সূরা আল-আন'আম (৬:১১৬) : "আর যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চল, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। তারা কেবল ধারণার অনুসরণ করে এবং কেবল অনুমানভিত্তিক কথা বলে।" (10:66)
এখানে "আল্লাহর পথ" বলতে বোঝানো হয়েছে সত্য, সঠিক নির্দেশনা এবং কেবলমাত্র কোরআন ভিত্তিক জীবন পদ্ধতি, যা সংখ্যাগরিষ্ঠের মনগড়া ধারণা বা অনুমান থেকে ভিন্ন হতে পারে। এটি বোঝায় যে, আল্লাহর পথ হলো সুস্পষ্ট ও প্রমাণিত সত্য।
আল-কোরআনে "সাবিলিল্লাহ" বা "আল্লাহর পথ" শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে এবং এর অর্থ সেই নির্দিষ্ট আয়াতের প্রেক্ষাপট অনুসারে পরিবর্তিত বা পরিপূরক হয়। তবে মূল ধারণাটি একই থাকে: আল্লাহর নির্দেশিত পথ, যা সত্য, ন্যায় এবং তাঁর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়।
এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়াত এবং সেগুলোর প্রেক্ষাপট সহ "আল্লাহর পথ" এর বিভিন্ন দিক উল্লেখ করা হলো:
1. আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় (সাদাকা ও দান):
"সাবিলিল্লাহ" প্রায়শই আল্লাহর উদ্দেশ্যে দান-সাদাকা বা সম্পদ ব্যয়ের প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়।
সূরা আল-বাকারা (২:২৬১): "যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা হলো একটি শস্যবীজের মতো, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রতিটি শীষে একশ শস্যদানা। আর আল্লাহ যাকে চান, তার জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।"
এখানে "আল্লাহর পথে" বলতে বোঝানো হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান, জনকল্যাণমূলক কাজ এবং দ্বীনের প্রচারে অর্থ ব্যয়। এটি একটি ব্যাপক ধারণা, যেখানে যেকোনো সৎকাজে অর্থ ব্যয় করা সাবিলিল্লাহর অংশ হতে পারে।
সূরা আত-তাওবা (৯:৬০): "সাদাকাত (যাকাত) তো কেবল ফকির, মিসকীন, আর তাতে নিযুক্ত কর্মচারী, যাদের অন্তর ঝোঁকানো হয় (ইসলামের প্রতি), দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (আভিযানকারী) এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরয। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।"
এই আয়াতে যাকাতের আটটি খাতের একটি হলো "ফী সাবিলিল্লাহ" বা "আল্লাহর পথে"। এখানে এর অর্থ ব্যাপক। এটি হতে পারে দ্বীন প্রচার, আল্লাহর পথে সংগ্রাম, জ্ঞান অর্জন বা অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজ যা আল্লাহর দ্বীনের স্বার্থে করা হয়। এর অর্থ শুধুমাত্র যুদ্ধের জন্য ব্যয় নয়।
2. আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুতি (পথভ্রষ্টতা):
কোরআন "আল্লাহর পথ" থেকে বিচ্যুত হওয়ার বিষয়েও সতর্ক করে, যা নির্দেশ করে যে এই পথটি একটি সুনির্দিষ্ট ও সঠিক পথ।
সূরা আল-আন'আম (৬:১১৬) : "আর যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চল, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। তারা কেবল ধারণার অনুসরণ করে এবং কেবল অনুমানভিত্তিক কথা বলে।"
এখানে "আল্লাহর পথ" বলতে বোঝানো হয়েছে সত্য, সঠিক নির্দেশনা এবং কোরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক জীবন পদ্ধতি, যা সংখ্যাগরিষ্ঠের মনগড়া ধারণা বা অনুমান থেকে ভিন্ন হতে পারে। এটি বোঝায় যে, আল্লাহর পথ হলো সুস্পষ্ট ও প্রমাণিত সত্য।
সূরা আন-নিসা (৪:১৬৭): "যারা কুফরী করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে, নিশ্চয় তারা চরম পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়েছে।"
এখানে "আল্লাহর পথ" হলো ইসলামের সঠিক দাওয়াত ও হেদায়েত, যা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখা পথভ্রষ্টতা।
৪. আল্লাহর পথ অনুসরণ করা :
সাধারণভাবে, "আল্লাহর পথ" অনুসরণ করা মানেই ইসলামী জীবনযাপন করা।
সূরা আল-আ'রাফ (৭:৮৬): "আর তোমরা প্রতিটি পথে (মানুষকে) হুমকি দিও না এবং আল্লাহর পথ থেকে যারা ঈমান এনেছে তাদের ফিরিয়ে দিও না এবং তাতে বক্রতা খুঁজতে চেও না..."
