"স্যার", "হুজুর" নাকি "ভাই"?-আল্লাহর বার্তা প্রচারকারীদের প্রতি শোভনীয় সম্বোধন কী?
byঅনুধাবনের আয়োজনে: মতিউর রহমান খান
0
আল্লাহর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বার্তা, বাণী, আয়াত, কিতাব বা রিসালাতিল্লাহ প্রচারকারীদের প্রতি শোভনীয় সম্বোধন: "স্যার", "হুজুর" নাকি "ভাই"?
"উস্তায" (أُسْتَاذٌ) কিংবা "শায়খ" (شَيْخٌ)?
যারা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বার্তা, বাণী, আয়াত, কিতাব বা রিসালাতিল্লাহ (আল্লাহর বার্তা) মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পবিত্র দায়িত্ব পালন করেন, সমাজে তাদের প্রতি আমাদের সম্বোধন কেমন হওয়া উচিত—এ প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে "স্যার", "হুজুর" এবং "ভাই"—এই তিনটি সম্বোধনই প্রচলিত। আসুন, কুরআন ও নবীদের আদর্শের আলোকে এই সম্বোধনগুলোর প্রভাব এবং কোনটি সবচেয়ে বেশি শোভনীয়, তা বিশ্লেষণ করি।
এখানে একটি চিত্র দেওয়া হলো যা "স্যার" এবং "হুজুর" সম্বোধনের আনুষ্ঠানিকতার বিপরীতে "ভাই" সম্বোধনের আন্তরিক সম্পর্ককে তুলে ধরে:
ইসলামে মানুষের সাথে মানুষের মৌলিক সম্পর্ক: ঈমানী বন্ধন
কুরআনুল কারীম মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ককে বিভিন্ন দিক থেকে উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী হলো ঈমানী সম্পর্ক, যা বিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই সম্পর্কের ধরনগুলো হলো:
১. ভ্রাতৃত্ব (ইখওয়াহ):
সূরা হুজুরাত, আয়াত ১০: "নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।"
অনুধাবন: এই আয়াতটি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একতার মৌলিক ভিত্তি। এই ভ্রাতৃত্ব রক্তের সম্পর্ক অতিক্রম করে এক গভীর আত্মিক বন্ধন তৈরি করে, যেখানে পারস্পরিক ভালোবাসা, সমর্থন, নিরাপত্তা এবং একতা অপরিহার্য।
২. বন্ধুত্ব/অভিভাবকত্ব (আউলিয়া):
সূরা তাওবা, আয়াত ৭১: "আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু (আউলিয়া)। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এরাই যাদের প্রতি আল্লাহ দয়া করবেন।"
অনুধাবন: এই সম্পর্কটি পারস্পরিক সমর্থন, সহযোগিতা এবং দায়িত্বশীলতার উপর গুরুত্বারোপ করে। মুমিনরা একে অপরের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং রক্ষাকবচ।
সূরা আলে ইমরান, আয়াত ২৮: "মুমিনরা যেন মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফিরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। যে এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না..."
অনুধাবন: এখানে 'আউলিয়া' শব্দটি বন্ধু, পৃষ্ঠপোষক, অভিভাবক বা সহযোগীকে বোঝায়, যা একটি গভীর সম্পর্ককে নির্দেশ করে। এটি পরোক্ষভাবে নির্দেশ করে যে, মুমিনদের উচিত নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখা।
৩. সহযোগিতার সম্পর্ক (Cooperation/Support):
সূরা মায়েদা, আয়াত ২: "...তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরের সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে একে অপরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।"
অনুধাবন: এই আয়াতটি মুমিনদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে। 'তা'আওয়ানু' (তোমরা সহযোগিতা করো) শব্দটি নির্দেশ করে যে, মুমিনদের উচিত ঈমানী ও নৈতিক দায়িত্ব পালনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। এই সহযোগিতা এক ধরনের যৌথ প্রচেষ্টা, যা দ্বারা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে কল্যাণ সাধিত হয়।
সুতরাং, একজন মুমিন আরেকজন মুমিনের ভাই, বন্ধু এবং সহযোগী সবকিছুই। এই সম্পর্কগুলো একে অপরের পরিপূরক এবং সামগ্রিকভাবে একটি মজবুত মুসলিম উম্মাহ গঠনে অপরিহার্য। এটি একটি ঐক্যের প্রতীক, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে পারস্পরিক সমর্থন ও ভালোবাসার মাধ্যমে এগিয়ে চলে। এই গভীর ঈমানী সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেই আমরা সম্বোধনের বিষয়টি বিশ্লেষণ করব।
