স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, যারা আয়াতে বিশ্বাসী মুসলিম হওয়ার আগে কিংবা ইসলাম গ্রহণের আগে বা এই আয়াত নাযিলের আগে এমন বিয়ে করে ফেলেছি, তাদের কী হবে? তাদের কি শাস্তি হবে? তাদের সন্তানদের কী হবে?
তাওবা-দুআ: ভিডিও নিচের দিকে দ্র:
সূরা আন-নিসা, আয়াত ২২
তবে অতীতে যা হয়ে গেছে, তা ছাড়া। নিশ্চয় এটি ছিল অশ্লীল, অতিশয় ঘৃণ্য এবং নিকৃষ্ট একটি পথ- আয়াত ৪:২২
অনুধাবন:
কোরআন যখন কোনো প্রথাকে "অশ্লীল" (ফাহিশাহ) ও "ঘৃণ্য" (মাক্বত) বলে ঘোষণা করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, যারা ইসলাম গ্রহণের আগে বা এই আয়াত নাযিলের আগে কিংবা আয়াতে বিশ্বাসী মুসলিম হওয়ার আগে এমন বিয়ে করে ফেলেছি, তাদের কী হবে? তাদের কি শাস্তি হবে? তাদের সন্তানদের কী হবে?
এই আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ (ইল্লা মা ক্বাদ সালাফ) মানে- তবে অতীতে যা হয়ে গেছে, তা ছাড়া।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম দয়ায়- 'তবে অতীতে যা হয়ে গেছে, তা ছাড়া' -বলে বিষয়টি পরিষ্কার করে দেন। এর অর্থ হলো:
এই আইন অবহিত হওয়ার পূর্বে/ কার্যকর হওয়ার আগে অজ্ঞতাবশত যা কিছু হয়ে গেছে, তার জন্য কোনো পাকড়াও করা হবে না বা শাস্তি দেওয়া হবে না। সু.তা. আল্লাহ সেই অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা করে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি করা একটি মারাত্মক গুনাহ।
2. সাধারণ নীতি হিসেবে এর প্রয়োগ:
এই আয়াতটি একটি সাধারণ ইসলামি আইনগত নীতি প্রতিষ্ঠা করে: ইসলাম তার পূর্বের সকল (অজ্ঞতাজনিত) গুনাহকে মুছে দেয়। যখন কোনো ব্যক্তি বা সমাজ ইসলাম গ্রহণ করে বা আল্লাহর কোনো নতুন বিধান লাভ করে, তখন তারা একটি পরিষ্কার পাতা থেকে জীবন শুরু করার সুযোগ পায়।
ভুল-দোষ-ত্রুটি-অন্যায় হয়ে গেলে করনীয়:
কোরআন আমাদের শেখায় যে, ভুল করা মানুষের স্বভাব, কিন্তু উত্তম মানুষ তারাই যারা ভুল করার সাথে সাথেই আল্লাহর কাছে ফিরে আসে।
সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৫:
এবং তারা সেই লোক, যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজেদের উপর যুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে-শুনে তার উপর জিদ করে না (পুনরাবৃত্তি করে না)।
অনুধাবন:
এই আয়াতটি আপনার "নতুন করে আর কোন ভুল ত্রুটি অন্যায় অপরাধ না হয়" এই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবসম্মত পথ দেখায়। এখানে বলা হচ্ছে, মুত্তাকী বা আল্লাহভীরু ব্যক্তিরাও ভুল করতে পারেন, কিন্তু তাদের বৈশিষ্ট্য হলো—তারা ভুলকে আঁকড়ে ধরে থাকেন না। তারা দ্রুত আল্লাহকে স্মরণ করেন, ক্ষমা চান এবং সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় সংকল্প করেন। (এটি মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য)।
তাওবা অতীতের সবকিছু মুছে দেয় (যা হয়ে গেছে, গেছে):
যারা তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু-সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭০
অনুধাবন (বিয়ের প্রেক্ষাপটে):
এই আয়াতটি একটি অবিশ্বাস্য প্রতিশ্রুতি। বিয়ের আগে যদি কারো কোনো ভুল-ত্রুটি বা গুনাহের অতীত থেকেও থাকে, আন্তরিক তাওবা শুধু সেই গুনাহকেই মুছে দেয় না, বরং আল্লাহ নিজ দয়ায় সেই পাপের স্থানকে পুণ্য দিয়ে বদলে দেন। সুতরাং, বিয়ের মাধ্যমে নতুন জীবন শুরু করার সময় একজন ব্যক্তি আক্ষরিক অর্থেই একটি পরিষ্কার স্লেট নিয়ে শুরু করতে পারে। "যা হয়ে গেছে, গেছে"—এই কথাটির এর চেয়ে সুন্দর কোরআনিক ব্যাখ্যা আর কি হতে পারে! তাই সচেতন থাকতে হবে- নতুন করে আর কোনো ভুল নয়।
১. অতীতের ভুলের জন্য হতাশ না হওয়া (যা হয়ে গেছে, গেছে)
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অতীতের ভুলের জন্য হতাশ হতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তাঁর ক্ষমার দরজা সর্বদা খোলা।
সূরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩:
