একটি বিখ্যাত দুআ: "রব্বিশরাহলি সদরি, ওয়া ইয়াসসিরলি আমরি..." কিন্তু সেই 'সদর' বা বক্ষ বলতে কোরআন কী বোঝায়?

"রব্বিশরাহলি সদরি, ওয়া ইয়াসসিরলি আমরি..."
(হে আমার রব, আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজকে সহজ করে দিন)।

ওহীর জ্ঞানে সমৃদ্ধ আলেম, স্কলার এবং বক্তাগণ প্রায়ই তাঁদের আলোচনার শুরুতে এই বরকতময় দুআটির মাধ্যমে রবের সাহায্য চেয়ে থাকেন।

কিন্তু আমরা কি কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, এই দুআতে যে 'সদর' (بَصَدْرِ) অর্থাৎ 'বক্ষ' প্রশস্ত করে দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করা হয়, সেই 'সদর' আসলে কী?

আসুন, আল কোরআনের আয়াতের আলোকে বিষয়টি অনুধাবন করার চেষ্টা করি।

 মস্তিস্কের সামনের অংশকে কি 'সদর' বলা হয়?

 'ছাদর বা ছুদুর' (বক্ষ) কি?

 সুদুর-এর অবস্থান কোথায়?

 আল কোরআনের দৃষ্টিতে মস্তিস্ক কি?

 'নাসিয়াহ' মস্তিস্কের সামনের অংশ (Prefrontal Cortex) কি?

 -এসংক্রান্ত কোরআনি দুআ সমূহ:

প্রতীকী ছবি

আল-কুরআনে 'ছাদর' (صَدْر) এবং এর বহুবচন 'ছুদুর' (صُدُور) শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

প্রথম প্রশ্ন: মস্তিস্কের সামনের অংশকে কি 'সদর' বলা হয়?

না, আল কোরআনের আয়াত অনুযায়ী মস্তিস্কের সামনের অংশকে আরবি শব্দ ’সদর’ (صَدْر) বলা হয় না।

'সদর' (صَدْر) শব্দের অর্থ:

'সদর' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো বক্ষ, বুক বা অন্তঃস্থল। কোরআনে এই শব্দটি রূপক অর্থে অন্তর, মন, চিন্তা, বিশ্বাস ও অনুভূতির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি শারীরিক অঙ্গ হিসেবে বক্ষকে নির্দেশ করলেও এর ভেতরের অবস্থাকেই (যেমন: মনের শান্তি বা অশান্তি) বোঝানো হয়।

 'সদর' শব্দটি মন, অনুভূতি ও বিশ্বাসের কেন্দ্রস্থল (বক্ষ) বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, মস্তিস্কের কোনো অংশ বোঝাতে নয়। মস্তিস্কের সামনের অংশ (Prefrontal Cortex)। আর এর জন্য কোরআন যে শব্দটি ব্যবহার করেছে তা হলো 'নাসিয়াহ' (نَاصِيَة), যার অর্থ কপালের সম্মুখভাগের চুল বা কপাল

’সদর’ এটি যে 'মস্তিস্ক' বা এর সম্মূখভাগ বুঝানো হয়নি-তার প্রমাণ:

সদর' বা বক্ষের প্রশস্ত ও সংকুচিত হওয়াকে কোরআন মস্তিস্কের জ্ঞান ধারণ ক্ষমতার সাথে তুলনা করেনি। বরং এটি বিশ্বাস, হেদায়েত, মানসিক প্রশান্তি এবং সত্য গ্রহণের সক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত।

'সদর' বা বক্ষকে এখানে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের অন্তর বা ভেতরের সত্তা-কে বোঝায়। এটি আবেগ, অনুভূতি, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক অবস্থার কেন্দ্র।

‘সদর’ (صَدْر) বা বক্ষের প্রশস্ত হওয়া (শারাহ্) এবং সংকুচিত হওয়া (দাইক্ব) সম্পর্কে  আল-কোরআনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত নিচে উল্লেখ করা হলো। এই আয়াতগুলো থেকে বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

১. বক্ষ প্রশস্ত হওয়া (শারাহ্ সদর شرح الصدر) - হিদায়াত ও ঈমানের চিহ্ন:

এখানে 'বক্ষ প্রশস্ত হওয়া' মানে জ্ঞান বা তথ্য বৃদ্ধি নয়, বরং সত্যকে গ্রহণ করার মানসিক ও আত্মিক সক্ষমতা লাভ করা।

সূরা আল-আন‘আম (الأنعام), আয়াত: ১২৫

فَمَن يُرِدِ اللَّهُ أَن يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ ۖ ...