১. স্যার (Sir) সম্বোধন:
"স্যার" একটি ইংরেজি শব্দ, যা শিক্ষক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা সম্মানীয় ব্যক্তিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বাংলাভাষায় এটি শিক্ষক ও পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে বেশ প্রচলিত।
ইতিবাচক দিক:
সম্মান ও শ্রদ্ধা: এই সম্বোধনের মাধ্যমে আল্লাহর বার্তা প্রচারকারীর জ্ঞান ও পদমর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
নেতিবাচক দিক (দাওয়াতের প্রেক্ষাপটে):
দূরত্ব সৃষ্টি: "স্যার" সম্বোধন অনেক সময় একটি আনুষ্ঠানিক দূরত্ব তৈরি করে। ইসলামের বার্তা অন্তর থেকে গ্রহণ করতে হয়, আর আন্তরিক সম্পর্ক দূরত্বের চেয়ে নৈকট্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
শ্রেণিবিভাজন: এটি শিক্ষক-ছাত্রের মতো একটি উঁচু-নিচ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। অথচ আল্লাহর বার্তা সকলের জন্য এবং এর প্রচারক নিজেদেরকে সাধারণ মানুষেরই অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
বিনয়ের অভাব (শ্রোতার মনে): শ্রোতাদের মনে হতে পারে যে বার্তা প্রচারকারী একজন উচ্চাসনের ব্যক্তি, যা তাদের প্রশ্ন করতে বা খোলামেলা আলোচনা করতে দ্বিধাগ্রস্ত করতে পারে।
২. হুজুর (Huzoor) সম্বোধন:
"হুজুর" একটি ফার্সি শব্দ, যার অর্থ "সম্মানিত উপস্থিতি"। এটি ধর্মীয় আলেম, পীর-মাশায়েখ ও ইসলামী জ্ঞানীদের জন্য সম্মানসূচক সম্বোধন হিসেবে আমাদের সমাজে ব্যবহৃত হয়।
ইতিবাচক দিক:
গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান: "হুজুর" সম্বোধন আল্লাহর বার্তা প্রচারকারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রকাশ করে।
আধ্যাত্মিক উচ্চতা: এটি অনেক সময় ব্যক্তির আধ্যাত্মিক অবস্থান বা পবিত্রতার প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে।
ঐতিহ্য: এটি সমাজে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী সম্বোধন।
নেতিবাচক দিক (দাওয়াতের প্রেক্ষাপটে):
আনুষ্ঠানিক দূরত্ব: "স্যার" এর মতোই "হuzur" সম্বোধনও এক ধরনের আনুষ্ঠানিক দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। এতে শ্রোতারা বার্তা প্রচারকারীকে নিজেদের থেকে আলাদা মনে করতে পারেন।
সাধারণ মানুষের সাথে ব্যবধান: আল্লাহর বার্তার মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামের সহজ বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। "হুজুর" সম্বোধন বার্তা প্রচারকারীকে সাধারণ মানুষের থেকে কিছুটা আলাদা করে দেয়, যা বার্তার সর্বজনীনতাকে সীমিত করতে পারে।
অতিরিক্ত মর্যাদা প্রদান: অনেক সময় এই সম্বোধন ব্যক্তির জন্য অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত মর্যাদা তৈরি করে, যা ইসলামে কাম্য নয়। ইসলামে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।
কুরআনুল কারীমে নবী-রাসূলগণকে তাঁদের কওমের পক্ষ থেকে "তাদের ভাই" (أَخُوهُمْ) বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এই সম্বোধনটি ঈমানী ভ্রাতৃত্বের গভীরতাকে প্রতিফলিত করে।
উদাহরণস্বরূপ, কয়েকটি আয়াত যেখানে নবীগণকে "তাদের ভাই" বলা হয়েছে:
■ আদ জাতির কাছে হুদ (আঃ): সূরা শু'আরা, আয়াত ১২৪; সূরা আরাফ, আয়াত ৬৫।
■সামূদ জাতির কাছে সালিহ (আঃ): সূরা শু'আরা, আয়াত ১৪২; সূরা আরাফ, আয়াত ৭৩।
নৈকট্য ও আপনত্ব: "ভাই" সম্বোধন আন্তরিকতা ও আপনত্ব প্রকাশ করে। এটি বোঝায় যে বার্তা প্রচারকারী শ্রোতাদেরই একজন, তাদের কষ্ট বোঝেন এবং তাদের কল্যাণ চান।
বিনয় ও সমতা: এটি বার্তা প্রচারকারীর বিনয়কে ফুটিয়ে তোলে এবং শ্রোতাদের মনে তাকে উঁচু আসনে বসানোর পরিবর্তে একাত্মতার অনুভূতি দেয়।