"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
অনুধাবন:
এই আয়াতটি আপনার কথার প্রথম অংশ "যা হয়ে গেছে, গেছে"-এর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ। আল্লাহ এখানে সরাসরি তাঁর বান্দাদের আশ্বস্ত করছেন যে, তারা যত বড় গুনাহই করুক না কেন, যেন তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হয়। আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে তিনি সকল গুনাহ ক্ষমা করতে প্রস্তুত।
২. তাওবা করে পরিশুদ্ধ হওয়া এবং আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন
"...নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরও ভালোবাসেন।"
অনুধাবন:
তাওবা করা মানে শুধু ক্ষমা পাওয়া নয়, বরং এটি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের একটি মাধ্যম। এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভুলের পর ফিরে আসাকে আল্লাহ অত্যন্ত পছন্দ করেন।
৩. ভালো কাজ দ্বারা মন্দ কাজকে মুছে ফেলা (এগিয়ে যেতে হবে):
সূরা হূদ, আয়াত ১১৪:
"...নিঃসন্দেহে ভালো কাজ মন্দ কাজকে মিটিয়ে দেয়। এটি তাদের জন্য এক উপদেশ, যারা উপদেশ গ্রহণ করে।"
অনুধাবন:
এই আয়াতটি আমাদের "এগিয়ে যেতে হবে" সংকল্পের জন্য একটি চমৎকার পথনির্দেশিকা। অতীতের পাপের জন্য অনুশোচনার পাশাপাশি যখন একজন ব্যক্তি একমাত্র আল কোরআন অনুশীলন করে, সালাত করে (অহীর সংযোগের চর্চা করে), দান করে, ভালো ব্যবহার এবং অন্যান্য সৎকর্মে নিজেকে নিয়োজিত করে, তখন সেই ভালো কাজগুলো তার অতীতের মন্দ কাজগুলোকে মুছে দেয়। এটিই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সর্বোত্তম উপায়।
অন্যের অতীত ঘাঁটাঘাঁটি না করা:
ইসলামে অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং বিশেষ করে তাওবার পর তার অতীত নিয়ে খোঁটা দেওয়া বা সন্দেহ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২:
"হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয় কোনো কোনো অনুমান তো পাপ। আর তোমরা অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না..."
অনুধাবন (বিয়ের প্রেক্ষাপটে):
বিয়ের পর স্বামী বা স্ত্রীর কারোই উচিত নয় অন্যের অতীত জীবন নিয়ে গোয়েন্দাগিরি করা বা সন্দেহ পোষণ করা। যদি কোনো সঙ্গী তার অতীত জীবনের জন্য তাওবা করে থাকে, তবে অপর সঙ্গীর দায়িত্ব হলো তাকে বিশ্বাস করা এবং আল্লাহর ক্ষমার উপর আস্থা রাখা। অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দুটোই নষ্ট হয়, যা কোরআনের এই আয়াতের শিক্ষার পরিপন্থী।
·͙⁺˚*•̩̩͙✩•̩̩͙*˚⁺‧͙⁺˚*•̩̩͙✩•̩̩͙*˚⁺‧͙⁺˚*•̩̩͙✩•̩̩͙*˚⁺‧͙
দুআ: আয়াত ২:২৮৫-২৮৬
রসূল সেটার প্রতি ঈমান এনেছে, যা তার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে আর মুমিনরাও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহর ও তাঁর মালাকদের আর তাঁর কিতাবসমূহের এবং তাঁর রসূলদের প্রতি। আমরা তাঁর রসূলদের মধ্য থেকে কারও মাঝে তারতম্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মানলাম। হে আমাদের রব! ক্ষমা আপনারই আর প্রত্যাবর্তন আপনারই কাছে।
আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্য ব্যতিত দায়িত্ব দেন না। সে যা অর্জন করেছে তা তারই পক্ষে এবং সে যা অর্জন করেছে তা তারই বিরুদ্ধে। হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, আপনি আমাদের ধরবেন না। হে আমাদের রব! আর আপনি আমাদের ওপর তেমন ভার চাপিয়ে দিবেন না, যেমন আমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের ওপর তা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। হে আমাদের রব! আর আপনি আমাদেরকে এমনকিছু চাপিয়ে দিবেন না, যেটার সামর্থ্য আমাদের নেই। আর আপনি আমাদের মাফ করুন এবং আপনি আমাদের ক্ষমা করুন আর আপনি আমাদের অনুগ্রহ করুন। আপনিই আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আপনি আমাদেরকে কাফির জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাহায্য করুন!
তাওবা-দুআ: video-1
তাওবা-দুআ: video-2