নাতি-নাতনী-বংশধরদের জন্য/ Next generation-এর জন্য দুআ: আল-কুরআন অনুধ্যানে-

✋জনৈক মুমিনার প্রশ্ন: আমি দাদী হতে চলেছি। এখন আমি কি দোয়া পড়বো?  

👉 কোরআনে 'জুররিয়্যাতিনা' (ذُرِّيَّاتِنَا) শব্দটি প্রায়শই ব্যবহার করা হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থ হল 'আমাদের বংশধর'। এই শব্দটি ব্যাপক অর্থ বহন করে এবং এটি কেবল সরাসরি সন্তান-সন্ততিকেই নয়, বরং নাতি-নাতনী এবং তারও পরের প্রজন্মকে অন্তর্ভুক্ত করে। কোরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে, বংশধরদের মধ্যে একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা রয়েছে, যেখানে পূর্ববর্তী প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মের উৎস।  ডিএনএ-এর সিকোয়েন্সের ধারণার সাথে মিলিয়ে দেখলে, এটি বোঝায় যে বংশের প্রতিটি সদস্য তার পূর্বপুরুষদের জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করে, যা তাদের একীভূত করে।

সূরা আল-বাকারা (২:১২৪):

وَإِذِ ابْتَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ ۖ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا ۖ قَالَ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۖ قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ

"যখন ইব্রাহীমকে তার প্রতিপালক কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করলেন এবং সে তা পূর্ণ করল, তখন তিনি বললেন, 'আমি তোমাকে মানবজাতির জন্য নেতা বানাব।' সে বলল, 'আর আমার বংশধরদের (ধুররিয়্যাতি) মধ্য থেকে?' তিনি বললেন, 'আমার প্রতিশ্রুতি জালিমদের জন্য নয়'।"

এই আয়াতে সালামুন আলা ইব্রাহীম তার বংশধরদের জন্য নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন। এখানেও 'ধুররিয়্যাত' শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা তার সরাসরি সন্তানদের ছাড়িয়ে তার পরবর্তী প্রজন্মকেও অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহ তায়ালা অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে এই নেতৃত্ব জালিমদের জন্য নয়, যা বংশগত অধিকারের পাশাপাশি নৈতিক গুণাবলীর গুরুত্ব তুলে ধরে।

এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে কোরআনে 'জুররিয়্যাতিনা' শব্দটি একটি বিস্তৃত ধারণা, যা ডিএনএ-এর সিকোয়েন্সের মতো একটি অবিচ্ছিন্ন বংশগত ধারাকে ইঙ্গিত করে। যদিও নাতি-নাতনীরা সরাসরি পেট বা ঔরসজাত নয়, তবুও তারা পূর্বপুরুষদেরই রক্ত ও গুণের বাহক এবং এই অর্থে তারা তাদেরই বংশধর।

দুআ ভিডিও/অডিও নিচের দিকে দ্র:

দুআ:

رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ 

رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ 

রব্বানা ওয়াজ‘আলনা মুসলিমাইনি লাকা, ওয়ামিন যুররিয়্যাতিনা উম্মাতান মুসলিমাতাল্লাক, ওয়াআরিনা মানাসিকানা, ওয়াতুব ‘আলাইনা, ইন্নাকা আন্তাত্তাওয়্বাবুর রাহীম।

রব্বানা ওয়াব‘আস ফীহিম রাসূলাম মিনহুম, ইয়াতলূ ‘আলাইহিম আয়াতিকা, ওয়িউ‘আল্লিমুহুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাহ, ওয়ুযাক্কীহিম, ইন্নাকা আনতাল আজীযুল হাকীম।

অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদেরকে আপনার অনুগত মুসলিম/আত্মসমর্পণকারী করুন এবং আমাদের বংশধরের মধ্য থেকে আপনার অনুগত মুসলিম/আত্মসমর্পণকারী উম্মত/জাতি বানান। আর আমাদের পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের  তাওবা কবুল করুন।নিশ্চয় আপনি তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু’।   [পদ্ধতি:- [2: 21,152,183,186, 286; 42:26]

‘হে আমাদের রব, তাদের মধ্যে তাদের থেকে একজন রাসূল পাঠান, যে তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে আর তাদেরকে যাকাত/পরিশুদ্ধ পবিত্র করবে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’। 

[হিকমত= 2:129, 151,231,251, 269; 3:48,81164; 4:54,113; 5:110; 16:125; 17:39; 31:12; 33:34; 38:20; 43:63; 54:5;57:25; 62:2 ] [১৩০-১৪১: ইবরাহিমের মিল্লাতের অনুসরণ]- আল কুরআন ২:১২৮, ২:১২৯ 

͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙‧ ͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙͙

🤲 আল-কোরআনে এই ধারণার সমর্থন নিম্নলিখিত আয়াতসমূহে দুআ পাওয়া যায়:

১. সূরা আল-ফুরকান (২৫:৭৪):

وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
রব্বানা-হাব্লানা-মিন্ আয্ওয়া-জ্বিনা-অর্যুরিয়্যা-তিনা-র্ক্বুরতা আ’ইয়ুনিঁও অজ্ব্‘আল্না-লিলমুত্তাকীনা ইমা-মা- 