ভালোবাসা ও সহানুভূতি: ভাই-ভাইয়ের সম্পর্ক ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীলতার উপর প্রতিষ্ঠিত। এই ধরনের সম্পর্ক বার্তার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
ইসলামী ভ্রাতৃত্ব: ইসলামে ঈমানের ভিত্তিতে সকল মুমিন ভাই-বোন। তাই আল্লাহর বার্তা প্রচারকারীকে "ভাই" বলে সম্বোধন করা ইসলামী ভ্রাতৃত্বের এক সুন্দর বহিঃপ্রকাশ।
শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক এবং দাওয়াতদাতার সম্পর্ক: যদিও আল্লাহর বার্তা প্রচারকারী দ্বীন শিক্ষা দেন বলে তিনি শিক্ষকের ভূমিকায় থাকেন। শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কে জ্ঞানের আদান-প্রদান ও শ্রদ্ধাবোধ জরুরি। তবে তাঁর সম্পর্ক কেবল শিক্ষকতার চেয়ে ব্যাপক। তাঁর কাজ শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা, উপদেশ দেওয়া, সংশয় দূর করা এবং হৃদয়কে প্রভাবিত করা। এই সম্পর্ক পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত হলে আল্লাহর বার্তা অধিক কার্যকর হয়।
অন্যান্য সম্মানসূচক কিন্তু অন্তরঙ্গ সম্বোধন:
"উস্তায" (أُسْتَاذٌ-Ustadh): "উস্তায" একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ 'শিক্ষক', 'গুরু' বা 'পণ্ডিত'। এবং এটিও সম্মানজনক। তবে এটি "ভাই" এর মতো এতটা নৈকট্যপূর্ণ নয়।
"শায়খ" (شَيْخٌ-Shaykh):"শায়খ" আরেকটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ 'বৃদ্ধ' বা 'প্রবীণ'। ইসলামী পরিভাষায় এটি সেইসব সম্মানিত ব্যক্তি, যারা জ্ঞান, প্রজ্ঞা, তাকওয়া এবং অভিজ্ঞতায় প্রবীণ।
সারকথা:
কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং নবী-রাসূলদের আদর্শের আলোকে, আল্লাহর বার্তা, বাণী, আয়াত, কিতাব বা রিসালাতিল্লাহ প্রচারকারীদের (দাওয়াতদাতা/আলেম) কে "ভাই" বলে সম্বোধন করা অত্যন্ত শোভনীয় এবং আকাঙ্ক্ষিত। এটি প্রচারকারীর সাথে শ্রোতাদের আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি করে, যা আল্লাহর বার্তার মূল উদ্দেশ্য সাধনে অধিক ফলপ্রসূ।
"স্যার" বা "হুজুর" সম্বোধন যদিও শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ করে, কিন্তু দাওয়াতের ক্ষেত্রে "ভাই" সম্বোধনটি আল্লাহর নির্দেশিত আদর্শিক ভ্রাতৃত্ব, নৈকট্য এবং বিনয়কে বেশি তুলে ধরে, যা আল্লাহর বার্তাকে আরও কার্যকর ও অন্তরঙ্গ করে তোলে। তাই, যারা আল্লাহর বার্তা প্রচার করেন, তাদের নিজেদেরকে "প্রিয় ভাই ও বোনেরা" বা "আমার মুসলিম ভাইয়েরা" বলে সম্বোধন করা উচিত, যাতে শ্রোতারা নিজেদেরকে তাদের অংশ মনে করে এবং বার্তা গ্রহণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
"ওহীর নেটওয়ার্ক/ওয়াইফাই/ইন্টারনেট গ্রুপে 'ভাই-ভাই' সম্পর্ক" এর চিত্রকল্পটি একটি ছবি দ্বারা ফুটিয়ে তোলা হলো:
ওহীর (কুরআন) অনুশীলন ও চর্চার মাধ্যমে যে দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাকে "নেটওয়ার্ক", "ওয়াইফাই" বা "ইন্টারনেট গ্রুপ" এর সাথে তুলনা করা আধুনিক প্রেক্ষাপটে খুবই প্রাসঙ্গিক এবং বোধগম্য বিষয়। এটি বোঝায় যে, এই বন্ধন একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী সংযোগের মাধ্যমে সৃষ্ট, যা দূরত্বের বাধা অতিক্রম করে মুমিনদেরকে একীভূত করে।
১. সূরা আহযাব (৩৩), আয়াত ৫:
এই আয়াতটি মূলত পালকপুত্রদের প্রকৃত পিতার পরিচয়ের ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়, কিন্তু এর শেষাংশে মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে:
এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর দ্বীনের অনুসারী, তারা একে অপরের "দ্বীনি ভাই" (إِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ)। এই আয়াতটি দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের এক মজবুত ভিত্তি স্থাপন করে, যা রক্তের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আসে।
