••┈┈┈••✦••┈┈┈┈┈••
৬টি হাদিস গ্রন্থের (কুতুবুস সিত্তাহ) সংগ্রাহক/ লেখকদের পরিচিতি:
১. সহীহ বুখারী (Sahih al-Bukhari):
২. সহীহ মুসলিম (Sahih Muslim):
৩. সুনানে আবু দাউদ (Sunan Abi Dawud):
মাতৃভাষা: ফার্সি (পার্সিয়ান) অথবা আরবি। সিজিস্তান (বর্তমান আফগানিস্তান ও ইরানের সীমান্ত অঞ্চল) ছিল বহুভাষিক অঞ্চল, তবে আরবি ছিল শিক্ষার প্রধান ভাষা।
জন্মভূমি (দেশ): সিজিস্তান (তৎকালীন খোরাসান, বর্তমান আফগানিস্তান-ইরান সীমান্ত)।
৪. সুনানে তিরমিযী (Jami' al-Tirmidhi / Sunan al-Tirmidhi):
মাতৃভাষা: ফার্সি (পার্সিয়ান)। তিরমিয (বর্তমান উজবেকিস্তান) একটি ফার্সিভাষী অঞ্চল ছিল।
জন্মভূমি (দেশ): তিরমিয (তৎকালীন খোরাসান, বর্তমান উজবেকিস্তান)।
৫. সুনানে নাসায়ী (Sunan an-Nasa'i):
মাতৃভাষা: ফার্সি (পার্সিয়ান)। নাসা (বর্তমান তুর্কমেনিস্তান) একটি ফার্সিভাষী অঞ্চল ছিল।
জন্মভূমি (দেশ): নাসা (তৎকালীন খোরাসান, বর্তমান তুর্কমেনিস্তান)।
৬. সুনানে ইবনে মাজাহ (Sunan Ibn Majah):
মাতৃভাষা: ফার্সি (পার্সিয়ান)। কাজভীন (বর্তমান ইরান) একটি ফার্সিভাষী অঞ্চল ছিল।
জন্মভূমি (দেশ): কাজভীন (তৎকালীন পারস্য, বর্তমান ইরান)।
—═◎═— ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ —═◎═—
👉 একমাত্র আল-কোরআনের বিধান বা হুকুমের সাথে কোন বিধান যুক্ত করা কিংবা শিরক করা যাবে না-
আল্লাহর ইবাদতে কোন কিছু শিরক করা বা যুক্ত করা (যার প্রমাণ আল্লাহ নাযিল করেননি) যাবে না-
—═◎═— ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ —═◎═—
একটিমাত্র নাযিলকৃত কিতাব (আল-কুরআন) অনুসরণ করতে বলা হয়েছে:
"তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ কর এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবককে অনুসরণ করো না। তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ কর।" (সূরা আল-আ'রাফ, ৭:৩)
অন্য কোনো উৎস অনুসন্ধান না করা:
আর তুমি সেই কিতাবকে মজবুতভাবে ধরো যা তোমার প্রতি ওহী করা হয়েছে; নিশ্চয় তুমি সরল পথের উপর আছ।
—═◎═— ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ —═◎═—
আল-কোরআনে নতুন কিছু উদ্ভাবন, যোগকরা, বাড়াবাড়ি বা মনগড়া কথা বলার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা:
ইসলামের একমাত্র ভিত্তি হলো
আল-কোরআন, যা আল্লাহ
তা'আলার পক্ষ থেকে
নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উপর
অবতীর্ণ সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ আসমানী
কিতাব। মুসলিম উম্মাহর
মধ্যে আল-কোরআনের পাশাপাশি
হাদিসের স্থান নিয়ে ঐতিহাসিক
এবং আধুনিককালেও বিভিন্ন আলোচনা ও বিতর্ক
বিদ্যমান। বিশেষত, আল-কোরআনে যখন নতুন
কিছু উদ্ভাবন বা আল্লাহর আয়াতের সাথে অন্য কিছু মিশ্রিত
করার বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা
রয়েছে, তখন কেন হাদিস
সংকলনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল এবং
কোরআনের পাঠ্যের বাইরে হাদিস সংগ্রহের
ক্ষেত্রে কোরআন নিজেই কী
ধরনের নির্দেশনা দেয়, তা অনুধাবন
করা জরুরি। এই
প্রবন্ধে আমরা প্রচলিত ধারণা
উপেক্ষা করে, কেবলমাত্র কোরআনের
আয়াতগুলোর আলোকে এই বিষয়গুলো
গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব এবং কোরআনের
বিকল্প গ্রন্থ আবিষ্কারের ভয়াবহতা
নিয়ে আলোকপাত করব।
—═◎═— ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ —═◎═—
আল-কোরআন নিজেকে পূর্ণাঙ্গ এবং সুস্পষ্ট কিতাব হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটি দাবি করে যে মানুষের হেদায়েতের জন্য প্রয়োজনীয় সকল মৌলিক দিক এতে সন্নিবেশিত হয়েছে। কোরআন সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করে যে, কেউ যেন আল্লাহর কিতাবের সাথে নতুন কিছু যুক্ত না করে বা বিকৃত না করে। আপনার উল্লেখিত এবং পূর্বের আয়াতগুলো এই কঠোরতারই প্রতিফলন:
1. সূরা বাকারা (২:১৭৪): "নিশ্চয় যারা আল্লাহর নাযিল করা কিতাবের কোনো কিছু গোপন করে এবং তার বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করে, তারা তাদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই খায় না। আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের পবিত্রও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।"
অনুধাবন: এই আয়াতটি আল্লাহর কিতাবকে বিকৃত করা বা তার অংশবিশেষ গোপন করার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট সতর্কতা। এটি ঐশী বাণীকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়।
2. সূরা বাকারা (২:৭৯): "সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্য, যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে, তারপর বলে, এটা আল্লাহর নিকট থেকে এসেছে, যাতে তারা এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্য, তাদের হাতের লেখার কারণে এবং ধ্বংস তাদের জন্য, যা তারা উপার্জন করে।"
অনুধাবন: এই আয়াতটি আরও সরাসরিভাবে সেইসব ব্যক্তিদের নিন্দা করে যারা নিজেদের মনগড়া কথাকে ঐশী কিতাবের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে। এটি ধর্মকে ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে এক চরম সতর্কতা।
3. সূরা আল-হাক্কাহ (69:৪৩-৪৭):
জগতসমূহের রবের পক্ষ থেকে অবতরণ। আর যদি সে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু কথা বানিয়ে বলত; অবশ্যই আমরা তাকে ডানহাতে ধরতাম। এরপর তার থেকে হৃদপিণ্ডের প্রধান ধমনী অবশ্যই কেটে দিতাম। তখন তোমাদের মধ্য থেকে তার ক্ষেত্রে রক্ষাকারী কেউই নেই। আর নিশ্চয় মুত্তাকীদের জন্য সেটা নিশ্চিত উপদেশবাণী।
অনুধাবন: এই আয়াতগুলো বিশেষভাবে নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-কেও সতর্ক করে যে, যদি তিনি আল্লাহর নামে কোনো মিথ্যা কথা রচনা করতেন, তাহলে আল্লাহ নিজেই তাকে কঠোর শাস্তি দিতেন। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহর নামে সামান্যতম মিথ্যাচার বা নিজের কথাকে আল্লাহর বাণী হিসেবে প্রচার করার কোনো সুযোগ নেই, এমনকি নবীর জন্যও। এটি কোরআনের বাইরে অন্য কোনো উৎসের বৈধতাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে, যদি তা আল্লাহর বাণীর সমতুল্য বা ধর্মের অংশ হিসেবে দাবি করা হয়।
4. সূরা বনী ইসরাঈল (১৭:৭৩-৭৫):
"আর তারা তো তোমাকে প্রায় ফিতনায় ফেলে দিয়েছিল যা আমি তোমার প্রতি ওহী করেছি, যাতে তুমি আমার উপর তার বিপরীত কিছু আরোপ কর। আর তখন তারা তোমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত। আর যদি আমি তোমাকে সুদৃঢ় না রাখতাম, তবে তুমি তাদের প্রতি কিছুটা ঝুঁকেই পড়তে। তাহলে আমি অবশ্যই তোমাকে জীবনের দ্বিগুণ ও মৃত্যুর দ্বিগুণ শাস্তি দিতাম, অতঃপর তুমি আমার বিরুদ্ধে কোনো সাহায্যকারী পেতে না।
অনুধাবন: এই আয়াতগুলো আবার নবীর উপর আল্লাহর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং ওহীর ব্যাপারে সামান্যতম বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সতর্কবাণী। এটি নবীর ব্যক্তিগত মতামত বা প্রবণতাকে ওহীর সাথে মিশিয়ে ফেলার যেকোনো সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দেয়। এটি নির্দেশ করে যে, এমনকি নবী (সাঃ)-এর কথা ও কাজও ওহীর নির্দেশনার অধীন ছিল এবং তিনি নিজে ওহীর বাইরে গিয়ে ধর্মীয় কোনো নতুনত্ব তৈরি করার ক্ষমতা রাখেননি।
5. সূরা জিন (৭২:২২): বলো, নিশ্চয় আমি আল্লাহ ছাড়া আর কারো কোনো ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখি না।
অনুধাবন: এই আয়াতটি নবীর নিজস্ব ক্ষমতা ও মর্যাদাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। তিনি আল্লাহর একজন বান্দা এবং রাসূল, যিনি কেবল আল্লাহর বাণী প্রচার করেন। তিনি নিজে আল্লাহর শরীয়তে কোনো পরিবর্তন বা সংযোজন করার মালিক নন। এটি নবীর ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতাকে পরিষ্কার করে এবং তিনি যে কোরআনের বাইরে গিয়ে ধর্মের নামে নতুন কিছু উদ্ভাবন করেননি, তা নিশ্চিত করে।
—═◎═— ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ —═◎═—
