আল্লাহর কালাম—তাঁর বাণী, শব্দ বা আয়াতের কোনো অংশই পরিবর্তন-পরিবর্ধন-সংযোজন-বিয়োজন, বিকল্প, বিকৃতি বা সংশোধন করার ক্ষমতা কারও নেই। কিন্তু আল্লাহর সেই দু:সাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহন করার চেষ্টা করলো কে বা কারা?
আল্লাহর কালাম—তাঁর বাণী, শব্দ বা আয়াতের কোনো অংশই পরিবর্তন, বিকৃতি বা সংশোধন করার ক্ষমতা কারও নেই/ সেই বিখ্যাত “চ্যালেঞ্জ আয়াতগুলো”
দেওয়া হলো যেখানে আল্লাহ তায়ালা মানুষ, জিন, কবি, সাহিত্যিক সবাইকে চ্যালেঞ্জ করেছেন—কুরআনের
সমকক্ষ কিছু তৈরি করতে পারলে করে দেখাও!
আয়াত দ্র: ১০:১৫, ৬:৩৪, ৬:১১৫, ১০:৬৪, ১৮:২৭ (৪১:৪১-৪২), ১৫:৯, ২:২৩-২৪,
১১;১৩, ১৭:৮৮।
আল্লাহর সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহন করার চেষ্টা করলো কে বা কারা?
কুরআন: আল্লাহর কালাম বা বাণী তথা আয়াতসমূহের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্যই, যার পরিবর্তন অসম্ভব এবং যা অপ্রতিদ্বন্দ্বী!
কুরআন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার এক ঐশী গ্রন্থ, যা মানবজাতির জন্য পথনির্দেশিকা হিসেবে নাযিল হয়েছে। এই পবিত্র কালামের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্যই আল্লাহর সরাসরি বাণী। তাই, এর একটি অক্ষরও পরিবর্তন, পরিবর্ধন, বিকৃতি বা সংশোধন করার ক্ষমতা সৃষ্টির কারো নেই। এই ব্লগ পোস্টে আমরা কুরআনের এই অলৌকিকতা এবং আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এর সুরক্ষার গ্যারান্টি নিয়ে আলোচনা করব।
১. আল্লাহর বাণীতে কোনো পরিবর্তন নেই (সূরা ইউনুস, ১০:১৫)
আমাদের মাঝে অনেকেই এমন আছেন যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করেন না বা পরকালে বিশ্বাস করেন না। তাদেরই কেউ কেউ যখন কুরআনের স্পষ্ট আয়াতগুলো শোনেন, তখন তারা বলেন, "এই কুরআন বদলে দাও, অথবা এর বদলে অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো!"
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে এই কথার জবাব দিতে বলেছেন:
📖 সূরা ইউনুস (১০:১৫) এর মূল বার্তা:
"আর যখন তাদের কাছে আমার পরিষ্কার আয়াতগুলো তেলাওয়াত করা হয়, তখন যারা আমাদের সাক্ষাতের আশা করে না তারা বলে, ‘এর বদলে অন্য কোনো কুরআন আনো অথবা এটিকে পরিবর্তন করো।’ বলুন, ‘আমি আমার পক্ষ থেকে এটিকে পরিবর্তন করার অধিকার রাখি না। আমি তো কেবল সে-ই অনুসরণ করি যা আমার কাছে অহী করা হয়। আমি যদি আমার রবের অবাধ্য হই তবে এক মহা দিনের শাস্তির ভয় করি।’"
২. আল্লাহর কথা চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় (সূরা আল-আন‘আম, ৬:৩৪)
আল্লাহর কথা মানে শুধু কুরআনের আয়াত নয়, তাঁর সকল প্রতিশ্রুতি, বিধান এবং সিদ্ধান্ত। এই সব কিছুই এতটাই সুনির্দিষ্ট যে, এতে কোনো প্রকার পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
📖 সূরা আল-আন‘আম (৬:৩৪) এর মূল বার্তা:
"...আর আল্লাহর বাণীসমূহের কোনো পরিবর্তনকারী নেই..."