২. সূরা আলে ইমরান (৩), আয়াত ১০৩:
আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে (কুরআনকে) মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের অন্তরসমূহে মহব্বত পয়দা করে দিলেন। ফলে তোমরা তাঁর মেহেরবানীতে ভাই-ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা ছিলে জাহান্নামের গর্তের কিনারায়, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করলেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হও।"
এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন, তাঁর নেয়ামতে তারা "ভাই-ভাই হয়ে গেলে" (فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا)। এটি সেই ঐক্যের কথা বলে যা ওহীর মাধ্যমে, অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশিত জীবনব্যবস্থার মাধ্যমে অর্জিত হয়। এটিই ওহীর সেই "নেটওয়ার্ক" যা মুমিনদেরকে এক করে দেয়।
এই নেটওয়ার্কের কিছু বৈশিষ্ট্য হতে পারে:
🔗 অদৃশ্য সংযোগ: ইন্টারনেটের মতো, এই সংযোগও চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর প্রভাব বাস্তব ও শক্তিশালী।
🔗তথ্য আদান-প্রদান: ওহীর জ্ঞান, উপদেশ, স্মরণীয় বিষয়াদি এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একে অপরের মধ্যে আদান-প্রদান করা হয়।
🔗পারস্পরিক সমর্থন: দ্বীনি ভাইয়েরা একে অপরের ভালো-মন্দে পাশে থাকে, সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করে এবং ভুল থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করে।
🔗 কেন্দ্রীয় শক্তি: আল্লাহ এবং তাঁর কিতাব (ওহী) হলো এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় সার্ভার বা রাউটার, যা থেকে সকলে শক্তি ও দিকনির্দেশনা লাভ করে।
মুত্তাকীদের জান্নাতের জীবন এবং তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তুলে ধরেছেন।
আয়াত (১৫:৪৫-৪৯):
"নিশ্চয়ই মুত্তাক্বীরা থাকবে জান্নাতসমূহে ও ঝর্ণাধারাসমূহে। (তাদেরকে বলা হবে) তোমরা সেখানে প্রবেশ করো শান্তিতে, নিরাপদে। আর আমি তাদের অন্তর থেকে বিদ্বেষ দূর করে দেবো; তারা ভাইয়ের মতো মুখোমুখি আসনে উপবিষ্ট থাকবে। সেখানে তাদের কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং তাদের সেখান থেকে বেরও করা হবে না। আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আমি তো পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
এই আয়াতগুলোতে মুত্তাক্বীদের জন্য জান্নাতের পরিবেশ, তাদের মানসিক শান্তি (বিদ্বেষমুক্ত হৃদয়), শারীরিক আরাম (ক্লান্তিহীন জীবন), জান্নাতের স্থায়িত্ব এবং সর্বোপরি আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
অর্র্থ: (এবং তাদের মধ্য হতে পরবর্তীতে যারা এসেছে তারা বলে) হে আমাদের রব! আমাদেরকে ও আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করে দিন, যারা ঈমানের সাথে আমাদের আগে চলে গিয়েছে। আর যারা ঈমান এনেছে, তাদের জন্য আমাদের অন্তরগুলোর মধ্যে কোন বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি ¯েœহপরায়ণ, পরম দয়ালু- আল কুরআন ৫৯:১০
উচ্চারণ: "রব্বিগফির লী ও ওয়ালি ওয়ালিদাইয়া ও লিমান দাখালা বাইতিয়া মু'মিনাও ওয়ালি মু'মিনীনা ওয়াল মু'মিনাতি ওয়ালা তাযিদিয যালিমীনা ইল্লা তাবারান।"
অর্থ: "হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতামাতাকে, যে আমার ঘরে মুমিন হয়ে প্রবেশ করে তাকে এবং সকল মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে ক্ষমা করে দিন; আর জালিমদের কেবল ধ্বংসই বাড়িয়ে দিন।" আয়াত (৭১:২৮):
অর্থ: "তিনি (মূসা) বললেন, 'হে আমার রব! আমাকে এবং আমার ভাইকে ক্ষমা করে দিন, আর আমাদেরকে আপনার রহমতের মধ্যে দাখিল করুন। আর আপনি তো সকল দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু'।" আয়াত (৭:১৫১):
এই দু'আর উপর ভিত্তি করে একটি চিত্র:
・。゚☆: *.☽ .* :☆゚.
