সর্বশেষ সংস্করণ: লেটেস্ট ভার্সন: ১০০% বিশুদ্ধ, সমগ্র মানবজাতির জন্য আল-কুরআন। The latest version-Al-Quran.

কুরআন শুধু পূর্ববর্তী কিতাবসমূহকে সত্যায়নই করেনি, বরং সেগুলোকে তার সার্বজনীন ও সর্বকালীন বিধান দ্বারা রহিত (নাসখ) করেছে – এমন একটি ধারনা রয়েছে। যদিও কুরআন সরাসরি 'পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ রহিত করা হয়েছে' এমন শব্দ ব্যবহার করে না, তবে একাধিক আয়াতের সম্মিলিত বিশ্লেষণ থেকে এই অনুধ্যানে আসে  যে, কুরআনের আগমনের পর এই নতুন ও চূড়ান্ত (latest version) নিয়ে চলছে-চলবে...।


১. কুরআনকে 'মুহাইমিন' (কর্তৃত্বকারী/ সংরক্ষক/ সর্বোপরি বিচারক) হিসেবে ঘোষণা:

সূরা আল-মায়িদাহ (5:48):
"আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি সত্য সহকারে, তার পূর্বের কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী ও সেগুলোর সংরক্ষক রূপে। সুতরাং তুমি তাদের মধ্যে ফয়সালা করো আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী, আর তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না যা তোমার কাছে সত্য এসেছে তা থেকে বিচ্যুত হয়ে..."

অনুধাবন: এই আয়াতের 'মুহাইমিন' শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর বিভিন্ন অর্থ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে 'তত্ত্বাবধায়ক', 'সংরক্ষক', 'চূড়ান্ত বিচারক' এবং 'সার্বভৌম কর্তৃত্বকারী'। যখন কুরআনকে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের 'মুহাইমিন' বলা হয়, তখন এর অর্থ হয়:

কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে যা সত্য ছিল, সেগুলোকে নিশ্চিত করে।

মানুষের হাতে যে বিকৃতি বা পরিবর্তন ঘটেছে, তা থেকে মূল সত্যকে রক্ষা করে।

গুরুত্বপূর্ণভাবে, এটি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব স্থাপন করে। এটি কার্যত পূর্ববর্তী শরীয়তের বিধানকে রহিত করে দেয়। আয়াতের শেষাংশ "সুতরাং তুমি তাদের মধ্যে ফয়সালা করো আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী" – এই নির্দেশ স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে, এখন থেকে বিচার-ফয়সালার একমাত্র মানদণ্ড হলো কুরআন।

২. দ্বীনের পূর্ণতা ও নেয়ামতের সমাপ্তি:

সূরা আল-মায়িদাহ (5:3):

"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।"

অনুধাবন:  এটি দ্বীনের পূর্ণতা ঘোষণা করে। যখন দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়ে যায় এবং আল্লাহর নেয়ামত সম্পূর্ণ হয়, তখন এর অর্থ হলো, এখন থেকে আর নতুন কোনো বিধান বা শরীয়তের প্রয়োজন নেই। পূর্ববর্তী শরীয়তগুলো যে অপূর্ণ ছিল বা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছিল, এই আয়াত তার ইঙ্গিত দেয়। কুরআনের মাধ্যমে সেই পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী সকল বিধানকে রহিত করে দিয়েছে।

 আর তোমার রবের বাণী সত্যরূপে ও সুবিচারপ্রসূত পূর্ণ হয়েছে। তাঁর বাণীসমূহের জন্য কোনো পরিবর্তনকারী নেই আর তিনি সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন-6:115

৩. সকল নবীদের কিতাব ও প্রজ্ঞার সত্যায়নকারী হিসাবে একজন রসূলে ঈমান ও সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি আদায়:

সূরা আলে ইমরান (3:81):

"আর স্মরণ করো, যখন আল্লাহ নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, যখন আমি তোমাদের কিতাব ও হেকমত দেব, অতঃপর তোমাদের কাছে এক রাসূল আসবে, যা তোমাদের কাছে আছে তার সত্যায়নকারী, তখন তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেন, 'তোমরা কি স্বীকার করলে এবং আমার এই অঙ্গীকার গ্রহণ করলে?' তারা বলল, 'আমরা স্বীকার করলাম।' তিনি বললেন, 'তবে তোমরা সাক্ষী থাকো, আর আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষীদের মধ্যে রইলাম।'