সুতরাং আল্লাহ যাকে হিদায়াত দিতে চান, তিনি ইসলামের জন্য তার বক্ষকে প্রশস্ত (ইয়াসরাহ সাদরাহু) করে দেন...

অনুধাবন: 

এখানে ‘শারহে সদর’ বা বক্ষ প্রশস্ত হওয়া বলতে বোঝানো হয়েছে যে, ইসলামকে গ্রহণ করা, এর বিধিবিধান পালন করা এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করা তার জন্য সহজ ও আনন্দদায়ক হয়ে যায়। তার মনে কোনো দ্বিধা, সংশয় বা সংকীর্ণতা থাকে না।

সূরা আয-যুমার (الزمر), আয়াত: ২২

أَفَمَن شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ فَهُوَ عَلَىٰ نُورٍ مِّن رَّبِّهِ ۚ ...

আল্লাহ ইসলামের জন্য যার বক্ষকে প্রশস্ত (شارح صدرহু) করে দিয়েছেন, ফলে সে তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক আলোর উপর রয়েছে, (সে কি তার সমান যে এমন নয়?)...

অনুধাবন: 

এই আয়াতেও ঈমানের আলোয় আলোকিত ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যার বক্ষ বা সদর ইসলামের জন্য উন্মুক্ত ও প্রশস্ত।

সূরা ত্বা-হা (طه), আয়াত: ২৫ 

قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي

তিনি (মূসা) বললেন, হে আমার রব! আমার জন্য আমার বক্ষকে প্রশস্ত (ইশরাহ লী সাদরী) করে দিন।

অনুধাবন: 

মূসা (সা:) ফেরাউনের মতো কঠিন প্রতিপক্ষের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার গুরুদায়িত্ব পালনের পূর্বে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন যেন তাঁর বক্ষ প্রশস্ত হয়। অর্থাৎ, তিনি যেন ধৈর্য, সাহস, জ্ঞান ও স্থিরতা লাভ করেন এবং কোনো ভয় বা সংকোচ তাকে বাধাগ্রস্ত না করে।

প্রশস্ত বক্ষ (শারহ আস-সাদর-شَرْح الصَّدْر):

أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ
অর্থ: আমি কি আপনার বক্ষকে প্রশস্ত করে দেইনি? (সূরা আশ-শারহ, ৯৪:১)

এখানে 'বক্ষ প্রশস্ত করা' মানে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মানসিক প্রশান্তি দান করা, যা শারীরিক অর্থে বুকের প্রসারণ নয়, মস্তিস্কের প্রসারনও নয়।

২. সংকুচিত বক্ষ (দ্বাইক্ব আস-সাদর - ضَيْق الصَّدْر): পথভ্রষ্টতা ও অবিশ্বাসের চিহ্ন:

এই অবস্থাটি তখন হয় যখন কেউ সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বা আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্টতায় ছেড়ে দেন। তখন তার অন্তর কঠিন ও সংকীর্ণ হয়ে যায়।

সূরা আল-আন‘আম (الأنعام), আয়াত: ১২৫ 

فَمَنۡ یُّرِدِ اللّٰہُ اَنۡ یَّہۡدِیَہٗ یَشۡرَحۡ صَدۡرَہٗ لِلۡاِسۡلَامِ ۖ وَمَنۡ یُّرِدۡ اَنۡ یُّضِلَّہٗ یَجۡعَلۡ صَدۡرَہٗ ضَیِّقًا حَرَجًا کَاَنَّمَا یَصَّعَّدُ فِی السَّمَآءِ ۚ کَذٰلِکَ یَجۡعَلُ اللّٰہُ الرِّجۡسَ عَلَی الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ﴿۱۲۵﴾

সুতরাং আল্লাহ যাকে চান যে, তিনি তাকে হিদায়েত দিবেন, তার অন্তরকে ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন। আর যাকে চান যে, ...আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করতে চান, তিনি তার বক্ষকে চরমভাবে সংকুচিত (সদরাহু দাইয়্যিকান হারাজান) করে দেন, (তার অবস্থা এমন হয়) যেন সে আকাশে আরোহণ করছে...। ওভাবেই আল্লাহ তাদের ওপর শাস্তি নির্ধারণ করেন, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না-আল-আনাম 6:125

