সঙ্গীত-মিউজিক-গান করা: Music-সীমানা! আল কোরআন অনুধাবনে-

আধুনিক সমাজে সঙ্গীত বা মিউজিক এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর বৈধতা ও সীমানা নিয়ে মুসলিম সমাজে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক প্রচলিত রয়েছে। এই বিতর্কের গভীরে যাওয়ার আগে মূল উৎসের দিকে ফিরে তাকানো অপরিহার্য। একজন মুসলিমের জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি হলো আল-কুরআন। সঙ্গীত বা গান নিয়ে কুরআন সরাসরি "হালাল" বা "হারাম" শব্দটি ব্যবহার না করলেও এমন কিছু শক্তিশালী মূলনীতি ও নির্দেশনা প্রদান করেছে, যা আমাদের এই বিষয়ে একটি স্বচ্ছ ধারণা লাভে সাহায্য করে। এই প্রবন্ধে আমরা কোনো ব্যক্তিগত মতামত বা প্রচলিত ব্যাখ্যাকে প্রাধান্য না দিয়ে, শুধুমাত্র আল-কুরআনের আয়াতগুলোর আলোকে সঙ্গীত ও গানের বিষয়টি অনুধাবনের চেষ্টা করব।    


মূল বিষয়: আল-কুরআনে "সঙ্গীত" (আরবীতে 'موسيقى' বা 'غناء') শব্দ ব্যবহার করে একে সরাসরি হালাল বা হারাম ঘোষণা করা হয়নি। অর্থাৎ, এমন কোনো আয়াত নেই যেখানে বলা হয়েছে, "তোমরা সঙ্গীত শ্রবণ করো না" বা "সঙ্গীত হারাম"।

সুতরাং, আমাদের কুরআনের সাধারণ নীতি ও প্রাসঙ্গিক আয়াতের ইংগিত থেকে বিষয়টি বুঝতে হবে।

অডিও/ভিডিও (পোষ্টের নিচের দিকে)

1. 'লাগ্‌ও' বা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা মুমিনের বৈশিষ্ট্য

সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১-৩:

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ... وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ

অর্থ: "অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ... এবং যারা 'লাগ্‌ও' (অনর্থক/بیهوده বিষয়) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।"

কুরআনভিত্তিক অনুধাবন:

'আল-লাগ্‌ও' (اللَّغْوِ): এই শব্দটি আরও ব্যাপক। এর মধ্যে পড়ে— ফালতু কথাবার্তা। অপ্রয়োজনীয় ও অর্থহীন কাজ। গীবত, পরনিন্দা, অশ্লীল রসিকতা।

যে কোনো কাজ যা ইহকাল বা পরকালে কোনো উপকার বয়ে আনে না।

কুরআন এখানে সফল মুমিনদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে "লাগ্‌ও" থেকে বিরত থাকাকে উল্লেখ করেছে। এর মানে হলো, একজন মুমিনের জীবন উদ্দেশ্যপূর্ণ। সে তার সময়, শক্তি ও মনোযোগ এমন কাজে ব্যয় করে যা অর্থবহ ও কল্যাণকর। অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করা সফলতার পথের বাধা।

2. 'যুর' (মিথ্যা) এবং 'লাগ্‌ও' (بیهوده) স্থান এড়িয়ে চলা

সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭২:

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا

অর্থ: "এবং (রহমানের বান্দা তারা) যারা 'যুর' (মিথ্যা বা বাতিল কর্ম)-এর সাক্ষী হয় না (বা উপস্থিত থাকে না) এবং যখন তারা কোনো 'লাগ্‌ও' (بیهوده কাজ)-এর সম্মুখীন হয়, তখন তারা আত্মসম্মানের সাথে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।"

কুরআনভিত্তিক অনুধাবন:

'আয-যুর' (الزُّورَ): এর প্রধান অর্থ মিথ্যা, তবে এর পরিধি আরও বিস্তৃত। এর দ্বারা এমন স্থান বা সমাবেশকেও বোঝানো হয় যেখানে মিথ্যা, শিরক, অশ্লীলতা বা আল্লাহর অবাধ্যতা হচ্ছে। রহমানের বান্দারা সচেতনভাবে এসব স্থান এড়িয়ে চলে।

'মাররু কিরামা' (مَرُّوا كِرَامًا): "আত্মসম্মানের সাথে পাশ কাটিয়ে যায়"—এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুমিন শুধু নিজে অনর্থক কাজ করে না, বরং অন্যের অনর্থক কাজের সম্মুখীন হলে তাতে লিপ্ত না হয়ে আত্মমর্যাদা সহকারে সেখান থেকে সরে আসে। সে এসবের দ্বারা প্রভাবিত হয় না।

3. অজ্ঞদের অনর্থক কথার জবাবে মুমিনের আচরণ

সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৫৫:

"এবং তারা যখন بیهوده কথা শোনে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, 'আমাদের কাজের ফল আমাদের জন্য এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের জন্য। তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সাথে জড়াতে চাই না'।

কুরআনভিত্তিক অনুধাবন:
এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, একজন মুমিনের মানসিকতা কতটা উন্নত। সে অনর্থক বা উসকানিমূলক কথায় কান দেয় না বা বিতর্কে জড়ায় না।
সে নিজের কর্ম ও সময়ের মূল্য বোঝে এবং অন্যের অজ্ঞতায় অংশীদার না হয়ে শান্তি ও সম্মানের সাথে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়।

৪. ভালো ও মন্দ শিল্পকর্মের পার্থক্য: কবিদের উদাহরণ

কুরআন শিল্প ও তার প্রভাব নিয়ে একটি চমৎকার নীতিমালা দিয়েছে সূরা আশ-শু'আরা-তে কবিদের প্রসঙ্গে।

