🔗 কখনও তোমরা পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা সেটা হতে ব্যয় করবে যা তোমরা ভালবাস। আর তোমরা যা কিছু হতে ব্যয় করো, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সে ব্যাপারে বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন-সূরা আল ইমরান ৩:৯২ (২:১৭৭, ২:১৮৯)
─── ・ 。゚☆: *.☽ .* :☆゚. ───
➥ আমার সম্পদ, আমার ইচ্ছা?
➥ অর্থ ও সম্পদ ব্যয়ের নির্ধারিত খাতসমূহ: আল-আল-কোরআন অনুধাবনে (যাকাত ও সদকা)
➥ অর্থ-সম্পদ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় করবেন? জেনে নিন কুরআনের নির্দেশনা-
➥ সম্পদ ব্যয়ের মূলনীতি: না কৃপণতা, না অপচয়? কুরআন বাতলে দিচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ পথ-
সম্পদ ব্যয়ের খাতসমূহ এবং সাদাকার খাত কি কি?
আল্লাহর কাছে গ্রহনযোগ্য করতে হলে নিজ ইচ্ছেমত নয়, কারন বলা হয়েছে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের বাতলে দেয়া নাযিলকৃত বিধান একমাত্র আল কুরআন ভিত্তিক হতে হবে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু তা'আলা আল কোরআনে আমাদের সম্পদ কোথায় এবং কাদের জন্য ব্যয় করতে হবে, তার একটি সুস্পষ্ট এবং ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। আসুন, কেবলমাত্র কোরআনের আয়াত থেকে জেনে নিই সেই খাতগুলো।
ব্যয়ের অগ্রাধিকার তালিকা:
১. নিজের ও পরিবারের জন্য ব্যয়:
স্ত্রী, সন্তান ও নিজের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা পুরুষের অন্যতম দায়িত্ব -সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৩৩
২. পিতা-মাতা:
তাদের ভরণ-পোষণ ও সেবা করা সন্তানের অবশ্যকর্তব্য। (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২১৫; সূরা আন-নিসা, ৪:৩৬)
৩. নিকটাত্মীয়:
রক্ত-সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনদের প্রয়োজনে তাদের পাশে দাঁড়ানো-আয়াত ২:২১৫, ৪:৩৬, ২:১৭৭, ৩০:৩৮, ৪:৮,১৭:২৬
৪. এতিম: (সাদাকা খাত):
পিতৃহীন শিশুদের প্রতিপালন ও তাদের অধিকার রক্ষা করা-আয়াত ২:১৭৭, ৭৬:৮, ২:২১৫, ৪:৮
৫. মিসকিন ও ফকির: (সাদাকা খাত):
সমাজের অভাবগ্রস্ত, নিঃস্ব ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটানো-২:২৭৩, ৯:৬০, ২:২১৫, ২:১৭৭, ৩০:৩৮, ৪:৮, ১৭:২৬।
ফকির ও মিসকীনের মধ্যে পার্থক্য কী? আল কুরআন অনুধাবনে (Faqir-Misken)
5.1. এমন ফকির (দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত):
যারা আল্লাহর দ্বীনের কাজে (ফি সাবিলিল্লাহ) নিজেদের উৎসর্গ করার কারণে অভাব অনাটনে মানুষের কাছে মিনতি করে চায় না- আয়াত২:২৭৩
7. প্রতিবেশী:
নিকট ও দূর-প্রতিবেশীর বিপদে-আপদে খোঁজখবর রাখা ও সাহায্য করা। (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৬)
8. মুসাফির (ইবনুস সাবিল):
সফররত অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বিপদগ্রস্ত বা নিঃস্ব হয়ে পড়লে তাকে সাহায্য করা- আয়াত ৯:৬০; ২:১৭৭, ১৭:২৬
9. সাহায্যপ্রার্থী:
যারা সরাসরি নিজেদের প্রয়োজনের কথা জানিয়ে সাহায্য চায়, তাদের ফিরিয়ে না দেওয়া। (সূরা আল-বাকারাহ, ২:১৭৭, সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:১৯, 70:24-25 )
10. বঞ্চিত:
যারা অভাবী হওয়া সত্ত্বেও আত্মসম্মানের কারণে চাইতে পারে না, তাদের খুঁজে বের করে সাহায্য করা- আয়াত ৫১:১৯, 70:24-25, 2:273
11. দাস বা বন্দিমুক্তি :
কোনো ব্যক্তিকে দাসত্ব, বন্দিদশা বা অন্যায্য আটক থেকে মুক্ত করা-আয়াত ৯:৬০, ২:১৭৭, 90:13
(এমন অবস্থা নাযিলকৃত একমাত্র আল্লাহর বিধান জানারও ফুরসত পায় না যারা)
12. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি:
ঋণের বোঝায় জর্জরিত ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত হতে সাহায্য করা (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৬০) ।
13. সাবিল-পথিক/ "ফি সাবিলিল্লাহ" (আল্লাহর পথে):
আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করতে যেকোনো সৎ ও জনকল্যাণমূলক কাজে (যেমন: আল্লাহর দ্বীনের জ্ঞানার্জন, প্রচার (আয়াত ৯৬:১, ৩৯:৯), সামাজিক উন্নয়ন- "আল্লাহর পথে" কাজের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ) ব্যয় করা- আয়াত ৯:৬০, ৩০:৩৮, ২:২৬১।
14. সাদাকা আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারী:
(সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৬০)
15. যাদের অন্তর আকর্ষণ করা প্রয়োজন:
16. অভাবের দিনে খাদ্য খাওয়ানো/ খাদ্যদান করার খাতসমূহ:
1. মিসকিন (দারিদ্র্যক্লিষ্ট বা দুর্দশাগ্রস্ত):
(আল-ইনসান-76:৮-৯, (সূরা আল বালাদ 90:14) [দ্র: ১০৭:১-৭]
2. এতিম (পিতৃহীন/অভিভাবকহীন অবুঝ শিশু):
(আল-ইনসান-76:৮) [দ্র: ১০৭:১-৭]
3. ইয়াতিমকে [কোনো নিকটাত্মীয়]
(সূরা আল বালাদ 90:14)
4. বন্দী (যুদ্ধবন্দী বা যে কোনো কারণে আটক ব্যক্তি):
(আল-ইনসান-76:৮)
·͙⁺˚*•̩̩͙✩•̩̩͙*˚⁺‧͙⁺˚*•̩̩͙✩•̩̩͙*˚⁺‧͙⁺˚*•̩̩͙✩•̩̩͙*˚⁺‧͙
ব্যয়ের পরিমাণ (কত ব্যয় করব?)
