আহসানুল হাদীস (আল-কোরআন) অনুযায়ী, আয়াতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত বিধানাবলী (হারাম কিংবা নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ) সম্পর্কে অতিরিক্ত গভীর বা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা অনুচিত। দ্বীনি বিধান মানার ক্ষেত্রে নাযিলকৃত অহীর বাইরে অনুসন্ধান করাও নিষিদ্ধ?
হ্যাঁ, ইসলামে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত প্রশ্ন করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এর কারণ হলো, কিছু প্রশ্ন নতুন বিধান নিয়ে আসতে পারে যা মানুষের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়, অথবা এমন বিষয় উন্মোচন করতে পারে যা মানুষের জন্য কল্যাণকর নয়।
✨ আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ, তা চান এবং যা কষ্টকর, তা চান না-সূরা বাকারার ১৮৫
আয়াত অনুধাবন:
১. কোরআনের স্পষ্ট বিধান: যা হারাম বা নিষিদ্ধ, তা নিয়ে অতিরিক্ত প্রশ্ন করা উচিত নয়। এর অর্থ হলো, যখন কোনো বিষয় কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, তখন তার কারণ বা গভীরে গিয়ে প্রশ্ন করে বিষয়টিকে জটিল করার প্রয়োজন নেই। বরং তা মেনে চলাই ইবাদতের অংশ।
এর মূল কারণগুলো নিম্নরূপ:
১. কঠোরতা আরোপের ভয়: যদি কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত প্রশ্ন করা হয়, তবে তার উত্তরে হয়তো এমন বিধান দেওয়া হতে পারে যা উম্মতের জন্য কঠোরতা বয়ে আনবে। ইতিহাসে এমন ঘটনা দেখা যায় যে, লোকেরা কিছু প্রশ্ন করার কারণে এমন বিধান জারি হয়েছিল যা পরবর্তীতে তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেমন বনী ইসরাইলদের প্রশ্নমালার সমাহার ও জটিলতা দ্র: ২:৬৭-৭১, ২:২৮৬।
২. সহজীকরণ: আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য দীনকে সহজ করতে চেয়েছেন। কিছু বিষয়কে স্পষ্ট না করে তিনি আমাদের জন্য সহজতা রেখেছেন। যদি আমরা সেগুলোতে খুঁটিনাটি খুঁজতে যাই, তাহলে এই সহজতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৩. প্রয়োজনীয়তার অভাব: যেসব বিষয় আল্লাহ আমাদের জন্য প্রকাশ করেননি, সাধারণত সেগুলো আমাদের বাস্তব জীবন পরিচালনার জন্য অপরিহার্য নয়। আমাদের যতটুকু জ্ঞান প্রয়োজন, ততটুকু কোরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে।
৪. বিভ্রান্তি সৃষ্টি: অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন বা বিতর্কের ফলে সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে এবং মানুষ মূল ইবাদত ও বিধান থেকে বিচ্যুত হতে পারে।
৫. আল্লাহর প্রজ্ঞা: আল্লাহর প্রজ্ঞা সীমাহীন। তিনি জানেন কী মানুষের জন্য কল্যাণকর এবং কী ক্ষতিকর। তাই তিনি যা গোপন রেখেছেন, তা অবশ্যই আমাদের ভালোর জন্যই।
সুতরাং, আল-কোরআনে স্পষ্টভাবে হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে এবং যেগুলোতে আল্লাহ নীরবতা পালন করেছেন, সেগুলোতে অতিরিক্ত প্রশ্ন না করে আল্লাহর উপর ভরসা রাখা উচিত। এই নীতি মুসলিম উম্মাহর জন্য সহজতা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করে।
বনী ইসরাইলদের বেশি প্রশ্ন করার কারণে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার একটি বিখ্যাত ঘটনা সূরা বাকারার ৬৭ থেকে ৭১ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি হলো গরুর কোরবানি সংক্রান্ত।
এখানে ঘটনাটির সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
তবে, তারা প্রশ্ন করতে শুরু করে: (দ্র: আয়াত ২:৬৭-৭১)
অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন বা চিন্তা মনের মধ্যে আসা এবং তা থেকে মুক্তি পাওয়া মানবমনের একটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ। আল-কোরআনের আলোকে এর চমৎকার সমাধান রয়েছে। নাযিলকৃত অহীর (কুরআন) অনুশীলনে সারাক্ষণ লেগে থেকে সুগভীর জ্ঞান অর্জন করাই এই সমস্যা থেকে মুক্তির অন্যতম প্রধান পথ।
"তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন, যার কিছু আয়াত সুস্পষ্ট (মুহকামাত), সেগুলোই কিতাবের মূল। আর কিছু আয়াত রূপক (মুতাশাবিহাত)। যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে, তারা ফিতনা সৃষ্টি এবং এর (মুতাশাবিহাত) ব্যাখ্যা অনুসন্ধানের জন্য রূপক আয়াতগুলোর অনুসরণ করে। অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর (وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ) তারা বলে, ‘আমরা এতে ঈমান আনলাম, এর সবকিছুই আমাদের রবের নিকট থেকে এসেছে।’ আর বুদ্ধিমানগণ ছাড়া কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।" (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৭)
(هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُّحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَ
যারা জ্ঞানে সুগভীর (وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ): এই আয়াতের মূল অংশটি আপনার প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত। 'রাসিখুন ফিল ইলম' বলতে তাদের বোঝানো হয় যারা ইলম বা জ্ঞানে অত্যন্ত গভীরতা লাভ করেছেন, অর্থাৎ সুগভীর জ্ঞানী। তাদের বৈশিষ্ট্য হলো:
তারা মুতাশাবিহাত আয়াতগুলোর চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কে জড়ায় না, বরং এর জ্ঞান আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়।
তারা দৃঢ় ঈমানের অধিকারী এবং বলে যে, কুরআনের সব আয়াত—সেগুলো সুস্পষ্ট হোক বা রূপক হোক—সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। তারা সব কিছুতেই আল্লাহর প্রজ্ঞা ও উদ্দেশ্য খুঁজে পায়।
তারা জানে যে, কিছু বিষয় মানুষের সীমিত জ্ঞান দ্বারা পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
এ আয়াতটি এটাই নির্দেশ করে যে, কুরআনের গভীর ও জটিল বিষয় অনুধাবনের জন্য কেবল সুগভীর জ্ঞানী ব্যক্তিরাই সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন এবং তাদের পক্ষেই কুরআনের প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করা সম্ভব। তারা ফিতনা সৃষ্টিকারীদের মতো অযথা বিতর্কে না জড়িয়ে, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখেন। এটি বস্তুত কুরআনের সকল বিষয় সঠিকভাবে বোঝার জন্য গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার গুরুত্ব তুলে ধরে।
এই আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন করছেন যে, মানুষ কেন কুরআন নিয়ে تدبر (তাদাব্বুর) বা গভীর চিন্তা করে না। 'তাদাব্বুর' মানে শুধু পড়া বা বোঝা নয়, বরং এর গভীর অর্থ, উদ্দেশ্য, উপদেশ এবং বার্তা নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করা, যাতে হৃদয়ে তার প্রভাব পড়ে।