সহজ ভাষায়: এই আয়াতটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেয়। এটি বলছে যে, আল্লাহ যা বলেন, তা স্থির এবং স্থায়ী। তাঁর সিদ্ধান্ত বা তাঁর কথা কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। অর্থাৎ, কুরআনের বিধান বা আল্লাহর ওয়াদা, সবকিছুই অপরিবর্তনীয়।
৩. সত্য ও ন্যায়ের পরিপূর্ণ বাণী
কুরআন শুধু সত্যের কথাই বলে না, এটি পরিপূর্ণ ন্যায়বিচারের কথাও বলে। যখন কোনো কিছু সত্য ও ন্যায় উভয় দিকেই পরিপূর্ণ হয়, তখন তাতে আর পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন থাকে না।
📖 সূরা আল-আন‘আম (৬:১১৫) এর মূল বার্তা:
"আর সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে আপনার রবের বাণী পরিপূর্ণ। তাঁর বাণী পরিবর্তন করার মতো কেউ নেই। আর তিনি হলেন সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।"
৪. অপরিবর্তনীয় বাণী, যা মহা সফলতার পথ (সূরা ইউনুস, ১০:৬৪)
কুরআন যে অপরিবর্তনীয়, তা মুমিনদের জন্য এক সুসংবাদ। এর অর্থ হলো, আমরা যে পথ অনুসরণ করছি, তা চিরন্তন এবং এটি আমাদের জন্য নিশ্চিত সফলতা বয়ে আনবে।
📖 "...আল্লাহর কথার কোনো পরিবর্তন হয় না। এটাই হলো মহা সফলতা।"
সহজ ভাষায়: এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর কথাগুলো স্থায়ী। এতে কোনো পরিবর্তন হয় না। আর এই অপরিবর্তনীয়তা আমাদের জন্য এক বিরাট সাফল্যের কারণ। যারা আল্লাহর এই বাণীকে আঁকড়ে ধরে থাকবে, তারাই দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হবে।
৫. আল্লাহর বাণী অপরিবর্তনীয় এবং তিনিই একমাত্র আশ্রয় (সূরা আল-কাহফ, ১৮:২৭)
আমরা যখন বিপদে পড়ি বা কোনো সমস্যায় পড়ি, তখন আমরা কার কাছে আশ্রয় খুঁজি? আল্লাহ তায়ালা আমাদের বলছেন যে, তাঁর বাণী যেমন অপরিবর্তনীয়, তেমনই তিনিই আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল।
📖 সূরা আল-কাহফ (১৮:২৭) এর মূল বার্তা:
"আর আপনার প্রতি আপনার রবের যে কিতাব ওহী করা হয়েছে, তা থেকে তিলাওয়াত করুন। তাঁর বাণীসমূহ পরিবর্তন করার মতো কেউ নেই। আর আপনি তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো আশ্রয়স্থল কখনো পাবেন না।"
৬. কুরআন: এক সম্মানিত গ্রন্থ, যেখানে বাতিল অনুপ্রবেশ করতে পারে না (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৪১-৪২)
কুরআন এমন এক গ্রন্থ, যা বাতিল বা মিথ্যা থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। কোনো দিক থেকেই এর মধ্যে কোনো মিথ্যা প্রবেশ করতে পারে না।
📖 সূরা ফুসসিলাত (৪১:৪১-৪২) এর মূল বার্তা:
"নিশ্চয় যারা তাদের কাছে যিকির (কুরআন) আসার পর তা অস্বীকার করে (তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে)। আর নিশ্চয়ই এটি এক সম্মানিত গ্রন্থ। বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না, না সামনে থেকে, না পেছন থেকে। এটি প্রজ্ঞাময়, পরম প্রশংসিতের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।"
৭. কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহর (সূরা আল-হিজর, ১৫:৯)
কুরআন বিকৃতি থেকে কেন সুরক্ষিত, তার সবচেয়ে বড় কারণ হলো, এর সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নিজে নিয়েছেন।
📖 সূরা আল-হিজর (১৫:৯) এর মূল বার্তা:
"নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।"
সহজ ভাষায়: এই আয়াতটি একটি শক্তিশালী ঘোষণা। আল্লাহ নিজেই বলছেন যে, তিনি কুরআন নাযিল করেছেন এবং এর সুরক্ষার দায়িত্বও তাঁরই। তাই, পৃথিবীর কোনো শক্তি বা মানুষ এই কুরআনকে পরিবর্তন বা বিকৃত করতে পারবে না।
আল্লাহর চ্যালেঞ্জ: কুরআনের সমকক্ষ কিছু তৈরি করো!
