একটি মামলা: ধারা নং: আয়াত ২৫:৩০

আল-কোরআন এই মৌলিক শিক্ষা দেয় যে, একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত আয়াত, ওহী এবং তাঁর বিধানকেই মজবুতভাবে ধারণ করতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সেটারই অনুসরণ করতে হবে। এর থেকে বিচ্যুত হওয়া, অর্থাৎ কোরআনকে উপেক্ষা বা পরিত্যাগ করার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কেও কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। উল্লেখ্য, কিয়ামতের মহাবিচার দিবসে আল্লাহর রাসূল (আল-কোরআনের সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ২৫:৩০ অনুসারে) এই মর্মে অভিযোগ উত্থাপন করে রবের দরবারে মামলা দায়ের করবেন যে, তাঁর সম্প্রদায় (কওম) এই মহিমান্বিত কিতাবকে পরিত্যাগ করেছিল।


অতএব তুমি দৃঢ়ভাবে তা ধরো, যা তোমার কাছে ওহী করা হয়েছে। নিশ্চয় তুমি সুদৃঢ় পথের ওপরেই। আর নিশ্চয় সেটা তোমার জন্য ও তোমার কওমের জন্য অবশ্যই উপদেশ। আর শীঘ্রই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে-সূরা আয-যুখরুফ (৪৩), আয়াত ৪৩-৪৪

"তবে অবশ্যই আমরা তাদেরকে জিজ্ঞাসা করব, যাদের প্রতি বার্তা পাঠানো হয়েছিল এবং অবশ্যই আমরা প্রেরিতদেরকেও জিজ্ঞাসা করব।" — সূরা আল-আরাফ (৭), আয়াত ৬

 এটি প্রতীকী ছবি: যা বাস্তব ঘটনার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং একটি ভাবনাকে চিত্ররূপে প্রকাশ করে।

আল্লাহর রাসূলের অভিযোগ — কিয়ামতের দিন আমাদের বিরুদ্ধে!🌙 💔 

কোন আদালতে মামলা: রবের দরবারে। 

অভিযুক্ত                  : তাঁরই প্রিয় কওম।

অভিযোগের ভাষ্য       :

 وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا


অর্থ: "রাসূল বলবেন, হে আমার রব! আমার কওম তো এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।"


🥀 ভাবুন তো, কওমের পরিস্থিতি কেমন হলে (এক রবের এক কিতাব বাদ দিয়ে মনুষ্য-সৃষ্ট বহু কিতাবে বিশ্বাসী) তাঁর কওমের বিরুদ্ধে এমন কথা বলেন?


আমরাই তো সেই কওম — 

➥ যারা কুরআনকে পড়ি না-

➥ বোঝার চেষ্টা করি না-

➥ একটিমাত্র রবের নাজিলকৃত কিতাবকে জীবনে অনুসরণযোগ্য হিসাবে মেনে নেই না-

🌧️ কুরআনের বাণী আজ বইয়ের শেলফে ধূলোমলিন।


🕯️ অথচ এটাই তো ছিল আমাদের নাজাতের পথ, আমাদের আলো।

。゚: *. .* :. 


বিস্তারিত:

ওহী/আল্লাহর কালামকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার নির্দেশ:

আল-কোরআনের বহু আয়াতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের এবং নবীদেরকে তাঁর নাযিলকৃত কিতাব বা ওহীকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশগুলো পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে একই মর্মার্থ বহন করে:


সূরা আয-যুখরুফ (৪৩:৪৩-৪৪):
"অতএব তুমি দৃঢ়ভাবে তা ধরো, যা তোমার কাছে ওহী করা হয়েছে। নিশ্চয় তুমি সুদৃঢ় পথের ওপরেই। আর নিশ্চয় সেটা তোমার জন্য ও তোমার কওমের জন্য অবশ্যই উপদেশ। আর শীঘ্রই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে।"

সূরা আল-ইমরান (৩:১০৩):
"আর তোমরা সকলে আল্লাহর রশিকে শক্তভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না..."

"আল্লাহর রশি" বলতে কোরআন এবং দ্বীন-ইসলামের পথকে বোঝানো হয়েছে, যা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূরা আল-আ'রাফ (৭:১৪৫):
"...... সুতরাং তুমি সেগুলো শক্তভাবে ধরো এবং তোমার সম্প্রদায়কে নির্দেশ দাও যেন তারা এর উত্তম বিষয়গুলো গ্রহণ করে..."

