ইহুদি-নাসারারা-সাবেঈরা-অগ্নিপুজক এবং যারা শিরক করেছে তাঁদের ব্যাপারে কী বলে আল-কোরআন? What does the Al-Quran say about the Jews, Christians, Sabeans, Magians (fire-worshippers)...?

অনুধাবনে যাওয়ার পূর্বে  Lates Edition -final version হিসাবে  নিচের আয়াতগুলো একটু স্টাডি করি: আয়াত ২২:১৭, ২:৬২, ৫:৬৯, ৫:৬৮: 

👉 নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইয়াহুদি হয়েছে এবং যারা সাবেঈ ও খৃস্টান ও অগ্নিপুজক এবং যারা শিরক করেছে, নিশ্চয় আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর ওপরে প্রত্যক্ষদর্শী-আয়াত ২২:১৭

👉 নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদি হয়েছে ও নাসারারা আর সাবেঈরা - যারাই আল্লাহর প্রতি ও শেষদিনের প্রতি ঈমান আনবে এবং আমলে সলেহ করবে, তাহলে তাদেরই জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান। আর তাদের ওপর কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না-আয়াত ২:৬২

👉 নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও যারা ইহুদি হয়েছে আর সাবেয়ীরা ও নাসারারা- যারা আল্লাহর ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আমলে সলেহ করেছে, তাহলে তাদের ওপর কোনো ভয় নেই আর না তারা দুঃখিত হবে- আয়াত ৫:৬৯

👉 বলো! হে আহলে কিতাব! তোমরা কোনোকিছুরই ওপর নও, যতক্ষণ না তোমরা প্রতিষ্ঠা করবে তাওরাত ও ইঞ্জিল এবং সেটা, যা নাযিল করা হয়েছে তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। আর তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, সেটা নিশ্চয় তাদের মধ্য থেকে অনেকের অবাধ্যতা ও কুফর বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং তুমি কাফির জনগোষ্ঠীর জন্য দুঃখ কোরো না-৫:৬৮ (আরও দ্র: ৫:৬৪-৬৭)


আয়াতসমূহ অনুধাবন:

আল-কোরআন ইহুদি, নাসারা (খ্রিস্টান), সাবেঈ, অগ্নিপূজক এবং মুশরিকদের (যারা শিরক করেছে) ব্যাপারে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেছে। কোরআনের এই আলোচনাগুলো মূলত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. ইহুদি ও নাসারা (আহলে কিতাব):

কোরআন ইহুদি ও নাসারাদের 'আহলে কিতাব' (আসমানী কিতাবের অনুসারী) হিসেবে উল্লেখ করে। কোরআন স্বীকার করে যে তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলের মতো আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছিল। তবে, কোরআন তাদের কিছু সমালোচনাও করে:

  • কিতাবের বিকৃতি: কোরআন উল্লেখ করে যে, তারা তাদের কিতাবের কিছু অংশ বিকৃত করেছে বা গোপন করেছে। (যেমন: সূরা বাকারা: ৭৫, ৭৯)

  • নবী-রাসূলদের অস্বীকার ও হত্যা: তারা অনেক নবীকে অস্বীকার করেছে এবং এমনকি কিছু নবীকে হত্যাও করেছে। (যেমন: সূরা বাকারা: ৮৭, ৯১)

  • তাওরাত ও ইঞ্জিলের অনুসরণ না করা: কোরআন তাদের প্রতি আহ্বান জানায় যে, তারা যেন তাওরাত ও ইঞ্জিলের মূল শিক্ষা এবং নবীদের আগমনের সুসংবাদ অনুযায়ী সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি নাযিলকৃত কুরআনের ওপর ঈমান আনে। (সূরা মায়েদা: ৬৮)

  • আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন: খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে, কোরআন ঈসা (আ.) এবং মারিয়াম (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র ও স্ত্রী হিসেবে বিশ্বাস করাকে শিরক হিসেবে আখ্যায়িত করে। (সূরা মায়েদা: ৭২-৭৩, ১১২-১১৯)