কুরআন যে শুধু অপরিবর্তনীয় তাই নয়, এটি এতটাই অলৌকিক যে, মানুষ ও জিন মিলে চেষ্টা করলেও এর সমকক্ষ কিছু তৈরি করতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন আয়াতে এই চ্যালেঞ্জটি বারবার দিয়েছেন।
৮. একটি মাত্র সূরার সমকক্ষ আনতে চ্যালেঞ্জ (সূরা ইউনুস, ১০:৩৮ ও সূরা বাকারাহ, ২:২৩-২৪)
অনেকে অভিযোগ করত যে, মুহাম্মদ (সা.) নিজেই এই কুরআন বানিয়েছেন। আল্লাহ তাদের এই অভিযোগের জবাব দিতে এক সহজ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন:
📖 সূরা ইউনুস (১০:৩৮) এর মূল বার্তা:
বলুন! তবে তোমরা এর মত একটি সূরা নিয়ে এসো।"
📖 সূরা বাকারাহ (২:২৩-২৪) এর মূল বার্তা:
"আর যদি তোমরা সন্দেহ পোষণ করো আমি আমার বান্দার প্রতি যা নাযিল করেছি, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে এসো। আর আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের তোমাদের সব সাহায্যকারীদেরকে ডাকো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। কিন্তু যদি তোমরা তা করতে না পারো – আর তোমরা কখনোই তা করতে পারবে না – তবে সেই আগুনকে ভয় করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।"
সহজ ভাষায়: আল্লাহ তায়ালা চ্যালেঞ্জ করছেন যে, যারা মনে করে কুরআন মানুষের বানানো, তারা যেন এর মতো মাত্র একটি সূরা বানিয়ে দেখায়! এমনকি, তারা তাদের সকল সাহায্যকারীকে ডাকতে পারে। কিন্তু আল্লাহ নিশ্চিত করে বলছেন যে, তারা এটা কখনোই করতে পারবে না। আর যদি না পারে, তাহলে তাদের জাহান্নামের আগুনকে ভয় করা উচিত, যা অবিশ্বাসী বা কাফেরদের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
৯. দশটি সূরার সমকক্ষ আনতে চ্যালেঞ্জ (সূরা হুদ, ১১:১৩)
চ্যালেঞ্জটি আরও বড় করা হয়েছে। এবার শুধু একটি নয়, দশটি সূরার সমকক্ষ আনতে বলা হয়েছে।
📖 সূরা হুদ (১১:১৩) এর মূল বার্তা:
"তারা কি বলে, সে (মুহাম্মদ ﷺ) নিজে বানিয়ে নিয়েছে? বলুন: তবে তোমরা আল্লাহ ছাড়া যার সাধ্য আছে তাকে ডেকে আনো এবং এর মতো দশটি গড়া সূরা তৈরি করে আনো—যদি সত্যবাদী হও।"
সহজ ভাষায়: আবারও সেই অভিযোগের জবাব। আল্লাহ বলছেন, যদি তোমাদের মনে হয় যে মুহাম্মদ (সা.) নিজেই কুরআন বানিয়েছেন, তাহলে তোমরা আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে ডেকে নিয়ে এসো। তারপর কুরআনের মতো দশটি সূরা বানিয়ে দেখাও, যদি তোমরা তোমাদের দাবিতে সত্যবাদী হও! এই চ্যালেঞ্জও কেউ পূরণ করতে পারেনি।
১০. পূর্ণ কুরআনের সমকক্ষ আনতে চ্যালেঞ্জ (সূরা ইসরা, ১৭:৮৮)
সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি হলো, পুরো কুরআনের সমকক্ষ কিছু তৈরি করা।
📖 সূরা ইসরা (১৭:৮৮) এর মূল বার্তা:
"বলে দিন: যদি মানুষ ও জিন একত্র হয়ে এই কুরআনের অনুরূপ কিছু আনতে চেষ্টাও করে, তবে তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না, যদিও তারা একে অন্যের সহযোগী হয়।"
সহজ ভাষায়: আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করছেন যে, শুধু মানুষ নয়, জিন জাতিও যদি একত্রিত হয়ে যায় এবং তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়েও এই কুরআনের মতো কিছু তৈরি করতে চায়, তবুও তারা সফল হতে পারবে না। এর কারণ হলো, কুরআন কোনো মানুষের বা জিনের রচনা নয়, এটি সরাসরি আল্লাহর বাণী।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী (সূরা আজ-যুমার, ৩৯:৬৫)
এই চ্যালেঞ্জগুলো শুধু অবিশ্বাসী বা সংশয়বাদীদের জন্য নয়, স্বয়ং নবীদের জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে এক সতর্কবাণী রয়েছে।
