কুকুর ও বিড়াল নিয়ে আল-কোরআনের বিধান:
বিড়াল: পবিত্র কোরআনে বিড়াল পালন করা, এর পবিত্রতা বা অপবিত্রতা সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট আয়াত বা নির্দেশনা নেই।
কুকুর: পবিত্র কোরআনে কুকুরকে সরাসরি "অপবিত্র" বা "নাপাক" বলা হয়নি। বরং দুটি স্থানে কুকুরের উল্লেখ ইতিবাচক এবং কার্যকরী প্রেক্ষাপটে এসেছে।
১. প্রাণীর প্রতি দায়িত্ব ও করুণা:
তিনিই, যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর মধ্যে যা আছে, সেসব কিছু সৃষ্টি করেছেন-আল-বাকারা 2:29
- আর পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই এবং এমন কোনো পাখিও নেই যা তার দুই ডানা দ্বারা উড়ে, কিন্তু তারা তোমাদের মতই এক একটি জাতি। আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেইনি; অতঃপর তাদেরকে তাদের রবের দিকে একত্র করা হবে। (সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৩৮)
এই আয়াতটি প্রাণীদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও সম্মানের স্বীকৃতি দেয়। কোনো প্রাণীকে নিজের অধীনে বা পোষ্য হিসেবে রাখলে তার যত্ন নেওয়া, খাদ্য ও আশ্রয় নিশ্চিত করা মানুষের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
আমি আমার নিজ হাতে তাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছি:
২. প্রাণীর উপকারিতা ও মানুষের জন্য হালাল হওয়া:
এবং চতুষ্পদ জন্তুগুলোকেও তিনি সৃষ্টি করেছেন; তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে উষ্ণতার উপকরণ ও বহু উপকার। আর তা থেকে তোমরা আহারও কর। (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫)
"আর তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন তোমাদের আরোহণের জন্য এবং শোভার জন্য। আর তিনি এমন কিছু সৃষ্টি করেন যা তোমরা জান না।" (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৮)
৩. ইতিবাচক উদাহরণ: আসহাবে কাহাফের কুকুর:
আর তুমি তাদেরকে জাগ্রত মনে করবে অথচ তারা ঘুমন্ত এবং আমরা তাদেরকে ডানদিকে ও বামদিকে পরিবর্তন করতাম আর তাদের কুকুরটি প্রবেশপথে তার দুপা বাড়ানো। যদি তুমি তাদেরকে উঁকি মেরে দেখতে তাহলে তুমি তাদের থেকে পালিয়ে ফিরে যেতে। এবং নিশ্চয় তুমি তাদের থেকে ভয়ে পূর্ণ হয়ে যেতে। (সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১৮)
৪. শিকারের কাজে প্রাণীর ব্যবহার:
তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তাদের জন্য কী হালাল করা হয়েছে? বলো! তোমাদের জন্য হালাল করা হলো যাবতীয় উপযোগী বস্তু। আর সেসব শিকারী প্রাণী হতে প্রশিক্ষিত পশু হিসাবে যেগুলোকে তোমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছ, তোমরা তাদেরকে প্রশিক্ষণ দাও তা হতে যা আল্লাহ তোমাদেরকে শিখিয়েছেন। সুতরাং তোমরা সেসব থেকে আহার করো যেগুলো তারা তোমাদের জন্য ধরে এনেছে। এবং তোমরা তাতে আল্লাহর নাম স্মরণ করবে। আর আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে দ্রুত (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৪)
১. কুকুর কি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত?-আয়াতটির আলোকে:
এই আয়াতে ব্যবহৃত আরবী শব্দটি হলো "মুকাল্লিবীন" (مُكَلِّبِينَ)। এই শব্দটি আরবী মূল শব্দ "কালব" (كَلْب) থেকে উদ্ভূত, যার সরাসরি অর্থ হলো "কুকুর"। যদিও শব্দটি সাধারণভাবে যেকোনো শিকারী প্রাণীকে বোঝাতে পারে, এর শাব্দিক মূল কুকুরের সাথে সম্পৃক্ত। এটি নির্দেশ করে যে, তৎকালীন আরবে এবং কোরআনের বিধান অনুযায়ী, কুকুরই ছিল প্রধান শিকারী প্রাণী যাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। সুতরাং, কোরআনের এই আয়াতটি সরাসরি শিকারী কুকুরের বৈধতা দেয়।
২. কুকুর কি অপবিত্র? - কোরআন কী বলে?
এর উত্তরটি বুঝতে হলে কোরআনের বিধান এবং প্রায়োগিক বিধানের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।
আল-কোরআন কুকুরকে 'অপবিত্র' বলেনি: আল-কোরআনের একটি আয়াতেও কুকুরকে 'অপবিত্র' বা 'নাপাক' বলা হয়নি। বরং, সূরা কাহাফে কুকুরকে ঈমানদারদের সঙ্গী ও পাহারাদার হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং সূরা মায়িদাহে এর উপযোগিতাকে স্বীকৃতি দিয়ে তার শিকারকে হালাল করা হয়েছে।
আল-কোরআন অপ্রয়োজনে গৃহে পালনে নিষেধ করেনি: একইভাবে, কোরআনের কোনো আয়াতে কুকুরকে অপ্রয়োজনে বা শখের বশে গৃহে পালনে সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়নি।
তাহলে সমস্যাটি কোথায়?
