আল-কোরআনের বর্ণনায়: নবী-রাসুল ও মনোনীত বান্দাদের পারিবারিক চিত্র:
আল-কোরআনের আয়াতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইঙ্গিতের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে।
১. যাদের সন্তান থাকার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে (পিতৃত্বের প্রমাণ):
কোরআনের আয়াতে এই নবীদের ‘পিতা’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে অথবা তাদের সন্তানদের কথা সরাসরি বলা হয়েছে।
1. সালামুন আলা আদম: তাঁর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। (সুরা মায়েদা: ২৭-৩১)
2. সালামুন আলা নূহ: প্লাবনের সময় তিনি তাঁর এক অবাধ্য পুত্রকে নৌকায় ডাক দিয়েছিলেন। (সুরা হূদ: ৪২-৪৩)
3. সালামুন আলা ইবরাহিম: বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর কাছে দুআ করে তিনি সালামুন আলা ইসমাইল ও সালামুন আলা ইসহাক-কে লাভ করেছিলেন। (সুরা ইবরাহিম: ৩৯)
3. সালামুন আলা লূত: কওমের হাত থেকে মেহমানদের বাঁচাতে তিনি নিজের ‘কন্যাদের’ বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। (সুরা হূদ: ৭৮)
4. সালামুন আলা ইয়াকুব): সালামুন আলা ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের পিতা। সন্তানরা তাঁকে ‘হে আমাদের বাবা’ বলে সম্বোধন করত। (সুরা ইউসুফ)
5. সালামুন আলা দাউদ: তাঁর উত্তরাধিকারী ও পুত্র হিসেবে সালামুন আলা সুলায়মান-এর নাম এসেছে। (সুরা নামল: ১৬; সুরা সদ: ৩০)
6. সালামুন আলা আইয়ুব: দীর্ঘ রোগভোগের পর আল্লাহ তাঁকে তাঁর পরিবার ও সন্তানাদি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। (সুরা আম্বিয়া: ৮৪)
7. সালামুন আলা লুকমান (হাকিম): তিনি তাঁর পুত্রকে ‘হে বতস’ বলে জ্ঞানগর্ভ উপদেশ দিয়েছিলেন। (সুরা লুকমান: ১৩)
8. সালামুন আলা জাকারিয়া: বার্ধক্যে আল্লাহর কাছে চাওয়ার পর তিনি পুত্র সালামুন আলা ইয়াহইয়া-এর সুসংবাদ পান। (সুরা মারইয়াম: ৭)
9. সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা.):
পুত্র সন্তান: কোরআন স্পষ্ট করেছে যে তিনি কোনো পুরুষের পিতা নন। (সুরা আহযাব: ৪০)
কন্যা সন্তান: তবে আয়াতে তাঁকে তাঁর ‘কন্যাদের’ (বানাতিকা) পর্দা করার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে কন্যা সন্তানের পিতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (সুরা আহযাব: ৫৯)
▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣
২. যারা কোরআনের বর্ণনায় ‘নিঃসন্তান’:
কোরআনের বিশেষ শব্দচয়ন ও ঘটনার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী এদের নিজস্ব কোনো সন্তান ছিল না।
1. সালামুন আলা ইয়াহইয়া: আল্লাহ তাঁকে ‘হাসুর’ (নারীদের প্রতি আসক্তিহীন/সংযমী) বিশেষণে ভূষিত করেছেন, যা তাঁর বৈরাগ্য ও নিঃসন্তান থাকার প্রমাণ। (সুরা আলে-ইমরান: ৩৯)
2. সালামুন আলা ঈসা: পিতা ছাড়া অলৌকিক জন্ম। কোরআনে তাঁর স্ত্রী বা সন্তানের কোনো উল্লেখ নেই।
3. ফেরাউনের স্ত্রী: শিশু মুসাকে দেখে তিনি বলেছিলেন, “একে হত্যা করো না, হয়তো আমরা একে ‘পুত্র’ হিসেবে গ্রহণ করব।” এটি তাঁর নিঃসন্তান থাকার ইঙ্গিত। (সুরা কাসাস: ৯)
4. আযীযের স্ত্রী: তিনিও সালামুন আলা ইউসুফ-কে দাস হিসেবে কেনার সময় একই কথা বলেছিলেন— “আমরা একে ‘পুত্র’ হিসেবে গ্রহণ করে নেব।” (সুরা ইউসুফ: ২১)
▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣
৩. যাদের ‘পরিবার’ (আহল) ছিল কিন্তু সন্তানের বিষয়ে কোরআন ‘নীরব’:
কোরআনে এদের স্ত্রী বা পরিবারের কথা উল্লেখ করা হলেও, সুনির্দিষ্টভাবে কোনো সন্তানের কথা বলা হয়নি।