  • গর্ব ও অহংকার: কোরআন তাদের কিছু অহংকার ও কুফরীর সমালোচনা করে, বিশেষ করে যখন তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয় জাতি বলে দাবি করত। (সূরা বাকারা: ১১১)

তবে, কোরআন এও বলে যে, আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে এবং নেক আমল করে, তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে। (সূরা বাকারা: ৬২, সূরা মায়েদা: ৬৯)।

২. সাবেঈন:

সাবেঈরা কারা, তা নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, তারা নুহ (আ.)-এর অনুসারী ছিল, আবার কেউ কেউ মনে করেন তারা তারকা পূজারি বা এক ধরনের কিতাবী সম্প্রদায় ছিল যাদের ধর্ম পরে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। কোরআন তাদের ব্যাপারে খুব বিস্তারিত কিছু বলে না, তবে ইহুদি ও নাসারাদের সাথে তাদেরও উল্লেখ করে:

  • ঈমান ও নেক আমলের শর্ত: সাবেঈদের ক্ষেত্রেও কোরআন একই শর্ত আরোপ করে যে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনবে এবং নেক আমল করবে, তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে। (সূরা বাকারা: ৬২, সূরা মায়েদা: ৬৯, সূরা হাজ্জ: ১৭)

এই আয়াতগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, তাদের মধ্যে যারা সত্যিকার অর্থে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল এবং সৎকর্ম করত, তারা আল্লাহর রহমতের অধিকারী হবে।

৩. অগ্নিপূজক (মাজুসী):

অগ্নিপূজকরা মূলত পারস্যের জরথুস্ট্রবাদের অনুসারী ছিল। তারা আগুনকে পবিত্র মনে করত এবং তাকে পূজা করত। কোরআন তাদের ব্যাপারে খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনা না করলেও সূরা হাজ্জে তাদের উল্লেখ করে:

  • আল্লাহ সকলকেই দেখেন: "নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইয়াহুদি হয়েছে এবং যারা সাবেঈ ও খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজক এবং যারা শিরক করেছে, নিশ্চয় আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর ওপরে প্রত্যক্ষদর্শী।" (সূরা হাজ্জ: ১৭)

এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সকলের বিচার করবেন এবং তিনি সকলের আমল সম্পর্কে অবগত। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, তাদের বিশ্বাস ও আমলের ব্যাপারে আল্লাহই চূড়ান্ত ফয়সালাকারী।

৪. মুশরিক (যারা শিরক করেছে):

মুশরিকরা হলো তারা যারা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করে বা অংশীদার স্থাপন করে। ইসলামের দৃষ্টিতে শিরক সবচেয়ে বড় গুনাহ এবং এটি ক্ষমার অযোগ্য, যদি না ব্যক্তি শিরক থেকে তওবা করে ঈমান না আনে। কোরআন মুশরিকদের তীব্র সমালোচনা করে:

  • শিরকের জঘন্যতা: কোরআন অসংখ্য আয়াতে শিরককে জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে। "নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না। এর নিচে যা আছে তা যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা নিসা: ৪৮, ১১৬)

  • মিথ্যা উপাস্যদের উপাসনা: মুশরিকরা দেব-দেবী, মূর্তি, তারকা বা অন্য কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর সমকক্ষ বা তাঁর অংশীদার মনে করে পূজা করত। কোরআন এই ধারণাগুলোকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে। (যেমন: সূরা ইউনুস: ৬৬, সূরা লুকমান: ১৩)

  • জাহান্নামের শাস্তি: মুশরিকদের জন্য কোরআন জাহান্নামের কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেয়। (যেমন: সূরা তাওবা: ১৭)

  • এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান: কোরআনের মূল বার্তা হলো এক আল্লাহর (আল্লাহ) ইবাদত করা এবং সকল প্রকার শিরক থেকে বিরত থাকা।

ভাবনায় সার কথা:

কোরআন এই বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও বিশ্বাসীদের সম্পর্কে এক সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। একদিকে, এটি আহলে কিতাবদের প্রতি তাদের কিতাবের মূল শিক্ষা ও শেষ নবীর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানায় এবং তাদের ত্রুটিগুলো তুলে ধরে। অন্যদিকে, সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস রাখে এবং সৎকর্ম করে, তাদের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। আর মুশরিকদের ক্ষেত্রে, কোরআন শিরককে সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানায়।

