ।


১. শরীয়া: আল কোরআনের পূর্নাঙ্গ দ্বীন অনুসরণ করতে সরাসরি নির্দেশ:

ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَىٰ شَرِيعَةٍ مِنَ الْأَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

অর্থ: এরপর আমি আপনাকে দ্বীনের এক বিশেষ শরীয়ার (বিধান বা পথের) উপর প্রতিষ্ঠিত করেছি। সুতরাং আপনি তার অনুসরণ করুন এবং যারা জানে না, তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না। (সূরা আল-জাছিয়াহ, ৪৫: ১৮)

এই আয়াতে আল্লাহ নিজেই তাঁর প্রদত্ত পথকে "শরীয়া" বলছেন এবং তা অনুসরণ করতে সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন।


শরীয়তের বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ সু.তা. যা নাযিলকৃত কিতাবেই রয়েছে-শরীয়ত প্রণয়নে মানুষের হস্তক্ষেপকে সরাসরি শিরক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে:

 নাকি তাদের জন্য রয়েছে কিছু অংশীদার, যারা তাদের জন্য দ্বীন থেকে সেই শরীয়া প্রণয়ন করেছে আল্লাহ যেটার ব্যাপারে অনুমতি দেন নাই? আর যদি মীমাংসার কথা না হতো, অবশ্যই তাদের মাঝে সিদ্ধান্ত হয়েই যেত। আর নিশ্চয় জালিমরা, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি-সূরা আশ শূরা 26:21


শরীয়ার মূল উদ্দেশ্য দুটি:
আল্লাহ যে শরীয়া দিয়েছেন, তার মূল উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য কী? আয়াতটি নিজেই তা স্পষ্ট করে দিয়েছে:

  • أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ (আন আক্বীমুদ্-দ্বীন): "তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো।" এর অর্থ  আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থাকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা।

  • وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ (ওয়ালা তাতাফার্রাক্বূ ফীহি): "এবং এতে (দ্বীনের ব্যাপারে) বিভক্ত হয়ো না।" অর্থাৎ, এই মৌলিক দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে ঐক্যবদ্ধ থাকা এবং দলাদলি ও বিভেদ সৃষ্টি না করা।

সারসংক্ষেপ:

"শার‘আ লাকুম" বাক্যটি আমাদেরকে শেখায়:

আল্লাহই বিধানদাতা: শরীয়ার উৎস তিনি, কোনো মানুষ নয়।

দ্বীনের ধারাবাহিকতা: সালামুন আলা মুহাম্মদ -এর উপর নাযিলকৃত শরীয়া বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ‘ঈসা (সা:) এর দ্বীনেরই পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত রূপ।

যেখানে 'শিরআহ'  ও 'মিনহাজ' (নীতিমালা ও কর্মপন্থা) ব্যবহৃত হয়েছে:

এই আয়াতে প্রত্যেক জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিধান দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা শরীয়তের ধারণাকেই সমর্থন করে।

সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৪৮

...لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا

...তোমাদের মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যই আমরা নীতিমালা ও কর্মপন্থা প্রণয়ন করেছি। 

তাৎপর্য: এই আয়াতটি থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা যুগে যুগে বিভিন্ন নবী-রাসূলের মাধ্যমে তাঁদের উম্মতের জন্য সময়োপযোগী আইন-কানুন (শিরআহ) এবং কর্মপন্থা (মিনহাজ) নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যদিও মৌলিক বিশ্বাস (তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত) এক ছিল, প্রায়োগিক কিছু বিধানে ভিন্নতা ছিল।


আল্লাহর কথায় কোনো পরিবর্তন নেই: পরিপূর্ণ তাঁর বাণী:

وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا ۚ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ ۚ

অর্থ: আপনার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে পরিপূর্ণ। তাঁর বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই।"  (সূরা আল-আন'আম, ৬: ১১৫)

পর্যবেক্ষণ: আল্লাহর বাণী (কোরআন) নিজেই "পরিপূর্ণ" (تَمَّتْ)। যা পরিপূর্ণ, তার সাথে নতুন কিছু যুক্ত করার প্রয়োজন হয় না।