অনুধাবন: এই আয়াতটি প্রকাশ করে যে, আল্লাহ সকল নবীর কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, শেষ নবী (মুহাম্মদ সা.) রসুল হিসাবে  যখন  আসবেন এবং তিনি তাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়নকারী হবেন, তখন তারা অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে। যদি নবীরাই তাঁর অনুসরণ করতে বাধ্য হন, তাহলে তাদের উম্মতদের/কওমদের জন্য তাঁর আনীত কিতাব ও হেকমত (কুরআন) অনুসরণ করা আরও বেশি বাধ্যতামূলক। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন এবং তাঁর প্রতি কুরআন নাযিলের পর পূর্ববর্তী সকল শরীয়ত বাতিল হয়ে গেছে।

৪. সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা.)-কে সমগ্র মানবজাতির জন্য রাসূল হিসেবে ঘোষণা:

সূরা আল-আ'রাফ (7:158): "বলো, হে মানবজাতি! নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল, যিনি আসমান ও যমিনের রাজত্বের মালিক..."

অনুধাবন: মুহাম্মদ (সা.)-কে সমগ্র মানবজাতির জন্য রাসূল হিসেবে ঘোষণা করা মানে তাঁর আনীত বিধান (কুরআন) সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য। এর বিপরীতে, পূর্ববর্তী নবীরা নির্দিষ্ট জাতি বা গোত্রের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। যখন একজন বিশ্বজনীন রাসূল এবং একটি বিশ্বজনীন কিতাব আসে, তখন নির্দিষ্ট জাতির জন্য প্রেরিত বিধানগুলো রহিত হয়ে যায়।

উপরোক্ত আয়াতগুলোর সম্মিলিত বিশ্লেষণ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, কুরআন শুধু পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের মৌলিক সত্যকে সত্যায়নই করেনি, বরং সেগুলোকে তার সার্বজনীন ও সর্বকালীন বিধান দ্বারা রহিত করেছে। 'মুহাইমিন' হিসেবে কুরআনের অবস্থান, দ্বীনের পূর্ণতা ঘোষণা, পূর্ববর্তী নবীদের কাছ থেকে শেষ নবীর আনুগত্যের অঙ্গীকার এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর সার্বজনীন রিসালাত – এই সবই প্রমাণ করে যে, কুরআনের আগমনের পর পূর্ববর্তী শরীয়তসমূহের কার্যকারিতা নেই এবং এখন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য একমাত্র প্রযোজ্য ও কার্যকরী বিধান হলো আল-কুরআন।

    ~*~*~*~     ~*~*~*~

👉 আল-কুরআন: পূর্ববর্তী কিতাবের ধারাবাহিকতায় তাসদীদকৃত সর্বশেষ ও একমাত্র ঐশী গ্রন্থ:

আল্লাহ তা'আলা যুগে যুগে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য কিতাব নাযিল করেছেন। এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ সংযোজন  (Latest Version) হলো আল-কুরআন। কুরআন শুধু পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যতাকে সত্যায়নই করে না, বরং সেগুলোর শিক্ষাকে পূর্ণতা দান করে এবং মানবজাতির জন্য একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করব যে, এটি পূর্ববর্তী কিতাবের ধারাবাহিকতায় তাসদীদকৃত (সত্যায়নকারী) সর্বশেষ ভার্সন এবং বর্তমানে এটিই পৃথিবীর একমাত্র নাযিলকৃত আল্লাহর কিতাব।

সূরা আল-বাক্বারাহ (2:41): "আর তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করো তাতে যা আমি নাযিল করেছি, তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়নকারী রূপে, আর তোমরাই প্রথম কাফের হয়ো না..."

সূরা আলে ইমরান (3:3): "তিনি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন সত্য সহকারে, যা তার পূর্বের কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী। আর তিনি নাযিল করেছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল।"

সূরা নিসা (4:47): "হে কিতাবপ্রাপ্তগণ, তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করো তাতে যা আমি নাযিল করেছি, তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়নকারী রূপে, তোমাদের মুখমন্ডল বিকৃত করে পশ্চাদ্দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার আগে অথবা তাদেরকে অভিসম্পাত করার আগে যেমনভাবে আমরা শনিবারের সাথীদেরকে অভিসম্পাত করেছিলাম। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকর হবেই।"

সূরা আল-মায়িদাহ (5:48): "আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি সত্য সহকারে, তার পূর্বের কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী ও সেগুলোর সংরক্ষক রূপে।"

আল-আনাম 6:19:  বলো! সাক্ষ্য হিসাবে কোন বিষয় সবচেয়ে বড়? বলো, আল্লাহ! তিনি সাক্ষী আমার মাঝে ও তোমাদের মাঝে। এবং আমার কাছে এই কুরআন ওহী করা হয়েছে, যেন এর দ্বারা আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি এবং তাকেও যার কাছে তা পৌঁছবে। নিশ্চয় তোমরা কি নিশ্চিত সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আল্লাহর সাথে অন্যান্য উপাস্যও আছে? বলো! আমি সাক্ষ্য দিই না। বলো! প্রকৃতপক্ষে তিনি একমাত্র ইলাহ। আর নিশ্চয় আমি তা থেকে মুক্ত যা তোমরা শিরক করো।