এখানে "আল্লাহর পথ" হলো ইসলামের হেদায়েত এবং সৎ জীবনযাপন পদ্ধতি, যা মানুষ গ্রহণ করতে চায়। এতে বক্রতা খোঁজা বা মানুষকে বাধা দেওয়া নিষেধ করা হয়েছে।
আল্লাহর পথের (ফি সাবিলিল্লাহ) এর বিপরীত পথকে বলা হয়েছে সাবিলুল মুযরিমিন (অপরাধীদের পথ)-আয়াত ৬:৫৫ যেটি আল-কুরআন অনুযায়ী মুসলিমের বিপরীত (দ্র: আয়াত ৬৮:৩৫, ১০:৮২, ১০:৭৫)
5. জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে সংগ্রাম):
এটি সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহারগুলির মধ্যে একটি, যেখানে "সাবিলিল্লাহ" প্রায়শই শারীরিক সংগ্রাম বা প্রতিরক্ষার অর্থে ব্যবহৃত হয়, তবে এর ব্যাপক অর্থ হলো আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।
সূরা আল-বাকারা (২:১৯০): "আর তোমরা আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তবে সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।"
এখানে "আল্লাহর পথে" বলতে বোঝানো হয়েছে ন্যায্য যুদ্ধ বা আত্মরক্ষা, যা আল্লাহর আদেশ দ্বারা অনুমোদিত, তবে এর সাথে সীমালঙ্ঘন না করার শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
সূরা আল-বাকারা (২:২৪৪): "আর তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।"
এই আয়াতেও যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে "আল্লাহর পথে" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা সংগ্রামকে বোঝায়।
"জিহাদান কাবিরা": মহা জিহাদ (সর্বাত্তক চেষ্টা) "জিহাদান কাবিরা" (جِهَادًا كَبِيرًا) শব্দটি কোরআনের মাত্র একটি আয়াতে সরাসরি উল্লেখিত হয়েছে, যা হলো:
সূরা আল-ফুরকান ২৫:৫২ (৫০:৪৫)
فَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَجَاهِدْهُم بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا
"অতএব, তুমি কাফিরদের আনুগত্য করো না এবং এর (কোরআনের) সাহায্যে তাদের বিরুদ্ধে মহা জিহাদ করো।" (আল-কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ-৫০:৪৫)
এখানে "জিহাদান কাবিরা" অর্থ হলো "মহা জিহাদ" বা "বড় জিহাদ" সর্বাত্তক চেষ্টা)।
এই আয়াতের অনুধাবন:
এখানে "জিহাদ" শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং "কাবিরা" (মহা/বড়) শব্দটি এর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই জিহাদের প্রকৃতি শারীরিক যুদ্ধের চেয়েও গভীর ও বিস্তৃত।
বিশেষভাবে "জিহাদান কাবিরা" বলতে যা বোঝানো হয়েছে:
১. কোরআনের মাধ্যমে জিহাদ (দাওয়াহ ও প্রমাণের জিহাদ): আয়াতের মধ্যে "بِهِ" (বিহী) শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার অর্থ হলো "এর দ্বারা" বা "এর সাহায্যে"। এখানে "এর" দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল-কোরআন (দ্র: যিকির মানে কুরআন দ্বারা ২৫:৫০, ৫০:৪৭)। অর্থাৎ, কোরআনের আয়াতসমূহ, তার যুক্তি, প্রমাণ, হেদায়েত এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে কাফিরদের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও কুযুক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। এটি হলো দাওয়াতের জিহাদ, যেখানে যুক্তির মাধ্যমে, উপদেশ দিয়ে এবং কোরআনের বাণী পৌঁছে দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়।
২. সচেতনতামূলক জিহাদ: এটি অজ্ঞতা, মিথ্যাচার এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কোরআনের আলোকবর্তিকা দিয়ে সংগ্রাম করা। সমাজে কোরআনের বিধান ও শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সর্বাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক ও দাওয়াতি প্রচেষ্টা।