অনুধাবন:

এখানে ‘দাইক্ব’ (সংকীর্ণ) এবং ‘হারাজ’ (চরমভাবে সংকুচিত) শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়েছে। পথভ্রষ্ট ব্যক্তির অবস্থা এমন হয় যে, ঈমান ও সত্য গ্রহণ করা তার জন্য শ্বাসরুদ্ধকর ও অসম্ভব মনে হয়। তার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে আকাশে আরোহণকারী ব্যক্তির সাথে, যে উচ্চতার কারণে অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস নিতে পারে না। 

এখানেও 'বক্ষ সংকুচিত' হওয়া মানে মানসিক কষ্ট, অস্থিরতা ও সত্য গ্রহণে অক্ষমতা বোঝানো হয়েছে। 'বক্ষ সংকুচিত' হওয়া মানে তাঁর জ্ঞান কমে যাওয়া বা মস্তিস্কের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া নয়। বরং এটি তীব্র মানসিক ও মনোস্তাত্তিক কষ্টকে বোঝাচ্ছে।

সুতরাং, 'সদর' শব্দটি মন, অনুভূতি ও বিশ্বাসের কেন্দ্রস্থল (বক্ষ) বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, মস্তিস্কের কোনো অংশ বোঝাতে নয়। 

🔗 সূরা আশু‘আরা 26: 13

এবং আমার অন্তর সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে (ইয়াদিকু সদরি) এবং আমার জিহ্বাও চলছে না। -সূরা আশু‘আরা 26: 13

এই আয়াতেও 'সদর' শব্দটির ব্যবহারে  মন, অনুভূতি ও একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের কাছে যেতে উপযুক্ত প্রোটোকল চাইতেই তাঁর  এমন  শাররীক ও মানসিক পরিস্থিতির কথা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, মস্তিস্কের কোনো অংশ বোঝাতে নয়। 

সূরা আল-হিজর (الحجر), আয়াত: ৯৭

وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّكَ يَضِيقُ صَدْرُكَ بِمَا يَقُولُونَ

আর আমি অবশ্যই জানি যে, তারা যা বলে তাতে আপনার বক্ষ সংকুচিত (ইয়াদীকু সাদরুকা) হয়।

অনুধাবন: 

এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসূল-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কাফিরদের মিথ্যাচার, উপহাস ও প্রত্যাখ্যানের কারণে রাসূল (সা:)-এর মনে যে কষ্ট ও সংকোচ আসত, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত। এটি প্রমাণ করে যে, মানসিক চাপ ও দুঃখের কারণেও ‘সদর’ বা বক্ষ সংকুচিত হতে পারে।

এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট যে, ‘সদর’ বা বক্ষ হলো মানুষের অনুভূতির প্রবেশদ্বার। আল্লাহর রহমতে তা প্রশস্ত হয়, ফলে মানুষ হিদায়াত ও শান্তি লাভ করে। আর আল্লাহর অবাধ্যতার কারণে তা সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে মানুষ পথভ্রষ্টতা ও অস্থিরতার মধ্যে নিপতিত হয়।

এখানে 'বক্ষ সংকুচিত' হওয়া মানে তাঁর জ্ঞান কমে যাওয়া বা মস্তিস্কের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া নয়। বরং এটি তীব্র মানসিক কষ্টকে বোঝাচ্ছে।

৪. কষ্ট, সংকট মানসিক চাপের স্থান হিসেবে (ইয়াদিকু ছদরাক):

মানসিক চাপ বা কষ্টের কারণে বক্ষ সংকুচিত হয়ে আসে।

আর অবশ্যই আমরা জানি যে তুমি, তোমার অন্তর সঙ্কুচিত হয়  (ইয়াদিকু ছদরাক) সে কারণে যা তারা বলে- আয়াত ১৫:৯৭

সারসংক্ষেপ:

