তোমাদের স্ত্রী-স্বামী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু!

তবে-

ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি: স্ত্রী-স্বামী একে অপরের পোশাক ও প্রশান্তি:

🍃 🍂 🍃 🍂 🍃

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ ۚ وَإِن تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

"হে মুমিনগণ! তোমাদের স্ত্রী-স্বামী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকো। আর যদি তোমরা তাদেরকে ক্ষমা কর, মার্জনা কর এবং উপেক্ষা কর, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৪)



এখানে স্ত্রী এবং সন্তানদের ঢালাওভাবে শত্রু বলা হয়নি। আয়াতের মূল বিষয়বস্তু হলো:

১. "কেউ কেউ" (مِنْ): আরবিতে "مِنْ" (মিন) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ হলো "থেকে" বা "কিছু অংশ" (some of)। অর্থাৎ, এখানে বলা হয়েছে যে তোমাদের সকল স্ত্রী বা সন্তান শত্রু নয়, বরং তাদের মধ্যে কেউ কেউ শত্রুর মতো আচরণ করতে পারে।

২. শত্রুতার ধরণ: এখানে "শত্রু" (عدو) বলতে সম্মুখ সমরের শত্রুকে বোঝানো হয়নি। বরং এমন আচরণকে বোঝানো হয়েছে যা একজন ব্যক্তিকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে। 

৩. সমাধান কী? আয়াতটি শুধু সমস্যাই তুলে ধরেনি, এর সমাধানও দিয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, তাদের সম্পর্কে "সতর্ক থাকো" (فَاحْذَرُوهُمْ)। এর অর্থ তাদের ভালোবাসার কারণে যেন আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা। কিন্তু এর পরের অংশেই আল্লাহ সমাধান দিয়েছেন: "আর যদি তোমরা ক্ষমা কর, মার্জনা কর এবং উপেক্ষা কর, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" অর্থাৎ, তাদের ভুলের জন্য কঠোর না হয়ে ক্ষমা ও উদারতার পথ অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

এর পরের আয়াতে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে:

"তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল এক পরীক্ষা (ফিতনা)। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে মহাপুরস্কার।" (সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৫)


এই আয়াতটি পরিষ্কার করে দেয় যে, স্ত্রী, সন্তান এবং সম্পদ হলো মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা। আল্লাহ দেখতে চান, মানুষ এগুলোর ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে আল্লাহকে ভুলে যায়, নাকি আল্লাহর প্রতি কর্তব্য পালন করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।


২. পরিবার ও সম্পদ যেন আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ না করে

এই আয়াতগুলোতে সতর্ক করা হয়েছে যে, পরিবার ও সম্পদের মোহ যেন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্য থেকে গাফেল না করে দেয়।

ক) সূরা আল-মুনাফিকুন, আয়াত ৯

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

"হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ করবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।" (সূরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩:৯)


প্রাসঙ্গিকতা: আত-তাগাবুনের আয়াতে পরিবারকে "শত্রু" বলার কারণ হলো তারা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত করতে পারে। এই আয়াতে সেই বিষয়টিই সরাসরি বলা হয়েছে এবং এমন কাজকে "ক্ষতি" হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সারসংক্ষেপ:

  • এই আয়াতে সকল স্ত্রী-সন্তানকে শত্রু বলা হয়নি, বরং তাদের মধ্যে কেউ কেউ শত্রুতামূলক আচরণ করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

  • এই "শত্রুতা" হলো আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার মাধ্যমে, সরাসরি ঘৃণা বা হিংসার মাধ্যমে নয়।

  • এর সমাধান হলো সতর্ক থাকা এবং তাদের ভুলগুলোকে ক্ষমা ও উদারতার সাথে দেখা, সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়।

  • স্ত্রী-সন্তান মূলত মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা (ফিতনা)।


ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি: স্ত্রী-স্বামী একে অপরের পোশাক ও প্রশান্তি:

এটা মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে, ইসলামে দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা ও প্রশান্তি, শত্রুতা নয়। উপরের আয়াতগুলো বিশেষ পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য। কুরআনে দাম্পত্য সম্পর্কের ইতিবাচক দিক নিয়ে অনেক আয়াত রয়েছে:

ক) সূরা আর-রূম, আয়াত: ২১

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً

অনুবাদ: "আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী-স্বামী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।"


খ) সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৭

هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ
অনুবাদ: "তারা তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।"

সারসংক্ষেপ:

"স্ত্রী-স্বামী একে অপরের শত্রু" সম্পর্কিত আয়াতগুলো মূলত সতর্কতামূলক। এর অর্থ হলো:
যখন কোনো জীবনসঙ্গী তার সঙ্গীকে ঈমান ও সৎকাজ থেকে বিরত রাখে, তখন তার ভূমিকা শত্রুর মতো।

ঈমানের ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা হলো সবচেয়ে বড় শত্রুতা (নূহ ও লূতের স্ত্রীর উদাহরণ)।

জীবনসঙ্গীর ভালোবাসা যদি আল্লাহর ভালোবাসাকে ছাপিয়ে যায়, তবে তা ক্ষতিকর।

তবে ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো প্রশান্তি, ভালোবাসা, দয়া এবং পারস্পরিক সুরক্ষা, যা উপরের ইতিবাচক আয়াতগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post