এই আয়াতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কুরআনকে শুধু সত্যায়নকারী নয়, বরং "সংরক্ষক" (মুহাইমিন) হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। 'মুহাইমিন' শব্দের অর্থ হলো তত্ত্বাবধায়ক, রক্ষক, বা কর্তৃত্বকারী। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে মানুষের দ্বারা প্রবেশকৃত বিকৃতি ও পরিবর্তন থেকে আসল সত্যকে রক্ষা করে এবং সেগুলোর ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব স্থাপন করে। এটি প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের যে অংশগুলো বিকৃত হয়নি, সেগুলোকে কুরআন সমর্থন করে এবং যে অংশগুলো বিকৃত হয়েছে, সেগুলোর ভুল সংশোধন করে।
    ~*~*~*~     ~*~*~*~

👉তাসদীক (সত্যায়ন) এবং মুহাইমিন (সংরক্ষক ও কর্তৃত্বকারী) হিসেবে কুরআন:

কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের "লেটেস্ট ভার্সন" হিসেবে শুধু সেগুলোর মূল সত্যকে সত্যায়নই করে না, বরং সেগুলোর ওপর কর্তৃত্বও স্থাপন করে।

সূরা আল-মায়িদাহ (5:48): "আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি সত্য সহকারে, তার পূর্বের কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী ও সেগুলোর সংরক্ষক রূপে।

এখানে 'মুহাইমিন' (সংরক্ষক/তত্ত্বাবধায়ক/কর্তৃত্বকারী) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হলো, কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের মধ্যে যে সত্যগুলো ছিল, সেগুলোকে নিশ্চিত করে এবং যেগুলোর মধ্যে বিকৃতি বা ত্রুটি প্রবেশ করেছিল, সেগুলোকে সংশোধন করে। এটি চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। এর মানে হলো, এখন থেকে সত্যের মানদণ্ড হলো কুরআন।

🔗সার্বজনীনতা ও সর্বকালীনতা:

কুরআন শুধু একটি নির্দিষ্ট জাতি বা সময়ের জন্য নাযিল হয়নি। এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য কিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য একটি সর্বজনীন ও সর্বকালীন জীবনবিধান।

সূরা ইব্রাহীম (14:52): "এটি মানুষের জন্য একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা, যাতে এর দ্বারা তারা সতর্ক হয় এবং যাতে তারা জানতে পারে যে, তিনিই একমাত্র উপাস্য, এবং যাতে বুদ্ধিমানেরা উপদেশ গ্রহণ করে।"

সূরা আন'আম (6:19): "বলো, সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য কার? বলো, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী। আর এই কুরআন আমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে, যেন আমি এর দ্বারা তোমাদেরকে এবং যাকে এর বার্তা পৌঁছে, তাকে সতর্ক করি।"

এই আয়াতগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, কুরআনের বার্তা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্বজনীন। অন্যান্য কিতাবগুলোর একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যকরী ছিল, কিন্তু কুরআনের বিধান কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী। এটিই একে "লেটেস্ট ভার্সন" হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যার আর কোনো নতুন সংস্করণ আসার প্রয়োজন নেই।
    ~*~*~*~     ~*~*~*~

👉 পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের বিকৃতি ও পরিবর্তিত রূপ এবং আল-কুরআনের বিশুদ্ধতা/ স্থিতিশীলতা:

নাযিলকৃত কিতাবের বিকৃতি এবং শব্দের বিকৃতির বিষয়ে কুরআন সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, আহলে কিতাবের একদল এই কাজটি করত।

কুরআনে এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি আয়াত রয়েছে যা তাদের এই অপকর্মের কথা তুলে ধরেছে।

শব্দগত বিকৃতি (تحريف الكلم عن مواضعه - তাহরীফ আল-কালিম আন মাওয়াদি'হি):

এই অভিব্যক্তিটি কুরআনে কয়েকবার এসেছে, যা নির্দেশ করে যে ইহুদিরা তাদের কিতাবের শব্দগুলোকে তাদের মূল স্থান থেকে সরিয়ে দিত বা সেগুলোর অর্থ পরিবর্তন করত।

