ইলিশ চাই, না ব্রীজ চাই? ব্রীজে স্বস্তি, নাকি ইলিশে শান্তি? মানুষের সিদ্ধান্তে প্রকৃতির বিপর্যয়! প্রকৃতি ধ্বংস করেই উন্নয়ন এগিয়ে চলছে: বিপর্যয় ও ভারসাম্যহীনতা-আমাদের রব কী বলেন?

"প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়ন" বিষয়ে আল-আল-কোরআনে সরাসরি এবং নীতিগতভাবে অনেক নির্দেশনা রয়েছে। কোরআন এমন উন্নয়নকে সমর্থন করে না যা পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করে এবং বিপর্যয় সৃষ্টি করে।

ইসলামের মূলনীতি হলো, মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর ‘খলিফা’ বা প্রতিনিধি। এই পৃথিবীর প্রকৃতি, সম্পদ ও পরিবেশ মানুষের কাছে একটি ‘আমানত’। তাই এই আমানতের সুরক্ষা করা মানুষের অন্যতম দায়িত্ব।

এই বিষয়ে আল-কুরআনিল হাকীমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়াত নিচে উল্লেখ করা হলো:

শান্তি কোথায়? ব্রীজে না ইলিশে?

১. বিপর্যয় ও ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে নিষেধ:

আল-কোরআনের সবচেয়ে স্পষ্ট আয়াতগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম, যা মানুষের দ্বারা পৃথিবীতে সৃষ্ট বিপর্যয়কে নির্দেশ করে।

সূরা আর-রূম, আয়াত ৪১:

“স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।”

তাৎপর্য: এই আয়াতে ‘ফাসাদ’ (বিপর্যয়, দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা পরিবেশ দূষণ, বনভূমি উজাড়, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা সহ সকল প্রকার ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপকে অন্তর্ভুক্ত করে। আধুনিক যুগে তথাকথিত উন্নয়নের নামে যে পরিবেশগত বিপর্যয় (যেমন - জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস) ঘটছে, তা এই আয়াতের বাস্তব উদাহরণ।


২. পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর বিপর্যয় সৃষ্টি না করা (Fasad fil Ard):

আল্লাহ পৃথিবীকে সুন্দরভাবে সুবিন্যস্ত করার পর তাকে নষ্ট করতে নিষেধ করেছেন।

সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত ৫৬:

وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا ۚ إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ

“পৃথিবীকে যথাযথভাবে সুবিন্যস্ত করার পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। আর তাঁকে ভয় ও আশা সহকারে ডাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।”

তাৎপর্য: এই আয়াত সরাসরি নির্দেশ দেয় যে, পৃথিবীতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পর তাতে বিশৃঙ্খলা বা বিপর্যয় সৃষ্টি করা যাবে না। যে উন্নয়ন প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে, তা এই আয়াতের নির্দেশের পরিপন্থী।


৩. প্রাকৃতিক ভারসাম্য (মিজান) লঙ্ঘন করার নিষেধাজ্ঞা: রক্ষা করার নির্দেশ:

আল্লাহ সু.তা. মহাবিশ্বের সবকিছু একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাপে ও ভারসাম্যের উপর সৃষ্টি করেছেন এবং এই ভারসাম্য নষ্ট করা এক ধরনের সীমালঙ্ঘন। এই ভারসাম্য লঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন।

সূরা আর-রহমান, আয়াত ৭-৯:

وَالسَّمَاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيزَانَ (7) أَلَّا تَطْغَوْا فِي الْمِيزَانِ (8) وَأَقِيمُوا الْوَزْنَ بِالْقِسْطِ وَلَا تُخْسِرُوا الْمِيزَانَ (9)

অনুবাদ: “তিনিই আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন ভারসাম্য (মিজান)। যাতে তোমরা ভারসাম্য লঙ্ঘন না করো। তোমরা ন্যায়বিচারের সাথে ওজন কায়েম করো এবং ওজনে কম দিও না।” 

তাৎপর্য: এতাৎপর্য: এখানে ‘মিজান’ বা ভারসাম্য শুধু দাঁড়িপাল্লার ওজনকেই বোঝায় না,  বরং এটি মহাবিশ্বের সকল প্রাকৃতিক, সামাজিক ও নৈতিক ভারসাম্যকে নির্দেশ করে,  প্রকৃতির বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য (ecological balance)।   উন্নয়নের নামে বন ধ্বংস, নদী ভরাট, এবং মাত্রাতিরিক্ত দূষণ করা এই ঐশ্বরিক ভারসাম্যকে লঙ্ঘন করার শামিল, যা কোরআনে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা এমনভাবে করতে হবে যেন এই মিজান বা ভারসাম্য লঙ্ঘিত না হয়। যদি এহেন উন্নয়ন এই ভারসাম্যকে ধ্বংস করে, তবে তা আল্লাহর নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।