আল-কুরআনই যে শরীয়তের মূল উৎস এবং মানুষের এ ক্ষেত্রে কোনো অধিকার নেই, এই বিষয়টির সমর্থনে আরও অনেক আয়াত রয়েছে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত উল্লেখ করা হলো:

১. বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর:

এই আয়াতগুলো সরাসরি ঘোষণা করে যে, সার্বভৌমত্ব ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা শুধু আল্লাহর।

সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০

إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ

বিধান দেওয়ার অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কারও নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারও ইবাদাত করবে না।

এই আয়াতে 'হুকুম' (বিধান) দেওয়ার বিষয়টিকে সরাসরি ইবাদতের সাথে যুক্ত করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে আইন প্রণয়ন আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অংশ।

সূরা আল-আনআম, আয়াত: ৫৭

বলুন, ‘আমি আমার রবের পক্ষ থেকে আসা সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর আছি, আর তোমরা তা অস্বীকার করেছ...। বিধান কেবল আল্লাহরই। তিনি সত্য বর্ণনা করেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী’।


২. আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী ফয়সালা না করা কুফর, যুলুম ও ফিসক:

এই আয়াতগুলো সতর্ক করে যে, আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য কোনো বিধান দ্বারা বিচার-ফয়সালা করা মারাত্মক অপরাধ।

সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৪৪

...আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফির-৪৪


...আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালিম-:৪৫


...আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক-:৪৭


৩. হালাল ও হারাম নির্ধারণের অধিকার একমাত্র আল্লাহর

মানুষের জন্য কোনো কিছুকে হালাল বা হারাম ঘোষণা করা আল্লাহর অধিকারে হস্তক্ষেপের শামিল।

সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১১৬

আর তোমাদের জিহ্বা মিথ্যা আরোপ করে বলে এটা হালাল এবং ওটা হারাম—এরূপ বলো না আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর জন্য।

🔗 তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসারবিরাগীদেরকে তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে... 9:31


৪. কুরআন পাঠানো হয়েছে ফয়সালার জন্য:

কুরআনকে মানুষের মাঝে বিচার ও ফয়সালা করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে পাঠানো হয়েছে।


সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৫

নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে সে অনুযায়ী ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে দেখিয়েছেন।


৩. আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিধানদাতাকে প্রত্যাখ্যান/ আল্লাহই একমাত্র বিধানদাতা:

(বলুন) আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিধানদাতাকে খুঁজব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত কিতাব (কোরআন) অবতীর্ণ করেছেন...(সূরা আল-আন'আম, ৬: ১১৪)

এই আয়াত প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গিতে শেখাচ্ছে যে, বিধানদাতা হিসেবে একমাত্র আল্লাহই গ্রহণযোগ্য এবং তাঁর বিধান তাঁর নাযিল করা "বিস্তারিত কিতাব" তথা কোরআনের মধ্যেই রয়েছে।


৪. কোরআনকে সকল বিষয়ের ব্যাখ্যাকারী হিসেবে ঘোষণা

...وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً وَبُشْرَىٰ لِلْمُسْلِمِينَ

অর্থ: ...আর আমি আপনার উপর কিতাব (কোরআন) নাযিল করেছি সকল বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা স্বরূপ এবং মুসলিমদের জন্য পথপ্রদর্শক, রহমত ও সুসংবাদ স্বরূপ। (সূরা আন-নাহল, ১৬: ৮৯)

এই আয়াতে কোরআনকে "সকল বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা" (تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ) বলা হয়েছে, যা এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান বা শরীয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।


৫. মতবিরোধ হলে আল্লাহর বিধানের দিকে ফেরার নির্দেশ:

অর্থ: ...অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ করো, তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখো... (সূরা আন-নিসা, ৪: ৫৯)

এখানে "আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া" অর্থ হলো তাঁর কিতাব আল-কোরআনের দিকে ফেরা, যা তাঁর সরাসরি বাণী ও বিধান।

সারসংক্ষেপ

উপরিউক্ত আয়াতগুলো থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, আল-কোরআন নিজেই নিজেকে একটি পূর্ণাঙ্গ শরীয়া বা জীবনবিধান হিসেবে ঘোষণা করে। এটি কেবল উপাসনার বই নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়—সকল ক্ষেত্রের জন্য আইন ও বিধানের সর্বোচ্চ এবং চূড়ান্ত উৎস।


কোরআন নিজেই তার বিধান বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী বলে?

এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। কোরআন যদি চূড়ান্ত এবং একমাত্র বিধান হয়, তবে সেই বিধানকে বোঝার এবং জীবনে বাস্তবায়ন করার পদ্ধতি কী? এই প্রশ্নের উত্তরও কোরআন নিজেই দিয়েছে। কোরআন তার বিধান মানার পাশাপাশি সেই বিধানের বাহক-কে অনুসরণ করার জন্যও কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।

লক্ষ্য করুন, এটি কোরআনের বাইরে কোনো উৎস নয়, বরং কোরআনেরই অভ্যন্তরীণ নির্দেশ।

আল-কোরআন ব্যাখ্যা নয় বর্ননা করার দায়িত্ব রাসূলকে দেওয়া হয়েছে:  (কারন আল-কোরআন অলরেডি বিস্তারিত ব্যাখ্যাকৃত দ্র: ৬:১১৪)

...وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ...

অর্থ: ...আর আমি আপনার প্রতি 'যিকির' (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের জন্য সুস্পষ্টভাবে বর্ননা  করে দেন, যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে... (সূরা আন-নাহল, ১৬: ৪৪)


রাসূলের আনুগত্যকে আল্লাহর আনুগত্যের সমতুল্য করা হয়েছে:

مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ...

অর্থ: "যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করল..." (সূরা আন-নিসা, ৪: ৮০)

রাসূলের সিদ্ধান্তকে বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়া ঈমানের শর্ত:

কিন্তু না, আপনার রবের কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে আপনাকে বিচারক মানে, এরপর আপনি যে রায় দেন, সে বিষয়ে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা রাখে না এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়। (সূরা আন-নিসা, ৪: ৬৫)


নিশ্চয়ই রাসূল (সা:) বিধানদাতা নন?

বিধানদাতা বা আইন প্রণেতা (شارع - শারে') একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহর রাসূল  সেই বিধানের প্রচারক, বর্ননাকারী মাত্র এবং প্রথম বাস্তবায়নকারী, কিন্তু তিনি নিজে কোনো নতুন বিধান তৈরি করেননি।


কারন আল্লাহর দ্বীনের বিধানের মধ্যে নবী-রাসূলগণ অহীর বাইরে গিয়ে নতুন কিছু যুক্ত করতে পারেন না: প্রমাণ-

আর অবশ্যই তোমার প্রতি ওহী করা হয়েছে এবং তাদের প্রতি যারা তোমার পূর্বে ছিল। অবশ্যই যদি তুমি শিরক করো  ( যুক্ত করো), নিশ্চিত তোমার আমল নষ্ট হয়ে যাবে এবং অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সূরা আয যুমার ৩৯:৬৫ (18:110)


রাসূল (সা:) বিচার-ফয়সালা বা রায় দিতেন শুধুমাত্র আল্লাহর নাযিলকৃত ওহী, অর্থাৎ কোরআন অনুযায়ী। তিনি কখনোই তাঁর নিজের মন-মতলব বা ব্যক্তিগত মতামতের অনুসরণ করতেন না।

আসুন, সরাসরি কোরআনের আয়াত থেকে এর প্রমাণ দেখি।

যে কিতাবের অনুসরণে রাসূল বিচার করতেন:

কোরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, রাসূল  (সা:)-কে কিতাব (কোরআন) দেওয়া হয়েছেই বিচার-ফয়সালা করার জন্য এবং সেই বিচার অবশ্যই কিতাব অনুযায়ী হতে হবে।

আয়াত 1: বিচার করার জন্য কিতাব নাযিলের ঘোষণা:

নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে সেই অনুযায়ী বিচার করতে পারেন যা আল্লাহ আপনাকে দেখিয়েছেন (বা জানিয়েছেন)। আর আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষে বিতর্ককারী হবেন না। (সূরা আন-নিসা, ৪: ১০৫)

 এখানে স্পষ্ট বলা হচ্ছে:

  • কিতাব নাযিল করা হয়েছে, যাতে তিনি বিচার করতে পারেন (لِتَحْكُمَ)

  • কী দিয়ে বিচার করবেন? "যা আল্লাহ আপনাকে দেখিয়েছেন" (بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ), অর্থাৎ ওহীর মাধ্যমে যে জ্ঞান ও বিধান আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন, তা দিয়ে।


আয়াত ২: আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা দিয়েই বিচার করার কঠোর নির্দেশ:

আর আপনি তাদের মধ্যে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, সেই অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করুন; তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না। আর তাদের থেকে সতর্ক থাকুন, যেন তারা আপনাকে আল্লাহর নাযিলকৃত কোনো বিধান থেকে সামান্যও বিচ্যুত করতে না পারে। (সূরা আল-মায়েদা, ৫: ৪৯)

এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন:

  • বিচার করতে হবে "আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন" (بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ) তা দিয়ে।

  • লোকদের খেয়াল-খুশি (أَهْوَاءَهُمْ) অনুসরণ করা যাবে না।

  • এমনকি নাযিলকৃত বিধানের "কিছু অংশ" (عَنْ بَعْضِ) থেকেও বিচ্যুত হওয়া যাবে না।


তিনি কি নিজের মন-মতলবের অনুসরণ করতেন? আল্লাহর রাসূল  কিসের অনুসরণ করতেন? যদি আমরা রাসূলের আনুগত্য করি, তাহলে রাসূল (সা:) নিজে কিসের আনুগত্য করতেন?

উত্তর: রাসূল (সা:) শুধুমাত্র ওহীর (আল্লাহর পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হতো) অনুসরণ করতেন। তিনি নিজের খেয়াল-খুশি বা ব্যক্তিগত মতের অনুসরণ করতেন না। কোরআন এই বিষয়টি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছে।


আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না (عَنِ الْهَوَىٰ)। তা তো কেবল ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়। (সূরা আন-নাজম, ৫৩: ৩-৪)

 "হাওয়া" (الْهَوَىٰ) শব্দের অর্থ হলো ব্যক্তিগত ইচ্ছা, খেয়াল-খুশি বা মন-মতলব। এই আয়াত নিশ্চিত করে যে, রাসূল  (সা:) যা বলতেন এবং যে বিধান দিতেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত মত ছিল না, বরং তা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ওহী।

বলুন! ‘আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে, আর আমি গায়েবও জানি না এবং তোমাদেরকে এও বলি না যে, আমি ফেরেশতা। আমি তো শুধু তারই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি ওহী হয়’। (সূরা আল-আন'আম, ৬: ৫০)


এই আয়াতে রাসূল (সা:) দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছেন যে, তাঁর অনুসরণের একমাত্র ভিত্তি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া ওহী।

...قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقَاءِ نَفْسِي ۖ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰ إِلَيَّ ۖ

...বলুন, ‘আমার নিজের পক্ষ থেকে এতে পরিবর্তন আনার কোনো অধিকার নেই। আমি তো কেবল তাই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহী করা হয়’।" (সূরা ইউনুস, ১০: ১৫)


 এটি প্রমাণ করে যে, দ্বীনের ব্যাপারে তাঁর কোনো কথাই ব্যক্তিগত ছিল না, সবই ছিল ওহী-নির্ভর

🔗 বলো! রসূলদের মধ্য থেকে আমি নতুন নই এবং আমি জানি না আমার সাথে কী করা হবে আর না তোমাদের সাথে। যা আমার প্রতি ওহী করা হয় সেটা ছাড়া আমি অনুসরণ করি না আর আমি স্পষ্ট সতর্ককারী ব্যতীত নই। সূরা আল আহকাফ 46:9


এখন প্রশ্ন হচ্ছে আল্লাহর রাসূলের কাছে কী ওহী করা হয়েছে কিংবা যা কিছু ওহী করা হয় তা পাবো কোথায় বা সেগুলো আছে কোথায়?