সূরা আল-বাক্বারাহ (2:75):
"তবে কি তোমরা আশা করো যে, তারা তোমাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে? অথচ তাদের একদল ছিল, যারা আল্লাহর বাণী শুনত, অতঃপর তা উপলব্ধি করার পর জেনে বুঝে পরিবর্তন করত।"

এই আয়াতে স্পষ্টত ইহুদিদের একটি দলের কথা বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর কালাম শুনে এবং তা বুঝে নেওয়ার পরেও স্বেচ্ছায় তা পরিবর্তন করত। এখানে 'يُحَرِّفُونَهُ' (ইউহাররিফুনাহু) শব্দটি 'তাহরীফ' থেকে এসেছে, যার অর্থ বিকৃত করা বা পরিবর্তন করা।

সূরা নিসা (4:46):
"ইহুদিদের মধ্যে কিছু লোক শব্দগুলোকে তাদের স্থান থেকে বিকৃত করে দেয় এবং বলে, 'আমরা শুনলাম ও অমান্য করলাম'..."

এখানেও ইহুদিদের কথা বলা হয়েছে যে, তারা শব্দগুলোকে তাদের মূল অবস্থান থেকে বিকৃত করত। এটি শুধু তাদের কিতাবের শব্দের বিকৃতি নয়, বরং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে কথা বলার সময়ও তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শব্দ পরিবর্তন করে অশালীন অর্থ প্রকাশ করত, যেমন 'রায়িনা' (আমাদের রাখাল/মন্দ ব্যক্তি) বলত, যার অর্থ 'আমাদের প্রতি খেয়াল রাখুন' এর বদলে।

সূরা আল-মায়িদাহ (5:13):
"অতঃপর তাদের চুক্তি ভঙ্গের কারণে আমি তাদের অভিশাপ দিয়েছি এবং তাদের অন্তর কঠিন করে দিয়েছি। তারা কিতাবের শব্দগুলোকে তাদের স্থান থেকে বিকৃত করে..."

এই আয়াতেও ইহুদিদের দ্বারা কিতাবের শব্দ বিকৃত করার কথা বলা হয়েছে, যা তাদের চুক্তি ভঙ্গের একটি পরিণতি হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে।

■ নিজেদের হাতে কিতাব লেখা এবং সেগুলোকে আল্লাহর কিতাব বলে দাবি করা:

ইহুদিরা শুধু শব্দ বিকৃতই করত না, বরং নিজেরা কিতাব লিখে সেগুলোকে আল্লাহর কিতাব বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত।

সূরা আল-বাক্বারাহ (2:79):

"সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজেদের হাতে কিতাব লেখে, তারপর বলে, 'এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে', যাতে এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যা তাদের হাত লিখেছে এবং দুর্ভোগ তাদের জন্য যা তারা উপার্জন করেছে।"

এই আয়াতটি অত্যন্ত স্পষ্ট। এটি সরাসরি সেইসব লোকদের নিন্দা করছে যারা নিজেদের হাতে বইপত্র লিখত এবং সেগুলোকে আল্লাহর বাণী বলে দাবি করত, সামান্য পার্থিব লাভের আশায়। এটি তাওরাতের বিকৃতির একটি গুরুতর দিক ছিল।

■ সত্য গোপন করা:

বিকৃতির পাশাপাশি, ইহুদি পণ্ডিতরা অনেক সত্যও গোপন করত যা তাদের কিতাবে ছিল, বিশেষ করে শেষ নবীর (মুহাম্মদ সা.) আগমন সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণী।

সূরা আল-বাক্বারাহ (2:42):

"আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জেনেশুনে সত্যকে গোপন করো না।"

সূরা আল-বাক্বারাহ (2:146):
"যাদেরকে আমরা কিতাব দিয়েছি, তারা তাকে (মুহাম্মদকে) চেনে, যেমন তারা তাদের সন্তানদের চেনে। কিন্তু তাদের একদল জেনেবুঝে সত্য গোপন করে।"

এই আয়াতগুলোতে সত্য গোপন করার কথা বলা হয়েছে, যা কিতাবের বিকৃতিরই একটি রূপ। তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে যে সত্য তাদের কিতাবে ছিল, তা প্রকাশ করত না।

আল-কুরআনের বিশুদ্ধতা/ স্থিতিশীলতা:

কুরআনের উপরোক্ত আয়াতসমূহ থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, নাযিলকৃত কিতাবের বিকৃতি এবং শব্দের বিকৃতি মূলত ইহুদি পণ্ডিতগণ (আহলে কিতাবের একদল) করত। তারা তাদের নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য, সত্যকে গোপন করার জন্য, এবং আল্লাহর বাণীতে পরিবর্তন আনার জন্য এই কাজগুলো করত। এই বিকৃতির প্রধান কারণ ছিল পার্থিব লোভ এবং সত্যের প্রতি বিদ্বেষ। এই কারণেই আল্লাহ তা'আলা কুরআনকে সুরক্ষিত রেখেছেন, যাতে এটি কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত থাকে এবং মানবজাতির জন্য একমাত্র বিশুদ্ধ হেদায়েতের উৎস হিসেবে কাজ করে।

