সৃষ্টির উদ্দেশ্য:
✨ "আমি জিন ও মানবকে কেবল আমার ইবাদতের (দাসত্বের) জন্যই সৃষ্টি করেছি।" (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)
📢 মানুষকে একমাত্র রবের ইবাদত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (২:২১, ৪০:৬২, ২৯:১৭, ১৭:২৩)।
সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণ: এই মহৎ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বান্দা একমাত্র তাঁরই কাছে ইবাদত করার সংকল্প করে থাকে (আল-ফাতিহা, ১:৫)।
তাহলে আমাদের জানা উচিত ’ইবাদত’ কি বা কাকে বলে?
ইবাদত কী? ইবাদত কাকে বলে?
"ইবাদত" (عبادة) একটি আরবি শব্দ, যা মূলত 'আবদ' (عَبْد) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ 'দাস'। তাই আভিধানিকভাবে 'ইবাদত' মানে হলো দাসত্ব করা, বশ্যতা স্বীকার করা, বা আনুগত্য প্রকাশ করা। ইসলামী পরিভাষায়, ইবাদত হলো একমাত্র আল্লাহ তায়ালার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, বশ্যতা ও দাসত্ব প্রকাশ করা এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে তাঁর সার্বভৌমত্বকে মেনে নেওয়া।
কুরআনের আলোকে 'আবদ' বা 'ইবাদাহ' শব্দের প্রয়োগ:
নিম্নোক্ত আয়াত দুটি 'আবদ' বা 'ইবাদাহ' শব্দগুলোর প্রয়োগের মাধ্যমে দাসত্ব, আনুগত্য বা বশ্যতার ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে তো এবং উক্ত আয়াত অনুধাবনে ইবাদত বা ইবাদতকারী বলতে কি বুঝায় তা সহজেই বুঝে আসে:
১. সূরা আল-মুমিনুন (২৩): আয়াত ৪৭
"فَقَالُوا أَنُؤْمْمِنُ لِبَشَرَيْنِ مِثْلِنَا وَقَوْمُهُمَا لَنَا عَابِدُونَ"
"তখন তারা বলল, 'আমরা কি এমন দু'জন মানুষের উপর ঈমান আনব, যারা আমাদেরই মতো? অথচ তাদের কওম আমাদের দাসত্বকারী (আবিদুন)।'"
এখানে 'عَابِدُونَ' (আবিদুন) শব্দটি 'আবদ' (দাস) থেকে এসেছে, যার অর্থ 'দাসত্বকারী'। ফেরাউনের কওমের লোকেরা মূসা (আ.) ও হারুন (আ.)-এর কওমের (বনী ইসরাঈল) প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিল যে তারা তাদের দাস। এই আয়াতে শব্দটি মানুষের প্রতি মানুষের দাসত্ব বা বশ্যতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
২. সূরা আশ-শু'আরা (২৬): আয়াত ২২
"وَتِلْكَ نِعْمَةٌ تَمُنُّهَا عَلَيَّ أَن عَبَّدتَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ"
"আর আমার প্রতি তোমার যে অনুগ্রহের কথা বলছ তা এই যে, তুমি বনী ইসরাঈলকে দাস বানিয়ে রেখেছ।"
এখানে 'عَبَّدتَّ' (আববাদতা) ক্রিয়াপদটি 'আবদ' (দাস) থেকে এসেছে, যার অর্থ 'দাস বানিয়ে রাখা'। ফেরাউন যখন মূসা (আ.)-কে তার অতীতের উপকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল, তখন মূসা (আ.) এর জবাবে বলেছিলেন যে ফেরাউন বনী ইসরাঈলকে দাস বানিয়ে রেখেছিল, যা আসলে কোনো অনুগ্রহ ছিল না। এই আয়াতেও শব্দটি মানুষের প্রতি মানুষের দাসত্ব আরোপ করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই আয়াতগুলো মানুষের প্রতি মানুষের দাসত্বের প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হলেও, এগুলো 'আবদ' এবং 'ইবাদাহ' ধারণার মূল অর্থ—অর্থাৎ বশ্যতা, আনুগত্য এবং সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়া—বুঝতে সাহায্য করে। যখন এই শব্দটি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত হয়, তখন এর অর্থ হয় একমাত্র আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা, তাঁর বিধান মেনে চলা এবং তাঁর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে নেওয়া। এটাই প্রকৃত 'ইবাদাহ'।