৪. অপচয় ও সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ:

প্রকৃতির সম্পদ ব্যবহার করার অনুমতি ইসলাম দিয়েছে, কিন্তু অপচয় বা সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছে।

সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত ৩১:

...وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

অনুবাদ: “...এবং খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।”

তাৎপর্য: এই নীতিটি শুধু খাদ্য বা পানীয়ের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া সকল নিয়ামত, যেমন - পানি, বন, খনিজ সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যে উন্নয়ন প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার ও অপচয় করে, তা ইসলামি নীতির বিরোধী।


শান্তি কোথায়? ব্রীজে না ইলিশে?

কোরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে, শান্তি (সাকিনাহ) বস্তুগত উন্নয়নে নয়, বরং আল্লাহর আদেশের আনুগত্য এবং ন্যায়বিচার ও ভারসাম্যের মধ্যেই নিহিত।

ব্রীজে শান্তি: যদি ব্রীজটি মানুষের কষ্ট লাঘব করে, অর্থনীতিকে সচল করে এবং এটি প্রকৃতির ক্ষতি না করে বা ন্যূনতম ক্ষতি করে নির্মিত হয়, তবে তা আল্লাহর নিয়ামত এবং এতে শান্তি রয়েছে।

ইলিশে শান্তি: ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, এটি একটি জাতির ঐতিহ্য, হাজারো জেলের জীবিকা এবং একটি সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ব্যবস্থার প্রতীক। এই প্রাকৃতিক নিয়ামতকে রক্ষা করার মধ্যেও শান্তি রয়েছে, কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টিকে সম্মান করা এবং তাঁর দেওয়া রিজিকের শুকরিয়া আদায় করার নামান্তর।

আল্লাহর দেওয়া এই অসীম "ফাদল" বা বিশেষ অনুগ্রহ (ইলিশ) আজ কেন সাধারণের নাগালের বাইরে—এই প্রশ্নের উত্তর কোরআনের আলোকেই অত্যন্ত স্পষ্ট।
দায়ী কে? এই দুপাওয়ালা মানুষই নয় কি?

আল্লাহর এই অসীম অনুগ্রহ থেকে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করার জন্য প্রধানত দায়ী এই ‘দুপাওয়ালা মানুষই’। কোরআনের ভাষায়, মানুষ তার নিজের কর্মকাণ্ডের দ্বারাই নিজের বিপর্যয় ডেকে আনে।

সিদ্ধান্ত মানুষ নেয়, কিন্তু সিদ্ধান্তের জবাবদিহিতা আল্লাহর কাছে: আমানতের খিয়ানত (Betrayal of Trust):

মানুষকে আল্লাহ 'খলিফা' বা প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাকে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ দেখতে চান, মানুষ কি তার দেওয়া আমানত (প্রকৃতি) রক্ষা করে উন্নয়ন করছে, নাকি স্বল্পমেয়াদী লাভের জন্য দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনছে।


সারসংক্ষেপ:

আল-কোরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে:

  • উন্নয়ন হবে গঠনমূলক, ধ্বংসাত্মক নয়: ইসলাম পৃথিবীকে আবাদ করতে (Imarah al-Ard) উৎসাহিত করে, কিন্তু তা হতে হবে প্রকৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

  • মানুষ তত্ত্বাবধায়ক, মালিক নয়: পৃথিবীর সকল কিছুর একচ্ছত্র মালিক আল্লাহ। মানুষ কেবল এর তত্ত্বাবধায়ক বা আমানতদার।

  • ভারসাম্য রক্ষা করা আবশ্যক: প্রকৃতির ভারসাম্য (Ecological Balance) নষ্ট করা একটি বড় ধরনের অপরাধ।

  • টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development): কোরআনের মূলনীতিগুলো আধুনিক টেকসই উন্নয়নের ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষা করার কথা বলা হয়।

সুতরাং, প্রকৃতি ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নয়ন নয়, বরং তা এক ধরনের বিপর্যয় বা 'ফাসাদ', যা কোরআনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post