এর বিপরীতে, আল্লাহ তা'আলা কুরআনের সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং গ্রহণ করেছেন।

কুরআনের সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশুদ্ধতা ও অবিকৃত অবস্থা। আল্লাহ তা'আলা নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যা অন্য কোনো আসমানী কিতাবের ক্ষেত্রে এভাবে বলা হয়নি।

সূরা আল-হিজর (15:9): "নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয় আমিই তার সংরক্ষণকারী।"

এই আয়াতটি কুরআনের বিশুদ্ধতার চূড়ান্ত গ্যারান্টি। আল্লাহ নিজেই যেহেতু এর সংরক্ষক, তাই এটি মানুষের হস্তক্ষেপ, বিকৃতি বা পরিবর্তন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। চৌদ্দশ বছর ধরে এর একটি অক্ষরও পরিবর্তন হয়নি, যা মানব ইতিহাসে আর কোনো ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি। এটি তার "লেটেস্ট ভার্সন" হওয়ার এবং ১০০% বিশুদ্ধ হওয়ার দাবির প্রধান ভিত্তি।

সূরা আল-হিজর (15:9): "নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয় আমিই তার সংরক্ষণকারী।"

এই আয়াতটি কুরআনের বিশুদ্ধতা ও অপরিবর্তনীয়তার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই প্রতিশ্রুতির কারণে চৌদ্দশ বছর ধরে কুরআন অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এটিই একমাত্র ঐশী কিতাব যা তার মূলরূপে সংরক্ষিত আছে।

🔗দ্বীনের পূর্ণতা:

আল্লাহ তা'আলা কুরআনের মাধ্যমেই দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করেছেন।
➤ সূরা আল-মায়িদাহ (5:3): "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।"

 আর তোমার রবের বাণী সত্যরূপে ও সুবিচারপ্রসূত পূর্ণ হয়েছে। তাঁর বাণীসমূহের জন্য কোনো পরিবর্তনকারী নেই আর তিনি সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন-6:115

দ্বীনের পূর্ণতা ঘোষণা করার অর্থ হলো, মৌলিক বিশ্বাস, ইবাদত, এবং জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল নির্দেশনা কুরআনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে। এর পরে দ্বীনের নামে নতুন কোনো মতবাদ বা নির্দেশনা যা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
    ~*~*~*~     ~*~*~*~

👉 নাযিলকৃত কিতাবের লেটেষ্ট ভার্সন: ১০০% বিশুদ্ধতার সহিত নাযিলকৃত আল-কোরআন:

সূরা আন নামল 27:6 

আর নিশ্চয় তুমি, প্রজ্ঞাময়, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন—এর কাছ থেকে অবশ্যই তোমাকে দেয়া হয়েছে কুরআন- (আরও দ্র: আয়াত 28:85, 24:1)

আর বলো, হক এসেছে এবং বাতিল বিলীন হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল হলো বিলীন। আর আমরা কুরআন থেকে যা নাযিল করি, তা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত। আর তা জালিমদের ক্ষতি ছাড়া বৃদ্ধি করে না-বনি ইসরাইল 17:81-82

সূরা ইউনুস (10:37): 

"আর এই কুরআন আল্লাহ ছাড়া কারো দ্বারা রচিত নয়। বরং এটি তার পূর্বের কিতাবসমূহের সত্যায়ন এবং কিতাবের বিশদ ব্যাখ্যা, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, যা জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে।"

সূরা ইউনুস (10:38-39): 

"নাকি তারা বলে, সে এটি রচনা করেছে? বলো, তবে তোমরা এর মতো একটি সূরা আনো এবং আল্লাহ ব্যতীত যাকে পারো ডাকো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। বরং তারা এমন বিষয়ের প্রতি মিথ্যারোপ করেছে, যার জ্ঞান তারা আয়ত্ত করতে পারেনি এবং যার ব্যাখ্যা এখনো তাদের কাছে আসেনি।"

সূরা ফুসসিলাত (41:41-42): 

নিশ্চয় যারা উপদেশবাণীকে (যিকর-কুরআন) ) অস্বীকার করেছে, যখন তা তাদের কাছে এসেছে। আর নিশ্চয় সেটা অবশ্যই এক শক্তিশালী কিতাব। অসত্য তার কাছে আসতে পারবে না, তার সামনে থেকে আর না তার পিছন থেকে। প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত—এর পক্ষ থেকে অবতরণ।