  • কোরআন জ্ঞানকে আল্লাহর ঐশী দান হিসেবে দেখে, যার নিয়ন্ত্রণ তাঁরই হাতে। এটি মস্তিস্কের জৈবিক ধারণ ক্ষমতার ঊর্ধ্বে।
  • 'সদর' (বক্ষ) শব্দটি কোরআনে মস্তিস্ক বা intellect বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি। বরং এটি মানুষের অন্তর, ভেতরের সত্তা, বিশ্বাস ও অনুভূতির কেন্দ্রস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
  • বক্ষ প্রশস্ত (শারাহ্) হওয়া মানে সত্য ও হেদায়েত গ্রহণের জন্য আত্মিক ও মানসিক সক্ষমতা লাভ করা, যার ফলে শান্তি ও স্থিরতা আসে।
  • বক্ষ সংকুচিত (দাইক্ব) হওয়া মানে সত্য বিমুখতা, মানসিক যন্ত্রণা, অস্থিরতা ও আধ্যাত্মিক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা।
  • সুতরাং, কোরআনের এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে 'সদর' বা বক্ষের প্রসারণ ও সংকোচন মানুষের আধ্যাত্মিক ও মানসিক অবস্থাকে নির্দেশ করে, মস্তিস্কের জ্ঞান ধারণ ক্ষমতাকে নয়।

'ছাদর বা ছুদুর' (بَصَدْرِ/صُدُور) কি?

আক্ষরিক অর্থ: 'ছাদর' (صَدْر) শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো বুক বা বক্ষ (Chest)। এটি মানবদেহের উপরিভাগের সেই অংশ যেখানে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস অবস্থিত।

কুরআনী পরিভাষায় অর্থ: আল-কুরআনে 'ছাদর' শব্দটি শুধুমাত্র শারীরিক অঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি, বরং এটি একটি গভীর রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ জগতের একটি বিস্তৃত পরিধিকে বোঝায়, যা হলো:

'সদর' (একবচন) এবং 'সুদূর' (বহুবচন) শব্দটির অর্থ হলো বক্ষ বা বুক। কোরআনের পরিভাষায়, এটি হলো সেই স্থান যেখানে 'কলব' বা হৃদয় (অন্তর) অবস্থান করে এবং যা মানুষের বিশ্বাস, ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা), চিন্তা ও অনুভূতির কেন্দ্রস্থল।

প্রমাণ:

الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ

অর্থ: যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের বক্ষসমূহে- (সূরা আন-নাস, ১১৪:৫)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, শয়তানের কুমন্ত্রণার স্থান হলো 'সুদূর' বা বক্ষ, যা মানুষের ভেতরের সত্তাকে প্রভাবিত করে।

অনুভূতি ও আবেগের কেন্দ্র: মানুষের আনন্দ, দুঃখ, কষ্ট, ভয়, হিংসা, ভালোবাসা ইত্যাদি অনুভূতির আধার হলো 'ছাদর'।

• চিন্তা ও নিয়তের ধারক: মানুষের মনে যা কিছু উদয় হয়, যে সংকল্প সে করে এবং যা কিছু সে গোপন রাখে—সেসবের স্থান হলো 'ছাদর'।

ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা)-এর প্রবেশদ্বার: শয়তান মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেওয়ার জন্য এই 'ছাদর'-কেই লক্ষ্যবস্তু বানায়।

ঈমান ও হিদায়াতের আধার: 'ছাদর' হলো সেই স্থান যা ঈমান, হিদায়াত এবং আল্লাহর নূরের জন্য প্রশস্ত হয়।

সহজ কথায়, 'ছাদর' হলো 'ক্বলব' বা অন্তরের ধারক বা পাত্র (container)। ক্বলবে যা কিছু থাকে, তার প্রভাব ও বিচরণক্ষেত্র হলো 'ছাদর'।

৪. সুদুর-এর অবস্থান (الَّتِي فِي الصُّدُورِ):

আয়াতটি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, এই উপলব্ধি করার হৃদয় বা 'কলব' কোথায় থাকে—"যা বক্ষের (সুদুর الصُّدُورِ) মধ্যে রয়েছে।"  'সদর' বা বক্ষ হলো অনুভূতির কেন্দ্র এবং তার ভেতরেই 'কলব' বা হৃদয় অবস্থিত।

প্রমাণ:

তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? তাহলে তাদের এমন হৃদয় (উপলব্ধির 'কলব') হতো যা দ্বারা তারা উপলব্ধি করতে পারত এবং এমন কান হতো যা দ্বারা তারা শুনতে পারত। বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হয় সেই হৃদয় (ক্বলবগুলো) যা বক্ষের (সদরের)  মধ্যে থাকে- (সূরা আল-হজ্জ, ২২:৪৬)

এই আয়াতটি 'কলব'-এর অবস্থানকে 'সদর'-এর ভেতরে নির্দিষ্ট করে দেয়।

আমরা আরও দেখি- আয়াতেকি কি প্রসঙ্গে 'ছাদর' ব্যবহার করা হয়েছে?