📖 সূরা আজ-যুমার (৩৯:৬৫) এর মূল বার্তা:
"আর অবশ্যই আপনার প্রতি এবং আপনার আগের নবীদের প্রতিও অহী করা হয়েছিল যে, যদি আপনি শরীক করেন/কোন কিছু যুক্ত করেন তবে অবশ্যই আপনার কর্ম /আমল ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং আপনি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।"
সহজ ভাষায়: এই আয়াতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের জানাচ্ছে যে, স্বয়ং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি এবং তাঁর আগের সমস্ত নবীদের প্রতি এই একই ওহী নাযিল হয়েছিল যে, যদি তারা আল্লাহর বাণীতে কোনো রকম পরিবর্তন বা সংযোজন করেন, তাহলে তাদের সমস্ত ভালো কাজ ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং তারা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কালামে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা স্বয়ং নবীদেরও নেই।
এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, কুরআন আল্লাহ তায়ালার এক অপরিবর্তনীয় ও অলৌকিক কালাম। এর সুরক্ষা স্বয়ং আল্লাহ নিয়েছেন এবং কেউ এর কোনো অংশ পরিবর্তন, বিকৃতি বা সংশোধন করতে পারবে না। এটি এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী গ্রন্থ, যার সমকক্ষ কিছু তৈরি করা মানুষ ও জিন কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই, আমাদের উচিত এই পবিত্র গ্রন্থকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে গ্রহণ করা এবং এর শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করা।
─── ・ 。゚☆:
*.☽ .* :☆゚. ───
যেখানে আল্লাহর রাসূলকে এমন হুমকি দেয়া হয়েছে:
জগতসমূহের রবের পক্ষ থেকে অবতরণ। আর যদি সে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু কথা বানিয়ে বলত; অবশ্যই আমরা তাকে ডানহাতে ধরতাম। এরপর তার থেকে হৃদপিণ্ডের প্রধান ধমনী অবশ্যই কেটে দিতাম। তখন তোমাদের মধ্য থেকে তার ক্ষেত্রে রক্ষাকারী কেউই নেই- সূরা আল হাক্কাহ ৪৩-৪৭
সেখানে আল্লাহর কালামের অপরিবর্তনীয়তা এবং এক দু:সাহসিক চ্যালেঞ্জের অপচেষ্টা করলো কে বা কারা?
আল্লাহর পবিত্র কালাম—তাঁর বাণী, শব্দ বা আয়াতের কোনো অংশই পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিকল্প তৈরি, বিকৃতি বা সংশোধন করার ক্ষমতা সৃষ্টির কারো নেই। এই অমোঘ সত্য স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা বহু আয়াতে ঘোষণা করেছেন। তিনি নিজেই এই পবিত্র গ্রন্থের সংরক্ষণকারী এবং এর ত্রুটিমুক্ততা ও অদ্বিতীয়তা নিশ্চিত করেছেন।
শুধু তাই নয়, আল্লাহ তায়ালা সমগ্র মানবজাতি ও জিনকে সম্মিলিতভাবে এক দু:সাহসিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন: যদি তারা সত্যবাদী হয়, তবে কুরআনের ক্ষুদ্রতম একটি সূরার সমকক্ষ কিছু তৈরি করে দেখাক। তিনি নিশ্চিত করে বলেছেন যে, তাদের পক্ষে এটা কখনোই সম্ভব নয়। এই চ্যালেঞ্জ প্রমাণ করে যে, কুরআন এমন এক গ্রন্থ যা মানুষের সৃষ্টি নয় এবং এর কোনো অংশও মানুষের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়। এটি অদ্বিতীয়, অলৌকিক এবং সরাসরি আল্লাহর বাণী।
তবে, চরম আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষ কতটা জাহেল (অজ্ঞ) হলে আল্লাহর এই স্পষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোকে উপেক্ষা করতে পারে! এমন সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ আল্লাহর সেই দু:সাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহন করার চেষ্টা করলো। কিন্তু কে বা কারা এই অপচেষ্টা করলো?