৩. নফসের জিহাদ (আত্মিক জিহাদ): যদিও এই আয়াত সরাসরি নফসের জিহাদের কথা বলছে না, তবে কোরআনের মাধ্যমে পরিচালিত এই মহা জিহাদ পরোক্ষভাবে ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি এবং কোরআনের শিক্ষায় নিজেকে সজ্জিত করার উপরও গুরুত্ব দেয়। কারণ, নিজে কোরআনের গুণে গুণান্বিত না হলে এর মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়া কঠিন। (দ্র: আয়াত ৯২:১৮, ৭৪:৫৪-৫৫, ৭৬:২৯, ৭৩:১৯)
৪. অবিরাম ও ব্যাপক প্রচেষ্টা: "কাবিরা" শব্দটি এই জিহাদের ব্যাপকতা, গভীরতা এবং অবিরাম প্রচেষ্টাকে নির্দেশ করে। এটি কেবল কোনো ছোটখাটো বা সীমিত প্রচেষ্টা নয়, বরং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি নিরলস ও সর্বাত্মক সংগ্রাম।
শারীরিক জিহাদের সাথে সম্পর্ক:
যদিও "জিহাদান কাবিরা" এই আয়াতে মূলত কোরআনের মাধ্যমে পরিচালিত দাওয়াতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদকে বোঝায়, তবে এর অর্থ শারীরিক জিহাদের প্রয়োজনীয়তাকে বাতিল করে না। কোরআনে প্রয়োজনে মুসলিমদের আত্মরক্ষা ও অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশও রয়েছে। কিন্তু এই নির্দিষ্ট আয়াতটি দাওয়াতের গুরুত্ব এবং কোরআনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে পরিচালিত জিহাদকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে, যা অনেকে বলে থাকেন "আকবরুল জিহাদ" (সবচেয়ে বড় জিহাদ) যেটি কি-না আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের বয়ানে বলা হয়েছে ’জিহাদান কাবিরা’ হিসাবে।
সুতরাং, সূরা আল-ফুরকানের ২৫:৫২ আয়াতেই "জিহাদান কাবিরা" শব্দটি রয়েছে, এবং এর মূল অর্থ হলো কোরআনের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যাপক দাওয়াত, যুক্তি ও প্রমাণের জিহাদ।
৫. আল্লাহর পথ সহজ ও সরল:
সূরা আল-কাহফ (১৮:২৯): "আর বল, 'সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং যে চায়, সে ঈমান আনুক আর যে চায়, সে কুফরি করুক।' নিশ্চয় আমরা যালিমদের জন্য আগুন প্রস্তুত করেছি, যার প্রাচীর তাদেরকে বেষ্টন করে ফেলবে। আর যদি তারা ফরিয়াদ করে, তবে তাদেরকে এমন পানি দিয়ে সাহায্য করা হবে যা গলিত তামার মতো, যা মুখমণ্ডল ঝলসে দেবে। কতই না মন্দ পানীয়! আর কতই না মন্দ বিশ্রামস্থল!"
যদিও এই আয়াতে সরাসরি "সাবিলিল্লাহ" শব্দটি নেই, তবে "সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে" উক্তিটি আল্লাহর পথকেই নির্দেশ করে, যা স্পষ্ট এবং সহজবোধ্য।
৬. আল্লাহর পথে আহ্বান (দাওয়াত):
সূরা আন-নাহল (১৬:১২৫): "তুমি তোমার রবের পথের দিকে আহ্বান করো হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়। নিশ্চয় তোমার রব ভালো জানেন কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তিনি ভালো জানেন কে হেদায়াতপ্রাপ্ত।"
এখানে "তোমার রবের পথ" বলতে বোঝানো হয়েছে ইসলামের দিকে দাওয়াত বা আহ্বান, যা প্রজ্ঞা ও উত্তম পন্থায় করতে হবে।
সারসংক্ষেপ:
কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের রেফারেন্সে "আল্লাহর পথ" (আন ছাবিলিল্লাহ) বলতে নিম্নলিখিত প্রধান বিষয়গুলো বোঝানো হয়েছে:
আল্লাহর নির্দেশিত সত্য দ্বীন ইসলাম।
আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলা ।
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের জান-মাল দিয়ে প্রচেষ্টা (জিহাদ)।
দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে সকল প্রকার প্রচেষ্টা।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সৎ কাজ করা।
সকল প্রকার পাপাচার, কুফরি ও শিরক থেকে বিরত থাকা।
৬:১১৬ আয়াতে উল্লেখিত "আল্লাহর পথ" বিশেষভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সঠিক হেদায়েত ও জ্ঞান কে নির্দেশ করে, যা মানুষের মনগড়া ধারণা বা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে ভিন্ন।