"হিজাব না পরলে কি জাহান্নামী হবে?"📍আহসানুল হাদীস (আল-কোরআন) কি এমন কথা বলে?

আল-কুরআনে হিজাব ও শালীনতা: একটি অনুধাবন এবং সতর্কীকরণ

আল-কুরআনে সরাসরি "হিজাব না পরলে জাহান্নামী হবে" এমন কথা বলা হয়নি। তবে, কোরআনের কিছু আয়াতে মুসলিম নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য শালীনতা বজায় রেখে পোশাক পরিধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এমন পোশাকের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যা আধুনিক প্রেক্ষাপটে হিজাব বা পর্দা হিসেবে পরিচিত। এই আয়াতগুলো মূলত সামাজিক শালীনতা ও সুরক্ষার জন্য নির্দেশিকা, যা মানুষের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।


কুরআনের নির্দেশনা:

১. পুরুষদের জন্য পর্দার নির্দেশ - সূরা নূর-এর ৩০ নম্বর আয়াত (২৪:৩০):
"মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।"

২. নারীদের জন্য পর্দার নির্দেশ - সূরা নূর-এর ৩১ নম্বর আয়াত (২৪:৩১):
"মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; তারা যেন তাদের আভরণ প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত। তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশের উপর ফেলে রাখে; তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র, নিজেদের নারীগণ, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, এমন পুরুষ যাদের কোন যৌন আকাঙ্ক্ষা নেই এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারো কাছে তাদের আভরণ প্রকাশ না করে।"

৩. নারীদের জন্য চাদরের নির্দেশ - সূরা আহযাব-এর ৫৯ নম্বর আয়াত (৩৩:৫৯):
"হে নবী! আপনার স্ত্রীগণকে, আপনার কন্যাগণকে এবং মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"

এই আয়াতগুলো মূলত সামাজিক শালীনতা ও সুরক্ষার জন্য নির্দেশিকা, যা নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

আল-কুরআনে অপরাধ ও শাস্তি:

আল-কুরআনে বিভিন্ন অপরাধ ও পাপের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের উভয় প্রকার শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুনিয়াবী শাস্তি নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্য নির্ধারিত, যা ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় কার্যকর করা হয়। আখিরাতের শাস্তি মূলত পরকালে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া হবে।

কুরআনে উল্লেখিত কিছু প্রধান অপরাধ ও সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ:

■ শির্ক (আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন কিংবা বিধানে বা ইবাদতে কিছু যুক্ত করা): ৪:৪৮, ৫:৭২
■  হত্যা: ৪:৯৩, ১৭:৩৩
■  চুরি: ৫:৩৮
■  ব্যভিচার (যিনা): ২৪:২
■  মিথ্যা অপবাদ: ২৪:৪
■  রিবা (সুদ): ২:২৭৫, ২:২৭৮-২৭৯
■  জুলুম ও অন্যায়: ২:২৭০
■  দ্বীনত্যাগ (রিদদা): ২:২১৭
■  পরনিন্দা ও কটাক্ষকারী-১০৪:১-৩
■ অশ্লীলতা ছড়ানো- ২৪:১৯

তবে এখানে উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ন বিষয়: অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে পছন্দ করা-

"যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে পছন্দ করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না"-সূরা আন-নূর (২৪:১৯)


পর্দা না পরার বিষয়টি এবং সতর্কীকরণ:

আল-কুরআনে সরাসরি "হিজাব না পরলে জাহান্নামী হবে" এমন কথা বলা হয়নি। তবে, সূরা নূর (২৪:৩০-৩১) এবং সূরা আহযাব (৩৩:৫৯) আয়াতে মুসলিম নারী ও পুরুষদের শালীনতা বজায় রেখে পোশাক পরিধানের এবং নিজেদের দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতগুলো মূলত সামাজিক শালীনতা ও সুরক্ষার জন্য নির্দেশিকা, যা উভয়ের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

যেহেতু এই নির্দেশগুলো আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে, তাই আল-কুরআনের সকল বিধি-বিধান, উপদেশ ও নির্দেশ একজন আয়াতে বিশ্বাসী মুসলিম-মুসলিমার জন্য মেনে চলা ও পালন করা ফরয। এটি তাদের ঈমানের দাবি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তা'আলার আদেশ অমান্য করা মহাপাপ, যার পরিণাম আখিরাতে কঠিন হতে পারে।

আল-কুরআনের সমন্বিত বিধান ও আখিরাতের গুরুত্ব:

আল-কুরআনের সকল বিধান সমন্বিত এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনকে সামনে রেখেই প্রণীত। এই পৃথিবীতে মানবতার জন্য সরাসরি ক্ষতিকর যেসব বিষয়, সেগুলোর শাস্তি দুনিয়াতেও বলবৎ করা হয়েছে, যেমন - হত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যা অপবাদ ইত্যাদি। এর পাশাপাশি আখিরাতের শাস্তি আরও ভয়াবহ এবং ব্যাপক। আল্লাহর আদেশ অমান্য করা হলে তার কঠিন পরিণাম হতে পারে, কারণ আল্লাহ তা'আলা ন্যায়পরায়ণ এবং তাঁর নির্দেশগুলো মানুষের কল্যাণার্থেই দেওয়া হয়েছে।

পোশাক ও তাক্বওয়ার গুরুত্ব - সূরা আল-আরাফ (৭:২৬-২৭):

"হে বনী আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং যা সৌন্দর্যস্বরূপ। আর তাক্বওয়ার পোশাক—সেটাই শ্রেষ্ঠ। এগুলো আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।"

"হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে, যেমন সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিল, তাদের পোশাক খুলে ফেলেছিল, যাতে তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ে। নিশ্চয় সে ও তার দলবল তোমাদেরকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। নিশ্চয় আমরা শয়তানদেরকে তাদের বন্ধু বানিয়েছি যারা ঈমান আনে না।"

সুতরাং, আল-কুরআনের আয়াতগুলো দ্বারা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, আল-কুরআনে উল্লেখিত সকল বিধি-বিধান, উপদেশ ও নির্দেশ একজন বিশ্বাসী মুসলিম-মুসলিমার জন্য মেনে চলা এবং পালন করা ফরয। এটি তাদের ঈমানের দাবি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, যা শয়তানের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতেও সহায়ক। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে, তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত সতর্কতার সাথে এ সকল বিধান মেনে চলা।

আল্লাহু আ’লামু (আল্লাহই অধিক জ্ঞাত)-৬:১২৪
আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post