এরা তারাই, যারা মনুষ্য রচিত বিভিন্ন বর্ণনা, যা সাধারণত 'হাদীস' বা 'সুন্নাহ' নামে পরিচিত, সংগ্রহ করেছে, সংরক্ষণ করেছে এবং প্রচার করেছে। তারা এই বর্ণনাগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যেন তা আল্লাহর কালামের মতোই অভ্রান্ত এবং অনুসরণযোগ্য, অথবা ক্ষেত্রবিশেষে কোরআনের আয়াতের চাইতেও অধিক গুরুত্ব ও কর্তৃত্ব প্রদান করে। এই কাজগুলো প্রকারান্তরে আল্লাহর চ্যালেঞ্জকে প্রত্যাখ্যান করা এবং তাঁর কালামের উপর মানবীয় বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করার এক জঘন্য অপচেষ্টা।
আল্লাহর চ্যালেঞ্জ এবং মানুষের অজ্ঞতা
আমরা পূর্ববর্তী আলোচনায় দেখেছি যে, আল্লাহ তায়ালা কুরআনের একাধিক আয়াতে (যেমন: সূরা ইউনুস ১০:১৫, সূরা আল-আন‘আম ৬:৩৪, ৬:১১৫, সূরা আল-কাহফ ১৮:২৭, সূরা আল-হিজর ১৫:৯, সূরা ফুসসিলাত ৪১:৪১-৪২) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর বাণীতে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিকৃতি সম্ভব নয়। তিনি নিজেই এর সংরক্ষণকারী।
শুধু তাই নয়, তিনি সমগ্র সৃষ্টিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন:
মাত্র একটি সূরার সমকক্ষ আনতে (সূরা ইউনুস ১০:৩৮, সূরা বাকারাহ ২:২৩-২৪): "যদি তোমরা সন্দেহ পোষণ করো আমি আমার বান্দার প্রতি যা নাযিল করেছি, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে এসো।" এবং আল্লাহ নিশ্চিত করেছেন, "কিন্তু যদি তোমরা তা করতে না পারো – আর তোমরা কখনোই তা করতে পারবে না..."
দশটি সূরার সমকক্ষ আনতে (সূরা হুদ ১১:১৩): "...এর মতো দশটি গড়া সূরা তৈরি করে আনো—যদি সত্যবাদী হও।"
পূর্ণ কুরআনের সমকক্ষ আনতে (সূরা ইসরা ১৭:৮৮): "যদি মানুষ ও জিন একত্র হয়ে এই কুরআনের অনুরূপ কিছু আনতে চেষ্টাও করে, তবে তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না, যদিও তারা একে অন্যের সহযোগী হয়।"
এই চ্যালেঞ্জগুলো প্রমাণ করে যে, কুরআন এমন এক গ্রন্থ যা মানুষের সৃষ্টি নয় এবং এর কোনো অংশও মানুষের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়। এটি অদ্বিতীয়, অলৌকিক এবং স্বয়ং আল্লাহর কালাম।
তবে, চরম আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষ কতটা জাহেল (অজ্ঞ) হলে আল্লাহর এই স্পষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোকে উপেক্ষা করতে পারে! এমন সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ মনুষ্য রচিত বিভিন্ন বর্ণনা (যাকে 'হাদীস' বা 'সুন্নাহ' বলা হয়) সংগ্রহ করে, সংরক্ষণ করে এবং প্রচার করে, যেখানে তারা পরোক্ষভাবে আল্লাহর কালামের সমকক্ষতা দাবি করে অথবা ক্ষেত্রবিশেষে কোরআনের আয়াতের চাইতেও অধিক গুরুত্ব প্রদান করে।
কথিত হাদীসকে কোরআনের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া জঘন্য অপরাধ:
যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশ্বাস করে যে, অমুক মনুষ্য রচিত হাদীস বা বর্ণনা আল্লাহর কালামের মতোই অভ্রান্ত এবং অনুসরণযোগ্য, অথবা যখন তারা এমন কোনো হাদীসকে অগ্রাধিকার দেয় যা কোরআনের স্পষ্ট আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক, তখন তারা এক জঘন্য অপরাধ করে। এটি মূলত আল্লাহর বাণীর উপর মানবীয় বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করার শামিল।