▶ সালামুন আলা মুসা: তিনি মাদায়েন থেকে ফেরার সময় ‘সপরিবারে’ (আহলিহি) যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু সেই কাফেলায় কোনো সন্তান ছিল কি না, তা উল্লেখ নেই। (সুরা কাসাস: ২৯)
▶ সালামুন আলা ইউসুফ: তিনি মিশরের রাজপ্রাসাদে পিতা-মাতাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর নিজের স্ত্রী বা সন্তানের কথা আয়াতে উল্লেখ নেই।
▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣
৪. যাদের সন্তান বা পরিবারের কোনো সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই:
কোরআনে এদের নাম ও নবুওয়াতের আলোচনা থাকলেও সন্তান-সন্ততির ব্যাপারে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
1. সালামুন আলা হূদ
2. সালামুন আলা সালিহ
3. সালামুন আলা শুআয়ব
4. সালামুন আলা ইদরিস
5. সালামুন আলা হারুন
6. সালামুন আলা ইউনুস
7. সালামুন আলা ইসমাইল (বংশধর আছে, কিন্তু তাঁর নিজের কোনো পুত্রের নাম কোরআনে সরাসরি উল্লেখ নেই)
▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣
▣ দত্তক পুত্র ও পালক সন্তান বিষয়ক কোরআনিক বিধান: The ruling on adopted sons and foster children:
আল-কোরআনের বর্ণনায় ‘দত্তক পুত্র বা পালক সন্তান’ হিসেবে গ্রহণ করার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে এমন ঘটনাগুলো নিচে আয়াত ও রেফারেন্সসহ তালিকাভুক্ত করা হলো।
কোরআনে মূলত ৪টি প্রধান ঘটনার উল্লেখ রয়েছে যেখানে ‘কাউকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ’ (ইত্তিখাযুল ওয়ালাদ) বা লালন-পালনের দায়িত্ব (কাফালা) নেওয়ার বিষয় এসেছে।
১. ফেরাউনের স্ত্রী কর্তৃক সালামুন আলা মুসা-কে দত্তক গ্রহণ:
শিশু সালামুন আলা মুসা-কে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার পর তিনি যখন ফেরাউনের প্রাসাদের ঘাটে পৌঁছান, তখন ফেরাউনের স্ত্রী (ইমারাতুন ফেরআউন) তাঁকে হত্যা না করে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহণ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন।
◆ দত্তক গ্রহণকারী: ফেরাউনের স্ত্রী (মুমিন নারী)।
◆ যাকে গ্রহণ করা হয়েছে: সালামুন আলা মুসা।
◆ উদ্দেশ্য: নিঃসন্তান থাকায় চোখের শীতলতা ও উপকারের আশায় পুত্র হিসেবে গ্রহণ।
আয়াত:
"ফেরাউনের স্ত্রী বলল, ‘এ শিশু আমার ও তোমার চোখের শীতলতা। তাকে হত্যা করো না। হতে পারে সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নেব।’ অথচ তারা পরিণাম জানত না" -(সুরা আল-কাসাস: ৯)
২. মিশরের আযীয (মন্ত্রী) কর্তৃক সালামুন আলা ইউসুফ-কে দত্তক গ্রহণ:
সালামুন আলা ইউসুফ-কে কুপ থেকে উদ্ধার করে যখন মিশরের বাজারে বিক্রি করা হলো, তখন যিনি তাঁকে কিনেছিলেন (মিশরের আযীয বা মন্ত্রী), তিনি তাঁর স্ত্রীকে এই বালককে যত্ন নিতে এবং পুত্র হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেছিলেন।
আয়াত:
মিশরের যে ব্যক্তি তাকে (সালামুন আলা ইউসুফকে) ক্রয় করল, সে তার স্ত্রীকে বলল, ‘এর থাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা কর। সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নেব।’..."(সুরা ইউসুফ: ২১)
3. সালামুন আলা জাকারিয়া কর্তৃক সালামুন আলা মারইয়াম-এর অভিভাবকত্ব গ্রহণ (কাফালা):
এটি সরাসরি ‘পুত্র/কন্যা হিসেবে দত্তক’ নেওয়া নয়, বরং ‘লালন-পালনের দায়িত্ব’ বা অভিভাবকত্ব গ্রহণ। কোরআনে একে ‘কাফালা’ বলা হয়েছে। সালামুন আলা মারইয়ামের বাবা ইমরান মারা যাওয়ার পর সালামুন আলা জাকারিয়া তাঁর দায়িত্ব নেন।