আল্লাহ কর্তৃক ওহীকে  ত্রুটিমুক্ত রাখা:

আল্লাহ নবীদেরকে ভুলত্রুটি থেকে রক্ষা করেন, বিশেষ করে ওহী প্রচারের ক্ষেত্রে।

সূরা জিন (72:26-28):

"(তিনিই) অদৃশ্য জগতের জ্ঞানী; তিনি তাঁর অদৃশ্য জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না, তবে তাঁর মনোনীত রাসূল ছাড়া। তখন তিনি তার সামনে ও পিছনে প্রহরী নিযুক্ত করেন। যেন তিনি জেনে নেন যে, তারা তাদের রবের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। আর তাঁর কাছে যা আছে, তা তিনি বেষ্টন করে রাখেন এবং প্রতিটি জিনিস তিনি সংখ্যায় পরিবেষ্টিত রাখেন।"

অনুধাবন: এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে যে, আল্লাহ তাঁর মনোনীত রাসূলদের প্রতি ওহী প্রেরণের সময় তাদের চতুর্দিকে প্রহরী (ফেরেশতা) নিযুক্ত করেন, যাতে ওহী সম্পূর্ণরূপে পৌঁছে যায় এবং কোনো প্রকার ভুল বা মিথ্যা তাতে প্রবেশ করতে না পারে। এটিই নিশ্চিত করে যে, কোনো নবী বা রাসূল শয়তানের প্ররোচনায় ওহীর সাথে কিছু যোগ করতে পারতেন না, কারণ আল্লাহ নিজেই ওহীর বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতেন।

✉ সরাসরি আল্লাহ কতৃক ফাইনাল এডিট করে আয়াত প্রকাশ:

আর তোমার পূর্বে আমরা কোনো রসূল পাঠাই নাই আর না কোনো নবী, কিন্তু যখনই সে আকাঙ্ক্ষা করেছে, শয়তান তার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মিশ্রণ ঘটিয়েছে। এরপর শয়তান যা মিশ্রিত করে আল্লাহ তা দূর করেন। তারপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে প্রজ্ঞাপূর্ণ করেন। আর আল্লাহ বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন, প্রজ্ঞাময়-22:52-53

    ~*~*~*~     ~*~*~*~

সালামুন আলা মুহাম্মদ সর্বশেষ নবী, এবং তাঁর প্রতি নাযিলকৃত কুরআন হলো সর্বশেষ আসমানী কিতাব। যেহেতু নবুওয়াতের সিলসিলা সালামুন আলা মুহাম্মদ--এর মাধ্যমে শেষ হয়েছে, তাই কিতাবের সিলসিলাও কুরআনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে।

সূরা আল-আহযাব (33:40): "মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের কারো পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।"

যখন নবুওয়াত শেষ হয়ে গেছে, তখন নতুন কোনো কিতাব আসার প্রশ্নই আসে না।

মুহাম্মদ (সা.)-কে সমগ্র মানবজাতির জন্য রাসূল হিসেবে ঘোষণা:

সূরা আল-আ'রাফ (7:158):
"বলো, হে মানবজাতি! নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল, যিনি আসমান ও যমিনের রাজত্বের মালিক..."

 নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও যারা ইহুদি হয়েছে আর সাবেয়ীরা ও নাসারারা- যারা আল্লাহর ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আমলে সলেহ করেছে, তাহলে তাদের ওপর কোনো ভয় নেই আর না তারা দুঃখিত হবে-2:62 (5:69, 5:64-68)


কুরআন শুধু পূর্ববর্তী কিতাবসমূহকে সত্যায়নই করেনি, বরং সেগুলোকে রহিতও করেছে তার সার্বজনীন ও সর্বকালীন বিধান দ্বারা। এখন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য একমাত্র হেদায়েতের উৎস হলো আল-কুরআন। অন্য কোনো কিতাব এখন আর আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে কার্যকরী নয়।
    ~*~*~*~     ~*~*~*~

সর্বশেষ সংস্করন (Latest version)  আল-কুরআন মান্যতার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা:

আর নিশ্চয় তুমি, প্রজ্ঞাময়, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন—এর কাছ থেকে অবশ্যই তোমাকে দেয়া হয়েছে কুরআন-সূরা আন নামল 27:6

কুরআন শুধু অমুসলিমদের জন্যই নয়, বরং পূর্ববর্তী  ও বর্তমান কিতাবধারীদের জন্যও একটি নির্দেশ। তাদেরকে আহ্বান জানানো হয়েছে কুরআনে বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য।