আল-কুরআনে বিভিন্ন প্রসঙ্গে 'ছাদর' শব্দটি এসেছে। প্রধান প্রসঙ্গগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

. হিদায়াত ঈমানের কেন্দ্র হিসেবে:
আল্লাহ যখন কাউকে হিদায়াত দান করেন, তখন তিনি তার বক্ষকে ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন।

আয়াত: "সুতরাং আল্লাহ যাকে হিদায়াত দিতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন। আর যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার বক্ষকে অতিশয় সংকুচিত করে দেন, যেন সে আকাশে আরোহণ করছে।" (সূরা আল-আন‘আম, ৬:১২৫) 

اَفَمَنۡ شَرَحَ اللّٰہُ صَدۡرَہٗ لِلۡاِسۡلَامِ فَہُوَ عَلٰی نُوۡرٍ مِّنۡ رَّبِّہٖ ۚ فَوَیۡلٌ لِّلۡقٰسِیَۃِ قُلُوۡبُہُمۡ مِّنۡ ذِکۡرِ اللّٰہِ ۚ اُولٰٓئِکَ فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ ﴿۲۲﴾

 তবে সে—ই কি, যার অন্তরকে আল্লাহ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, এরপর সে তার রবের পক্ষ থেকে আলোর উপর রয়েছে? সুতরাং দুভোর্গ, আল্লাহর উপদেশ থেকে তাদের পাষাণ হৃদয়সমূহের জন্য। ওরাই সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে-39:22 

. গোপন বিষয় রহস্যের আধার হিসেবে:
আল্লাহ মানুষের বক্ষে লুকানো সবকিছু সম্পর্কে অবগত।

আয়াত: "আর নিশ্চয় আপনার রব জানেন তাদের 'ছুদুর' (বক্ষসমূহ) যা গোপন রাখে এবং যা প্রকাশ করে।" (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৬৯)

আয়াত: "নিশ্চয় তিনি 'ছাদর' (বক্ষ)-এর ভেতরের সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।" (সূরা হূদ, ১১:৫) 
 

4. ছুদুর এবং গোপন বিষয়ের প্রকাশ:

সূরা আল-মুলক (৬৭:১৩):

তোমরা তোমাদের কথাগুলো গোপন রাখো কিংবা তা প্রকাশ করো, নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের অন্তরের (ছুদুর) কথা জানেন

এখানে 'ছুদুর' শব্দটি এই বার্তা দেয় যে মানুষের কথার চেয়েও তার অন্তরের গোপন চিন্তা অনুভূতির ওপর আল্লাহর পূর্ণ নজরদারি রয়েছে
 

5. ছুদুর এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা:

সূরা আন-নাস (১১৪:৫):

"যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের বক্ষস্থলে (ছুদুর)"

এই আয়াতে 'ছুদুর' শব্দটি মানুষের অন্তর বোঝায়, যেখানে শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে মানুষের ঈমানকে দুর্বল করার চেষ্টা করে এটি মানুষের অন্তরের সেই জায়গা যেখানে ভালো এবং মন্দ চিন্তার দ্বন্দ্ব ঘটে
 

🔗 সূরা আল-‘আদিয়াত (১০০) এর ১০ নং আয়াত সম্পর্কে এই আয়াতটি 'ছাদর' বা 'ছুদুর' (বক্ষ)-এর ধারণাকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে তুলে ধরে নিচে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো  

أَفَلَا يَعْلَمُ إِذَا بُعْثِرَ مَا فِي الْقُبُورِوَحُصِّلَ مَا فِي الصُّدُورِ 
ওয়া হুস্সিলা মা ফিস্-সুদূর।

সে কি জানে না, যখন কবরে যা কিছু আছে, তা উত্থিত করা হবে?"  এবং ছুদুরসমূহে  যা কিছু আছে, তা প্রকাশ করে দেওয়া হবে। (১০০:৯-১০)

এই আয়াতে কিয়ামতের দিনের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যখন মানুষকে তাদের কবর থেকে পুনরুত্থিত করা হবে। এটি হলো শারীরিক পুনরুত্থান।

এই আয়াতটি শারীরিক পুনরুত্থানের পর মানুষের অভ্যন্তরীণ বা আধ্যাত্মিক অবস্থার কথা বলছে। এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ রয়েছে: 