কোরআনের পাঠ্যের বাইরে হাদিস সংগ্রহে কোরআনের কঠোরতা:
কোরআনের নিজস্ব উপস্থাপনা থেকে বোঝা যায় যে, এটিই মানবজাতির জন্য পর্যাপ্ত হেদায়েত। যখন কোরআন নিজেকে "সর্বাধিক সুস্পষ্ট" (৬:১১৫), "প্রত্যেক বস্তুর স্পষ্ট বর্ণনা" (১৬:৮৯), এবং "হেদায়েত ও রহমত" (৬:১৫৭) হিসেবে দাবি করে, তখন এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, এর বাইরে অন্য কোনো উৎসের প্রয়োজন আছে কিনা।
পূর্ণাঙ্গ কিতাবের ধারণা:
সূরা আন'আম (৬:৩৮): "আমি কিতাবে কোন কিছুই বাদ দেইনি।"সূরা আন'আম (৬:১১৫): "আর তোমার রবের বাণী সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার দিক থেকে পরিপূর্ণ। তার বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই।"
সূরা ইউনুস (১০:৩৭): "আর এই কোরআন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দ্বারা রচিত হওয়া সম্ভব নয়। বরং এটি এর পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়ন এবং কিতাবের বিশদ ব্যাখ্যা, এতে কোন সন্দেহ নেই, (এটি) জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে।"
সূরা নাহল (১৬:৮৯): "...এবং প্রত্যেক বস্তুর স্পষ্ট বর্ণনা।"
অনুধাবন: এই আয়াতগুলো দৃঢ়ভাবে নির্দেশ করে যে, কোরআন নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ, বিস্তারিত এবং অপরিবর্তনীয় গ্রন্থ। যদি কোরআন নিজেকে 'কোন কিছুই বাদ না দেওয়া' এবং 'প্রত্যেক বস্তুর স্পষ্ট বর্ণনা' হিসেবে দাবি করে, তাহলে এর বাইরের কোনো উৎসকে সমমর্যাদার বা অপরিহার্য হিসেবে দেখা কোরআনের নিজস্ব দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
—═◎═— ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ —═◎═—
🕊 আল্লাহর ওহী অনুসরণ এবং অন্যকে ত্যাগ:
সূরা আন'আম (৬:৫০): "বলো, আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডারসমূহ আছে, আর আমি গায়েবও জানি না। আর আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমি একজন ফিরিশতা। আমি কেবল তাই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহী করা হয়।"
সূরা ইউনুস (১০:১০৯): "আর তুমি অনুসরণ কর যা তোমার প্রতি ওহী করা হয় এবং ধৈর্য ধারণ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ ফয়সালা করেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী।"
অনুধাবন: এই আয়াতগুলো নবীর ভূমিকাকে কেবল ওহী অনুসরণকারী হিসেবে সীমিত করে। নবী (সাঃ) নিজেই কেবল ওহী অনুসরণ করতেন, যা পরোক্ষভাবে নির্দেশ করে যে, মুসলিমদেরও কেবল ওহী (কোরআন) অনুসরণ করাই যথেষ্ট।
—═◎═— ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ —═◎═—
'হাদিস' শব্দের ব্যবহার কোরআনে:
কোরআনে 'হাদিস' শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো 'কথা' বা 'বর্ণনা'। কিছু আয়াতে এটিকে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করে কোরআন ব্যতীত অন্য কোনো 'হাদিস' (কথা/গ্রন্থ) অনুসরণ করার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে:সূরা ইউসুফ (১২:১১১): "তাদের কাহিনীসমূহে চিন্তাশীলদের জন্য অবশ্যই শিক্ষা রয়েছে। এটি মনগড়া কোনো কথা (হাদিস) নয়, বরং এটি তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়ন এবং মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য প্রত্যেক বস্তুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা, হেদায়েত ও রহমত।"
সূরা লুকমান (৩১:৬): "আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে যে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অজ্ঞতাবশত অসার কথা (লাহওয়াল হাদিস) ক্রয় করে এবং তাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তাদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।"
সূরা জাসিয়া (৪৫:৬): "এগুলি আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার কাছে সত্যসহ তেলাওয়াত করছি। অতঃপর তারা আল্লাহ ও তাঁর আয়াতসমূহের পর আর কোন কথায় (হাদিস) ঈমান আনবে?"