সূরা আল-বাকারা (২:৬৩):
.. 'যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি তা শক্তভাবে ধরো এবং তাতে যা আছে তা স্মরণ করো, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পারো'।"

বনী ইসরাঈলকেও আল্লাহর প্রদত্ত বিধানকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে বলা হয়েছিল।

সূরা আল-আন'আম (৬:১৫৩):
"আর এটিই আমার সরল পথ, সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করো এবং অন্যান্য পথের অনুসরণ করো না, কারণ তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এই নির্দেশ তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন, যাতে তোমরা সতর্ক হও।"

সূরা ইউনুস (১০:১০৯):
আর তোমার প্রতি যা ওহী করা হয়েছে, তুমি তার অনুসরণ করো এবং ধৈর্যধারণ করো, যতক্ষণ না আল্লাহ ফয়সালা করেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী।

সূরা আল-আ'রাফ (৭:৩):
"তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা তার অনুসরণ করো। আর তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবকের অনুসরণ করো না। তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ করো।"

কোরআনকে পরিত্যাগ করার ভয়াবহ পরিণতি – আয়াত ২৫:৩০:

উপরে উল্লিখিত নির্দেশগুলো অমান্য করার পরিণতি যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তা সূরা আল-ফুরকান (২৫:৩০)

 আয়াতে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে। এটি কিয়ামতের দিনের এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করে:

সূরা আল-ফুরকান (২৫:৩০):

"وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا"

"আর রাসূল বলবেন, হে আমার রব! আমার কওম তো এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।


রাসূলের অভিযোগ — কিয়ামতের দিন আমাদের বিরুদ্ধে! 💔
ভাবুন তো, কতটা কষ্টে হলে এক নবী তাঁর উম্মতের বিরুদ্ধে এমন কথা বলেন?
আমরাই তো সেই কওম— যারা কোরআনকে পড়ি না, বোঝার চেষ্টা করি না, জীবনে চালু করি না।


কোরআনের বাণী আজ বইয়ের শেলফে ধূলোমলিন। অথচ এটাই তো ছিল আমাদের নাজাতের পথ, আমাদের আলো।


কোরআনকে মাহজুরা (পরিত্যাজ্য) না করার অর্থগত বিপরীত অবস্থা:

কোরআনে مَهْجُورًا (মাহজুরা) অর্থাৎ "পরিত্যাজ্য" বা "পরিত্যক্ত" এর সরাসরি কোনো একটি একক বিপরীত শব্দ নেই যা একটি নির্দিষ্ট আয়াতের রেফারেন্স দিয়ে দেখানো যাবে। কারণ কোরআন নিজেই মাহজুরা না হওয়ার আহ্বান জানায়। এর বিপরীত অর্থগতভাবে এমন অবস্থা যেখানে কোরআনকে "গ্রহণযোগ্য" (مقبول), "আদৃত", "গুরুত্বপূর্ণ" (مهم) বা "অনুসরণীয়" হিসেবে দেখা হয়। এর বিপরীত অবস্থা হলো কোরআনকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করা, অনুসরণ করা এবং এর উপর আমল করা।

যেমন:

  • সূরা ইউনুস (১০:৫৭): "ওহে মানুষ! অবশ্যই তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে একটি উপদেশ এবং অন্তরসমূহের মধ্যে যা রয়েছে, তার জন্য আরোগ্য আর মুমিনদের জন্য পথনির্দেশ ও দয়া।"

  • সূরা আল-বাকারা (২:১৭০):
    "আর যখন তাদেরকে বলা হয়, 'আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তার অনুসরণ করো', তখন তারা বলে, 'বরং আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে যার উপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব'।"

এটি আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন (অর্থাৎ ওহী/কোরআন) তার অনুসরণ করার গুরুত্ব তুলে ধরে এবং বাপ-দাদাদের অন্ধ অনুকরণের বিরুদ্ধে সতর্ক করে। এর মাধ্যমে ওহীকে আঁকড়ে ধরার গুরুত্বই প্রতীয়মান হয়।

এই আয়াতগুলো সম্মিলিতভাবে মুসলিমদের প্রতি আল্লাহর কিতাব, ওহী এবং এর শিক্ষাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে জীবন পরিচালনার গুরুত্ব তুলে ধরে।


উপসংহার:

অতএব, কোরআনের এই আয়াতগুলো আমাদের স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, আল-কোরআন নিছক একটি পাঠ্যগ্রন্থ নয়, বরং একটি জীবন্ত সংবিধান, যা আমাদের জীবনের প্রতিটি দিক নির্দেশনা দেয়। একে পরিত্যাগ করা, এর উপদেশ গ্রহণ না করা অথবা এর নির্দেশাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কিয়ামতের দিনে রাসূলের (সা.) অভিযোগের কারণ হবে।



🕊️ আসুন, আমরা ফিরে যাই কুরআনের দিকে।
এটাই হবে রাসূলের প্রতি আমাদের ভালোবাসার সেরা প্রমাণ।



এই আয়াতগুলো সরাসরি মাহজুরা এর বিপরীত শব্দ ব্যবহার না করলেও, এর অর্থগত বিপরীত অবস্থা, অর্থাৎ কোরআনকে গ্রহণ করা ও তার অনুসরণ করার গুরুত্ব তুলে ধরে।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post