অপরের জন্য কল্যাণ, ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনার দু'আ/ শুভকামনা প্রকাশ-

কোনো মুসলিম ভাই বা বোন আমাদের কাছে দু'আ চাইলে, আল-কোরআনের কোন আয়াত থেকে দু'আ করা যায়, তা নিয়ে আমরা অনেকেই দ্বিধায় পড়ি। অথচ কোরআনই হলো অপরের জন্য—যেমন: পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং সকল বিশ্বাসীর জন্য—কল্যাণ, ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনার এক সুবিন্যস্ত ও অব্যর্থ ভান্ডার।

অন্যের পক্ষ থেকে দু'আ চাওয়া হলে কোরআনের আলোকে কীভাবে প্রার্থনা করা যেতে পারে, তার একটি সহজ নির্দেশিকা নিচে তুলে ধরা হলো। এই নির্দেশিকাটি কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন প্রার্থনার আঙ্গিক ও প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে তৈরি।

কোরআনুল কারিম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার জন্য এক বিশাল এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ ভান্ডার। কোরআনের দু'আগুলো শুধু 'রব্বানা' (আমাদের রব) বা 'রব্বি' (আমার রব) সম্বোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং বিভিন্ন আঙ্গিকে ও পরিস্থিতিতে অপরের জন্য কল্যাণ, ক্ষমা ও রহমতের প্রার্থনা করা হয়েছে।

প্রথম অংশ: সরাসরি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা:

১. সম্মিলিত আবেদন-দু'আ-প্রার্থনা:

’রব্বানা’ (رَبَّنَا) - "আমাদের রব" - শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে দু'আকারী নিজেকে একটি বৃহত্তর গোষ্ঠীর (পরিবার, সমাজ, সমগ্র উম্মাহ) অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এটি সম্মিলিত বিনয়, ঐক্য এবং সার্বজনীন কল্যাণের প্রতীক।

সম্মিলিত আবেদন ও বিনয়: ‘আমরা’ শব্দটি ব্যবহার করে আবেদনকারী আল্লাহর সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা এবং সম্মিলিত প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেন। যেমন- আদম (সা:) ও তাঁর স্ত্রী যখন ভুল করলেন, তখন তারা দুজনেই বলেছিলেন:

অর্থ: "হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের উপর অত্যাচার করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।" (সূরা আল-আ'রাফ, ৭:২৩)

"রব্বানা জালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।"


সার্বজনীন দু'আ: ’রব্বানা’ দিয়ে করা দু'আগুলো সার্বজনীন এবং উম্মাহর জন্য কল্যাণকর। এর মাধ্যমে একজন মু'মিন শুধু নিজের জন্য নয়, বরং সমস্ত মু'মিনের জন্য আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। যেমন- কোরআনের বহুল পঠিত একটি দু'আ:


"রব্বানা আতিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান্নার।"

অর্থ: "হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২০১)

দু'আয় অন্যদের শামিল করে নেয়া: যখন একজন ব্যক্তি "আমাদের রব! বলে দু'আ করেন, তখন তিনি তার সকল মু'মিন ভাই-বোনকে সেই দু'আয় শামিল করে নিতে পারেন তার নিজস্ব অনুধাবনে।

২. ব্যক্তিগত আবেদন, কিন্তু অপরের জন্যও:

’রব্বি’ (رَبِّ) - "আমার রব" - শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে আবেদনকারী আল্লাহর সাথে একটি গভীর, ব্যক্তিগত এবং নিবিড় সম্পর্ক প্রকাশ করেন।


গভীর ব্যক্তিগত আকুতি: নবী-রাসূলগণ যখন চরম বিপদে বা ব্যক্তিগত গভীর আকুতি নিয়ে আল্লাহর কাছে দু'আ করেছেন, তখন প্রায়শই ’রব্বي’ ব্যবহার করেছেন। যেমন- সালামুন আলা মুসা-এর দু'আ:

"রব্বিশরাহ লি সদরি, ওয়া ইয়াসসির লি আমরি।"

অর্থ: "হে আমার রব! আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজকে সহজ করে দিন।" (সূরা ত্বহা, ২০:২৫-২৬)

  • ব্যক্তিগত আবেদনে অন্যকে অন্তর্ভুক্ত করা: ’রব্বি’ দিয়ে দু'আ শুরু করেও অন্যের জন্য দু'আ করা যায়।