আল কোরআনের আলোকে সম্পদ ব্যয়ের খাতগুলোতে কোন খাতে ঠিক কত পরিমাণ ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তরটি কোরআনের একটি মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। কোরআন নির্দিষ্ট সংখ্যা বা শতাংশের চেয়ে ব্যয়ের উদ্দেশ্য, মানসিকতা এবং মূলনীতির উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
১. যাকাত (পরিশুদ্ধি) এবং সাদাকা (দান):
কোরআনে "যাকাত" শব্দটি মূলত পরিশুদ্ধি (purification) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে । সম্পদ থেকে একটি অংশ ব্যয় করা বা 'সাদাকা' প্রদান করা হলো সেই পরিশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যম। আল্লাহ বলেন:
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا...
অর্থ: "তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা গ্রহণ কর, এর দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ (তুযাক্কীহিম) করবে..." (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১০৩)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, 'সাদাকা' হলো সেই কর্ম, যার মাধ্যমে 'যাকাত' বা পরিশুদ্ধি অর্জিত হয়। (যাকাত মানে পরশিুদ্ধি-প্রমাণ ৮৭:১৪, ৯১:৯-১০, ৯:১০৩)
২. বাধ্যতামূলক সাদাকা: "সাদাকা তো কেবল (৮টি খাতের জন্য):
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ ... فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ ...
প্রকৃতপক্ষে সাদাকাসমূহ ফকির ও মিসকীনদের জন্য এবং সে বিষয়ের কর্মচারীদের আর যাদের হৃদয় আকৃষ্ট করার তাদের এবং দাসত্বমুক্তির ও ঋণগ্রস্তদের এবং আল্লাহর পথে ও পথিকদের খাতে, আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ হিসাবে। আর আল্লাহ বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন, প্রজ্ঞাময় (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৬০)
এখানে "ফরয" বা "নির্ধারিত বিধান" শব্দটি বোঝায় যে এটি ঐচ্ছিক নয়, বরং অপরিহার্য। এটি একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। তবে, কোরআনে এই নির্ধারিত সادাকার হার বা পরিমাণ (যেমন: ২.৫%) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এই যাকাতের হার সংশ্লিষ্ট শাসকেরা সুবিধামত ট্যাক্স নির্ধারনের মতো নির্ধারন করে দিয়েছিল এটা আল্লাহর রাসূলও নির্ধারন করেননি। কোরআন একে একটি অপরিহার্য কর্তব্য বলেছে এবং এর খাতগুলো নির্দিষ্ট করে দিয়েছে।
২. হারের প্রশ্ন: মানে কতটুকু সাদাকা বা ব্যয় (ইনফাক) করব?