সারসংক্ষেপ:
ইবাদত হলো আল্লাহর দাসত্ব বা বন্দেগি করা। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক কিছু কাজ যেমন সালাত, সাওম, যাকাত, হজ, দু'আ, যিকির ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আল্লাহর প্রতি পূর্ণাঙ্গ বশ্যতা ও আনুগত্যের প্রকাশ। এর অর্থ হলো, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলা এবং একমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করা। আল্লাহই একমাত্র সত্তা যার সার্বভৌমত্ব ও আদেশ-নিষেধের প্রতি মানুষ দাসত্ব বা আনুগত্য প্রকাশ করবে।
নাযিলকৃত দলিল (আল-কুরআন) /প্রমাণবহিীন কোনো ইবাদত গ্রহণযোগ্য নয়:
নাযিলকৃত দলিল (কুরআন) ব্যতীত কোনো ইবাদত গ্রহণযোগ্য না হওয়ার বিষয়টি কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে পরোক্ষভাবে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে, যারা আল্লাহর অনুমোদিত পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ অবলম্বন করে বা নিজেদের মনগড়া পদ্ধতিতে ইবাদত করে, তাদের ইবাদত মূল্যহীন বা বরবাদ হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এখানে কিছু আয়াত উল্লেখ করা হলো যা এই ধারণাকে সমর্থন করে:
১. সূরা আল-কাহফ, আয়াত ১০৩-১০৬:
এই আয়াতগুলো মানুষের সম্পর্কে যারা মনে করে তারা ভালো কাজ করছে, কিন্তু তাদের কাজগুলো আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
"বলো, আমরা কি তোমাদেরকে সেসব লোকের খবর দেবো, যারা আমলের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? তারাই তারা, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে বৃথা গেছে, অথচ তারা মনে করতো যে, তারা ভালো কাজই করছে। তারাই তারা যারা তাদের রবের নিদর্শনাবলী ও তাঁর সাথে সাক্ষাৎ অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে। সুতরাং কিয়ামতের দিন তাদের জন্য আমরা কোনো ওজনের ব্যবস্থা রাখবো না। তাদের এই প্রতিদান জাহান্নাম, কারণ তারা কুফরী করেছিল এবং আমার আয়াতসমূহ ও আমার রাসূলদেরকে ঠাট্টার পাত্র বানিয়েছিল।"
(এখানে 'ضَلَّ سَعْيُهُمْ' (তাদের প্রচেষ্টা পথভ্রষ্ট হয়েছে) এবং 'فَحَبِطَتْ أَعْمَٰلُهُمْ' (তাদের আমল বিনষ্ট হয়েছে) দ্বারা নাযিলকৃত দলিলবিহীন আমলের অগ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।)
২. সূরা আশ-শূরা, আয়াত ২১:
"তাদের কি এমন অংশীদার আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? যদি মীমাংসার চূড়ান্ত ঘোষণা না থাকত, তবে তাদের মধ্যে ফয়সালা হয়ে যেত। আর যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।"
(এই আয়াতটি সরাসরি ইঙ্গিত দেয় যে, আল্লাহর অনুমতি বা নির্দেশ ব্যতীত দ্বীনের নামে কোনো কিছু উদ্ভাবন করা অংশীদার স্থাপন করার শামিল, যা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।)
সূরা ইউসুফ (১২:৪০):
إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءٌ سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ ۚ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
অর্থ: "তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কেবল কতগুলো নামের ইবাদত করছো, যে নামগুলো তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা রেখেছ। আল্লাহ এগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। বিধান দেওয়ার ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।"