পিতা-মাতার জন্য দু'আ:

"রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগিরা।"

অর্থ: "এবং বলো! ‘হে আমার রব! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে দয়াসহকারে লালন-পালন করেছেন’।" (সূরা বনি ইসরাইল, ১৭:২৪)

নিজেকেসহ পুরো উম্মাহর জন্য দু'আ: সালামুন আলা নূহ-এর দু'আ এ ক্ষেত্রে একটি অসাধারণ উদাহরণ। তিনি ’রব্বি’ দিয়ে শুরু করে নিজেকে, পিতা-মাতা এবং সকল মু'মিনদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন:

  • "রব্বিগফিরলি ওয়া লিওয়ালিদাইয়্যা ওয়া লিমান দাখালা বাইতিয়া মু'মিনাও ওয়া লিলমু'মিনিনা ওয়াল মু'মিনাত।"

    অর্থ: "হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার অবস্থায় প্রবেশ করবে তাকে এবং সকল মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীকে ক্ষমা করুন।" (সূরা নূহ, ৭১:২৮)

    দ্বিতীয় অংশ: বিভিন্ন আঙ্গিকে অপরের জন্য কল্যাণ ও ক্ষমার প্রার্থনা

কোরআনে সরাসরি 'হে আল্লাহ' বলে প্রার্থনা করার পাশাপাশি বিভিন্ন বর্ণনামূলক ভঙ্গিতেও অপরের জন্য দু'আ বা শুভকামনা করা হয়েছে।

১. গল্পের ছলে বা তৃতীয় পুরুষের (Third Person) মাধ্যমে দু'আ:

  • সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর দু'আ: তিনি মক্কা নগরী ও তার অধিবাসীদের জন্য দু'আ করছেন:

    "রব্বিজ'আল হা-যা বালাদান আ-মিনাওঁ ওয়ারযুক আহলাহু মিনাছ ছামারা-ত..."

    অর্থ: "হে আমার রব, একে নিরাপদ শহর বানান এবং এর অধিবাসীদেরকে ফলমূল দ্বারা রিযিক দান করুন..." (সূরা আল-বাকারা, ২:১২৬)
    এবং
    "রব্বানা...ফাজ'আল আফ'ইদাতাম মিনান না-সি তাহওয়ী ইলাইহিম..."

    অর্থ: "হে আমাদের রব...আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের দিকে আকৃষ্ট করে দিন..." (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৩৭)

  • সালামুন আলা আইয়ুব-এর দু'আ: তিনি নিজের অবস্থা তুলে ধরে আল্লাহর দয়া কামনা করছেন, যা পরোক্ষভাবে একটি দু'আ।

    "আন্নি মাসসানিয়াদ দুররু ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমিন।"

    অর্থ: "আমি তো দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।" (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৩)

২. আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও প্রতিশ্রুতির বাণী (ঐশ্বরিক শুভকামনা):

কিছু আয়াতে আল্লাহ নিজেই তাঁর বান্দার জন্য ক্ষমা, কল্যাণ ও পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, যা আমরা অন্যদের জন্য শুভকামনা হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।

  • রাসূল (সা:)-এর জন্য আল্লাহর ঘোষণা:

    "যেন আল্লাহ তোমার ভুল-ত্রুটি থেকে তোমাকে ক্ষমা করেন, যা পূর্বে হয়েছে আর যা পরে হয়েছে এবং তোমার প্রতি তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন এবং আল্লাহ তোমাকে বলিষ্ঠ সাহায্য দান করেন... (এবং) মু’মিন পুরুষ ও নারীদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করান..." (সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:২-৫)

  • দৃঢ় আশ্বাসমূলক আয়াত:

    আসাল্ল-হু আইঁ ইয়াজ'আলা বাইনাকুম ওয়া বাইনাল্লাযীনা 'আ-দাইতুম মিনহুম মাওয়াদ্দাহ..."

    অর্থ: "আশা করা যায়, আল্লাহ তোমাদের এবং তোমাদের শত্রুদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন..." (সূরা আল-মুমতাহিনা, ৬০:৭)

৩. মানুষের পক্ষ থেকে সরাসরি অপরকে সম্বোধন করে শুভকামনা/দু'আ:

  • সালামুন আলা  ইউসুফ-এর ক্ষমা ও দু'আ: তিনি তাঁর ভাইদেরকে বলছেন:

    "...লা- তাছরীবা 'আলাইকুমুল ইয়াওম; ইয়াগফিরুল্ল-হু লাকুম..."