কুরআনের আলোকে আল্লাহর কিতাবের আয়াত প্রচারকারী ও জ্ঞানীদের উপাধি ও গুণাবলী:
আল-কুরআন সরাসরি "স্যার", "হুজুর" বা "শায়খ" (আধুনিক বা প্রচলিত অর্থে) এর মতো সম্বোধন ব্যবহার করেনি। বরং, যারা আল্লাহর কিতাবের আয়াত প্রচার ও প্রসার করে এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ, তাদেরকে তাদের ভূমিকা ও গুণাবলী এবং তাদের চিন্তা ও উপলব্ধির বিভিন্ন স্তরভেদে নিম্নলিখিত উপাধি ও গুণবাচক শব্দসমূহে ভূষিত করেছে:
৬. মুফতি (مُفْتِي) বা ফকীহ (فَقِيهٌ): (যদিও শব্দগুলো সরাসরি কুরআনে নেই, তবে ভূমিকা নির্দেশক) (৯:১২২) [দ্বীন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন ও মানুষকে সতর্ক করার নির্দেশ থেকে এই ভূমিকার উৎপত্তি]
৭. আহলুল কিতাব (أَهْلُ الْكِتَابِ - কিতাবপ্রাপ্ত সম্প্রদায়): (কিতাবের সত্যতা অনুযায়ী চলে ও জ্ঞান প্রচারকারী নেককার অংশ) (৩:১১৩-১১৫, ৩:১৯৯, ৫:৮৩)
সারসংক্ষেপ: আল-কুরআন সরাসরি "স্যার", "হুজুর" বা "শায়খ" (আধুনিক বা প্রচলিত অর্থে) এর মতো সম্বোধন ব্যবহার করেনি। বরং, যারা আল্লাহর কিতাবের আয়াত প্রচার ও প্রসার করে এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ, তাদেরকে তাদের ভূমিকা ও গুণাবলীর উপর ভিত্তি করে নাবী, রাসূল, 'আলীম (জ্ঞানী), উলিল ইলম (জ্ঞানের অধিকারী), রাব্বানী (আল্লাহওয়ালা জ্ঞানী), হিকমাতের অধিকারী (প্রজ্ঞাবান), দায়ী ইলাল্লাহ (আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী), মুফতি/ফকীহ (দ্বীন সম্পর্কে গভীর জ্ঞানী ও সতর্ককারী), আহলুল কিতাবের মধ্যে যারা সত্যনিষ্ঠ, উলুল আলবাব (অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন), উলুন নুহা (বিবেকবান), আর-রাসিখুনা ফিল ইলম (জ্ঞানে সুদৃঢ়), আহলুয যিকর (স্মরণকারী), এবং ইলমুল কিতাব (কিতাবের জ্ঞানে অভিজ্ঞ) সহ বিভিন্ন সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করেছে। এছাড়াও, তাদের মধ্যে থাকা সালিহুন (সৎকর্মশীল), মুহসিনুন (সৎকর্মপরায়ণ) এবং সিদ্দিকুন (সত্যবাদী) এর মতো গুণাবলীও উল্লেখ করা হয়েছে। এই উপাধিগুলো তাদের ধর্মীয় ও জ্ঞানভিত্তিক মর্যাদাকে সুউচ্চ আসনে স্থাপন করেছে এবং তাদের চিন্তা, অনুধাবন ও পর্যবেক্ষণের গভীরতাকে নির্দেশ করে।