আয়াত ৫:১১৬-১১৯ পর্যন্ত অনুধাবনে আমাদের নতুন কিছু তথ্য দেয় যা বিবেচনার দাবী রাখে: (আরও বিবেচনায় আনতে হবে ৫:৬১-৮৫)

আর যখন আল্লাহ বলবেন, হে মারইয়াম পুত্র ঈসা! তুমি কি মানুষকে বলেছ, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে আমাকে এবং আমার মাকে, দুই উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করো? সে বলবে, পবিত্রতা আপনারই। আমার জন্য সেটা হতে পারেনা যে, আমি তা বলব যার কোন অধিকার আমার জন্য নেই। যদি আমি সেটা বলতাম তাহলে অবশ্যই আপনি তা জানতেন। আপনি জানেন, যা আমার অন্তরের মধ্যে আছে। আর আপনার অন্তরের মধ্যে যা আছে তা আমি জানি না। নিশ্চয় আপনি, আপনিই অদৃশ্যসমূহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। আমি তাদেরকে বলিনি সেটা ছাড়া যার বিষয়ে আপনি আমাকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত করো। আর আমি তাদের ব্যাপারে একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম, যতদিন আমি তাদের মাঝে ছিলাম। এরপর যখন আপনি আমার কালসম্পন্ন করলেন, আপনিই তাদের ব্যাপারে পর্যবেক্ষক ছিলেন। আর আপনি সবকিছু সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী। যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন তাহলে তারা অবশ্যই আপনার বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তাহলে নিশ্চয় আপনি, আপনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। 

আল্লাহ বলবেন, এটা এমন দিন যেদিন তাদের সত্যতা সত্যবাদীদের উপকারে আসবে। তাদের জন্য রয়েছে এমন জান্নাতসমূহ, সেগুলোর নিচ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হয়। তারা স্থায়ীভাবে চিরকাল সেখানে থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। সেটাই

সূরা মুহাম্মাদ 47:2-3

আর যারা ঈমান আনে ও আমলে সলেহ করে এবং সে বিষয়ে ঈমান আনে যা মুহাম্মাদের ওপর নাযিল করা হয়েছে আর তা তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য। তিনি তাদের থেকে তাদের ত্রুটিগুলো লুকিয়ে রাখেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করেন। সেটা এ কারণে যে, যারা কুফর করে তারা বাতিলের অনুসরণ করে। আর এটাও যে, যারা ঈমান আনে তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে হকের অনুসরণ করে। ওভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্তসমূহ উপস্থাপন করেন।

সারসংক্ষেপ:

আয়াতগুলো একত্রিত করলে যে মূল বার্তাটি পাওয়া যায় তা হলো:

➤ মুক্তির জন্য আল্লাহর প্রতি ঈমান, শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস এবং নেক আমল অপরিহার্য।

➤ আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাযিল হয়েছে (তাওরাত, ইঞ্জিল, কুরআন) তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা আবশ্যক।

➤ সকল পূর্ববর্তী নাযিলকৃত কিতাবে শেষ নবীর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিল, তাই মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি নাযিলকৃত কুরআনের ওপর ঈমান আনা সকল মানুষের জন্য জরুরি।

➤শিরক বা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করা গুরুতর অপরাধ, যা থেকে বিরত থাকতে হবে।

এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, ইসলাম সকল মানুষকে তাওহিদ এবং আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করার আহ্বান জানায়, যা কিনা পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাবের মূল শিক্ষাও ছিল।

এই আয়াতগুলো নিঃসন্দেহে এই সত্যকে তুলে ধরে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাযিল হয়েছে, বিশেষ করে শেষ কিতাব কুরআন (Lates Edition -final version) , তা মানা সকলের জন্য ফরয। এর ব্যতিক্রম করা কুফর হিসেবে বিবেচিত হবে।

আল্লাহু আ’লামু (আল্লাহই অধিক জ্ঞাত)-৬:১২৪

আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post