এর কয়েকটি গুরুতর দিক রয়েছে:
১. আল্লাহর চ্যালেঞ্জকে অস্বীকার করা: আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, কোরআনের সমকক্ষ কিছু তৈরি করা অসম্ভব। যখন কোনো কথিত হাদীসকে কোরআনের মতোই বা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, তখন প্রকারান্তরে আল্লাহর এই চ্যালেঞ্জকে অস্বীকার করা হয়। এটি হলো, আল্লাহর কথার উপর মানুষের ধারণাকে প্রাধান্য দেওয়া।
২. আল্লাহর কালামকে বিকৃত করার চেষ্টা: আমরা দেখেছি যে, সূরা আজ-যুমারের ৬৫ নং আয়াত (৩৯:৬৫) অনুযায়ী, স্বয়ং নবীদেরও আল্লাহর বাণীতে কিছু যোগ বা বাদ দেওয়ার অধিকার ছিল না। আল্লাহ বলেছেন, "...যদি আপনি শরীক করেন/কোন কিছু যুক্ত করেন তবে অবশ্যই আপনার কর্ম /আমল ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং আপনি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।" অর্থাৎ, আল্লাহর কালামের সাথে অন্য কোনো বাণীতে 'শরীক' করা হলে তা জঘন্য অপরাধ। কথিত হাদীসকে কোরআনের সমকক্ষ মনে করা এক প্রকার "শরীক" করা।
৩. ইসলামের মৌলিক ভিত্তিকে দুর্বল করা: ইসলাম আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর কালামের চূড়ান্ত কর্তৃত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। যখন অন্য কোনো উৎসকে আল্লাহর কালামের সমান্তরাল বা তার চেয়েও প্রভাবশালী হিসেবে দেখা হয়, তখন ইসলামের এই মৌলিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
৪. কোরআনের বিরুদ্ধে নতুন বিধান সৃষ্টি: কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, কথিত হাদীসের নামে এমন সব বিধান বা ধারণা পেশ করা হয় যা কোরআনের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক অথবা কোরআনে যার কোনো ভিত্তি নেই। এটি আল্লাহর কিতাবে এমন কিছু যুক্ত করার শামিল, যা তিনি অনুমোদন করেননি।
৫. বিভ্রান্তি ও ফিতনা সৃষ্টি: যখন কোরআনের স্পষ্ট আয়াত বাদ দিয়ে বা সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে কথিত হাদীসের উপর নির্ভর করা হয়, তখন মুসলিম উম্মাহর মধ্যে মতবিরোধ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। কোরআন হলো মুসলিমদের ঐক্যের ভিত্তি। এই ভিত্তি থেকে সরে গেলে বিভেদ অনিবার্য।
─── ・ 。゚☆: *.☽ .* :☆゚. ───
বিকৃতি ও বিকল্প আবিস্কারের একটি জলন্ত উদাহরন:
‘সালামুন আলাইকুম’ বনাম ‘আসসালামু আলাইকুম’ (জানতে এখানে ক্লিক করুন-
উপসংহার
আল্লাহ তায়ালা কোরআনকে মানবজাতির জন্য এক সুস্পষ্ট পথনির্দেশিকা হিসেবে নাযিল করেছেন। এটি এমন এক গ্রন্থ, যা সকল সন্দেহ, ভুল এবং বিকৃতি থেকে মুক্ত। মানুষের জন্য একমাত্র হেদায়েতের উৎস হলো এই কোরআন।
যারা আল্লাহর এই অমোঘ সত্যকে উপেক্ষা করে, কথিত হাদীস বা সুন্নাহর নামে মনুষ্য রচিত বর্ণনাগুলোকে কোরআনের সমকক্ষ বা তার চেয়েও উপরে স্থান দেয়, তারা নিজেদের চরম অজ্ঞতার পরিচয় দেয়। এটি শুধু একটি ভুল নয়, বরং আল্লাহর কালামের প্রতি এক জঘন্য অপরাধ এবং তাঁর সুস্পষ্ট চ্যালেঞ্জের প্রতি অবজ্ঞা। আমাদের উচিত, সকল প্রকার বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে কেবল আল্লাহর কিতাব আল-কোরআনকে আঁকড়ে ধরা এবং এর আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনা করা। এটিই প্রকৃত হেদায়েত এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পথ।