  • হুস্সিলা (حُصِّلَ): এর অর্থ শুধু "প্রকাশ করা" নয়, বরং এর মধ্যে আরও গভীর অর্থ নিহিত আছে। যেমন:
    • বের করে আনা (To extract): যা কিছু ভেতরে লুকানো ছিল, তা টেনে বের করা হবে।
  • একত্রিত করা (To collect): বিক্ষিপ্ত চিন্তা, গোপন নিয়ত, লুকানো বিশ্বাস—সবকিছু একত্রিত করা হবে।
  • যাচাই-বাছাই করা (To sift): ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, ঈমান-নিফাক সবকিছুকে আলাদা করে স্পষ্ট করে দেওয়া হবে।
  • ফসল কাটার মতো: যেমন কৃষক তার পুরো বছরের পরিশ্রমের ফসল কেটে ঘরে তোলে, তেমনি মানুষের সারাজীবনের অভ্যন্তরীণ কর্মের (নিয়ত, বিশ্বাস) ফসল সেদিন প্রকাশ করা হবে। 

  • মা ফিস-সুদূর (مَا فِي الصُّدُورِ): "বক্ষসমূহের মধ্যে যা কিছু আছে।" এখানে 'ছুদুর' (বক্ষের বহুবচন) বলতে মানুষের অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিষয়গুলোকে বোঝানো হয়েছে। যেমন:
নিয়ত (Intention): কোনো কাজ কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়েছিল, নাকি লোকদেখানোর (রিয়া) জন্য?

বিশ্বাস (Belief): প্রকৃত ঈমান ছিল, নাকি সন্দেহ, সংশয় বা কুফর লুকিয়ে ছিল?

চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য (Traits): অহংকার, হিংসা, ঘৃণা, ভালোবাসা, আন্তরিকতা—যা মানুষ দুনিয়াতে লুকিয়ে রাখত।

গোপন পরিকল্পনা (Secrets): মানুষের ভালো-মন্দ সব গোপন পরিকল্পনা ও চিন্তা।

৫. জ্ঞান নিরাময়ের স্থান হিসেবে ('ছুদুর) :

কুরআনকে বক্ষে ধারণ করা জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্য এবং এটি অন্তরের রোগ নিরাময়কারী।

আয়াত: বরং যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তাদের 'ছুদুর' (বক্ষে) এটি (কুরআন) সুস্পষ্ট আয়াত। (সূরা আল-আনকাবূত, ২৯:৪৯)

আয়াত: হে মানুষ, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে উপদেশ এবং 'ছুদুর' (বক্ষের) মধ্যে যা কিছু আছে তার নিরাময়... (সূরা ইউনুস, ১০:৫৭)

মস্তিস্ক: মস্তিস্কের সামনের অংশ  বলতে আয়াত কী বলে?

আল কোরআনে সরাসরি "মস্তিস্ক" (আরবিতে 'দিমাগ' - دِمَاغ) শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। তবে কোরআন মস্তিস্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের কার্যক্রমের দিকে সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করেছে, যা হলো মস্তিস্কের সামনের অংশ (Prefrontal Cortex)। আর এর জন্য কোরআন যে শব্দটি ব্যবহার করেছে তা হলো 'নাসিয়াহ' (نَاصِيَة), যার অর্থ কপালের সম্মুখভাগের চুল বা কপাল

আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মস্তিস্কের সামনের এই অংশটিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মিথ্যা বলা, পরিকল্পনা করা এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু।

প্রমাণ:

কোরআন এই 'নাসিয়াহ' বা কপালকে মিথ্যা ও পাপ কাজের উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছে।

আল্লাহ তা'আলা আবু জাহেলের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জবাবে বলেন:

كَلَّا لَئِن لَّمْ يَنتَهِ لَنَسْفَعًا بِالنَّاصِيَةِ * نَاصِيَةٍ كَاذِبَةٍ خَاطِئَةٍ

অর্থ: কখনোই নয়, সে যদি বিরত না হয়, তবে আমি তাকে হেঁচড়ে নিয়ে যাব তার কপালের চুল ধরে। এক মিথ্যাবাদী, পাপী কপালের চুল। (সূরা আল-আলাক, ৯৬:১৫-১৬) 

আয়াতটির তাৎপর্য ও বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক:

অনুধাবন ও বিশ্লেষণ: 