সূরা মুরসালাত (৭৭:৫০): "সুতরাং এর পর আর কোন কথায় (হাদিস) তারা ঈমান আনবে?"
—═◎═— ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ —═◎═—
নবীর ব্যক্তিগত কথাবার্তা (হাদিস) সংগ্রহ বা কথা শোনার ক্ষেত্রে কঠোর বার্তা:
অনুধাবন: এই আয়াতে নবীর ব্যক্তিগত জীবনে অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং তাঁর ঘরে বেশি সময় ধরে অবস্থান করে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলার বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। '(হাদিস) কথাবার্তা বলার জন্য সেখানে লেগে থেকো না' (ولا مستأنسين لحديث) – এই অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল সৌজন্যতার প্রশ্ন নয়, বরং নবীর ব্যক্তিগত পরিসরকে রক্ষা করার নির্দেশ। এটি পরোক্ষভাবে নির্দেশ করে যে, নবীর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি কথা বা আলোচনা জনসমক্ষে প্রকাশ করা বা সংরক্ষণ করা আল্লাহর অভিপ্রেত ছিল না, বরং তা নবীকে কষ্ট দিত এবং অন্তরকে অপবিত্র করতে পারত। যদি নবীর ব্যক্তিগত কথাগুলো সংরক্ষণ করা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ব্যবহার করা ধর্মের অংশ হতো, তাহলে আল্লাহ নিজেই সেগুলোকে উৎসাহিত করতেন, কিন্তু এখানে তিনি কঠোরভাবে বারণ করেছেন। এটি হাদিস সংকলনের ধারণার উপর প্রশ্ন উত্থাপন করে, বিশেষত যখন তা নবীর ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
(৬৬:৪): "যদি তোমরা উভয়ে (নবী পত্নীরা) তওবা কর, তবে তোমাদের অন্তর অবশ্যই ঝুঁকেছে; আর যদি তোমরা তার বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য কর, তবে নিশ্চয় আল্লাহই তার সাহায্যকারী, আর জিবরাঈল এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ এবং ফিরিশতাগণও এরপর তার সাহায্যকারী।"
(৬৬:৫): "যদি সে তোমাদেরকে তালাক দেয়, তবে তার রব তাকে তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী দেবেন; যারা মুসলিম, মুমিন, অনুগত, তওবাকারিনী, ইবাদতকারিনী, সাওম পালনকারিনী, কুমারী ও অকুমারী।"
অনুধাবন: এই আয়াতগুলো নবীর ব্যক্তিগত জীবনের একটি সংবেদনশীল ঘটনা প্রকাশ করে, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত গোপন কথা তাঁর স্ত্রীদের মাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়। আল্লাহ নবীর ব্যক্তিগত বিষয়গুলোকে গোপন রাখার উপর জোর দিয়েছেন এবং যারা এই গোপন বিষয়গুলো ফাঁস করেছে তাদের তিরস্কার করেছেন। 'ব্যক্তিগত কথা অন্যের সাথে চালাচালি করলে কঠোরভাবে সতর্কতা' – এই বিষয়টি এখানে অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এটি কোরআনের অফিসিয়াল আয়াতের বাইরে আল্লাহর নবীর ব্যক্তিগত কোনো কথাবার্তা (হাদিস) যাতে সংগ্রহ করা না হয় বা জনসমক্ষে প্রচার না করা হয়, সেদিকে একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত দেয়। যদি নবীর ব্যক্তিগত কথোপকথনগুলো ধর্মীয়ভাবে সংরক্ষণের যোগ্য হতো, তাহলে আল্লাহ এগুলো ফাঁস হওয়ার জন্য তাঁর স্ত্রীদের তিরস্কার করতেন না, বরং সেগুলোকে শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে উৎসাহিত করতেন। এই আয়াতগুলো আল্লাহর রাসূলের ব্যক্তিগত জীবনের পবিত্রতা এবং তাঁর কথোপকথনগুলোর অননুমোদিত প্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা হাদিস সংকলনের ক্ষেত্রে গভীর চিন্তার উদ্রেক করে।
