আল-কুরআনে ইয়াজুজ ও মাজুজ (গগ ও ম্যাগগ) সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। তাদের সম্পর্কে কোরআনের প্রধান বিষয়গুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী জাতি: সূরা কাহাফের ৯৪ নম্বর আয়াতে উখল্লে আছে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে ফ্যাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি করত।
২. জুলকারনাইনের প্রাচীর নির্মাণ: সূরা কাহাফে জুলকারনাইন (যুল-কারনাইন) নামক এক ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর কথা বলা হয়েছে। তিনি তার ভ্রমণকালে এমন এক জাতির কাছে পৌঁছেছিলেন, যারা ইয়াজুজ ও মাজুজের অত্যাচার থেকে নিজেদের রক্ষা করতে জুলকারনাইনের সাহায্য চেয়েছিল। তখন জুলকারনাইন লোহা ও গলিত তামা ব্যবহার করে একটি বিশাল প্রাচীর নির্মাণ করে ইয়াজুজ ও মাজুজকে আটকে দিয়েছিলেন।
৩. শেষ বিচারের আগে তাদের উত্থান: কোরআনে বলা হয়েছে যে, কেয়ামতের কাছাকাছি সময়ে এই প্রাচীর ভেঙে যাবে এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ আবার পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। সূরা আম্বিয়ার ৯৬ ও ৯৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, যখন ইয়াজুজ ও মাজুজের পথ খুলে দেওয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে দ্রুত ছুটে আসবে, তখন সত্য প্রতিশ্রুতি (কেয়ামত) নিকটবর্তী হবে। মানুষ হতবাক হয়ে যাবে এবং বলবে, "হায় আফসোস আমাদের! আমরা এ বিষয়ে উদাসীন ছিলাম, বরং আমরা ছিলাম সীমালঙ্ঘনকারী।"
ইয়াজুজ ও মাজুজ (গগ ও ম্যাগগ) সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের প্রাসঙ্গিক আয়াতগুলি উল্লেখ করা হলো:
১. সূরা কাহফ (১৮:৯৩-৯৮)
এই আয়াতগুলিতে জুলকারনাইন (যুল-কারনাইন) নামের একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশার কথা বলা হয়েছে, যিনি ইয়াজুজ ও মাজুজের ফেতনা থেকে মানবজাতিকে রক্ষার জন্য একটি প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন।
➤ ১৮:৯৩: "অবশেষে যখন তিনি দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছলেন, তখন সেখানে এমন এক জাতিকে পেলেন যারা কোনো কথা প্রায় বোঝে না।"
➤ ১৮:৯৪: "তারা বলল, 'হে যুল-কারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে বড়ই অরাজকতা সৃষ্টি করছে। আমরা কি আপনাকে এর বিনিময়ে কিছু খরচ দেব যে, আপনি আমাদের ও তাদের মাঝে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন?'"
অনুধাবন: এই আয়াতে স্পষ্টভাবে ইয়াজুজ ও মাজুজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের অরাজকতা সৃষ্টির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। জনগণ তাদের থেকে বাঁচার জন্য জুলকারনাইনের কাছে সাহায্য চেয়েছিল।
➤ ১৮:৯৫: "তিনি বললেন, 'আমার রব আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শক্তি দিয়ে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মাঝে এক সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেবো।"
➤ ১৮:৯৬: "তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও।' অবশেষে যখন তিনি দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে দিলেন, তখন বললেন, 'তোমরা হাঁপর দাও।' যখন তা আগুনে পরিণত হলো, তখন বললেন, 'তোমরা আমাকে গলিত তামা এনে দাও, আমি তা এর উপর ঢেলে দেবো।"
➤ ১৮:৯৮: "তিনি বললেন, 'এটা আমার রবের অনুগ্রহ। অতঃপর যখন আমার রবের ওয়াদা পূর্ণ হবে, তখন তিনি এটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন। আর আমার রবের ওয়াদা অবশ্যই সত্য।"
অনুধাবন: এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, কেয়ামতের কাছাকাছি সময়ে যখন আল্লাহর ওয়াদা পূর্ণ হবে, তখন এই প্রাচীর ভেঙে যাবে এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ বের হয়ে আসবে।
২. সূরা আম্বিয়া (২১:৯৬-৯৭)
এই আয়াতগুলিতে ইয়াজুজ ও মাজুজের বের হওয়ার বিষয়টি কেয়ামতের অন্যতম বড় আলামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
➤ ২১:৯৬: "এমনকি যখন ইয়াজুজ ও মাজুজকে ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে দ্রুত নেমে আসবে।"
অনুধাবন: এই আয়াতে তাদের দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। 'প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে নেমে আসা' (من كل حدب ينسلون) বাক্যটি তাদের বিপুল সংখ্যা এবং দ্রুত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।
➤ ২১:৯৭: "এবং যখন সত্য ওয়াদা (কেয়ামত) নিকটবর্তী হবে, তখন কাফেরদের চোখ স্থির হয়ে যাবে (তারা বলবে), 'হায় আফসোস আমাদের! আমরা এ বিষয়ে গাফেল ছিলাম, বরং আমরা ছিলাম জালিম।"
অনুধাবন: ইয়াজুজ ও মাজুজের বের হওয়া কেয়ামতের খুব নিকটবর্তী সময়ে ঘটবে, যখন মানুষ তাদের কৃতকর্মের জন্য আফসোস করবে।
সংক্ষিপ্ত সার:
আল-কুরআনে ইয়াজুজ ও মাজুজকে পৃথিবীতে অরাজকতা সৃষ্টিকারী এক জাতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাদের থেকে মানবজাতিকে রক্ষার জন্য জুলকারনাইন একটি লোহার ও তামার প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। তবে এই প্রাচীর সাময়িক এবং কেয়ামতের কাছাকাছি সময়ে আল্লাহর ইচ্ছায় এটি ভেঙে যাবে এবং তারা পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, যা কেয়ামতের অন্যতম একটি বড় আলামত।
আল-কোরআনে ইয়াজুজ ও মাজুজের শারীরিক বর্ণনা বা তাদের সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত আর তেমন কিছু বলা হয়নি। এই সম্পর্কে এর চেয়ে বেশীকিছু আমাদের হয়তো জানার প্রয়োজন নেই বিধায়।
আল্লাহু আ’লামু (আল্লাহই অধিক জ্ঞাত)-৬:১২৪
আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!