আল-কোরআন এই 'নির্ধারিত বিধান'-এর খাতগুলো সুনির্দিষ্ট করে দিলেও, এর হার বা পরিমাণ (rate or percentage) কোরআনের কোনো আয়াতে সরাসরি উল্লেখ করেনি।
কোরআন-কেন্দ্রিক এই অনুধাবন অনুসারে, আল্লাহ যেখানে কোনো হার নির্দিষ্ট করে দেননি, সেখানে এটি একটি প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী:
হার নির্ধারণ একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত:
সমাজের সামগ্রিক প্রয়োজন, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং কালের চাহিদা অনুযায়ী একটি ইসলামী রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষ সম্মিলিতভাবে এই হার নির্ধারণ করতে পারে।
এটি আল্লাহর রাসূল নির্ধারণ করেননি: যেহেতু কোরআনে এর কোনো হার উল্লেখ নেই এবং কোরআনই একমাত্র ঐশী বিধানের উৎস, সেহেতু এই হার রাসূল (সা.আ.) কর্তৃক নির্ধারিত নয়, বরং এটি তৎকালীন এবং পরবর্তী শাসকদের একটি প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রয়োজন ভিত্তিক সিদ্ধান্ত ছিল। এটি অনেকটা রাষ্ট্রের কল্যাণকর কর (welfare tax) নির্ধারণের মতোই একটি পরিবর্তনশীল বিষয় হতে পারে, যা সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী কম-বেশি হওয়ার সুযোগ রাখে।
কোরআন একে একটি অপরিহার্য কর্তব্য বলেছে এবং এর খাতগুলো নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, কিন্তু এর প্রয়োগের পরিমাণ নির্ধারণের বিষয়টি মানুষের সম্মিলিত ও প্রশাসনিক কাঠামোর উপর ছেড়ে দিয়েছে।
৩. সাধারণ ব্যয়ের মূলনীতি: "আল-আ'ফওয়া" (যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত):
যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, পরিশুদ্ধির জন্য কী পরিমাণ ব্যয় করতে হবে, তখন কোরআন একটি সার্বজনীন নীতি দিয়েছে:
তারা কী ব্যয় করবে তাও তোমার কাছে জানতে চায়? তুমি বল-
“যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত” (আল-আ'ফওয়া)। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতগুলো পরিষ্কার/সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর। (যাতে তোমরা) দুনিয়া ও আখেরাত সম্বন্ধে (চিন্তা-ভাবনা কর)-সূরা আল-বাকারাহ, ২:২১৯
এটিই সাধারণ ব্যয়ের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, নিজের ও পরিবারের অপরিহার্য প্রয়োজন মেটানোর পর যা উদ্বৃত্ত বা অতিরিক্ত থাকে, তা থেকে ব্যয় করা। এই নীতিটি প্রত্যেককে তার নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী পরিশুদ্ধি অর্জনের সুযোগ দেয়, কোনো নির্দিষ্ট অংকের বোঝা চাপিয়ে দেয় না।
৪. ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্যের নীতি (Check & balance):
কোরআন ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিমাণ নির্ধারণ না করলেও, ব্যয়ের পদ্ধতি নিয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। কৃপণতা ও অপচয় উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
"এবং তারা যখন ব্যয় করে তখন অপচয় করে না, কৃপণতাও করে না, বরং উভয়ের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করে" (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৭)
অর্থ-সম্পদ টাকা-পয়সা ইচ্ছেমত খরচ করা যাবে না:
"তারা বলল, ‘হে শু‘আইব! তোমার সালাত কি তোমাকে এই নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পূর্বপুরুষরা যার উপাসনা করত, আমরা তা বর্জন করব? অথবা আমাদের ধন-সম্পদ সম্পর্কে আমরা যা খুশি তাই করব (তা-ও বর্জন করব)? তুমি তো একজন সহনশীল, সুপথপ্রাপ্ত ব্যক্তি’!"
সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান প্রান্তিকতা—অপচয় (ইসরাফ ও তাবযীর) এবং কৃপণতা (বুখল)—উভয়কেই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বেশ কিছু আয়াত রয়েছে। নিচে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এবং সরাসরি সম্পর্কিত আয়াতগুলো উল্লেখ করা হলো:
১. অপচয় ও অপব্যয় নিষিদ্ধ (Prohibition of waste and extravagance)
ইসলামে অপচয় বা লাগামহীন ব্যয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে সুস্পষ্ট আয়াত হলো:
সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৬-২৭
"আর আত্মীয়-স্বজনকে তার حق দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় (তাবযীর) করো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।"
অনুধাবন: এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা হকদারদের হক আদায়ের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই অপব্যয় করতে নিষেধ করেছেন। অপব্যয়কারীকে "শয়তানের ভাই" বলে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে, যা এর ভয়াবহতা প্রমাণ করে।
সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৩১
...وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
"...এবং খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় (ইসরাফ) করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।"
তাৎপর্য: খাওয়া-পরার মতো বৈধ বিষয়েও সীমালঙ্ঘন বা বাড়াবাড়ি করাকে আল্লাহ অপছন্দ করেন। এটি জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধের গুরুত্ব তুলে ধরে।
২. মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ (The command to follow a middle path):