আয়াত:
"...আর আল্লাহ তাকে (মারইয়ামকে) উত্তমভাবে লালন-পালন করলেন এবং জাকারিয়াকে তার তত্ত্বাবধায়ক (অভিভাবক) বানালেন..." -(সুরা আলে-ইমরান: ৩৭)
4. আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ কর্তৃক জায়েদ (রা.)-কে পালন:
রাসুলুল্লাহ (সা.) জায়েদ (রা.)-কে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে নিজের পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়-মক্কাবাসীরা তাঁকে ‘জায়েদ বিন মুহাম্মদ’ বলে ডাকত। কিন্তু কোরআনের আয়াতে আল্লাহ এই ‘পিতার নামের সম্পর্ক’ বাতিল করে দেন এবং জায়েদ (রা.)-এর নাম উল্লেখ করে বিধান নাযিল করেন।
◆কোরআনিক সিদ্ধান্ত: পালক পুত্র নিজের সন্তান নয়; তাকে তার আসল পিতার পরিচয়ে ডাকতে হবে।
আয়াত (জায়েদের নাম উল্লেখ):
"...অতঃপর জায়েদ যখন তার (স্ত্রীর) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম। যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা (পালক পুত্ররা) তাদের স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে তাদেরকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোনো দ্বিধা না থাকে..." — (সুরা আল-আহযাব: ৩৭)
আয়াত (বিধান):
"...আর তিনি তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে (পালক পুত্রদের) তোমাদের প্রকৃত পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র... তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত" — (সুরা আল-আহযাব: ৪-৫)
▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣
দত্তক পুত্র ও পালক সন্তান বিষয়ক কোরআনিক বিধান: The ruling on adopted sons and foster children:
কোরআন পালক পুত্রকে ‘আপন সন্তান’ ডাকার প্রথা বাতিল করেছে এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
ক. মুখের কথায় সন্তান হয় না:
কাউকে ‘বেটা’ ডাকলেই সে সন্তান হয়ে যায় না; এগুলো মানুষের মুখের কথা মাত্র। আল্লাহ রক্ত সম্পর্ককেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। (সুরা আহযাব: ৪)
খ. সঠিক পরিচয় দেওয়ার নির্দেশ: পিতার নামে ডাকতে হবে
পালক পুত্রদের তাদের প্রকৃত পিতার নামে ডাকতে হবে।
◆ যদি পিতার নাম জানা না থাকে, তবে তারা হবে ‘দ্বীনি ভাই’ (ইখওয়ানু কুম ফিদ-দ্বীন) অথবা ‘বন্ধু/আশ্রিত’ (মাওয়ালিকুম)। (সুরা আহযাব: ৫)
গ. নবী মুহাম্মদ (সা.) -এর জীবনে বাস্তব উদাহরণ (জায়েদ রা.-এর ঘটনা):
কোরআনে একমাত্র সাহাবী হিসেবে জায়েদ (রা.)-এর নাম উল্লেখ করে আল্লাহ একটি প্রথা ভেঙেছেন।◆ নবীর পালক পুত্র জায়েদ তাঁর স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর আল্লাহ নবীকে সেই নারীকে বিবাহ করার নির্দেশ দেন।
উদ্দেশ্য: এটা প্রমাণ করা যে, পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা বৈধ (যা আপন পুত্রের ক্ষেত্রে হারাম)। (সুরা আহযাব: ৩৭)
ঘ. চূড়ান্ত ঘোষণা
“মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী।” (সুরা আহযাব: ৪০)
এর মাধ্যমে পালক সন্তানের ‘উত্তরাধিকার’ ও ‘বংশনাম’ দাবি করার পথ চিরতরে বন্ধ করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপ:
১. সালামুন আলা মুসা - পালক মা: ফেরাউনের স্ত্রী (সুরা কাসাস: ৯)।
২. সালামুন আলা ইউসুফ - পালক বাবা: মিশরের আযীয (সুরা ইউসুফ: ২১)।
৩. সালামুন আলা জায়েদ - পালক বাবা: মুহাম্মদ (সা.) (সুরা আহযাব: ৩৭)।
৪. সালামুন আলা মারইয়াম - অভিভাবক:সালামুন আলা জাকারিয়া (সুরা আলে-ইমরান: ৩৭)।