—═◎═— ◇ ◇ ◇ ◇ ◇ —═◎═—
হাদিস
সংকলনের প্রক্রিয়া এবং কোরআনের বিকল্প গ্রন্থ আবিষ্কারের ভয়াবহতা:
আপনি যে প্রশ্নগুলো উত্থাপন
করেছেন, তা হাদিস সংকলনের
কার্যকারিতা এবং এর ধর্মীয়
প্রভাব নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন
তৈরি করে:
বিশেষ করে ৬টি প্রধান হাদিস সংগ্রহের সময়কাল থেকে দেখা যায়, এগুলো নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর ওফাতের দুইশত, আড়াইশত বা প্রায় তিনশত বছর পর সংকলিত হয়েছে। বুখারী, মুসলিম, তিরমিজি... ইত্যাদি গংরা লোকমুখে শুনে শুনে লিপিবদ্ধ করেছেন। এটা কি করে সম্ভব যে মানুষের মেমোরিতে হুবাহু নবীর কথা তারা ধারণ করে বংশ পরস্পরায় সংগ্রহ করা ও সেগুলিকে প্রকাশ করা?
কোরআনের আলোকে অনুধাবন:
'লক্ষ লক্ষ হাদিস থেকে অল্প কিছু গ্রহণ' এবং 'পরস্পর বিরোধিতা':
হাদিস সংকলকগণ লক্ষ লক্ষ হাদিস সংগ্রহ করে মাত্র অতি অল্প কিছু (৫/৬ হাজার বা তার কাছাকাছি) রেখে বাকিগুলি বাদ দিয়েছেন। আবার হাদিস সংগ্রাহক একজনেরটি অন্যজন গ্রহণ করেননি।কোরআনের আলোকে অনুধাবন: এই বিষয়টি নিজেই প্রমাণ করে যে, সংগ্রহকৃত 'হাদিস'গুলোর মধ্যে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা এবং দুর্বলতা বিদ্যমান ছিল। যদি নবীর প্রতিটি কথা ধর্মের অংশ হতো এবং তা সংরক্ষণের জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিতেন, তাহলে এই ধরনের বিশাল বর্জন এবং পরস্পর বিরোধিতা পরিলক্ষিত হতো না। আল্লাহর কিতাব সম্পূর্ণ এবং তাতে কোনো বিকৃতি নেই (৬:১১৫)। কিন্তু হাদিস গ্রন্থগুলোর সংকলন প্রক্রিয়ার এই বাস্তবতা এটাই প্রমাণ করে যে, মানবীয় প্রচেষ্টায় সংগৃহীত এই 'হাদিস'গুলো সেই একই নির্ভুলতার মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি, যা কোরআনের জন্য আল্লাহ নিশ্চিত করেছেন। যদি 'ধর্মের উৎস' হিসেবে এই 'হাদিস'গুলো গ্রহণ করা হয়, তাহলে এটি কোরআনের পূর্ণাঙ্গতার ধারণাকে খর্ব করে।
দ্বীনের নামে বিকল্প বই-পুস্তক এবং শিরকের ভয়াবহতা:
এভাবে ধর্মের নামে বিকল্প বই-পুস্তক মানুষ রচনা করে মূল নাযিলকৃত কিতাব আল-কোরআন-এর সাথে যুক্ত করে অধিকাংশ মানুষ এখন শিরকে লিপ্ত হয়ে মুশরিক হয়ে নিজেকে মুসলিম দাবী করছে।কোরআনের আলোকে অনুধাবন: কোরআন শিরকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সতর্কতা জারি করেছে। শিরক মানে আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার করা, তা উপাসনার ক্ষেত্রে হোক, বা তাঁর আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে হোক, অথবা তাঁর কিতাবের পাশাপাশি অন্য কোনো উৎসকে সমান মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে হোক।