আধুনিক নিউরোসায়েন্স প্রমাণ করেছে যে, মস্তিষ্কের সম্মুখ ভাগ বা প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex), যা কপালের ঠিক পেছনে অবস্থিত, মানুষের পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সামাজিক আচরণ এবং মিথ্যা বলার মতো কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। কোরআন ১৪০০ বছর আগে এই ‘নাসেয়াহ’-কে ‘মিথ্যাবাদী’ ও ‘পাপী’ বলে অভিহিত করে সরাসরি মস্তিষ্কের এই অংশের কার্যক্রমের দিকে ইঙ্গিত করেছে। এটি একটি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সঙ্গতি, যা প্রমাণ করে—মানুষের ভুল, পাপ ও মিথ্যাচারের উৎস তার মস্তিষ্কের এই অংশ।

১. মিথ্যাবাদী কপাল (نَاصِيَةٍ كَاذِبَةٍ): কোরআন এখানে ব্যক্তিটিকে "মিথ্যাবাদী" না বলে তার 'নাসিয়াহ' বা কপালকে "মিথ্যাবাদী" বলেছে। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আধুনিক নিউরোসায়েন্স প্রমাণ করেছে যে, মানুষ যখন মিথ্যা বলে, তখন তার মস্তিস্কের সামনের অংশ, অর্থাৎ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex), যা কপালের ঠিক পেছনে অবস্থিত, সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়। এই অংশটিই মিথ্যা কথা বলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য দায়ী।

২. পাপী কপাল (نَاصِيَةٍ خَاطِئَةٍ): একইভাবে, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক নিয়ম মেনে চলার মতো কাজগুলোও করে থাকে। কোনো পাপ বা ভুল কাজ করার সিদ্ধান্ত এই অংশ থেকেই উৎপন্ন হয়। তাই কোরআন এই 'নাসিয়াহ'-কে "পাপী" বলে আখ্যা দিয়েছে।

সুতরাং, কোরআন ১৪০০ বছর আগেই মস্তিস্কের সম্মুখভাগকে মিথ্যা ও পাপ কাজের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের সাথে হুবহু মিলে যায়।

চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রতীক হিসেবে ‘নাসেয়াহ’:

اِنِّیۡ تَوَکَّلۡتُ عَلَی اللّٰہِ رَبِّیۡ وَرَبِّکُمۡ ۚ مَا مِنۡ دَآبَّۃٍ اِلَّا ہُوَ اٰخِذٌ ۢ بِنَاصِیَتِہَا ۚ اِنَّ رَبِّیۡ عَلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ

...তাঁকে ছাড়া। সুতরাং তোমরা সবাই আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করো। তারপর আমাকে সুযোগ দিও না। নিশ্চয় আমি, আমি নির্ভর করেছি .. এমন কোনো বিচরণশীল প্রাণী নেই, যার কপাল (নাসেয়াহ) তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। নিশ্চয় আমার রব সুদৃঢ় পথের ওপর রয়েছেন -১১:৫৫-৫৬

অনুধাবন ও বিশ্লেষণ: 

এই আয়াতটি পূর্বের আয়াতের অর্থকে আরও গভীর করে। হূদ (সা:)-এর জাতি যখন তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত (كيد) করছিল, তখন তিনি ঘোষণা দেন যে, তাদের চক্রান্তের উৎস—অর্থাৎ তাদের ‘নাসেয়াহ’ বা সম্মুখ মস্তিষ্ক—স্বয়ং আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। এর অর্থ হলো, "তোমরা যে মস্তিষ্ক দিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছ, সেই মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণই আমার আল্লাহর হাতে।" এটি প্রমাণ করে, মানুষের সকল পরিকল্পনা ও কর্মের চূড়ান্ত উৎস যে মস্তিষ্ক, তার উপর আল্লাহর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব রয়েছে।

তবে- মস্তিস্ক কি?

আল-কোরআনে সরাসরি "মস্তিস্ক" ('দিমাগ') শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। তবে কোরআন মানুষের উপলব্ধি, বিচার-বুদ্ধি ও চিন্তা-ভাবনার কেন্দ্র হিসেবে 'কলব' (قلب) বা হৃদয়কে চিহ্নিত করেছে। 'কলব' শুধু রক্ত সঞ্চালনকারী অঙ্গ নয়, বরং এটি প্রজ্ঞা, ঈমান এবং সত্যকে অনুধাবন করার কেন্দ্র। 

প্রমাণ:

فَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا...