    অর্থ: "...আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন..." (সূরা ইউসুফ, ১২:৯২)

  • স্নেহপূর্ণ ঐশ্বরিক বাণী: আল্লাহ তাঁর নবী-কে সম্বোধন করে বলছেন:

    'আফাল্ল-হু 'আনকা লিমা আযিন্তা লাহুম..."

    অর্থ: "আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন! আপনি কেন তাদেরকে অনুমতি দিলেন..." (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৪৩)

৪. শান্তি ও স্বাগত ঘোষণামূলক বাক্য:

  • জান্নাতের সম্ভাষণ: ফেরেশতারা মু'মিনদের বলবেন:

    "সালা-মুন 'আলাইকুম বিমা- সাবাতরুম..."

    অর্থ: "তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, কারণ তোমরা ধৈর্যধারণ করেছিলে..." (সূরা আর-রা'দ, ১৩:২৪)

  • হেদায়েতের অনুসারীদের জন্য শান্তি:

    "...ওয়াসসালা-মু 'আলা- মানিত্তাবা'আল হুদা-।"

    অর্থ: "আর শান্তি তাদের উপর, যারা হেদায়েত অনুসরণ করে।" (সূরা ত্বহা, ২০:৪৭)

যখন কেউ আপনার কাছে দু'আ চাইবে

যখন কোনো ব্যক্তি আপনার কাছে দু'আ চান, তখন আপনি কোরআনের ’রব্বানা’ এবং ’রব্বি’ উভয় প্রকার দু'আই ব্যবহার করতে পারেন।

  • ’রব্বানা’ যুক্ত দু'আ: এগুলো স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক। যেমন, ক্ষমা ও রহমতের জন্য:

    "রব্বানা আমান্না ফাগফির লানা ওয়ারহামনা ওয়া আনতা খাইরুর রাহিমিন।"

    অর্থ: "হে আমাদের রব!, আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও আমাদের প্রতি দয়া করুন এবং আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।" (সূরা আল-মু'মিনুন, ২৩:১০৯)

  • ’রব্বি’ যুক্ত দু'আ: সালামুন আলা নূহ-এর দু'আটি (সূরা নূহ, ৭১:২৮) একটি আদর্শ মডেল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, যা নিজের সাথে পিতা-মাতা ও সকল মু'মিনকে অন্তর্ভুক্ত করে।

  • সরাসরি শুভকামনা: সালামুন আলা ইউসুফ-এর মতো করে বলতে পারেন, "আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন ও আপনার উপর রহম করুন।"

সারসংক্ষেপ ও মূলনীতি

  • দু'আর বৈচিত্র্য: কোরআন আমাদের বিভিন্ন আঙ্গিকে দু'আ করতে শেখায়—কখনও সম্মিলিতভাবে ('রব্বানা'), কখনও ব্যক্তিগতভাবে ('রব্বি'), আবার কখনও গল্পের ছলে বা অন্যের জন্য শুভকামনা প্রকাশের মাধ্যমে।

  • অন্যের জন্য প্রার্থনা: একজন মু'মিনের দায়িত্ব তার দু'আর পরিধিকে পিতা-মাতা, পরিবার, এবং সমগ্র মু'মিন উম্মাহর জন্য বিস্তৃত করা।

  • নিয়তের গুরুত্ব: দু'আর সময় আপনার অন্তরের উদ্দেশ্যই প্রধান। আল্লাহ আপনার সেই উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত।

  • আন্তরিকতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তরিকতা ও ইখলাস। আপনি যে শব্দই ব্যবহার করুন না কেন, আপনার অন্তরের নিয়ত যদি বিশুদ্ধ হয়, আল্লাহ তা কবুল করবেন।

রহমত (দয়া) প্রসঙ্গে:

সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১০৫ (2:105):

"...আর আল্লাহ তাঁর রহমতের জন্য যাকে ইচ্ছা বিশেষভাবে মনোনীত করেন এবং আল্লাহ মহা অনুগ্রহের অধিকারী।"   (يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِ مَن يَشَاءُ)

অপরের জন্য কল্যাণ, ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনার দু'আ এবং শুভকামনা প্রকাশ- লিংক ফাইল এখানে ক্লিক করুন ক্লিক করুন:

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post