সূরা আল-মায়িদাহ (5:68): "বলো, হে কিতাবপ্রাপ্তগণ! তোমরা কোনো কিছুর ওপর নও, যতক্ষণ না তোমরা তাওরাত, ইঞ্জিল এবং তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠিত করো।"

এই আয়াতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী কিতাবধারীগণ প্রকৃতপক্ষে তাদের নিজস্ব কিতাবের ওপরও ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত নয়, যতক্ষণ না তারা সর্বশেষ নাযিলকৃত কিতাব, অর্থাৎ কুরআনকে মেনে নেয় এবং তার বিধান অনুযায়ী চলে। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, কুরআনের আগমনের পর পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের বিধান রহিত হয়ে গেছে এবং এখন একমাত্র কুরআনের অনুসরণই হেদায়েতের পথ।

সূরা আল-মায়িদাহ (5:15): "হে কিতাবপ্রাপ্তগণ! তোমাদের কাছে আমার রাসূল এসেছেন, যিনি তোমাদের কাছে কিতাবের বহু বিষয় স্পষ্ট করে বর্ণনা করেন যা তোমরা গোপন করতে এবং বহু বিষয় ক্ষমা করেন। তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে।"

এখানে 'আলো' (নূর) এবং 'স্পষ্ট কিতাব' (কিতাবুম মুবীন) দ্বারা কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। এটি পূর্ববর্তী কিতাবধারীদেরকে কুরআনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে এবং বলছে যে, এটি তাদের জন্য হেদায়েত।

যারা অনুসরণ করে রসূলকে; উম্মি নবী, যাকে তারা তাদের কাছে তাওরাতে ও ইঞ্জিলের মধ্যে লিখিত অবস্থায় পায়। যে তাদেরকে ন্যায়কাজের বিষয়ে আদেশ দেয় ও অন্যায়কাজ থেকে তাদেরকে নিষেধ করে এবং তাদের জন্য উপযুক্ত জিনিস হালাল করে এবং তাদের ওপর অনুপযুক্ত জিনিস হারাম করে। আর তাদের থেকে তাদের ভার ও শৃঙ্খলসমূহ অপসারণ করে, যা তাদের ওপর ছিল। অতএব, যারা তার প্রতি ঈমান আনে এবং তাকে সম্মান করে আর তাকে সাহায্য করে এবং তার সাথে যে নূর নাযিল করা হয়েছে তারা সেটা অনুসরণ করে, ওরাই সফল-7:157

কুরআন অস্বীকারের পরিণতি:

কুরআনকে সর্বশেষ হেদায়েত হিসেবে অস্বীকার করার পরিণতি সম্পর্কে কুরআন সতর্ক করেছে।
সূরা আল-বাক্বারাহ (2:6): "নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে, তুমি তাদেরকে সতর্ক করো বা না করো, তারা ঈমান আনবে না।"

কুরআনের আগমনের পর তাকে অস্বীকার করা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত:

সূরা ফুসসিলাত (41:41-42): "নিশ্চয় যারা যিকর (কুরআন) আসার পর তা অস্বীকার করে, (তাদের পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর)। আর নিশ্চয় এটি এক সুরক্ষিত কিতাব। বাতিল এর কাছে আসতে পারে না সম্মুখ দিক থেকেও না পশ্চাৎ দিক থেকেও। এটি প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত সত্তার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।"

আর বলো, হক এসেছে এবং বাতিল বিলীন হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল হলো বিলীন। আর আমরা কুরআন থেকে যা নাযিল করি, তা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত। আর তা জালিমদের ক্ষতি ছাড়া বৃদ্ধি করে না-বনি ইসরাইল 17:81-82

আর যারা ঈমান আনে ও আমলে সলেহ করে এবং সে বিষয়ে ঈমান আনে যা মুহাম্মাদের ওপর নাযিল করা হয়েছে আর তা তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য। তিনি তাদের থেকে তাদের ত্রুটিগুলো লুকিয়ে রাখেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করেন। সেটা এ কারণে যে, যারা কুফর করে তারা বাতিলের অনুসরণ করে। আর এটাও যে, যারা ঈমান আনে তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে হকের অনুসরণ করে। ওভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্তসমূহ উপস্থাপন করেন। সূরা মুহাম্মাদ 47:2-3

এই আয়াতগুলো কুরআনকে অস্বীকারকারীদের জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি এবং একই সাথে কুরআনের অভ্রান্ততা ও ঐশ্বরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে। যে কিতাব স্বয়ং আল্লাহ সংরক্ষণ করেন এবং যা সকল বাতিল থেকে মুক্ত, তা মান্য করা অবশ্যই বাধ্যতামূলক।