অপচয় ও কৃপণতার মাঝামাঝি ভারসাম্যপূর্ণ পথে চলার জন্য ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে।
সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৭
(রহমানের বান্দা তো তারাই) যারা যখন ব্যয় করে তখন তারা অপচয় করে না এবং কৃপণতাও করে না, বরং এই উভয়ের মাঝে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে।
অনুধাবন: এটি হলো সম্পদ ব্যয়ের ইসলামী মূলনীতি। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে এখানে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে—তারা যেমন উড়িয়ে দেয় না, তেমনি আঁকড়েও ধরে না।
সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৯
"আর তুমি তোমার হাত তোমার ঘাড়ে বেঁধে রেখো না (অর্থাৎ কৃপণ হয়ো না) এবং তা সম্পূর্ণরূপে প্রসারিতও করে দিও না (অর্থাৎ বেহিসাবি হয়ো না), তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।"
অনুধাবন: এই আয়াতে অত্যন্ত সুন্দর উপমার মাধ্যমে কৃপণতা এবং অপচয়—দুটি থেকেই বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
৩. কৃপণতা নিষিদ্ধ (Prohibition of Miserliness):
সম্পদ জমা করে রাখা এবং হকদারদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করাও একটি গুরুতর পাপ।
সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৪
"...আর যারা সোনা ও রুপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও।"
সারসংক্ষেপ
বিষয় মূলনীতি
অপব্যয় (তাবযীর) সম্পদে্র অন্যায় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়- 17:২৬-২৭
অপচয় (ইসরাফ) বৈধ কাজেও সীমালঙ্ঘন
করা -7:৩১
মধ্যমপন্থা অপচয়
ও কৃপণতার মাঝে ভারসাম্য- 25:৬৭ , 17: ২৯
কৃপণতা
(বুখল) সম্পদ
জমা করা এবং হক
আদায় না করা-9:৩৪
সুতরাং, কুরআন স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, সম্পদ আল্লাহর দান এবং তা তাঁর দেখানো পথেই ব্যয় করতে হবে—দায়িত্বশীলতা, পরিমিতিবোধ এবং ভারসাম্যের সাথে। খেয়াল-খুশি মতো ব্যয় করা জায়েজ নয়।
আল-কোরআনের আলোকে সম্পদ ব্যয়ের মূলনীতি: একটি পূর্ণাঙ্গ সারসংক্ষেপ:
১. উদ্দেশ্য:
পরিশুদ্ধি অর্জন (যাকাত): ব্যয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘যাকাত’ বা আত্মিক ও জাগতিক পরিশুদ্ধি অর্জন করা। এই পরিশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যম হলো ‘সাদাকা’ বা সত্যনিষ্ঠ দান প্রদান করা (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১০৩)।
আল্লাহর সন্তুষ্টি: আর যারা তাদের সম্পদসমূহ ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ও তাদের অন্তরসমূহের দৃঢ়তা স্থাপন করতে, তাদের দৃষ্টান্ত উঁচুস্থানে এমন বাগানের দৃষ্টান্তের মতো, যেখানে মুষলধারে বৃষ্টি পতিত হয়। তখন তার ফল দ্বিগুণ হয়ে যায়। তবে যদি তাতে মুষলধারে বৃষ্টি নাও পতিত হয়, তাহলে হালকা বৃষ্টিই। আর তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আল্লাহ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন-আল-বাকারা 2:265
➥ আর তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্বেষণ ছাড়া ব্যয় কোরো না-2:272
২. কর্তব্য: একটি নির্ধারিত বিধান (ফরয):
কোরআন অনুসারে সাদাকা একটি ‘নির্ধারিত বিধান’ (ফরয), যা ঐচ্ছিক নয়, বরং সমাজের প্রতি একটি অপরিহার্য কর্তব্য (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৬০)।
যদিও কোরআন এটিকে একটি "নির্ধারিত বিধান" বলেছে, তবে সেই বিধানের সুনির্দিষ্ট হার বা পরিমাণ কোরআনে উল্লেখ করেনি।
৩. বাধ্যতামূলক দানের হার: একটি প্রশাসনিক এখতিয়ার
কোরআনে এই বাধ্যতামূলক দানের কোনো নির্দিষ্ট হার (যেমন: ২.৫%) উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং, এই হার নির্ধারণের বিষয়টি একটি প্রশাসনিক এখতিয়ার, যা সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী শাসক বা কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করতে পারে। এটি কোনো অপরিবর্তনীয় ঐশী হার নয়।
৪. সাধারণ দান: প্রয়োজনের অতিরিক্ত (আল-আ'ফওয়া)
বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার বাইরে, সাধারণ ব্যয়ের মূলনীতি হলো ‘আল-আ'ফওয়া’। অর্থাৎ, নিজের ও পরিবারের অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণের পর যা উদ্বৃত্ত থাকে, তা থেকে মুসলিমরা স্বেচ্ছায় দান করবে (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২১৯)।
সুতরাং, কোরআন "কত" ব্যয় করতে হবে, তার সংখ্যাত্ত¥ক নির্দেশের চেয়ে পরিশুদ্ধির চেতনা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে।
─── ・ 。゚☆: *.☽ .* :☆゚. ───
‘ব্যয়’ কী? - কোরআনের আলোকে একটি বহুমাত্রিক ধারণা:
কোরআনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট অনুধাবন করলে বোঝা যায়, আয়াত ২:২১৯-এ 'ব্যয়' (إنفاق) শব্দটি কেবল অর্থে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি অনেক ব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা।
আসুন, কেবলমাত্র আল-কোরআনের আলোকেই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বুঝি।
১. আয়াতের প্রাথমিক প্রেক্ষাপট: অর্থ ও সম্পদ
وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ ۗ ...