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের দাম্পত্যসাথীদের ও আমাদের প্রজন্মের  (ধুররিয়্যাতিনা)  মধ্য থেকে আমাদের জন্যে চক্ষুসমূহ শীতলকারী দান করুন। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে ইমাম বানিয়ে দিন- কুরআনুল কারীম ২৫:৭৪ 

এখানে 'ধুররিয়্যাতিনা' শব্দটির মাধ্যমে কেবল সরাসরি সন্তান-সন্ততিকে বোঝানো হয়নি, বরং এমন প্রজন্মকে বোঝানো হয়েছে যা তাদের (দোয়াকারীদের) চোখের শীতলতা বয়ে আনবে, যা নাতি-নাতনীদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করে। একটি সৎ ও ধার্মিক বংশধর, সে সরাসরি সন্তানই হোক বা নাতি-নাতনী, সবই পিতামাতার জন্য আনন্দের উৎস।

২. সূরা ইব্রাহীম (১৪:৪০-৪১):

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
রব্বিজ্‘আল্নী মুক্বীমাছ্ ছলা-তি ওয়া মিন র্যুরিইয়াতি, রব্বানা- ওয়া তাক্বাব্বাল্ দু‘আ-, রব্বানা-র্গ্ফিলী ওয়া লিওয়া-লিদাইয়া ওয়া লিলমু’মিনীনা ইয়াওমা ইয়াক্বূমুল হিসা-ব।  

অর্থ: হে আমার রব!  আমাকে ও আমার বংশধরদের মধ্য থেকে সলাত কায়েমকারী (অহীর অনুশীলনীর সংযোগ স্থাপনকারী) বানান। হে আমাদের রব! আর আপনি আমার দুআ কবুল করুন। হে আমাদের রব! যেদিন হিসাব অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন আমাকে  ও  আমার পিতা-মাতাকে ও মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দিন!- আল কুরআন ১৪:৪০-৪১

এখানে সালামুন আলা ইব্রাহীম তার 'ধুররিয়্যাত' বা বংশধরদের জন্য দোয়া করেছেন যাতে তারাও সালাত কায়েমকারী হয়। এই দোয়াটি শুধুমাত্র তার নিজের সন্তানদের জন্য নয়, বরং তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সকল সদস্যের জন্য, যা নাতি-নাতনীদেরও অন্তর্ভুক্ত করে। বংশের এই ধারাবাহিকতা বোঝায় যে ধার্মিকতা এবং কল্যাণ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হোক।

رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي ۖ إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
রব্বি আওযি’নী- আন্ আশ্কুরা নি’মাতাকাল্লাতী- আন্‘আম্তা ‘আলাইয়্যা অ‘আলা-ওয়া-লিদাইয়্যা অআন্ ‘আমালা ছোয়া-লিহান র্তাদ্বোয়া-হু অআছ্লিহ্ লী ফী র্যুরিয়্যাতী; ইন্নী তুব্তু ইলাইকা অইন্নী মিনাল্ মুস্লি­মীন্।   

অর্থ:  হে আমার রব!  আপনি আমাকে আপনার সে নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের যোগ্যতা দিন, যে নিয়ামত আপনি আমার প্রতি ও আমার পিতামাতার প্রতি দিয়েছেন এবং আমলে সলেহ করার, যা আপনি পছন্দ করেন। আর আপনি আমার জন্য আমার প্রজন্মেকে পরিশুদ্ধ করুন। নিশ্চয়ই আমি আপনার কাছে তাওবা করলাম। আর নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত-আল কুরআন ৪৬:১৫

সালামুন আলা ঈসা ইবনে মারিয়ামের এর জন্য তাঁর নানীর দুআ:

إِنِّىٓ أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ ٱلشَّيْطَٰنِ ٱلرَّجِيمِ
ইন্নী- উ‘ঈযুহা-বিকা অর্যুরিয়্যাতাহা-মিনাশ্ শাইত্বোয়া-র্নি রাজ্বীম্।  
আর আমি তাকে ও তার সন্তান‑সন্ততিকে অভিশপ্ত শয়তানের প্রভাব থেকে (রক্ষার জন্য) তোমার হেফাজতে দিচ্ছি”- আল কুরআন ৩:৩৬।

وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا
অজ্ব‘আল্হু রব্বি রদ্বিয়্যা-।  
অর্থ: হে আমার রব! আপনি তাকে সন্তোষভাজন ব্যক্তি বানিয়ে দিন!- আল কুরআন ১৯:৬

رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ  وَاجْعَل لِّي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ  وَاجْعَلْنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ
রব্বি হাব্লী হুক্মাঁও অআল্হিক্নী বিছ্ছা-লিহীন্। অজ্ব ‘আল্লী লিসা-না ছিদ্ক্বিন্ ফিল্ আ-খিরীন্। অজ‘আল্নী মিঁও অরছাতি জ্বান্নাতিন্ না‘ঈম্।
  
অর্থ: হে আমার রব! আপনি আমার জন্য প্রজ্ঞা দান করুন। এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের সাথে (সংশোধনকারীদের সাথে) সম্পৃক্ত করুন। এবং আমাকে পরবর্তীদের (next generation) মাঝে সত্যভাষী বানান। আর আপনি আমাকে জান্নাতুন নাঈমের উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন- আল কুরআন ২৬:৮৩-৮৫ 
অনুবাদ উৎস: প্রজ্ঞাময় কুরআন, তাজকিয়ানফস.কম।

দুআ ভিডিও

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post