সর্বশেষ সংস্করণ (Latest Version) আল-কুরআন মান্যতা একজন বুদ্ধিমান ও সত্যসন্ধানী মানুষের জন্য এক অনিবার্য বাধ্যবাধকতা। এর কারণগুলি হলো:

■ এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত হেদায়েত।

■  আল্লাহ নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, ফলে এটি ১০০% বিশুদ্ধ ও অবিকৃত।

■  এটি পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাবের সত্যায়নকারী, সংরক্ষক এবং তাদের উপর কর্তৃত্বকারী।

■  কুরআনকে অস্বীকার করা হেদায়েত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নামান্তর এবং এর কঠোর পরিণতি সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ সতর্ক করেছেন।

তাই, মানবজাতির মুক্তির জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এবং সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার জন্য সর্বশেষ সংস্করণ আল-কুরআন মান্য করা অপরিহার্য।
    ~*~*~*~     ~*~*~*~

৩. মুসলিমের সংজ্ঞা এবং বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ:

ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী, একজন মুসলিম হতে হলে আল্লাহর প্রেরিত সকল নবী-রাসূল ও কিতাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়, যার মধ্যে সর্বশেষ কিতাব আল-কুরআনও অন্তর্ভুক্ত।

সূরা আল-বাক্বারাহ (2:285): "রাসূল ঈমান এনেছেন সে বিষয়ের প্রতি যা তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি নাযিল হয়েছে এবং মুমিনগণও। তাদের প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি। (তারা বলে) আমরা তাঁর রাসূলগণের কারো মধ্যে পার্থক্য করি না।"

এই আয়াতে স্পষ্টত উল্লেখ আছে যে, সকল কিতাবে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেহেতু কুরআন সর্বশেষ কিতাব, তাই এতে অবিশ্বাস করা মানে ঈমানের মূল ভিত্তিকে অস্বীকার করা।
~*~*~*~     ~*~*~*~

সারসংক্ষেপ:

কুরআনের উপরোক্ত আয়াতসমূহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি সুস্পষ্ট যে, সর্বশেষ নাযিলকৃত এবং অবিকৃত ঐশী গ্রন্থ হিসেবে আল-কুরআনকে মেনে নেওয়া মানবজাতির জন্য অপরিহার্য। যারা ইহুদি, খ্রিস্টান, সাবেয়ী অথবা অন্য যেকোনো ধর্মাবলম্বী হয়েও আল্লাহর সর্বশেষ কিতাব আল-কুরআনকে মেনে নেবে না, তারা হেদায়েত থেকে বিচ্যুত থাকবে এবং আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো 'কিছু'র ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে না। এর কারণ হলো, কুরআন শুধু পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারীই নয়, বরং সেগুলোর ওপর কর্তৃত্বকারী (মুহাইমিন) এবং সেগুলোর বিধানকে রহিতকারীও। কিয়ামতের দিন পর্যন্ত মানবজাতির জন্য এটিই একমাত্র পথপ্রদর্শক ও জীবনবিধান। তাই, কুরআনকে অস্বীকার করা মানে আল্লাহর সর্বশেষ বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করা এবং পরিণামে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।

কুরআনের আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এটি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের ধারাবাহিকতায় আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এটি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের মূল সত্যকে সত্যায়ন করে, সেগুলোর বিকৃতি থেকে আসল সত্যকে রক্ষা করে এবং আল্লাহ স্বয়ং এর সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করার কারণে এটি পৃথিবীর একমাত্র অবিকৃত ঐশী গ্রন্থ। নবুওয়াতের পরিসমাপ্তির কারণে এবং কুরআনের সার্বজনীন ও সর্বকালীন বিধানের কারণে, বর্তমানে এটিই মানবজাতির জন্য একমাত্র পথপ্রদর্শক এবং আল্লাহর নির্দেশাবলীর উৎস। অতএব, মুসলিম হিসেবে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, আল-কুরআনই সেই নির্ভুল ও চিরন্তন বাণী যা কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানবজাতির জন্য হেদায়েতের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।

 ১০০% বিশুদ্ধতার সহিত নাযিলকৃত আল-কুরআন হলো নাযিলকৃত কিতাবসমূহের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সংস্করণ। এর এই অকাট্য বিশুদ্ধতা, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের উপর এর কর্তৃত্ব, এবং এর সার্বজনীন ও সর্বকালীন আবেদন এটিকে মানবজাতির জন্য আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত একমাত্র এবং চূড়ান্ত হেদায়েত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। 

আল্লাহু আ’লামু (আল্লাহই অধিক জ্ঞাত)-৬:১২৪
আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post