আল কুরআনে "জন্ম নিয়ন্ত্রণ" (Birth Control) বা "পরিবার পরিকল্পনা" (Family Planning) শব্দগুলো সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। তাই এই বিষয়ে সরাসরি কোনো হ্যাঁ বা না-সূচক আয়াত খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে, কুরআনের কিছু সুস্পষ্ট নির্দেশ এবং মূলনীতি রয়েছে যা থেকে এই বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
আমরা বিষয়টিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি:
প্রথম ভাগ: যা সরাসরি নিষিদ্ধ:
আয়াত ১: সূরা আল-ইসরা (১৭:৩১)
আয়াত ২: সূরা আল-আনআম (৬:১৫১)
৩. আল কুরআনের নীরবতা এবং তার অর্থ কী দাড়ায়!
কুরআন 'আযল' (প্রত্যাহারের মাধ্যমে জন্ম নিয়ন্ত্রণ) বা অন্য কোনো গর্ভনিরোধক পদ্ধতি নিয়ে সরাসরি কথা বলেনি। ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের একটি নীতি হলো, যে বিষয়ে কুরআন সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, তা মৌলিকভাবে বৈধতার পরিসরে থাকে।
অনুধাবন:
কুরআন যেখানে সন্তান হত্যার মতো বিষয়ে এতটা সোচ্চার, সেখানে জন্ম প্রতিরোধের মতো একটি প্রচলিত বিষয়ে এর নীরবতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদি আল্লাহ জন্ম প্রতিরোধকে হারাম করতে চাইতেন, তবে তিনি তা সুস্পষ্টভাবেই বলতেন। এই নীরবতা প্রমাণ করে যে, জন্ম প্রতিরোধ করা এবং হত্যা করাকে আল্লাহ এক করে দেখেননি।
2.
দ্বিতীয় ভাগ: যে মূলনীতিগুলো থেকে অনুমতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়:
"আল্লাহ কোনো ব্যক্তির উপর তার
গভীর অনুধাবন:
আয়াত: সূরা আল-বাকারা (২:১৯৫) "...এবং তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না ..."
মূলনীতি-৩: সন্তানের সঠিক প্রতিপালন ও ব্যবধান
কুরআনের নীরবতার তাৎপর্য:
দ্বীনি জ্ঞানতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, যে বিষয়ে আল কোরআনে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই, তা মৌলিকভাবে কখনও কখনও বৈধ বলেই বিবেচিত হয়। 'আযল' প্রথাটি কুরআন নাযিলের সময় আরবে প্রচলিত ছিল। যদি আল্লাহ এই প্রথাটিকে শিরক, ব্যভিচার বা সন্তান হত্যার মতো হারাম বা নিষিদ্ধ করতে চাইতেন, তবে তিনি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট আয়াত নাযিল করতেন।
কুরআন যে বিষয়ে নীরব, অথচ তা সমাজে প্রচলিত ছিল, সেই নীরবতাটিই একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে।
গভীর অনুধাবন:
পার্থক্য: আল্লাহ এখানে 'হত্যা' (قَتْل) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। 'আযল' হলো জন্মকে প্রতিরোধ করার একটি প্রচেষ্টা, যা কোনোভাবেই একটি বিদ্যমান জীবনকে 'হত্যা' করার সমতুল্য নয়। কুরআন এই দুটির মধ্যে একটি বিশাল পার্থক্য করেছে—একটিকে কঠোর ভাষায় নিষিদ্ধ করেছে, আর অন্যটি সম্পর্কে নীরব থেকেছে।
আযল' (عزل) কি ? আযল শব্দটি আল কোরআনে আছে কী?
সরাসরি নিষেধাজ্ঞা: কুরআন শুধুমাত্রসন্তান হত্যাকে (গর্ভধারণের পর) হারাম করেছে।সরাসরি কোনো নির্দেশ নেই: জন্মপ্রতিরোধ করার বিষয়ে কুরআন সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা বা অনুমতি দেয়নি। বিষয়টি নীরবতার আওতায় পড়ে।মূলনীতির প্রয়োগ: কুরআনের মূলনীতি—যেমন ব্যক্তির সাধ্যাতীত বোঝা না চাপানো, জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা করা, এবং সন্তানের উত্তম প্রতিপালনের জন্য বিরতি নেওয়া—বিবেচনা করলে, যৌক্তিক ও স্বাস্থ্যগত কারণে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করা কুরআনের চেতনার পরিপন্থী নয়।
─── ・ 。゚☆: *.☽ .* :☆゚. ───
দায়িত্বপালন বড়ই কঠিন!
তবে বিয়ের পূর্বেই যে বিষয়ে পাত্র-পাত্রী/অভিভাবককে তাদের সুচিন্তিত গভীর ভাবনায় থাকা উচিৎ:
এই নির্দেশনাটি সূরা আন-নূর, আয়াত নম্বর ৩৩ এ রয়েছে।
আয়াতটি নিম্নরূপ:
وَلْيَسْتَعْفِفِ ٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغْنِيَهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضْلِهِۦ...
"আর যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, তারা যেন সংযম (পবিত্রতা) অবলম্বন করে; যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন..."
আয়াতের গভীর অনুধাবন:
এই আয়াতটি গভীর অর্থ ও নির্দেশনা বহন করে। একে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বোঝা যেতে পারে:
১. কাদের জন্য এই নির্দেশনা?