সমস্যাটি কোরআনের আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং এটি বিধানের প্রায়োগিক ক্ষেত্র নিয়ে। সূরা মায়িদাহের আয়াতটি কুকুরের একটি নির্দিষ্ট "ফাংশন" বা "কাজ"-কে বৈধতা দিচ্ছে। আয়াতটি বলছে:
"সুতরাং তারা (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণী) যা তোমাদের জন্য ধরে আনে, তা থেকে তোমরা খাও..." (৫:৪)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, শিকারী কুকুরের মুখ লাগার কারণে শিকারটি অপবিত্র হয়ে যায় না, বরং তা হালাল ও পবিত্র থাকে। এটি কুকুরের শিকারী ভূমিকার পবিত্রতার স্বীকৃতি।
কোরআনের মূলনীতি হলো:
আল্লাহ একটি প্রাণীকে যে কাজের জন্য উপযোগিতা দিয়েছেন, সেই কাজটি যদি মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তা বৈধ। সূরা মায়িদাহের আয়াতটি এই নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এটি মানুষের প্রয়োজনে (খাদ্য সংগ্রহ) প্রাণীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তাদের সাথে একটি কার্যকরী (functional) সম্পর্ক স্থাপন করার পূর্ণ বৈধতা দেয়।
আয়াতের সমর্থনে বক্তব্য:
কোরআনের আয়াত (৫:৪) অনুযায়ী, একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরের শিকারী ভূমিকা সম্পূর্ণরূপে বৈধ এবং তার দ্বারা ধরা শিকার পবিত্র। এই আয়াতটি কুকুরের সত্তাকে "অপবিত্র" বলে না, বরং এর একটি নির্দিষ্ট কাজকে "পবিত্র" ও "বৈধ" হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
কুকুরের অপবিত্রতা এবং গৃহে পালনের যে বিধানগুলো ইসলামে প্রচলিত আছে, সেগুলো মূলত মানব রচিত হাদিসের উপর ভিত্তি করে তৈরী করা হয়েছে, যা প্রায়োগিক জীবনের বিভিন্ন দিক (যেমন: ইবাদতের স্থানের পবিত্রতা) নিয়ে আলোচনা করে।
কিন্তু শুধুমাত্র আল-কোরআনের আয়াতের দিকে তাকালে, বিষয়টি নিম্নরূপ:
- কোরআন কুকুরকে মানুষের একটি উপকারী এবং কার্যকরী সঙ্গী হিসেবে দেখে।
- শিকারের মতো প্রয়োজনে কুকুরের ব্যবহার ও প্রশিক্ষণকে কোরআন অনুমোদন করে।
সূরা মায়িদাহের ৪ নম্বর আয়াতটিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে, কুকুরের কাজ (শিকার ধরা) তার শিকারকে অপবিত্র করে না, যা এই প্রাণীটির প্রতি কোরআনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকারই ইঙ্গিত দেয়।
সুতরাং, কোরআনের আলোকে উত্থাপিত দ্বন্দ্বটির কোনো অস্তিত্ব নেই। কোরআন কুকুরের প্রায়োগিক উপযোগিতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর শিকারকে পবিত্র ঘোষণা করেছে।
৫. তবে অপচয় ও সীমা লঙ্ঘনের নিষেধাজ্ঞা:
"...এবং তোমরা আহার কর ও পান কর, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।" (সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৩১)
"নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭)
সারসংক্ষেপ (কোরআনের আয়াতের আলোকে):
সরাসরি বিধান: কোরআনে আধুনিক অর্থে "পোষা প্রাণী" পালন সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট হালাল বা হারাম বিধান দেওয়া হয়নি।নীতিগত অনুমোদন: কোরআন মানুষের উপকারের জন্য (খাদ্য, আরোহণ, পাহারা, শিকার) প্রাণী পালন ও ব্যবহারকে অনুমোদন করে।দায়িত্বশীলতা: প্রাণীরা আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষের মতো তারাও এক একটি জাতি। তাদের প্রতি যত্নশীল ও দায়িত্ববান হওয়া মানুষের কর্তব্য।সীমা রক্ষা: প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে অপচয়, বিলাসিতা এবং এমন কোনো বাড়াবাড়ি করা যাবে না যা আল্লাহর দেওয়া সীমা লঙ্ঘন করে।
━━━༻❁༺━━━
আকাশ ও যমিনের সৃষ্টি দেখে যে দোয়া-তাসবিহ পাঠ করতে হবে: কোরআনের নির্দেশনা
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَجَعَلَ الظُّلُمَاتِ وَالنُّورَ
সুতরাং, যখনই কোনো ব্যক্তি আকাশ ও পৃথিবীর কোনো নিদর্শন, যেমন— রাতের আকাশে অগণিত তারকা, বিশাল বিস্তৃত নীল আকাশ, মেঘমালার চলাচল, সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত, পাহাড়, নদী ও সবুজ পৃথিবী দেখবে, তখন তার উচিত আল্লাহর এই সৃষ্টিগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করা এবং উপরে বর্ণিত দোয়া ও তাসবিহ পাঠ করা। এটি কেবল একটি দোয়া পাঠই নয়, বরং আল্লাহর প্রতি নিজের বিশ্বাস ও আনুগত্যকে নতুন করে প্রকাশ করার একটি মাধ্যম।
...ওয়াল্লাহু ইয়া'লামু ওয়া আন্তুম লা তা'লামুন
"...আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।" (আয়াত ২:২১৬, ২:২৩১, ৩:৬৬)
"সদাকাল্লাহু ওয়া রাসূলুহ" (আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছেন’) সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২২
আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!
