অমুসলিমদের মৃত্যুতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ: অনুধ্যানে আল-কোরআন । Muslim's participation in the funeral or expressing condolences for the death of a non-Muslim

আল-কোরআনে অমুসলিমদের মৃত্যুতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ বা সমবেদনা জানানোর বিষয়ে সরাসরি কোনো স্পষ্ট নির্দেশ বা আদেশ-নিষেধ উল্লেখ নেই। তবে, কোরআনের আয়াতসমূহ অনুধাবন করলে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা পাওয়া যায়। নিঃসন্দেহে, আল-কোরআন বিশ্ব মানবতার জন্য এক পরম রহমত, যা এর আয়াতসমূহ গভীরভাবে অনুধ্যানের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায় এবং আমাদের বোধশক্তিকে জাগ্রত করে।


আল-কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে সাধারণ মানবিকতা, দয়া, ন্যায়বিচার এবং অন্যের প্রতি সদয় আচরণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতগুলো পরোক্ষভাবে এই ধরনের পরিস্থিতিতে মুসলিমদের আচরণ কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে একটি ধারণা দিতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ:

📖 সূরা আল-মুমতাহিনাহ, আয়াত ৮: 

"আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের সম্পর্কে নিষেধ করেন না, যারা তোমাদের সাথে দ্বীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি যে, তোমরা তাদের সাথে ভালো আচরণ করবে এবং তোমরা তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালবাসেন।"

🔍অনুধাবন:

দিও এই আয়াতটি জীবিতদের সাথে আচরণের কথা বলছে, এর মূল বার্তা হলো যারা মুসলিমদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে না, তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা উচিত। এর আলোকে, মৃত্যুতে সমবেদনা জানানোকে সদ্ব্যবহারের একটি অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।  
কোনো অমুসলিম প্রতিবেশীর মৃত্যুতে সমবেদনা জানানো বা তাদের দুঃখের সময়ে পাশে দাঁড়ানোকে 'সদ্ব্যবহার' (বির্ন) এর একটি রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি কোরআনের মৌলিক উদারতার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

📖 সূরা বনি ইসরাইল ১৭:৭০

আর অবশ্যই আমরা আদম সন্তানদেরকে সম্মানিত করেছি এবং তাদেরকে স্থলের ও জলের মধ্যে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে উপযোগী বস্তুসমূহ থেকে রিযিক দিয়েছি এবং আমরা যা সৃষ্টি করেছি, তার মধ্য থেকে অনেকের উপর তাদেরকে বিশেষত্ব দিয়েছি, যথাযথ বিশেষত্বায়।

📖 সূরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৪:

"আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে।"

এই আয়াতটি দাওয়াতের গুরুত্বের উপর জোর দেয়। যদি একজন মুসলিম অমুসলিমের মৃত্যুতে উপস্থিত হন এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখান, তবে এটি দাওয়াতের একটি পরোক্ষ মাধ্যম হতে পারে, যেখানে তাদের কাছে ইসলামের মানবিক দিকটি তুলে ধরা হয়।

এছাড়াও, কোরআনে এমন অনেক আয়াত আছে যা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা এবং প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে কথা বলে, যা বৃহত্তর অর্থে মানবিক সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে।

যদি আমরা শুধুমাত্র কোরআনের আয়াতের দিকে তাকাই, তবে কোনো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা বা নির্দেশ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে কোরআনের সাধারণ নীতিমালা এবং নৈতিক মূল্যবোধের আলোকে, অমুসলিম প্রতিবেশীদের প্রতি সহানুভূতি এবং সমবেদনা জানানোকে মানবিক সদ্ব্যবহারের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা ইসলামের উদার ও সহনশীল শিক্ষার পরিপন্থী নয়।

আরও যে বিবেচ্য বিষয়:

ইহুদী, নাসারা (খৃস্টান) ও সাবেঈন অথচ তাঁদের মধ্যেও যাদের জন্য নাই কোন No tension No sorrow:

আল-কোরআনে কিছু আয়াত রয়েছে যা বিভিন্ন চিন্তাভাবনা-অনুধ্যানের জন্ম দিয়েছে এবং এই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক আয়াতটি হলো:

📖 সূরা বাকারা, আয়াত ৬২:

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদী, নাসারা ও সাবেঈনদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে পুরস্কার রয়েছে। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।"

এবং এর প্রায় একই রকম আরেকটি আয়াত:

📖 সূরা মায়েদা, আয়াত ৬৯:

"নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদী, সাবেঈন ও নাসারাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।"

এই আয়াতগুলোর অনুধাবন:

এই আকোরআনে ইহুদী ও খৃস্টানদের মধ্যে মুসলিমদের প্রতি সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ এবং নিকটতম বলে যাদের উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলো খৃষ্টানরা।

আয়াতটি হলো:

📖 সূরা আল-মায়েদা, আয়াত ৮২:

"যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য মানুষের মধ্যে ইহুদিদেরকে এবং যারা শিরক করেছে তাদেরকে তুমি অবশ্যই শত্রুতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠোর পাবে। আর যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য মিত্রতার ক্ষেত্রে তুমি অবশ্যই তাদেরকে সবচেয়ে নিকটবর্তী পাবে, যারা বলে, আমরা নাসারা। সেটা এ কারণে যে, তাদের মধ্যে রয়েছে পুরোহিত ও সংসার বিরাগী এবং এটাও যে, তারা অহংকার করে না।"

🔍অনুধাবন:

এই আয়াতে বিশেষভাবে খৃষ্টানদের একটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে, যা তাদের মুসলিমদের কাছাকাছি নিয়ে আসে:

আলেম (قِسِّيسِينَ): তাদের মধ্যে আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তিরা আছেন, যারা সম্ভবত ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা করেন এবং সত্যের সন্ধানী।

সংসারবিরাগী (رُهْبَانًا): তাদের মধ্যে সংসারবিরাগী বা পাদ্রী/রাহিব আছেন, যারা দুনিয়াবী মোহ ত্যাগ করে আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝোঁকেন।

অহংকারবিহীন (لاَ يَسْتَكْبِرُونَ): তারা অহংকার করেন না। এই বিনয়ী মনোভাব সত্য গ্রহণে তাদের সহায়ক।

এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে, কোরআন খৃষ্টানদের (বিশেষ করে এই শ্রেণীর খৃষ্টানদের) মুসলিমদের প্রতি অধিকতর সহানুভূতিশীল এবং বন্ধুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছে, যা ইহুদী ও মুশরিকদের থেকে আলাদা।

একত্ববাদ ও সৎকর্মের গুরুত্ব:  এই আয়াতগুলো সার্বজনীন নীতি নির্দেশ করে: যে কোনো ব্যক্তি (তার জাতি বা ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে) যদি এক আল্লাহতে বিশ্বাস করে, শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে এবং সৎকাজ করে, তবে সে পুরস্কৃত হবে। তবে, এই অনুধাবনেও সাধারণত ইসলাম গ্রহণের শর্তটি implicit (অন্তর্নিহিত) থাকে।

অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আয়াত:

আল-কোরআনের অন্যান্য আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা ইসলামকে একমাত্র মনোনীত ধর্ম হিসেবে কবুল করেছেন:

📖 সূরা আল-ইমরান, আয়াত ৮৫: "আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করবে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

📖 সূরা আল-ইমরান, আয়াত ১৯: "নিশ্চয় আল্লাহর কাছে একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম।"

এখন সিদ্ধান্ত আপনার: Choice is yours!

শপথ প্রাণের ও তাঁর, যিনি তা সুষম করেছেন। তারপর তিনি তাকে তার অপরাধ ও তার তাকওয়া সম্পর্কে বোধ দিয়েছেন-সূরা আশ শামস ৯১:৭-৮
আলহামদুলিল্লাহির রব্বিল আলামিন!
Allah Knows the Best!
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post