কোনো মুসলিম ভাই বা বোন আমাদের কাছে দু'আ চাইলে, আল-কোরআনের কোন আয়াত থেকে দু'আ করা যায়, তা নিয়ে আমরা অনেকেই দ্বিধায় পড়ি। অথচ কোরআনই হলো অপরের জন্য—যেমন: পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং সকল বিশ্বাসীর জন্য—কল্যাণ, ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনার এক সুবিন্যস্ত ও অব্যর্থ ভান্ডার।
অন্যের পক্ষ থেকে দু'আ চাওয়া হলে কোরআনের আলোকে কীভাবে প্রার্থনা করা যেতে পারে, তার একটি সহজ নির্দেশিকা নিচে তুলে ধরা হলো। এই নির্দেশিকাটি কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন প্রার্থনার আঙ্গিক ও প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে তৈরি।
কোনো মুসলিম ভাই বা বোন আমাদের কাছে দু'আ চাইলে, আল-কোরআনের কোন আয়াত থেকে দু'আ করা যায়, তা নিয়ে আমরা অনেকেই দ্বিধায় পড়ি। অথচ কোরআনই হলো অপরের জন্য—যেমন: পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং সকল বিশ্বাসীর জন্য—কল্যাণ, ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনার এক সুবিন্যস্ত ও অব্যর্থ ভান্ডার।
"রব্বিশরাহ লি সদরি, ওয়া ইয়াসসির লি আমরি।"
অর্থ: "হে আমার রব! আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজকে সহজ করে দিন।" (সূরা ত্বহা, ২০:২৫-২৬)
ব্যক্তিগত আবেদনে অন্যকে অন্তর্ভুক্ত করা: ’রব্বি’ দিয়ে দু'আ শুরু করেও অন্যের জন্য দু'আ করা যায়।
"রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগিরা।"
অর্থ: "এবং বলো! ‘হে আমার রব! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে দয়াসহকারে লালন-পালন করেছেন’।" (সূরা বনি ইসরাইল, ১৭:২৪)
নিজেকেসহ পুরো উম্মাহর জন্য দু'আ: সালামুন আলা নূহ-এর দু'আ এ ক্ষেত্রে একটি অসাধারণ উদাহরণ। তিনি ’রব্বি’ দিয়ে শুরু করে নিজেকে, পিতা-মাতা এবং সকল মু'মিনদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন:
"রব্বিগফিরলি ওয়া লিওয়ালিদাইয়্যা ওয়া লিমান দাখালা বাইতিয়া মু'মিনাও ওয়া লিলমু'মিনিনা ওয়াল মু'মিনাত।" অর্থ: "হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার অবস্থায় প্রবেশ করবে তাকে এবং সকল মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীকে ক্ষমা করুন।" (সূরা নূহ, ৭১:২৮)দ্বিতীয় অংশ: বিভিন্ন আঙ্গিকে অপরের জন্য কল্যাণ ও ক্ষমার প্রার্থনা
সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর দু'আ: তিনি মক্কা নগরী ও তার অধিবাসীদের জন্য দু'আ করছেন:"রব্বিজ'আল হা-যা বালাদান আ-মিনাওঁ ওয়ারযুক আহলাহু মিনাছ ছামারা-ত..." অর্থ: "হে আমার রব, একে নিরাপদ শহর বানান এবং এর অধিবাসীদেরকে ফলমূল দ্বারা রিযিক দান করুন..." (সূরা আল-বাকারা, ২:১২৬)এবং "রব্বানা...ফাজ'আল আফ'ইদাতাম মিনান না-সি তাহওয়ী ইলাইহিম..." অর্থ: "হে আমাদের রব...আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের দিকে আকৃষ্ট করে দিন..." (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৩৭)সালামুন আলা আইয়ুব-এর দু'আ: তিনি নিজের অবস্থা তুলে ধরে আল্লাহর দয়া কামনা করছেন, যা পরোক্ষভাবে একটি দু'আ।"আন্নি মাসসানিয়াদ দুররু ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমিন।" অর্থ: "আমি তো দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।" (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৩)