অর্থ: তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? তাহলে তাদের এমন হৃদয় (কলব) হতো যা দ্বারা তারা উপলব্ধি করতে পারত... (সূরা আল-হজ্জ, ২২:৪৬)

এখানে 'আক্বল' বা উপলব্ধি করার কাজটি 'কলব' বা হৃদয়ের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে কোরআনের দৃষ্টিতে গভীর চিন্তার কেন্দ্র হলো অন্তর।

২. ‘আক্বল’ ও ‘তাফাক্কুর’ - চিন্তা, যুক্তি ও গবেষণার কেন্দ্র:

মস্তিষ্কের প্রধান কাজ হলো চিন্তা ও যুক্তি। কোরআন এই কাজগুলোকে ‘আক্বল’ (উপলব্ধি), ‘তাফাক্কুর’ (গভীর চিন্তা), এবং ‘তাদাব্বুর’ (অনুধ্যান)-এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছে।

সূরা আল-মুলক (৬৭:১০): জাহান্নামীরা আফসোস করে বলবে, "যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি (না'ক্বিলু) প্রয়োগ করতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম না।"

অনুধাবন: ‘আক্বল’ বা যুক্তি প্রয়োগের ব্যর্থতাই তাদের ধ্বংসের কারণ। এটি মস্তিষ্কের সেই ক্ষমতাকে নির্দেশ করে, যা তথ্য বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

সূরা আর-রূম (৩০:৮): "তারা কি তাদের নিজেদের মধ্যে গভীরভাবে চিন্তা (ইয়াতাফাক্কারূ) করে না?..."

অনুধাবন: আত্ম-বিশ্লেষণ বা introspective thinking মস্তিষ্কের একটি জটিল ও উচ্চতর কাজ, যা মানুষকে নিজের অস্তিত্ব ও স্রষ্টার নিদর্শন বুঝতে সাহায্য করে।

সারসংক্ষেপ:

'সদর' (صَدْر) মানে বক্ষ বা অন্তর, যা অনুভূতি ও বিশ্বাসের কেন্দ্র। এটি মস্তিস্ক নয়।

কোরআন মস্তিস্কের সামনের অংশের (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স) কার্যক্রমকে 'নাসিয়াহ' (نَاصِيَة) বা কপাল দ্বারা চিহ্নিত করেছে এবং একে মিথ্যা ও পাপের উৎস বলে বর্ণনা করেছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের দ্বারা প্রমাণিত।

সুতরাং, কোরআন চিন্তাভাবনা, উপলব্ধি এবং বিশ্বাসকে কেবল মস্তিস্কের কাজ হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে, একে অন্তর বা হৃদয়ের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছে, যা মানুষের সত্তার এক গভীরতর দিক নির্দেশ করে

এ-সংক্রান্ত কোরআনি দুআ সমূহ:

১. বক্ষ প্রশস্তকরণ ও কাজ সহজ করার দুআ:
قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي * وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي
উচ্চারণ: ক্বলা রব্বিশরাহলি সদরি, ওয়া ইয়াসসিরলি আমরি।

অর্থ: তিনি বললেন, 'হে আমার রব! আমার বক্ষকে (সদরকে) প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজকে সহজ করে দিন। (সূরা ত্বা-হা, ২০:২৫-২৬)

২. জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দুআ:
...وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا
উচ্চারণ: ...ওয়া কুর রব্বি যিদনী 'ইলমা।

অর্থ: ...এবং বলুন, 'হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন'। (সূরা ত্বা-হা, ২০:১১৪)

৩. অন্তরকে সরল পথে অবিচল রাখার দুআ:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
উচ্চারণ: রব্বানা লা তুযিগ্ কুলূবানা বা'দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাবলানা মিল্লাদুনকা রহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হাব।

অর্থ: হে আমাদের রব, সরল পথ দেখানোর পর আপনি আমাদের অন্তরকে বাঁকা করে দেবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনিই মহাদাতা (সূরা আলে-ইমরান, ৩:৮)
Dua: audio


...ওয়াল্লাহু ইয়া'লামু ওয়া আন্তুম লা তা'লামুন

"...আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।" (আয়াত ২:২১৬, ২:২৩১, ৩:৬৬)

"সদাকাল্লাহু ওয়া রাসূলুহ"  (আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছেন’সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২২

আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post