"এবং কবিদের—তাদের অনুসরণ করে তারা, যারা পথভ্রষ্ট। তুমি কি দেখো না যে, তারা প্রত্যেক উপত্যকায় উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়? এবং তারা যা বলে, তা করে না? তবে তারা ব্যতীত, যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করেছে...।" (সূরা আশ-শু'আরা, ২৬:২২৪-২২৭)

শিল্পীর দায়বদ্ধতা: কুরআন এখানে সব কবিকে এক কাতারে ফেলেনি। এটি সেই কবিদের নিন্দা করেছে যারা লাগামহীন কল্পনা ও কথার ফুলঝুরিতে মানুষকে বিভ্রান্ত করে, কিন্তু নিজেরা সৎপথে চলে না।

ঈমানদার শিল্পীর প্রশংসা: পক্ষান্তরে, যে শিল্পীরা ঈমানদার, সৎকর্মশীল এবং যাদের শিল্পকর্ম আল্লাহকে স্মরণ করায়, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে।

এই নীতি সরাসরি গানের গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যে গান বা সঙ্গীত মানুষকে ঈমান, নৈতিকতা ও সৎকর্মের দিকে অনুপ্রাণিত করে, তা প্রশংসার যোগ্য। আর যা মানুষকে বিভ্রান্তি, অনৈতিকতা ও আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে, তা নিন্দনীয়।

6. সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত ৩২ (সাধারণ অনুমতির নীতি):

"বলুন, 'আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্য ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে?'"

  • কুরআনভিত্তিক বিশ্লেষণ: এই আয়াতটি একটি সাধারণ নীতি প্রতিষ্ঠা করে যে, আল্লাহ প্রদত্ত সৌন্দর্য এবং উত্তম ও পবিত্র জিনিসগুলো মূলত হালাল, যতক্ষণ না কোনো সুস্পষ্ট দলিল দ্বারা তা হারাম প্রমাণিত হয়।

  • এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সুন্দর সুর বা শিল্পকে আল্লাহর দেওয়া একটি সৌন্দর্য হিসেবে দেখা যেতে পারে, যদি তা কুরআনের অন্য কোনো নীতি (যেমন অশ্লীলতা বা শিরক বর্জন) লঙ্ঘন না করে।

কুরআনের সার্বজনীন মূলনীতি:

কুরআন কোনো নির্দিষ্ট কাজের তালিকা দিয়ে হালাল-হারাম নির্ধারণের চেয়ে বরং কিছু মৌলিক নীতি দিয়েছে। সেই নীতিগুলো হলো:

উদ্দেশ্য ও প্রভাব: যেকোনো কাজের মূল বিচার্য বিষয় হলো তার উদ্দেশ্য (Purpose) এবং প্রভাব (Impact)। কাজটি কি মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করছে নাকি তাঁর দিকে নিয়ে যাচ্ছে?

সময়ের মূল্য: সময় একজন মুমিনের জন্য অমূল্য সম্পদ। 'লাগ্‌ও' বা অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করা এই সম্পদের অপচয়, যা কুরআনের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়।

মুমিনের চরিত্র: একজন মুমিনের ব্যক্তিত্ব হবে উন্নত, আত্মমর্যাদাশীল ও উদ্দেশ্যপূর্ণ। ফালতু, অসার ও অর্থহীন কাজ তার চরিত্রের সাথে বেমানান।

সক্রিয় বর্জন: শুধু নিজে অনর্থক কাজ না করাই যথেষ্ট নয়, বরং এমন পরিবেশ বা আলোচনা এড়িয়ে চলাও ঈমানের দাবি যেখানে অনর্থক ও বাতিল বিষয় চর্চা হয়।

সুতরাং, সঙ্গীত হোক বা অন্য যেকোনো কাজ—যদি তা এই নীতিগুলোর বিরুদ্ধে যায়, অর্থাৎ অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন, উপকারহীন এবং মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুতকারী হয়, তবে কুরআন তা থেকে বিরত থাকতে জোরালোভাবে নিরুৎসাহিত করে।

শুধুমাত্র কুরআনের ভিত্তিতে সারসংক্ষেপ:

কেবলমাত্র কুরআনের পাঠ থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি:

১. মাধ্যম নয়, বিষয়বস্তু ও প্রভাবই মূল: কুরআন সঙ্গীত বা কোনো শিল্প মাধ্যমকে ঢালাওভাবে হারাম করেনি। বরং এর বিষয়বস্তু (content), উদ্দেশ্য (purpose) এবং প্রভাব (impact)-এর উপর ভিত্তি করে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে।

২. যা নিষিদ্ধ:
* যে কথা বা সুর মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে (সূরা লুকমান)।

* যাতে মিথ্যা, শিরক বা অশ্লীলতা রয়েছে (সূরা ফুরকান)।

* যা অনর্থক (লাগ্‌ও) এবং মুমিনের আত্মমর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক (সূরা ফুরকান)।

৩. যা অনুমোদিত হতে পারে:
* যে শিল্প বা কথা ঈমান, সৎকর্ম এবং আল্লাহর স্মরণের কথা বলে (সূরা আশ-শু'আরা-এর নীতি)।

* যা আল্লাহর দেওয়া সৌন্দর্য ও পবিত্রতার সীমার মধ্যে থাকে (সূরা আ'রাফ)।

সুতরাং, শুধুমাত্র কুরআনের আলোকে সঙ্গীতের বিষয়টি সাদা বা কালো নয়, বরং এটি একটি ধূসর এলাকা যেখানে মানদণ্ড হলো এর বার্তা এবং প্রভাব। কুরআন আমাদের বিচার করার জন্য নীতি দিয়েছে, ঢালাওভাবে কোনো রায় দেয়নি।

অডিও/ভিডিও

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post