৩. সূরা আল-আন'আম, আয়াত ১৫০:
"বলো, তোমাদের সাক্ষীগণকে উপস্থিত করো, যারা সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ এগুলো হারাম করেছেন। যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তবে তাদের সাথে তুমি সাক্ষ্য দিয়ো না। আর তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলেছে এবং যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না এবং যারা তাদের রবের সাথে অন্যকে সমকক্ষ করে।"
(যদিও এটি হালাল-হারামের বিষয়ে, এর মূলনীতি একই যে, আল্লাহর অনুমোদন ব্যতীত কোনো কিছুকে দ্বীনের অংশ বানানো যাবে না। এর জন্য 'শাহাদাত' বা দলিল প্রয়োজন।)
৫. সূরা আয-যুখরুফ-৪৩:৬৩-৬৫:
"আর যখন ঈসা সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ আগমন করলো, সে বললো, আমি তোমাদের কাছে হিকমত (প্রজ্ঞা) নিয়ে এসেছি... অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমাকে অনুসরণ করো। নিশ্চয় আল্লাহই আমার রব এবং তোমাদেরও রব; অতএব তাঁরই ইবাদত করো। এটাই সরল পথ।"
এই আয়াতগুলো একত্রিতভাবে এই বার্তা দেয় যে, ইসলামী শরীয়তের মৌলিক উৎস আল-কোরআন থেকে প্রাপ্ত দলিল ছাড়া কোনো কাজকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
ইবাদতকারী (আবেদুন) কে বা কারা?
ইবাদতকারী (আবেদুন) হলেন তারা, যারা আল্লাহর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করে, তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে এবং তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করে। এই বিষয়ে আরও জানতে দেখুন: ২:১৩৮, ৯:১১২, ১০৯:৩-৫।
সহজ কথায়, ইবাদত হলো আল্লাহকে একক সত্তা হিসেবে স্বীকার করে তাঁর দেওয়া জীবন বিধান অনুযায়ী নিজেদের জীবনকে সম্পূর্ণরূপে পরিচালিত করা, তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, ভালোবাসা ও ভয় নিয়ে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা। এটি কেবল নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ভালো কাজ, যা আল্লাহর নির্দেশ মেনে এবং তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তা-ই ইবাদত।
সহজ কথায়, ইবাদত হলো আল্লাহকে একক সত্তা হিসেবে স্বীকার করে তাঁর দেওয়া জীবন বিধান অনুযায়ী নিজেদের জীবনকে সম্পূর্ণরূপে পরিচালিত করা, তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, ভালোবাসা ও ভয় নিয়ে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা। এটি কেবল নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ভালো কাজ, যা আল্লাহর নির্দেশ মেনে এবং তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তা-ই ইবাদত।
✨ কাফের-এর ইবাদত ও মুসলিমের ইবাদত:
আল-কুরআনে উল্লেখিত দ্বীন পালনই মুসলিমের ইবাদত (কাফের-মুশরিকদের ইবাদতের বিপরীত হচ্ছে মুসলিমের ইবাদত):
আল-কুরআনে উল্লেখিত দ্বীন পালনই মুসলিমের ইবাদত (কাফের-মুশরিকদের ইবাদতের বিপরীত হচ্ছে মুসলিমের ইবাদত)
🔍 অনুধাবনে: আয়াত ১০৬:১-৬ ৬:১০৬, (৪৩:৬৯-৭০), 29:17। [আর দ্বীন মানে বুঝতে দ্র: আয়াত ৩:১৯, ২৪:২, ১:৪, ৫:৩]
২. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তাঁর এককত্ব ঘোষণা:
* আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং আমাদের সকল নেয়ামতের উৎস। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং তাঁকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে স্বীকার করা ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
"আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই সাহায্য চাই।" -সূরা আল-ফাতিহা (১:৫)
৩. মানবজাতির কল্যাণ ও সফলতা:
* ইবাদত মানুষকে আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ করে, নৈতিকভাবে উন্নত করে এবং সামাজিক জীবনে শান্তি ও শৃঙ্খলা আনয়ন করে। এটি ইহকাল ও পরকালের সফলতার চাবিকাঠি।
* সূরা আন-নাহল (১৬:৯৭): "যে মুমিন অবস্থায় সৎকাজ করে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে এক পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দেব যা তারা করত।"
ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ তাকওয়া অর্জন করে, যা তাকে মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে এবং সৎকর্মে উৎসাহিত করে।
কী কাজ করলে ইবাদত হয় - কেবলমাত্র আল-কোরআন অনুধাবনে:
আল-কোরআনের আলোকে ইবাদত কেবল আনুষ্ঠানিক উপাসনা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করা। নিচে কোরআনের ভিত্তিতে ইবাদত হিসেবে গণ্য কিছু কাজের উদাহরণ দেওয়া হলো:
১. একমাত্র আল্লাহর উপাসনা (তাওহীদ)/ তাঁর সাথে কাউকে শিরক না করা:
তাকওয়া অবলম্বন বা মুত্তাকী হওয়া: ➥ ওহে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করো, যিনি তোমাদের ও যারা তোমাদের পূর্ববর্তী তাদের সৃষ্টি করেছেন। যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। (২:২১)
🔍তাকওয়া অবলম্বনের উপায় জানতে দেখুন: ২:২-৫, ২:১৭৭, ৩:১৫-১৭, ৩:১৩৩-১৩৫, ৩৯:৩৩, ১৬:৩০।
শিরকবিহীন বিশুদ্ধ ইবাদত:
🔗 আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। (৪:৩৬)
🔗 বলো! প্রকৃতপক্ষে আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমার কাছে ওহী করা হয় যে, তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাতের আশা করে থাকে, তাহলে সে যেন সংশোধনের কাজ করে এবং তার রবের ইবাদতের সাথে যেন কাউকে শিরক না করে। (১৮:১১০)
🔗 এবং তিনি তাঁর কর্তৃত্বে কাউকে অংশীদারিত্ব দেন না। (১৮:২৬)🔗 বলো! প্রকৃতপক্ষে আমি আমার রবকে ডাকি এবং তার সাথে কাউকে শিরক করি না (যুক্ত করি না)। (৭২:২০)
📖 আল-কোরআন স্টাডি করা 'ইবাদাহ':
অর্থ: প্রকৃতপক্ষে আমি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি যে, আমি এই নগরীর রবের ইবাদত করব, যেটিকে তিনি সম্মানিত করেছেন। আর সবকিছু তাঁরই জন্য। আর আমি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি যে, আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হব। আর এও যে আমি কুরআন পাঠ করব (অতএব, যে হিদায়েতপ্রাপ্ত হয়, তাহলে সে মূলত তার নিজের জন্যই হিদায়েতপ্রাপ্ত হয় আর যে পথভ্রষ্ট হয়, তাহলে বলো! প্রকৃতপক্ষে আমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভ্ক্তু)-২৭:৯১-৯২
(বলো!) নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি, দ্বীনকে তাঁর জন্য একনিষ্ঠ করে। আর আমি আদিষ্ট হয়েছি, যেন আমি মুসলিমদের মধ্যে অগ্রণী হই। (বলো!) নিশ্চয়ই আমি মহাদিবসের শাস্তির ভয় পাই যদি আমি আমার রবের অমান্য করে ফেলি। (বলো!) আমি আল্লাহর ইবাদত করি, আমার দ্বীনকে তাঁর জন্য একনিষ্ঠ করে-আল কুরআন ৩৯:১১-১৪
[মোখলেস বান্দার ডাক /বিনীতভাবে সংগোপনে ডাকা-দু’আ করা/ সমুদ্রের মধ্যে (রহ ঃযব ংবধ) বিপদে কেমন করে ডাকে তা জানতে-২৯:৬৫-৬৬, ৩১:৩২, ১০:২২, ৪০:১৪, ১০:১২, ৬:৬৩-৬৪, ১৭:৬৭, ৭:৫৬, ১৯:৩-৬, ২১:৮৯-৯০, ৬:৪২-৪৩, ৫:৪৫, ৫:৫০, ৫:৩৯ ২:২৭৯, ৮:৫৪]। মুখলেছ-গঁশযষবং-খালেছ-এখলাস-৩৯:২-৩, ৪:১৪৬, ৩৯:১১-১২, ৯৮:৫, ৩৮:৪৬ ৪০:৬৫, ৪০:৬২, ৭৩:৭-৭৩:৮ (৭৩:৬, ৯৪:৭-৮)