বলো! সাক্ষ্য হিসাবে কোন বিষয় সবচেয়ে বড়? বলো, আল্লাহ! তিনি সাক্ষী আমার মাঝে ও তোমাদের মাঝে। এবং আমার কাছে এই কুরআন ওহী করা হয়েছে, যেন এর দ্বারা আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি এবং তাকেও যার কাছে তা পৌঁছবে। আল-আনাম 6:19 (12:3, 42:7, 16:44, 15:9)


আল্লাহর রাসূলের কাছে যা কিছু ওহী নাযিল করা হয়েছে সবই কি তিনি আল কোরআনের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন? না, আরও আছে? (ওহী গাইর মাতলু?)

ওহে রসূল! তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তা পৌঁছে দাও। আর যদি না করো, তাহলে তুমি তাঁর বার্তা প্রচার করলে না। আর আল্লাহ তোমাকে মানুষ থেকে রক্ষা করেন। -আল-মায়িদাহ 5:67

আল-কুরআন হল আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি নাযিলকৃত ওহী, যা মানবজাতির জন্য শেষ এবং পূর্ণাঙ্গ দীন বা জীবন বিধান। এটি আল্লাহর বাণী এবং এর প্রতিটি শব্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে।


সারসংক্ষেপ: সূরা আন-নিসা, ৪:৬৫ এর সঠিক তাৎপর্য

এবার আপনার উদ্ধৃত আয়াতটির (৪:৬৫) সাথে উপরের আয়াতগুলোকে মিলিয়ে দেখুন:


যখন আল্লাহ বলছেন, "...আপনাকে বিচারক মানে...", তখন এর অর্থ হলো, আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী বিচার করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে আপনাকে মানে।


যখন আল্লাহ বলছেন, "...আপনি যে রায় দেন...", তখন এর অর্থ হলো, আপনি আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব (কোরআন) থেকে যে ফয়সালা দেন।

সুতরাং, রাসূল (সা:)-এর রায়কে সর্বান্তকরণে মেনে নেওয়া মানে আল্লাহরই বিধানকে মেনে নেওয়া, কারণ রাসূল  (সা:)  তো সেই বিধানের বাইরে গিয়ে কোনো রায় দিতেনই না। তাঁর বিচার ছিল কোরআনেরই প্রতিচ্ছবি।


চূড়ান্ত সমন্বয়: আল-কোরআনের সাক্ষ্য অনুযায়ী:

"আল-কোরআনই একমাত্র শরীয়া"—সম্পূর্ণরূপে সঠিক এবং এটিই ইসলামের ভিত্তি।


আল্লাহর রাসূল বিচার করতেন শুধুমাত্র কোরআন দিয়ে। তাঁর রায় ছিল আল্লাহরই রায়, যা তিনি ওহীর মাধ্যমে পেতেন। তিনি কখনোই নিজের মন-মতলবের অনুসরণ করে কোনো ফয়সালা দেননি।

তবে, কোরআন নিজেই সেই শরীয়াকে বোঝার, বর্ননা করার (ব্যাখ্যা নয়) এবং বাস্তবায়ন করার জন্য রাসূল  (সা:)-কে চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। রাসূল (সা:) কোরআনের কোনো নতুন শরীয়া দেননি, বরং কোরআনেরই শরীয়াকে তাঁর কথা, কাজ ও জীবন দ্বারা  প্রতিষ্ঠা করেছেন।


সুতরাং, বিষয়টি এমন নয় যে কোরআনের পাশাপাশি অন্য কোনো কথিত হাদিস একটি ভিন্ন বা দ্বিতীয় শরীয়া। বরং: আল-কোরআন হলো: সংবিধান (The Constitution)।

সুতরাং, যখন কোরআন বলে, "যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করল" (সূরা আন-নিসা, ৪: ৮০), তখন এর অর্থ দাঁড়ায়:


আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা মানে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো মত বা আইনের আনুগত্য করা নয়, বরং তাঁর মাধ্যমে পাঠানো আল্লাহরই বিধান ও ওহীর আনুগত্য করা। রাসূল (সা:) ছিলেন সেই ঐশী বিধানের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এবং তাঁর আনুগত্য ছিল কোরআনেরই বাস্তব আনুগত্য।


তিনি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত বার্তাবাহক, যিনি আল্লাহর বার্তা বা বিধানকে সামান্যতম পরিবর্তন বা সংযোজন ছাড়াই পৌঁছে দিয়েছেন এবং নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post