অর্থ: "আর তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? বল, ‘যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত (আল-আ'ফওয়া)।’ ..." (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২১৯)
প্রথম দৃষ্টিতে এবং সাধারণ অর্থে, يُنفِقُونَ (তারা ব্যয় করবে) বলতে আর্থিক বা বস্তুগত সম্পদ ব্যয় করা বোঝায়। কারণ, মানুষ সাধারণত অর্থ, খাদ্য, বা অন্যান্য সম্পদ নিয়েই এই প্রশ্ন করে থাকে। الْعَفْوَ (আল-আ'ফওয়া) বা "প্রয়োজনের অতিরিক্ত" শব্দটিও আর্থিক সামর্থ্যের সাথেই বেশি সম্পর্কিত।
সুতরাং, এর সরাসরি এবং প্রাথমিক অর্থ হলো—নিজের এবং পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি) মেটানোর পর যে অর্থ বা সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকে, তা ব্যয় করা।
২. কোরআনের ব্যাপক প্রেক্ষাপট: “তোমরা তা থেকে ব্যয় কর, যা আমি তোমাদেরকে রিযিক দিয়েছি”
কোরআন যখন ব্যয়ের কথা বলে, তখন প্রায়ই একটি মূলনীতি উল্লেখ করে, যা ব্যয়ের ধারণাকে অনেক প্রসারিত করে। যেমন, সূরা আল-বাকারার শুরুতেই মুত্তাকীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে:
...وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
অর্থ: "...এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।" (সূরা আল-বাকারাহ, ২:৩)
এখানে মূল শব্দটি হলো "রিযিক" (رِزْق)। কোরআনের আলোকে "রিযিক" কেবল অর্থ বা সম্পদ নয়।
৩. ‘রিযিক’ (رِزْق) কী? কোরআনের আলোকে
"রিযিক" বা আল্লাহর দেওয়া জীবনোপকরণ একটি অত্যন্ত ব্যাপক ধারণা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
অর্থ-বিত্ত ও সম্পদ: টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি, জমি, খাদ্য—যা কিছু আমাদের মালিকানায় আছে।
জ্ঞান ও মেধা: আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা এবং কোনো বিশেষ দক্ষতা।
সময় ও শক্তি: আমাদের আয়ু, সুস্থতা, শারীরিক ও মানসিক শক্তি।
ক্ষমতা ও প্রভাব: সমাজে বা পরিবারে আমাদের অবস্থান, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা বা মানুষকে প্রভাবিত করার যোগ্যতা।
আল্লাহর দেওয়া এই প্রতিটি জিনিসই আমাদের জন্য "রিযিক"। সুতরাং, "আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে" কথাটির অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিটি নিয়ামত থেকেই তাঁর পথে ব্যয় করা।
৪. “আল-আ’ফওয়া” (الْعَفْوَ) বা ‘উদ্বৃত্ত’ এর ব্যাপক প্রয়োগ
এবার যদি আমরা "রিযিক"-এর এই ব্যাপক ধারণাকে ২:২১৯ আয়াতের "আল-আ'ফওয়া" (উদ্বৃত্ত) নীতির সাথে যুক্ত করি, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়:
অর্থ-বিত্তের ব্যয়: নিজের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের পর উদ্বৃত্ত অর্থ অভাবীদের জন্য ব্যয় করা।
মেধা ও জ্ঞানের ব্যয়: নিজের জ্ঞানার্জন ও প্রয়োজন পূরণের পর উদ্বৃত্ত জ্ঞান ও মেধা অন্যকে শেখানোর জন্য, সঠিক পরামর্শ দেওয়ার জন্য বা সমাজের সমস্যা সমাধানে ব্যয় করা। যে ব্যক্তি জ্ঞানকে নিজের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে, সে তার জ্ঞানের "আ'ফওয়া" ব্যয় করে না।
সময়ের ব্যয়: নিজের ও পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার পর উদ্বৃত্ত সময় সমাজের কল্যাণে, আর্তের সেবায় বা দ্বীনের কাজে ব্যয় করা।
শক্তির ব্যয়: নিজের প্রয়োজন পূরণের পর উদ্বৃত্ত শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে কোনো দুর্বলকে সাহায্য করা।
সারসংক্ষেপ:
কেবলমাত্র কোরআনের আলোকে, আয়াত ২:২১৯-এ উল্লেখিত ‘ব্যয়’ প্রাথমিকভাবে আর্থিক ব্যয়কে নির্দেশ করলেও, কোরআনের সামগ্রিক শিক্ষা ও ‘রিযিক’-এর ব্যাপক ধারণা অনুযায়ী এটি একটি সামগ্রিক জীবনবিধান। এটি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহ আমাদের যা কিছু দিয়েছেন—তা অর্থ, সম্পদ, মেধা, সময় বা শক্তি যাই হোক না কেন—সেখান থেকে নিজের অপরিহার্য প্রয়োজনটুকু রেখে বাকি ‘উদ্বৃত্ত’ (আল-আ’ফওয়া) অংশ আল্লাহর পথে তথা সৃষ্টির কল্যাণে ব্যয় করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
সুতরাং, উত্তরটি হলো—হ্যাঁ, এটি কেবল অর্থ নয়; বরং মেধা, অর্থ-বিত্ত, সম্পদ, সময় এবং আল্লাহর দেওয়া সকল নিয়ামতকেই অন্তর্ভুক্ত করে।
কেবলমাত্র আল-কোরআনের আয়াতের উপর ভিত্তি করে ‘ব্যয়’ (ইনফাক) এর ধারণাটি নিচে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