নির্দেশনাটি তাদের জন্য, "যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে না" (ٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا)।
এই "অসামর্থ্য" বা "অপারগতা" বিভিন্ন রকম হতে পারে:
আর্থিক অক্ষমতা: মোহরানা প্রদান, স্ত্রীর ভরণপোষণ এবং একটি পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্যের অভাব।
অন্যান্য পারিপার্শ্বিক অসুবিধা: যেমন উপযুক্ত (আয়াতে বিশ্বাসী মুসলিম) সঙ্গী না পাওয়া, শারীরিক অযোগ্যতা অথবা এমন কোনো পরিস্থিতি যা বিয়ের জন্য অনুকূল নয়। আপনার উল্লিখিত "অক্ষমতা-অযোগ্যতা-অপারগতা" সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।
২. মূল নির্দেশনা কী?
মূল নির্দেশনা হলো: "তারা যেন সংযম অবলম্বন করে" (وَلْيَسْتَعْفِفِ)।
ইয়াস্তা'ফিফ (يَسْتَعْفِفِ) শব্দটি এসেছে ইফফাহ (عِفَّة) থেকে, যার অর্থ হলো— আত্মসংযম, পবিত্রতা রক্ষা করা, নিজেকে সব ধরনের অশ্লীল ও হারাম কাজ (যেমন—ব্যভিচার, পর্নোগ্রাফি, অবৈধ সম্পর্ক) থেকে কঠোরভাবে বিরত রাখা।
অর্থাৎ, সামর্থ্য না থাকা পর্যন্ত বিয়ে বহির্ভূত সব ধরনের যৌন চাহিদা পূরণ থেকে নিজেকে রক্ষা করে ধৈর্য ধরতে বলা হয়েছে।
৩. এই ধৈর্যের শেষ কোথায়? (আল্লাহর প্রতিশ্রুতি):
আয়াতে একটি অসাধারণ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে: "যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন" (حَتَّىٰ يُغْنِيَهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضْلِهِۦ)।
এটি শুধু একটি নির্দেশ নয়, বরং এর সাথে একটি আশার বাণীও রয়েছে। আল্লাহ বলছেন যে, যারা এই কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করবে এবং পবিত্র থাকবে, তিনি নিজ অনুগ্রহে তাদের সেই অক্ষমতা ও অভাব দূর করে দেবেন এবং তাদের জন্য পথ খুলে দেবেন।
এটি আল্লাহর উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখার এক দারুণ শিক্ষা।
আয়াতের প্রেক্ষাপট:
এই আয়াতের ঠিক আগের আয়াতে (সূরা নূর: ৩২) সমাজ ও অভিভাবকদেরকে অবিবাহিতদের বিয়ে দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। এরপর এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে, সামাজিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যদি কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে সামর্থ্য অর্জন করতে না পারে, তবে তার করণীয় হলো ধৈর্য ও পবিত্রতা রক্ষা করা।
সুতরাং, আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, সূরা আন-নূরের ৩৩ নম্বর আয়াতটিই সেই আয়াত, যেখানে বিয়ের সামর্থ্য না থাকা পর্যন্ত ধৈর্য ও আত্মসংযমের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সারসংক্ষেপ: কুরআনের আলোকে সিদ্ধান্ত:
হারাম: সন্তান গর্ভে আসার পর তাকে হত্যা করা বা দারিদ্র্যের ভয়ে জন্ম নেওয়া শিশুকে হত্যা করা সুস্পষ্টভাবে হারাম ও মহাপাপ।
অনুমোদিত (শর্তসাপেক্ষে): জন্ম প্রতিরোধ করা বা পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করা সরাসরি নিষিদ্ধ নয়। বরং, কুরআনের মূলনীতি (মায়ের স্বাস্থ্য রক্ষা, সন্তানদের সঠিক প্রতিপালন, সাধ্যাতীত বোঝা এড়ানো) বিবেচনায় এটি একটি অনুমোদিত ও যৌক্তিক কাজ হতে পারে।
উদ্দেশ্যই মূল: জন্ম নিয়ন্ত্রণের পেছনের উদ্দেশ্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল হারিয়ে ফেলা, তবে তা নিন্দনীয়। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় একটি সুস্থ, সবল ও আদর্শ পরিবার গঠন, তবে তা কুরআনের শিক্ষার পরিপন্থী নয়।
সুতরাং, কুরআন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা দেয়, যা একদিকে জীবনের পবিত্রতাকে সম্মান করে এবং অন্যদিকে মানবীয় বাস্তবতা, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক কল্যাণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়।
Video
আর নূহ বলল! হে
আমার রব! কাফিরদের মধ্য থেকে কোনো গৃহবাসীকে আপনি পৃথিবীর ওপর ছাড় দেবেন না। অবশ্য
আপনি যদি তাদের ছেড়ে দেন, তারা আপনার বান্দাদের বিভ্রান্ত করবে। আর তারা কাফির পাপাচারী
ছাড়া জন্ম দেয় না। হে আমার রব! আপনি আমার জন্য ও আমার পিতামাতার জন্য এবং যে মুমিন
হিসাবে আমার ঘরে প্রবেশ করবে তার জন্য আর মুমিন পুরুষদের ও মুমিন নারীদের জন্য ক্ষমা
করে দিন। আর আপনি জালিমদেরকে বাড়িয়ে দেবেন না, ধ্বংস ছাড়া-71:26-28