রাসূল (সা:)-এর জন্য আল্লাহর ঘোষণা: "যেন আল্লাহ তোমার ভুল-ত্রুটি থেকে তোমাকে ক্ষমা করেন, যা পূর্বে হয়েছে আর যা পরে হয়েছে এবং তোমার প্রতি তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন এবং আল্লাহ তোমাকে বলিষ্ঠ সাহায্য দান করেন... (এবং) মু’মিন পুরুষ ও নারীদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করান..." (সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:২-৫) দৃঢ় আশ্বাসমূলক আয়াত: আসাল্ল-হু আইঁ ইয়াজ'আলা বাইনাকুম ওয়া বাইনাল্লাযীনা 'আ-দাইতুম মিনহুম মাওয়াদ্দাহ..." অর্থ: "আশা করা যায়, আল্লাহ তোমাদের এবং তোমাদের শত্রুদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন..." (সূরা আল-মুমতাহিনা, ৬০:৭)
সালামুন আলা ইউসুফ-এর ক্ষমা ও দু'আ: তিনি তাঁর ভাইদেরকে বলছেন:"...লা- তাছরীবা 'আলাইকুমুল ইয়াওম; ইয়াগফিরুল্ল-হু লাকুম..." অর্থ: "...আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন..." (সূরা ইউসুফ, ১২:৯২)স্নেহপূর্ণ ঐশ্বরিক বাণী: আল্লাহ তাঁর নবী-কে সম্বোধন করে বলছেন:'আফাল্ল-হু 'আনকা লিমা আযিন্তা লাহুম..." অর্থ: "আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন! আপনি কেন তাদেরকে অনুমতি দিলেন..." (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৪৩)
জান্নাতের সম্ভাষণ: ফেরেশতারা মু'মিনদের বলবেন:"সালা-মুন 'আলাইকুম বিমা- সাবাতরুম..." অর্থ: "তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, কারণ তোমরা ধৈর্যধারণ করেছিলে..." (সূরা আর-রা'দ, ১৩:২৪)হেদায়েতের অনুসারীদের জন্য শান্তি: "...ওয়াসসালা-মু 'আলা- মানিত্তাবা'আল হুদা-।" অর্থ: "আর শান্তি তাদের উপর, যারা হেদায়েত অনুসরণ করে।" (সূরা ত্বহা, ২০:৪৭)
যখন কেউ আপনার কাছে দু'আ চাইবে
’রব্বানা’ যুক্ত দু'আ: এগুলো স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক। যেমন, ক্ষমা ও রহমতের জন্য:"রব্বানা আমান্না ফাগফির লানা ওয়ারহামনা ওয়া আনতা খাইরুর রাহিমিন।" অর্থ: "হে আমাদের রব!, আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও আমাদের প্রতি দয়া করুন এবং আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।" (সূরা আল-মু'মিনুন, ২৩:১০৯)’রব্বি’ যুক্ত দু'আ: সালামুন আলা নূহ-এর দু'আটি (সূরা নূহ, ৭১:২৮) একটি আদর্শ মডেল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, যা নিজের সাথে পিতা-মাতা ও সকল মু'মিনকে অন্তর্ভুক্ত করে।সরাসরি শুভকামনা: সালামুন আলা ইউসুফ-এর মতো করে বলতে পারেন, "আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন ও আপনার উপর রহম করুন।"
দু'আর বৈচিত্র্য: কোরআন আমাদের বিভিন্ন আঙ্গিকে দু'আ করতে শেখায়—কখনও সম্মিলিতভাবে ('রব্বানা'), কখনও ব্যক্তিগতভাবে ('রব্বি'), আবার কখনও গল্পের ছলে বা অন্যের জন্য শুভকামনা প্রকাশের মাধ্যমে।অন্যের জন্য প্রার্থনা: একজন মু'মিনের দায়িত্ব তার দু'আর পরিধিকে পিতা-মাতা, পরিবার, এবং সমগ্র মু'মিন উম্মাহর জন্য বিস্তৃত করা।নিয়তের গুরুত্ব: দু'আর সময় আপনার অন্তরের উদ্দেশ্যই প্রধান। আল্লাহ আপনার সেই উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত।আন্তরিকতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তরিকতা ও ইখলাস। আপনি যে শব্দই ব্যবহার করুন না কেন, আপনার অন্তরের নিয়ত যদি বিশুদ্ধ হয়, আল্লাহ তা কবুল করবেন।
.png)