কোরআনের আলোকে, ‘ব্যয়’ বা ইনফাক (إنفاق) শুধুমাত্র একটি আর্থিক লেনদেন নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন এবং ঈমানের এক অপরিহার্য স্তম্ভ। এটি এমন একটি কর্ম, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তাঁরই দেখানো পথে পরিচালিত করে।
১. এটি আল্লাহর দেওয়া ‘রিযিক’ থেকে ব্যয় করা:
কোরআন ব্যয়ের সংজ্ঞার মূলে রেখেছে ‘রিযিক’ বা আল্লাহর দেওয়া জীবনোপকরণের ধারণা। মুত্তাকী বা আল্লাহ-সচেতনদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো:
...وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
অর্থ: "...এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।" (সূরা আল-বাকারাহ, ২:৩)
এখানে ‘রিযিক’ কেবল অর্থ নয়, বরং এর অন্তর্ভুক্ত:
সম্পদ: অর্থ, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান।
জ্ঞান ও মেধা: আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দক্ষতা।
সময় ও শক্তি: আয়ু, সুস্থতা ও শারীরিক সামর্থ্য।
ক্ষমতা ও প্রভাব: সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা।
সুতরাং, কোরআনের দৃষ্টিতে ‘ব্যয়’ হলো আল্লাহর দেওয়া এই সকল নিয়ামতকে তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য সঠিক পথে পরিচালিত করা।
২. এটি পরিশুদ্ধি (যাকাত) অর্জনের মাধ্যম:
‘ব্যয়’ হলো সেই কর্ম, যার মাধ্যমে আত্মা ও সম্পদ উভয়ই পরিশুদ্ধ হয়। কৃপণতা, লোভ এবং সম্পদের প্রতি অন্ধ মোহ থেকে আত্মাকে পবিত্র করার এটি একটি ঐশী প্রক্রিয়া।
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا...
অর্থ: "তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা গ্রহণ কর, এর দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে..." (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১০৩)
অতএব, ব্যয় হলো একটি আত্মিক ও আধ্যাত্মিক পরিশোধন প্রক্রিয়া।
৩. এটি আল্লাহর সাথে একটি লাভজনক বিনিয়োগ:
কোরআন ব্যয়কে একটি ‘ক্ষয়’ হিসেবে দেখে না, বরং আল্লাহর কাছে এটি একটি লাভজনক বিনিয়োগ বা ‘সুন্দর ঋণ’ (قرضًا حسنا) হিসেবে উপস্থাপন করে, যা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে ফেরত আসে।
কে সে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, ফলে তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন?... (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৪৫)
অন্য আয়াতে একে একটি বীজের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যা থেকে শত শত শস্যদানা উৎপন্ন হয় (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৬১)। সুতরাং, ব্যয় হলো আল্লাহর সাথে করা সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক বাণিজ্য।
৪. এটি একটি সামাজিক অধিকার (হক) পূরণ করা:
কোরআনের দৃষ্টিতে, ধনীদের সম্পদে অভাবীদের একটি নির্ধারিত ‘অধিকার’ (হক) রয়েছে। এটি কোনো করুণা বা দয়া নয়, বরং একটি সামাজিক দায়িত্ব ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা।
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
অর্থ: "আর তাদের সম্পদে অধিকার ছিল সাহায্যপ্রার্থী ও বঞ্চিতদের।" (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:১৯)
তাই, ব্যয় হলো সমাজের দুর্বল শ্রেণীর অধিকারকে সম্মান জানানো এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করার একটি মাধ্যম।
৫. এটি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ও পরীক্ষা:
প্রকৃত পুণ্য বা ধার্মিকতা অর্জনের মাপকাঠি হলো নিজের প্রিয় বস্তু ব্যয় করা। যা নিজের কাছে প্রিয়, তা আল্লাহর জন্য ব্যয় করার মাধ্যমেই ভালোবাসার পরীক্ষা হয়।
لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ...
অর্থ: "তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তা থেকে ব্যয় করবে, যা তোমরা ভালোবাসো..." (সূরা আলে ইমরান, ৩:৯২)
সুতরাং, ‘ব্যয়’ কোরআনের দৃষ্টিতে একটি বিচ্ছিন্ন কাজ নয়, বরং এটি ঈমান, ইবাদত, আখলাক ও সমাজ ব্যবস্থার এক সমন্বিত ও গতিশীল প্রতিফলন।
কোরআনে 'সম্পদ' বা 'মাল' (الْمَال) এর ধারণা
যেকোনো মূল্যবান বস্তু যা মানুষের অধিকারে থাকে এবং যার একটি উপযোগিতা ও মূল্য আছে।
সোনা ও রূপার মুদ্রা (দীনার ও দিরহাম) গবাদি পশু (উট, গরু, ছাগল) শস্য ও ফল (গম, যব, খেজুর, আঙ্গুর) ব্যবসার পণ্য জমি ও বাড়ি
নগদ টাকা-পয়সা ব্যাংক ব্যালেন্স বেতন ও পারিশ্রমিক ব্যবসার লাভ ও পুঁজি শেয়ার, বন্ড ও অন্যান্য বিনিয়োগ জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, গাড়ি সোনা, রূপা এবং অন্যান্য মূল্যবান ধাতু
আয়াত কী বলে?
“তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা
“...এবং ফসল কাটার দিনে তার হক (যাকাত) আদায় করো...” (সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৪১)
সারসংক্ষেপ
১. ফসলের 'হক' (অধিকার) - যাকাত বা উশর:
কোরআন মজীদে ফসলের 'হক' আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা মূলত কৃষি উৎপন্ন দ্রব্যের যাকাত বা 'উশর' নামে পরিচিত। আল্লাহ তাআলা সূরা আন'আমের ১৪১ নং আয়াতে বলেন:সূরা আন'আম (৬:১৪১):
এই আয়াতে "ফসল কাটার দিনে তার হক আদায় করো" বাক্যটি ফসলের যাকাত বা উশর আদায়ের সুস্পষ্ট নির্দেশ দেয়। এটি ফসল উৎপাদনের উপর এক অবশ্যপালনীয় অর্থনৈতিক অধিকার, যা সমাজের অভাবী ও বঞ্চিতদের জন্য নির্ধারিত।
🔖 উত্তম জিনিস দান করার নির্দেশ:
দানের ক্ষেত্রে কোরআন উৎকৃষ্ট ও পবিত্র জিনিস থেকে দান করার উপর জোর দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:এই আয়াতে "তাইয়্যিবাত" (طَيِّبَاتِ) অর্থাৎ উৎকৃষ্ট ও পবিত্র অংশ থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এবং "খাবিস" (الْخَبِيثَ) অর্থাৎ খারাপ বা নিকৃষ্ট অংশ দান করতে নিষেধ করা হয়েছে। এটি দানের গুণগত মানের উপর গুরুত্বারোপ করে।
➥ সূরা আলে ইমরান (৩:৯২):
"তোমরা কখনও পুণ্য লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় করবে। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত।"
এটি আরও স্পষ্ট করে যে, সর্বোত্তম পুণ্য অর্জন করতে হলে প্রিয় বস্তু থেকেই দান করতে হবে।
📍কতটুকু, কখন, কীভাবে ও কার জন্য:
■ সময়: ফসল যখন তোলার উপযোগী হয় এবং ফলন হাতে আসে, তখনই তার হক আদায় করতে হয়।
■ পদ্ধতি: সাধারণত ফসল বা শস্যের মাধ্যমেই আদায় করা হয়। এর সমপরিমাণ অর্থও প্রদান করা যায়।
■ গ্রহীতা: যাকাতের সুস্পষ্ট আটটি খাত কোরআনে উল্লেখ রয়েছে (সূরা তওবা, ৯:৬০): ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী, নব মুসলিম, দাস মুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে ব্যয় এবং মুসাফির।
২. দানের নীতি (ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ):
প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশ দান:
"তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তারা কী ব্যয় করবে? তুমি বলো, 'যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত (العفو)।'"
এই আয়াতটি স্বেচ্ছামূলক দানের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয় যে, ব্যক্তির নিজের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের পর যা উদ্বৃত্ত থাকে, তা আল্লাহর পথে ব্যয় করা উচিত। এটি উদারতা ও ত্যাগের মনোভাব সৃষ্টি করে।
📌 স্বচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা অনুযায়ী দান:
🔗 "যারা স্বচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় ব্যয় করে..." সূরা আলে ইমরান (৩:১৩৪)🔗 "যার স্বচ্ছলতা আছে, সে তার স্বচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করবে। আর যার রিযিক সংকুচিত করা হয়েছে, সে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ কাউকে তার প্রদত্ত সামর্থ্যের অতিরিক্ত কিছু চাপান না..." সূরা তালাক (৬৫:৭)
এই আয়াতগুলো নির্দেশ করে যে, দানের পরিমাণ ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল। কোরআন চায় না যে দান করতে গিয়ে কেউ নিজেকে কষ্টে ফেলে দিক, বরং প্রত্যেকের উচিত তার বর্তমান আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী সাধ্যের মধ্যে দান করা।
📌 অপচয় ও অসদাচরণ পরিহার:
🔗 "......আর অপচয় করবে না; নিঃসন্দেহে তিনি অপচয়কারীদের ভালবাসেন না" -সূরা আন'আম (৬:১৪১)🔗 সূরা আন'আম (৬:১৫২):
"......আমি কারো ওপর তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপাই না। আর যখন কথা বলো, তখন ইনসাফ করো, যদিও সে তোমার আত্মীয় হয়। আর আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। এভাবেই তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।"
এই আয়াতগুলো দানের ক্ষেত্রে সংযম ও ইনসাফ বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে। অপচয় যেমন নিন্দনীয়, তেমনি দান করে খোঁটা দেওয়া বা গ্রহীতাকে কষ্ট দেওয়াও নিন্দনীয়।
সূরা আল-কলম (৬৮:১৭-৩১) এবং 'মিসকিনদের' অধিকার:
ঘটনার সারসংক্ষেপ:
এই ঘটনা থেকে যে বিষয়গুলো অনুধাবন করা যায়:
১. মিসকিনদের অগ্রাধিকার: এই আয়াতে বিশেষভাবে 'মিসকিনদের' (الْمَسَاكِينَ) কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যখন বাগান মালিকরা শপথ করছিল, তখন তাদের উদ্দেশ্য ছিল যেন কোনো মিসকিন তাদের বাগান থেকে কোনো অংশ না পায়। এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, ফসলের 'হক' আদায়ের ক্ষেত্রে 'মিসকিন' বা হতদরিদ্রদের একটি বিশেষ অগ্রাধিকার রয়েছে এবং তাদের অধিকারকে উপেক্ষা করা গুরুতর অপরাধ।
২. 'হক' আদায় না করার পরিণতি: বাগান মালিকরা তাদের ফসলের 'হক' আদায় না করে নিজেদের মধ্যে সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত করতে চেয়েছিল। এর ফলস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাদের বাগানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেন। এটি প্রমাণ করে যে, দরিদ্রের হক আত্মসাৎ করা বা তাদের বঞ্চিত করার চেষ্টা করলে জাগতিক শাস্তিও নেমে আসতে পারে।
৩. 'দল্লুন' (পথভ্রষ্ট), 'জালিমুন' (অত্যাচারী) ও 'তাগীন' (সীমালঙ্ঘনকারী):
পথভ্রষ্ট (দল্লুন): আয়াত ৬৮:২৬-এ বলা হয়েছে, "যখন তারা তা দেখল, তখন বলল, 'আমরা নিশ্চিত পথভ্রষ্ট হয়েছি (لَضَالُّونَ)'।" অর্থাৎ, তারা পথ হারিয়েছে, সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। ফসলের হক আদায় না করার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নির্দেশ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল, তাই তারা নিজেদের পথভ্রষ্ট বলে স্বীকার করে।
জালিমুন (অত্যাচারী): আয়াত ৬৮:২৯-এ তারা বলে, "তারা বলল, 'আমাদের রবের পবিত্রতা ঘোষণা করছি, নিশ্চয়ই আমরা জালিম (ظَالِمِينَ)'।" অর্থাৎ, তারা নিজেদেরকে অত্যাচারী হিসেবে স্বীকার করে। মিসকিনদের হক থেকে বঞ্চিত করা এক প্রকার জুলুম বা অত্যাচার, যা তারা করেছিল।
তাগীন (সীমালঙ্ঘনকারী): আয়াত ৬৮:৩১-এ তাদের মধ্যে একজন বলে, "সে বলল, 'আমি কি তোমাদের বলিনি, কেন তোমরা আল্লাহর তাসবীহ করছ না?' (অর্থাৎ তাঁর আনুগত্য করছ না)।"
এই আয়াতে 'তাগীন' শব্দটি ব্যবহৃত হয়, তাদের কার্যকলাপ ছিল সীমালঙ্ঘনের (তুগয়ান) প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে দরিদ্রের হক নষ্ট করা ছিল সীমালঙ্ঘন। পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতেও তারা যখন মিসকিনদের বঞ্চিত করার শপথ নেয় (৬৮:১৭-১৮), তখন তা ছিল আল্লাহর নির্দেশনার সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘন।
সারসংক্ষেপ:
৪. বিশেষ সম্পদের অংশীদারিত্ব:
কোরআনে কিছু বিশেষ অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে ভিন্নতর বণ্টনের নির্দেশ রয়েছে, যা সাধারণ যাকাত থেকে আলাদা।ক. গণীমত (অর্জিত সম্পদ):
এই আয়াতে শুধু যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মনে করা হলেও এটি যেকোন অর্জিত যেকোন সম্পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। এতে এক-পঞ্চমাংশ (২০%) আল্লাহ, রাসূল এবং সমাজের অভাবী শ্রেণীর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
খ. খনিজ সম্পদ (রিকাজ) এবং অন্যান্য বিশেষ অর্জিত সম্পদ:
উপসংহার:
আল-কোরআন অনুসারে, মুমিনদের জন্য তাদের ফসল ও উপার্জন থেকে একটি 'হক' (অধিকার) আদায় করা অবশ্য কর্তব্য। এই 'হক' অবশ্যই উৎকৃষ্ট অংশ থেকে হতে হবে। সাধারণ স্বেচ্ছামূলক দানের ক্ষেত্রে, কোরআন উৎসাহিত করে যে, ব্যক্তি তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশ দান করবে, যা তার স্বচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপান না।
নির্দিষ্ট ধরনের অর্জিত সম্পদ, যেমন যুদ্ধলব্ধ গণীমত এবং অনুরূপভাবে ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ বা গুপ্তধন, থেকে একটি সুনির্দিষ্ট অংশ (যেমন এক-পঞ্চমাংশ) সমাজের জন্য ব্যয় করার একটি বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। এটি এমন সম্পদ যা সহজে বা বিশেষ উপায়ে অর্জিত হয়, এবং তাই এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করা অপরিহার্য। এই বিধানটি সাধারণ উপার্জন বা কৃষি ফসলের উপর প্রযোজ্য সাধারণ দান বা যাকাতের পরিমাণের থেকে ভিন্ন এবং বিশেষ প্রেক্ষাপটের জন্য নির্ধারিত। সামগ্রিকভাবে, কোরআন একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সহানুভূতিশীল সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন, অপচয় পরিহার এবং মানবকল্যাণে সম্পদ ব্যবহারের উপর জোর দেয়।