সূরা আন'আম (৬:১৯): "বলো, কে সবচেয়ে বড় সাক্ষী? বলো, আল্লাহ! তিনি আমার ও তোমাদের মাঝে সাক্ষী। আর এই কোরআন আমার প্রতি ওহী করা হয়েছে, যেন আমি এর দ্বারা তোমাদেরকে এবং যাকে এটি পৌঁছাবে, তাকে সতর্ক করি। তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সাথে অন্যান্য উপাস্য আছে? বলো, আমি সাক্ষ্য দিই না। বলো, তিনি তো একক ইলাহ। আর নিশ্চয় আমি অংশীদার সাব্যস্তকারীদের থেকে মুক্ত।"
সূরা আল-কাহফ (১৮:২৬): "বলো, আল্লাহই ভালো জানেন তারা কতক্ষণ ছিল। আসমানসমূহ ও জমিনের গায়েব তাঁরই জ্ঞানসীমার মধ্যে। তিনি কত সুন্দর দ্রষ্টা ও কত সুন্দর শ্রোতা! তিনি ছাড়া তাদের কোনো অভিভাবক নেই। আর তিনি তাঁর শাসন ক্ষমতার (হুকুম) কাউকে অংশীদার করেন না।"
সূরা ইউনুস (১০:৬৬): "সাবধান! যারা আসমানসমূহে আছে আর যারা জমিনে আছে, তারা সবাই আল্লাহরই। আর যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অংশীদারদের ডাকে, তারা আসলে কেবল ধারণার অনুসরণ করে, আর তারা কেবল মিথ্যাই বলে।"
উপসংহার:
আল-কোরআন নিজেকে পূর্ণাঙ্গ,
বিস্তারিত এবং সুস্পষ্ট হেদায়েত
হিসেবে দাবি করে।
এটি নতুন কিছু উদ্ভাবন,
বিকৃতি বা আল্লাহর কিতাবের
সত্যকে গোপন করার বিরুদ্ধে
কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়। নবী
(সাঃ)-কেও তার নিজের
নামে বা আল্লাহর নামে
কিছু রচনা করার ক্ষেত্রে
কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে
(৭০:৪৩-৪৭, ১৭:৭৩-৭৫, ৭২:২২)। উপরন্তু,
কোরআন নবীর ব্যক্তিগত জীবন
এবং কথোপকথন সংগ্রহ ও প্রচারের
ক্ষেত্রেও (৩৩:৫৩, ৬৬:৩-৫) কঠোরতা
প্রদর্শন করেছে।
হাদিস
সংকলনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, যার মধ্যে বহু
শতাব্দীর মৌখিক বর্ণনা, লক্ষ
লক্ষ হাদিস থেকে অল্প
কিছু গ্রহণ এবং সংকলকদের
মধ্যে মতভিন্নতা অন্তর্ভুক্ত, তা কোরআনের নিজস্ব
'পূর্ণাঙ্গতা' এবং 'নির্ভুলতার' দাবির
সাথে সাংঘর্ষিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। কোরআনের এই
সুস্পষ্ট আয়াতগুলো অনুধাবন করলে, কোরআনের পাঠ্যের
বাইরে অন্য কোনো উৎসকে
সমমর্যাদার বা কোরআনের উপর
অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট
কঠোরতা ও সাবধানতা অবলম্বন
করতে হয়। কোরআনের
বিকল্প গ্রন্থ আবিষ্কার এবং
সেগুলোকে কোরআনের সাথে যুক্ত করা,
কোরআনের দৃষ্টিতে শিরকের ভয়াবহতার দিকে
পরিচালিত করতে পারে, যেখানে
মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্য
কারো 'কথা' বা 'বিধান'কে ধর্মের অবিচ্ছেদ্য
অংশ হিসেবে গ্রহণ করে।
মুসলিমদের জন্য এটি একটি গভীর আত্ম-অনুসন্ধানের বিষয় যে, তারা কীভাবে কোরআনের মৌলিক শিক্ষাকে বজায় রেখে ধর্ম পালন করবেন। প্রচলিত ধারণাকে উপেক্ষা করে কোরআনের প্রতিটি আয়াতকে গভীরভাবে অনুধাবন করা এবং তা থেকে সরাসরি হেদায়েত লাভ করার উপরই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এটিই একমাত্র পথ যা মানুষকে কোরআনের পরিপূর্ণতার উপর বিশ্বাস রাখতে এবং আল্লাহর একত্ববাদের (তাওহীদ) মূলনীতি থেকে বিচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
