কোরআনুল কারিমের আয়াতসমূহ থেকে দত্তক বা পালক সন্তান (Adoption) এবং অভিভাবকত্ব (Kafala) সংক্রান্ত বিধান ও উদাহরণগুলো বিস্তারিতভাবে নিচে তুলে ধরা হলো। এখানে শুধুমাত্র কোরআনের আয়াতের অনুবাদ ব্যবহার করা হয়েছে।
আল-কোরআনে পালক সন্তান বিষয়ক বিধি-বিধান (রুলিং):
অনুধাবনে আসে হয়তো পূর্বে একদা পালক পুত্রকে নিজের ঔরসজাত সন্তানের মর্যাদা দেওয়া হতো। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা কোরআনের মাধ্যমে সেই প্রথা বাতিল করে নতুন বিধান দিয়েছেন। বিধানগুলো নিম্নরূপ:
১. পালক সন্তান প্রকৃত সন্তান নয় এবং তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকতে হবে:
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, মুখের কথায় কাউকে সন্তান ডাকলে সে প্রকৃত সন্তান হয়ে যায় না। ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাদের আসল পিতার নামেই ডাকতে হবে।
আয়াত:
"...আর তিনি (আল্লাহ) তোমাদের পালক পুত্রদেরকে তোমাদের প্রকৃত পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। আল্লাহ সত্য কথাই বলেন এবং তিনিই সরল পথ প্রদর্শন করেন।"
"তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে (আসল বাবার নামে) ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত। যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জান, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই ও বন্ধু..."
(সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪-৫)
২. পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ করার বৈধতা:
পালক সন্তান যে নিজের রক্তের সম্পর্কের সন্তানের মতো নয়, তা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আল্লাহ তাআলা পালক পুত্রের তালাক দেওয়া স্ত্রীকে বিবাহ করা পালক পিতার জন্য বৈধ করেছেন।
আয়াত:
"...অতঃপর যায়েদ (পালক পুত্র) যখন তার (স্ত্রীর) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল (তালাক দিল), তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম; যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে, তাদেরকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোনো বিঘ্ন না থাকে। আর আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।"
(সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৭)
৩. মাহরাম বা যাদের বিবাহ করা হারাম (সেখানে পালক সন্তানের স্ত্রীর কথা নেই):
যাদের সাথে বিবাহ হারাম, সেই তালিকায় আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র ‘ঔরসজাত’ (নিজের জন্ম দেওয়া) পুত্রের স্ত্রীদের উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে পালক পুত্রের স্ত্রীকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতা থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে।আয়াত:
"...আর তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীগণ (তোমাদের জন্য বিবাহ করা হারাম)..."
(সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৩)
৪. বংশীয় সম্পর্কের চূড়ান্ত ঘোষণা:
রাসূল (সা.) বা কোনো ব্যক্তি পালক সন্তানের প্রকৃত পিতা নন, তা নিশ্চিত করে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে নবুওয়াতের মর্যাদা এবং বংশীয় সম্পর্কের স্বচ্ছতা রক্ষা করা হয়েছে।
আয়াত:
"মুহাম্মদ তোমাদের কোনো ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আর আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।"
(সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪০)
সারসংক্ষেপ:
১. পালক পুত্র প্রকৃত পুত্র নয়।
২. তাদের আসল বাবার নামে ডাকতে হবে।
৩. পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ করা (পালক পিতার জন্য) বৈধ।
৪. বিবাহ হারাম হওয়ার বিধান শুধুমাত্র নিজের ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣ ▣
আল-কোরআনে বর্ণিত দত্তক গ্রহণ বা অভিভাবকত্বের (Kafala) উদাহরণ:
কোরআনে এমন ৪টি প্রধান ঘটনার উল্লেখ রয়েছে যেখানে ‘কাউকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ’ (ইত্তিখাযুল ওয়ালাদ) বা লালন-পালনের দায়িত্ব (কাফালা) নেওয়ার বিষয় এসেছে। নিচে ঘটনাগুলো আয়াতসহ উল্লেখ করা হলো:
১. ফেরাউনের স্ত্রী কর্তৃক সালামুন আলা মুসা-কে দত্তক গ্রহণ:
শিশু সালামুন আলা মুসা-কে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার পর তিনি যখন ফেরাউনের প্রাসাদের ঘাটে পৌঁছান, তখন ফেরাউনের স্ত্রী তাঁকে হত্যা না করে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহণ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন।
❖ দত্তক গ্রহণকারী: ফেরাউনের স্ত্রী (ইমরাআতু ফেরআউন। ❖ যাকে গ্রহণ করা হয়েছে: সালামুন আলা মুসা। ❖ উদ্দেশ্য: নিঃসন্তান থাকায় চোখের শীতলতা ও উপকারের আশায় পুত্র হিসেবে গ্রহণ।আয়াত:
আর ফিরআউনের স্ত্রী বলল, আমার জন্য ও তোমার জন্য চোখের শীতলতা, তোমরা তাকে হত্যা কোরো না। আশা করা যায় যে, সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাকে সন্তান হিসাবে গ্রহণ করব। অথচ তারা (এর) পরিণাম জানত না। (সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৯)
২. মিশরের আযীয (মন্ত্রী) কর্তৃক সালামুন আলা ইউসুফ -কে দত্তক গ্রহণ:
সালামুন আলা ইউসুফ-কে কুপ থেকে উদ্ধার করে যখন মিশরের বাজারে বিক্রি করা হলো, তখন যিনি তাঁকে কিনেছিলেন (মিশরের আযীয), তিনি তাঁর স্ত্রীকে এই বালককে যত্ন নিতে এবং পুত্র হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেছিলেন।
❖ দত্তক গ্রহণকারী: মিশরের আযীয (মন্ত্রী)।
❖ যাকে গ্রহণ করা হয়েছে: সালামুন আলা ইউসুফ।
আয়াত:
"মিশরের যে ব্যক্তি তাকে (ইউসুফকে) ক্রয় করল, সে তার স্ত্রীকে বলল, ‘এর থাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা কর। সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নেব’..."
(সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২১)
৩. সালামুন আলা জাকারিয়া কর্তৃক সালামুন আলা মারইয়াম-এর অভিভাবকত্ব গ্রহণ (কাফালা):
এটি সরাসরি ‘পুত্র/কন্যা’ হিসেবে গ্রহণ নয়, বরং ‘লালন-পালনের পূর্ণ দায়িত্ব’ বা অভিভাবকত্ব গ্রহণ। কোরআনে একে ‘কাফালা’ শব্দ দ্বারা বোঝানো হয়েছে। সালামুন আলা মারইয়াম-এর বাবা ইমরান মারা যাওয়ার পর সালামুন আলা জাকারিয়া তাঁর দায়িত্ব নেন।
❖ অভিভাবক: সালামুন আলা জাকারিয়া।
❖ যার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে: সালামুন আলা মারইয়াম।
আয়াত:
"...আর আল্লাহ তাকে (মারইয়ামকে) উত্তমভাবে লালন-পালন করলেন এবং জাকারিয়াকে তার তত্ত্বাবধায়ক (অভিভাবক) বানালেন..."
(সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৩৭)
৪. রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক জায়েদ (রা.)-কে পালন ও বিধান পরিবর্তন:
ইতিহাস থেকে জানা যায়-মক্কাবাসীরা তাঁকে ‘জায়েদ বিন মুহাম্মদ’ বলে ডাকত। কিন্তু পরবর্তীতে কোরআনের আয়াতে আল্লাহ এই ‘পিতার নামের সম্পর্ক’ বাতিল করে দেন এবং জায়েদ (রা.)-এর নাম উল্লেখ করে বিধান নাযিল করেন। এটিই কোরআনের একমাত্র স্থান যেখানে কোনো সাহাবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
❖কোরআনিক সিদ্ধান্ত: পালক পুত্র নিজের সন্তান নয়; তাকে তার আসল পিতার পরিচয়ে ডাকতে হবে।
আয়াত (জায়েদের নাম উল্লেখ ও বিবাহের বিধান):
"...অতঃপর জায়েদ যখন তার (স্ত্রীর) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম। যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা (পালক পুত্ররা) তাদের স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে তাদেরকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোনো দ্বিধা না থাকে..."
(সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৭)
আয়াত (পিতৃপরিচয়ের বিধান):
"...আর তিনি তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে (পালক পুত্রদের) তোমাদের প্রকৃত পুত্র করেননি... তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত।"
(সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪-৫)