২. সালাত কায়েম/ প্রতিষ্ঠা (অহীর সংযোগ স্থাপন অনুশীলন বা চর্চা): 'ইবাদাহ'
* সূরা ত্বা-হা (২০:১৪): "নিশ্চয় আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণে সালাত কায়েম করো।"
* সূরা আল-আনকাবুত (২৯:৪৫): "...আর সালাত কায়েম করো। নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।"
💬 ইবাদত: আল্লাহর স্মরণে জিকির-তাসবীহ-সিজদা-দোয়া:
সূরা আল-বাকারাহ (২:১৮৬): "আর যখন আমার বান্দাগণ আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তখন (বলো), আমি তো নিকটেই। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিই যখন সে আমাকে আহ্বান করে।"
🔹 আর তোমাদের রব বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দিব। নিশ্চয় যারা আমার ইবাদতের ক্ষেত্রে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে, অচিরেই তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে-৪০:৬০
🔹 নিশ্চয় যারা তোমার রবের সান্নিধ্যে, তারা তাঁর ইবাদতের ব্যাপারে অহংকার করে না এবং তারা তাঁর তাসবীহ করে আর তাঁরই জন্য তারা সিজদা করে-7:206
🔹আর তুমি তোমার রবকে তোমার মনের মধ্যে বিনীতচিত্তে ও ভীতি সহকারে এবং কথার চেয়ে অনুচ্চস্বরে সকালে ও সন্ধ্যায় স্মরণ করো। আর তুমি উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। নিশ্চয় যারা তোমার রবের সান্নিধ্যে, তারা তাঁর ইবাদতের ব্যাপারে অহংকার করে না এবং তারা তাঁর তাসবীহ করে আর তাঁরই জন্য তারা সিজদা করে-৭:২০৫-২০৬
🔹 আর রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র তাঁর নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। তোমরা সূর্যকে সিজদা কোরো না এবং চন্দ্রকেও না। আর সিজদা করো আল্লাহর উদ্দেশ্যে যিনি সেগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা শুধু তাঁরই হয়ে থাক, তোমরা ইবাদত করো। এরপরও যদি তারা অহংকার করে, তবে যারা তোমার রবের সান্নিধ্যে, তারা রাতে ও দিনে তাঁরই জন্য তাসবীহ করে। আর তারা ক্লান্ত হয় না-৪১:৩৭-৩৮
🔹 ইয়াকীন না আসা পর্যন্ত ইবাদত (continuously): অতএব, তুমি তোমার রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ করো এবং সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর তোমার রবের ইবাদত করো, যতক্ষণ না তোমার কাছে ইয়াকিন বা ‘দৃড় বিশ্বাস’ আসে-১৫:৯৮-৯৯
🔗 [ইয়াকীন অনুধ্যানে দ্র: আয়াত: ১০২:৫, ১০২:৭, ৫৬:৯৫, ১৫:৯৮-৯৯, ২৭:৮১-৮৫, ৭৪:৪৭, ৫:৫০, ৪৫:৩-৪, ২৭:১-৫, ২:২১, ১৩:২, ৪৫:২০, মুকিনিন Moqinen-51:20-21]
* সূরা আর-রাদ (১৩:২৮): "যারা ঈমান আনে এবং যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।"
আল্লাহকে স্মরণ করা এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করাও ইবাদত।
পরিশুদ্ধতা অর্জন (যাকাত) ও দান-সদকা: 'ইবাদাহ'
* সূরা আল-বাইয়্যিনাহ (৯৮:৫): "তাদেরকে কেবল এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করে, সালাত কায়েম করে এবং পরিশুদ্ধতা অর্জন (যাকাত) করে; আর এটাই হলো সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন।"
* সূরা আত-তাওবা (৯:১০৩): "তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা (যাকাত) গ্রহণ করো, যা দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র করবে এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবে..."
আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা এবং দরিদ্রদের অধিকার আদায় করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
সিয়াম পালন পালন (রোজা): 'ইবাদাহ'
সূরা আল-বাকারাহ (২:১৮৩): "ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের ওপর সিয়াম লিখে দেয়া হয়েছে, যেমনভাবে লিখে দেয়া হয়েছিল তাদের ওপর যারা তোমাদের পূর্বে ছিল। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করো।"
🔖 (তাকওয়া অর্জনের উপায় উপরে উল্লেখ করা হয়েছে)।
হজ ও উমরাহ পালন (যদি সামর্থ্য থাকে : 'ইবাদাহ'
আর তোমরা আল্লাহর জন্য হজ্জ ও উমরাহ পূর্ণ করো। ....আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমরা জেনে রাখ যে, আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।
হজ্জ হলো নির্দিষ্ট কয়েকমাস। অতএব, যে সেসময় হজ্জ ফরয করে নিল, তখন হজ্জের ভেতর নেই কোনো অশ্লীলতা আর না কোনো স্বেচ্ছাচারিতা এবং না কোনো ঝগড়াবিবাদ। আর ভাল থেকে যা তোমরা করো, সেটা আল্লাহ জানেন। এবং তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো। তবে নিশ্চয় তাকওয়াই উত্তম পাথেয়। আর হে বোধসম্পন্নরা! তোমরা আমাকে ভয় করো-২:১৯৬-১৯৭।
🔖 (তাকওয়া অর্জনের উপায় উপরে উল্লেখ করা হয়েছে)।
পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার: 'ইবাদাহ'
* সূরা বনী ইসরাঈল (১৭:২৩): "তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।"
আল্লাহর ইবাদতের পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে এর গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।
৮. সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ (আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার): 'ইবাদাহ'
* সূরা আলে ইমরান (৩:১০৪): "আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎ কাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর এরাই সফলকাম।"
সমাজের সংস্কার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাও ইবাদতের অংশ।
৯. ন্যায়পরায়ণতা, সততা ও সুবিচার:
* সূরা আন-নাহল (১৬:৯০): "নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচার, সদ্ব্যবহার এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।"
ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ন্যায় ও সততা প্রতিষ্ঠা করাও ইবাদত।
১0. আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হালাল জীবিকা অর্জন:
* ইসলামে হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জন করা এবং তা দ্বারা পরিবার ও সমাজের হক আদায় করাও ইবাদত।
দ্র: আয়াত ৫:৩, ২:১৮৮
📢 ইবাদত: আদেশ-নিষেধ মেনে চলা:
এই হলো সিরাতারল মুসতাকিম:
🔹 ইয়্যা-কা না’বুদু ওয়া ইয়্যা-কা নাসতাই’-ন ইহদিনাস সিরাতা’ল মুসতাকি’-ম। সিরাতা’ল্লা যি-না আনআ’মতা আ’লাইহিম গা’ইরিল মাগ’দু’বি আ’লাইহিম ওয়ালা দ্দ-ল্লি-ন।
আমরা আপনারই ইবাদত করি আর আমরা আপনারই সাহায্য চাই। আমাদেরকে সুদৃঢ় পথ দেখান, তাদের পথ যাদের ওপর আপনি অনুগ্রহ করেছেন; নয় তাদের, যাদের ওপর অভিশাপ করা হয়েছে আর নয় তাদের, যারা পথভ্রষ্ট- আল কুরআন ১:১-৪।
إِنَّ اللَّهَ هُوَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ ۚ هَـٰذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيمٌ
🔖 নিশ্চয়ই আল্লাহ, তিনি আমার রব এবং তোমাদের রব। [অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত করো। সেটাই ছির-তুম্ মুস্তাক্বীম-৪৩:৬৪ (৩:৫১, ১৯:৩৬, 6:151-153, 17:22-39)]
ইবাদতের ক্ষেত্রে একমাত্র রবের হুকুম কার্যকর করতে হবে বা পালন করতে হবে, অন্য কারও হুকুমে-আদেশ-নির্দেশ মানা যাবে না:
ইবাদতে শিরক- হুকুমে শিরক:
আল্লাহ তায়ালা কোরআনে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ইবাদতে তাঁর সাথে কারো কোনো অংশীদারিত্ব থাকতে পারে না। ইবাদতের ক্ষেত্রে সমস্ত হুকুম, বিধান, আদেশ, মাস'য়ালা বা ফতোয়া একমাত্র তাঁরই এবং অন্য কারো এসব দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। এই বিষয়টিকে 'শিরক' (আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন) বলে গণ্য করা হয়েছে, যা ইসলামে সবচেয়ে বড় গুনাহ।
আপনি যে আয়াতগুলো উল্লেখ করেছেন, সেগুলো এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে:
১. ইবাদতে শিরক (১৮:১১০):
"قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا"
"বলো, 'আমি তো তোমাদেরই মতো একজন মানুষ। আমার প্রতি ওহী করা হয় যে, তোমাদের ইলাহ হলেন এক ও অদ্বিতীয় ইলাহ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ লাভের আশা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।"
(এই আয়াত সরাসরি ঘোষণা করে যে আল্লাহর ইবাদতে কাউকে শরিক করা যাবে না)
২. হুকুমে শিরক (১৮:২৬):
"قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا ۖ لَهُ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ أَبْصِرْ بِهِ وَأَسْمِعْ ۚ مَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَلِيٍّ وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا"
"বলো, 'তারা কতকাল ছিল, তা আল্লাহই ভালো জানেন। আসমান ও যমীনের গায়েব তাঁরই। তিনি কত সুন্দর দেখেন ও কত সুন্দর শোনেন! তিনি ব্যতীত তাদের কোনো অভিভাবক নেই। আর তিনি তাঁর হুকুমে কাউকে শরিক করেন না।"(এই আয়াত সুস্পষ্টভাবে বলে যে আল্লাহর হুকুমে কেউ অংশীদার নয়। আইন প্রণয়ন, বিধান দেওয়া, আদেশ জারি করা – এসব একমাত্র আল্লাহরই এখতিয়ার।)
অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আয়াত:
৩:৭৯-৮০: "কোনো মানুষের জন্য এটা সঙ্গত নয় যে, আল্লাহ তাকে কিতাব, হেকমত ও নবুওয়াত দান করার পর সে মানুষকে বলবে, 'তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমার দাসত্ব করো।' বরং সে বলবে, 'তোমরা রব্বানী হয়ে যাও, যেহেতু তোমরা কিতাব শেখো এবং তা অধ্যয়ন করো।' আর সে তোমাদেরকে ফেরেশতাদের ও নবীদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করতে বলবে না। তোমরা মুসলিম হওয়ার পর কি সে তোমাদেরকে কুফরীর নির্দেশ দেবে?"
(এই আয়াতে আল্লাহর দাসত্বে অন্য কাউকে অংশীদার করার কঠোর নিন্দা করা হয়েছে।)
১২:৪০: "আল্লাহ ব্যতীত যাদের তোমরা ইবাদত করো, তারা তো কতগুলো নাম বৈ নয়, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষরা রেখেছ; আল্লাহ এর কোনো সনদ অবতীর্ণ করেননি। বিধান (হুকুম) কেবল আল্লাহরই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না। এটাই সরল দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।" (এই আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, হুকুম বা বিধান একমাত্র আল্লাহরই এবং তাঁর ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা যাবে না।)
৬:১১৪: "(বলো) 'আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিচারক অনুসন্ধান করব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন বিস্তারিতভাবে...'" (আল্লাহই একমাত্র বিধানদাতা ও বিচারক।)
৫:৫০: "তারা কি জাহেলিয়াতের ফায়সালা চায়? আর দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য ফায়সালা প্রদানে আল্লাহর চেয়ে উত্তম আর কে?" (আল্লাহর বিধানের বাইরে অন্য কারো ফায়সালা বা হুকুম চাওয়া জাহেলিয়াত।)
৫১:৫৬: "আর আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।" (মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, যা তাঁর নির্দেশিত পথে হবে।)
কুরআন অনুযায়ী ইবাদতে জাগতিক বা আধ্যাত্মিক কোনো পার্থক্য নেই:
ইসলামে ইবাদত শুধু আনুষ্ঠানিক রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাগতিক কাজ যেমন ব্যবসা, চাকরি, পরিবার প্রতিপালন, সামাজিক দায়বদ্ধতা – যদি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ও তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে সেগুলোও ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। এক্ষেত্রেও মূলনীতি হলো, সকল কাজ ও তার পদ্ধতি হতে হবে একমাত্র আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুযায়ী, অর্থাৎ কুরআনের বিধান অনুসারে।
যেমন:
৪:২৯: "হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে তোমাদের পারস্পরিক সম্মতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যতীত।..." (এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যকেও ইবাদতের একটি অংশ হিসেবে ধরা হয়েছে, যা শরিয়তের নিয়ম মেনে চলতে হবে।)
৫:৪৪: "...আর যে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই কাফির।" (এই আয়াতটি দ্বীনের জাগতিক দিক, যেমন আইন ও বিচার, সেগুলোতেও আল্লাহর বিধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে)
সুতরাং, ইবাদতের ব্যাপক অর্থ হলো জীবনের সকল ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও তাঁর বিধান নাযিলকৃত অহি আল-কোরআন মতে মেনে চলা। এর মধ্যে জাগতিক বা আধ্যাত্মিক কোনো পার্থক্য নেই। আল্লাহর হুকুমই চূড়ান্ত এবং এর বাইরে অন্য কারো আদেশ, মাস'য়ালা বা ফতোয়াকে ইবাদতের অংশ বানানো স্পষ্ট শিরক।
একজন 'ইবাদুর রহমান' এর কিছু বৈশিষ্ট্য:
আল-কুরআনে 'ইবাদুর রহমান' এর কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষ করে সূরা আল-ফুরকান এর আয়াত ৬৩ থেকে ৭৬ পর্যন্ত। এখানে কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো:
1. বিনয় ও নম্রতা (হাঁটাচলায়): তারা পৃথিবীতে বিনয় ও নম্রভাবে চলাফেরা করে। যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের সাথে কথা বলে, তখন তারা 'সালাম' (শান্তিপূর্ণ উত্তর) বলে। (২৫:৬৩)
2. কিয়ামুল লাইল: তারা তাদের রবের উদ্দেশ্যে সেজদায় ও দাঁড়িয়ে রাত অতিবাহিত করে। (২৫:৬৪)
3. জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি প্রার্থনা: তারা বলে, "হে আমাদের রব, জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের রক্ষা করুন, এর আযাব তো নিশ্চিত বিনাশকারী।" (২৫:৬৫)
4. মিতব্যয়িতা: যখন তারা ব্যয় করে, তখন তারা অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না, বরং এর মাঝামাঝি একটি পথ অবলম্বন করে। (২৫:৬৭)
5. শিরক থেকে বিরত থাকা: তারা আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহকে ডাকে না। (২৫:৬৮)
6. হত্যা না করা: আল্লাহ যার হত্যা হারাম করেছেন, সঙ্গত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না। (২৫:৬৮)
7. ব্যভিচার না করা: তারা ব্যভিচার করে না। (২৫:৬৮)
8. মিথ্যা সাক্ষ্য না দেওয়া: তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না। (২৫:৭২)
9. অসার বিষয় থেকে দূরে থাকা: যখন তারা কোনো অসার ও অনর্থক বিষয়ের পাশ দিয়ে যায়, তখন তারা ভদ্রভাবে পাশ কাটিয়ে যায়। (২৫:৭২)
10. আয়াতসমূহের প্রতি মনোযোগ: যখন তাদের রবের আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দেওয়া হয়, তখন তারা সেগুলোর প্রতি অন্ধ ও বধিরের মতো আচরণ করে না। (২৫:৭৩)
11. নেক সন্তান ও জীবনসঙ্গীর জন্য দোয়া: তারা বলে, "হে আমাদের রব, আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন, যারা আমাদের চোখ জুড়াবে এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।" (২৫:৭৪)
আল্লাহু আ’লামু (আল্লাহই অধিক জ্ঞাত)-৬:১২৪
আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!